সোমালয়

চৈত্রমাসের দুপুর বেলার রোদটা সবসময়ই একটু অন্যরকম। সবকিছুকে যেন তাতিয়ে রাখে। ঢাকার রাস্তার পিচ থেকে শুরু করে মানুষের মেজাজ পর্যন্ত। সেই হিসাবে হাতাহাতিও একটূ বেশি হওয়ার কথা অন্য সময়ের তুলনায়। আচ্ছা, পুলিশ ভাইদের কাছে এই বিষয়ে কি কোন তথ্য আছে ? থাকার কথা। সাধারন পরিসংখ্যানের কথা হওয়া উচিত – বছরের কোন কোন মাসে ব্যাক্তিগত হানাহানির সংখ্যা বেড়ে যায় ? তাছাড়া, এই তথ্যটা তাদের নিজেদের জন্যেও কাজে দেয়ার কথা – কোন মাসে নিজেরা একটু শান্তিতে রাতে ঘুমাতে পারবেন!

আজকে ভাবছি, সামনে কোন পুলিশ পেলে জিজ্ঞেস করবো। তবে নীলক্ষেতের কোন পুলিশকে জিজ্ঞেস করা যাবে না। পেদানী দিয়ে জেলে ঢুকায়ে দেয়ার সম্ভাবনা আছে। রিকশা আর গাড়ির জ্যামে যে কোন মানুষেরই মেজাজের পারদ আকাশে উঠে থাকার কথা, সে তুলনায় পুলিশ মেজাজ মঙ্গল গ্রহে থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। তবে, কোন এক অজানা কারনে, উনাদের মেজাজ সম্ভবত আরো বেশি ঠান্ডা হয়। যত বেশি রাস্তায় জ্যাম, তত বেশি মেজাজ ঠান্ডা। এমনকি ভয়াবহ জ্যামের মাঝেও উনাদের দেখেছি রাস্তার পাশে হকারের ছাউনির নিচে গিয়ে বসে আছে। ঠিক কি কারন, এটা কখনো উনাদের কারো কাছ থেকে শোনা হয় নি।

বিষয়গুলো জানা দরকার। জানার লিস্ট বেশি বড় হয়ে গেলে আমার আবার সমস্যা হয়। মাথা হ্যাং করে বসে থাকে। একজনের পরামর্শ শুনে এই সমস্যার সমাধানে গিয়েছিলাম এক সাইকোলজিস্টের কাছে। বেশ নামকরা ডাক্তার। ধানমন্ডি-১৫ তে সুন্দর চেম্বার খুলেছেন। চেম্বারের সব আসবাবপত্র পুরাতন হলেও ডাক্তার সাহেবের চেয়ারটা মনে হল নতুন। রিভলভিং চেয়ার, চারদিকে ঘোরে। উনার বসার ভাব দেখেই মনে হইছিল, চেয়ারটাতে বসতে সম্ভবত অনেক আরাম। তবে কোন কারনে উনার চোখ অসম্ভব লাল।

-কি নাম?

-স্যার, নাম তো আপনার এসিসটেন্ট প্রেসক্রিপশনের উপরে লিখে দিল।

-(ভ্রু কুচকিয়ে) আপনার কাছে জানতে চেয়েছি, এসিসট্যান্টের কাছে জানতে চাইনি।

-জ্বি স্যার। নাম সোমালয়।

একটু বিরক্ত হয়ে হাই তুলতে তুলতে-

-নামের অর্থ জানেন ? আর এই অদ্ভুত নাম রেখেছিল কে?

-জ্বি স্যার। নামের অর্থ জানি। চাদের বাড়ি। নাম রেখেছিল বাবা। উনি লেখক হুমায়ূন আহমেদের বড় ভক্ত ছিলেন, সাথে হিমু’রও বিশাল ভক্ত। তাই উনি আমার বড়ভাইয়ের নাম রাখেন হিমালয়। আর সেখান থেকে আমার নাম রাখেন সোমালয়।

-(বিশাল একটা হাই তুলতে তুলতে) তো বড়ভাই এখন কি করে?

-জানিনা, স্যার।

-(একটু ধমকের সুরে) কেন ? যোগাযোগ নাই?

-জ্বি না, স্যার। সুযোগ হয়নি। উনি উনার নামপ্রাপ্তির কয়েক ঘন্টা পরেই মারা যান।

-(ভ্রু কুচকে) মানে?

-মানে স্যার, উনি জন্মের পর তিন ঘন্টা মত বেচে ছিলেন। আমার সাথে পরিচয়ের সুযোগ হয়নি।

(ডাক্তার সাহেব মনে হল, একটু ধাক্কার মত খেলেন। পাগল মানুষজন মনে হয় মৃত্যু নিয়ে এভাবে কথাবার্তা বলে না)।

-হুম। (কিছুক্ষন ঝিম মেরে থাকলেন)। বলুন, আপনার সমস্যা কি হচ্ছে?

-চিন্তাভাবনা করতে সমস্যা হচ্ছে, স্যার।

-মানে ? (আবার ভ্রু কুচকে)

-মানে স্যার, ইদানীং রাস্তায় হাটাহাটির সময় চিন্তা করতে সমস্যা হয়। আগে মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে রেখে হাটতে পারতাম। এখন হাটতে গেলে অল্প কয়েকটা প্রশ্ন মাথায় এলেই হ্যাং করে যায়। নতুন কোন চিন্তা করতে পারি না। আগের চিন্তাগুলোই ঘুরপাক খায় মাথার মধ্যে।

-রাস্তায় হাটেন কবে থেকে?

-মনে নাই স্যার, বছরদশেক হবে। আবার কমও হতে পারে।

(চলবে)

Published by

Unknown's avatar

Lost in a broken world

A biologist by education. For now, trying hard to get my head into the scientific world. Will figure out the rest when it comes.

Leave a comment