মনের বারান্দায়

তুমি আমার পাশে বন্ধু হে,

বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো।

ট্রেনের বগির মাঝে টেবিলে কয়েকটা ছেলে গান ধরেছে। হাতে গিটার, সাথে ব্যাকপ্যাক দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোন কলেজে বা, ভার্সিটিতে পড়ে।

সেলিম ছেলেগুলোর পেছনের সিটেই বসে আছে। ও বাড়িতে যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে ডিউটি পড়াতে বাড়িতে যাওয়া হয়নি। ঈদের ৩য় দিন আজ, ট্রেন স্টেশন বেশ ফাকা ছিল। ট্রেনেও ভিড় তেমন নাই, তার উপরে ও বসে আছে এসি বগিতে। বেশ কিছুদিন পরে বাড়ি যাচ্ছে সেলিম। মা আর ছোটবোনটার সাথে বেশ কিছুদিন পরে দেখা হবে। গত বছর কুরবানী ঈদে ঘুরে এসেছে, আর যাওয়া হয় নি। এখন যাচ্ছে, তাও আবার রোজার ঈদের ২ দিন পর।

ছেলেগুলোর মাঝে একজনের হাতে গিটার, সাথে আরেকজন ট্রেনের টেবিলটাকে তবলা বানিয়ে ফেলেছে। আর ওদের সাথে আরো দুইজন ফ্রেন্ড গলা মিলাচ্ছে। এরা সবাইই সম্ভবত নন-এসি কোচে টিকেট কেটে উঠেছিল। কিছুক্ষণ আগে টিকেট চেকার এসে টিকেট আপগ্রেড করে দিয়ে গেছে। ছেলেগুলোর গানের আসর বেশ জমে উঠেছে। গিটার হাতে, সবুজ নামের ছেলেটা বেশ ভালোই গাইছে। একেকজন একটু পর পর “সবুজ, এই গানটা ধর”, বা “ঐ গানটা ধর”। আর সবুজ উৎসাহ নিয়ে সেই গানটা গাওয়া শুরু করছে। কিছুক্ষন পরে সেলিমও ওদের গানে তাল দেয়া শুরু করলো। এক ফাঁকে সবুজকে বললো – সবুজ ভাই, আপনার কোন গান নাই? নিজের জন্যে কোন গান লিখেন নাই? সেরকম কিছু গেয়ে শোনান।

সবুজ ছেলেটা একটু থেমে গেল। সেলিমের দিকে ঘুরে বললো – সত্যি শুনতে চান? সেলিম আগ্রহ নিয়ে ঘাড় নাড়লো। সবুজ গাইতে শুরু করলো–

বদ্ধ দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে আছি মনের বারান্দায়,

শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়,

হৃদয় জানালা দিয়েছি খুলে…

(গীটার ব্রেক)

হৃদয় জানালা দিয়েছি খুলে…

তোমার পাওয়ার আশায়।

শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়।

শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়।

……………………

সেলিম কিছুটা আনমনা হয়ে গেল গানটা শুনতে শুনতে। কয়েক বছর আগেও একজনের দেখা পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতো। অপেক্ষার প্রহর শেষ করে সে অন্যপাড়ে চলে গেছে। অসম্ভব জেনেও সেলিম মাঝে মাঝে মনের অজান্তেই তার দেখা পাওয়ার আশায় থাকে এখনো, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে সম্ভবত। এই পাড়ে সেলিম এখন একা। মানুষ নাকি সামাজিক জীব! তবুও, প্রকৃতি মানুষের ডিএনএ’র মাঝে কোথাও একাকিত্বের জীন রেখে দিয়েছে। এজন্যেই শত প্রাচুর্যের মাঝে থাকলেও মানুষ অনেক সময়ই একাকী ফিল করে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে – invisible in the midst of the multitude. আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ভাষায়, “আমি সবসমই একা, এমনকি যখন আমি মানুষের ভীড়ে থাকি”।

সেলিমের প্রাচুর্য নেই, তবে অজানাতে হারিয়ে যাওয়া একজনের জন্যে একাকিত্ব আছে। কথায় বলে, সময়ে নাকি সব সেরে যায়। সেলিম এই কথার সাথে একমত না। সময়ের সাথে মানুষ কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে যায়। অনেকটা অভ্যাসের মত, কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে অভ্যাসের বাইরের জীবন চলে আসে। আজকে যেমন সেলিম নিজের অজান্তেই আবার রাইসাকে মনে করলো।

রাইসার সাথে পরিচয় হয়েছিল বছর চারেক আগে, এই ট্রেনেই বাড়ি যাওয়ার সময়। প্রথম দেখাতেই দু’জনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন, অনেক বিষয় নিয়ে। রাইসা সম্ভবত কথা বলেছিল, কারন সেলিম তাকে একজন মেয়ের থেকে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছিল, যেটা ও খুব বেশি ছেলেদের কাছে পায়নি। তার উপর কিছুদিন আগে রাইসার ব্রেক আপ হয়েছিল তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে, যার কাজ ছিল রাইসার প্রতিটা বিষয়ে খবরদারি আর নিয়ন্ত্রণ করা। একরোখা আর মুখের উপর কথা বলা টাইপ স্বভাবের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও রাইসার কাছে প্রথমে খারাপ লাগে নি। মনে হত, তার কথা শোনা আর কাজে সাপোর্ট দেয়ার জন্যে কেউ একজন তো আছে। কিন্তু, কিছুদিন পরে ধীরে ধীরে ছেলেটা রাইসার ছোট ছোট বিষয় নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করা শুরু করলো। রাইসাকে সবসময়ই কোন কিছু “এভাবে না করে ওভাবে করলে ভালো হত” বলাটা যেন তার অভ্যাস হয়ে পড়েছিলো। আর এভাবে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত ছেলেটাই সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়, যদিও রাইসা চেয়েছিল এভাবে সম্পর্কটা না ভাঙতে।

ট্রেনে সেদিন কথা বলা আসলে সেলিমই শুরু করেছিল। কোন এক কারনে ঐদিনের কথাগুলো সেলিমের খুব ভালো মনে নেই। শুধু মনে আছে, অসম্ভব সুন্দর চোখের একজন মানুষের সাথে ঐদিন তার দেখা হয়েছিল। হতে পারে, ভালবাসার মানুষদের এ কারনে বার বার দেখতে মন চায়। আর শত্রুদের একবার দেখলেই দীর্ঘদিন তাদের চেহারা মনে থাকে। কথাও মনে থাকে। হয়তো একই কারণে সেলিম চোখ বন্ধ করলে কেন জানি রাইসার সবটুকু দেখতে পায় না। শুধু মাথায় আসে, একজোড়া চোখ আর সুন্দর হাসির মায়ায় পড়েছিল সে। কোথায় যেন একবার পড়েছিল –  উড়ে যায় পাখি, পড়ে থাকে পালক। মানুষ মরে যায়, কিংবা হারিয়ে যায়, কিন্তু তার জন্যে মায়া হারায় না। হয়তোবা, না পাওয়া আর হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্যেই মানুষের মায়া থাকে বেশি। সব হারিয়ে গেলেও মায়া রয়ে যায়।

আজ অনেকদিন পর রাইসার কথা মনে পড়লো। সেই ট্রেনে প্রথম দেখার সময় সেলিমের সাহস হয়নি রাইসার ফোন নাম্বার চাওয়ার। তবে, নিয়তি যেন লিখে রেখেছিল, ওদের দু’জনের কথা, যেন আবার তাদের দেখা হবে। হয়েও ছিল তাই। প্রথম দেখার মাস দুই পরে আবার দেখা হয় দু’জনের। সেলিম ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ছিল বাসের অপেক্ষায়। আর সেই বাসের অপেক্ষাই যেন শাপেবর হলো ওর জন্যে। হঠাৎ কাঁধে টোকা পড়তেই ঘুরে তাকিয়ে দেখে রাইসা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আবারও কথা হলো সেদিন। বাস আসতে দেরি ছিল, সেই ফাঁকে দু’জনের জমে থাকা সংকোচগুলোও যেন বাসের ধোঁয়ার মতোই উবে গেল। ফোন নম্বর আদান-প্রদান হলো। সেই থেকে শুরু।

ফোনে কথা বলতে বলতে কখন যে রাত ভোর হতো, দু’জনের কেউই টের পেত না। রাইসা সেলিমের মাঝে এক অদ্ভুত মুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। আগের সম্পর্কের সেই দমবন্ধ করা শাসন বা খবরদারি সেলিমের মধ্যে ছিল না। সেলিম বরং চাইত, রাইসা তার বন্ধুদের সাথে সময় কাটাক, নিজের মতো করে বাঁচুক। রাইসার বন্ধুদের সাথে সেলিমেরও ভালো খাতির হয়ে গিয়েছিল। এই স্বাধীনতা আর বিশ্বাসের মাঝেই রাইসা নতুন করে সেলিমের প্রেমে পড়ে। তবে, প্রেমটা ছিল অনেক ধীরস্থির, অনেক বেশি গভীর। রাইসা মনে মনে অপেক্ষা করত, কবে সেলিম তাকে ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলবে।

তিন মাস পরে এক বুধবারের কথা। সেদিন রাইসার জন্মদিন আর আকাশজুড়ে আষাঢ়ে মেঘের ঘনঘটা, যেন শহরকে ধুয়ে মুছে বিশুদ্ধ করবে, এই প্রয়াস । সকালে ঘুম ভেঙে এমন আবহাওয়া দেখে সেলিম ভাবলো, আজকে রাইসাকে ওর ভালোবাসার কথা বলবে, যদিও ঠিক শিওর না, কিভাবে বলবে। যাওয়ার পথে ফুটপাথে দেখলো, এক পিচ্চি কয়েক গুচ্ছ কদম ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রি করার জন্যে। সেলিম কিছু না ভেবে বললো, সবগুলো কদম ফুল দিয়ে একটা তোড়া বানিয়ে দিতে। পিচ্চি একটু অবাক হয়ে ওর মা’কে ডাকলো। সেলিম বুঝিয়ে বলার পরে ঐ পিচ্চির মা মুচকি হেসে ৪টা তোড়া ভেঙ্গে একটা বিশাল তোড়া বানিয়ে দিলো। বর্ষাকালের মেঘ আর কদমফুলের ভক্ত অনেক পাগল আছে, ফুটপাথের থাকা মানুষেরা এটা জানে।

রাইসা হলের সামনের বাগানবিলাসের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পরে সেলিমকে দেখলো, একটু অবাকই হলো। সেলিমের হাতে বিশাল আকারের এক কদম ফুলের তোড়া। রাস্তার সবাই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার হলেও ঘুরে দেখছে। ও জানে, সেলিম অন্যদের থেকে আলাদা, অন্য রকমের রোমান্টিক মানুষ, প্রকাশ করে না। আর আজকে তার হাতে এত ফুল অবাক না হয়ে উপায় নেই। সেলিম এসে কোন কথা না বলে একটু হেসে, রাইসার হাতে ফুলের তোড়াটা তুলে দিলো। রাইসার চোখে যেন হাসির ঝিলিক দেখতে পেল সেলিম। তবে, তোড়াটা এতই বড়, যে এটা হাতে ধরে রাখাও মুশকিল। রাইসা ফিক করে হেসে ফেললো। সেলিমও হেসে ফেললো ওর হাসি দেখে। যারা তখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তারা খুব সুন্দর একটা দৃশ্য দেখলো। দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে একটা বিশাল কদম ফুলের তোড়া হাতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

সেলিম হাসতে হাসতে বললো, “জানো রাইসা, আমার খুব শখ – কোনো এক ঝুম বৃষ্টির দিনে আমার ভালোবাসার মানুষটার হাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় ভিজব। তুমি কি আমার সেই স্বপ্নটা সত্যি করবে, চাইলে সাথে এই কদম ফুলগুলোও রাখতে পারো?”

সেলিমের প্রপোজালটা হয়তো সিনেমার মতো সাজানো কোনো ডায়লগ ছিল না, বরং খুব সাদামাটা। তবে, সেটাই রাইসার হৃদয়ে দাগ কাটার মতো ছিল। রাইসা ‘না’ করতে পারেনি। পরদিন সত্যিই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। দু’জনে একসাথে সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজেছিল। ইট-পাথরের এই শহরের রাস্তায় তখন ট্রাফিকের সাথে মানুষও পানিবন্দি। দু”জনে তখনও ফুটপাথে বসা। সেলিম রাইসার হাত ধরে খুব আস্তে করে বললো, “আমার বউ হবে?”

রাইসা থমকে গিয়েছিল। সম্ভবত চোখে পানিও চলে এসেছিলো, কিন্তু সেটা হয়তো বৃষ্টির জন্যে বোঝা যায় নি। সে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

সেদিন দু’জনেই একবুক আনন্দ নিয়ে ফিরেছিল। রাইসা ঠিক করল, পরদিন সকালে সে তার সবচেয়ে প্রিয় নীল শাড়িটা পরে সেলিমকে সারপ্রাইজ দিতে যাবে।

পরদিন সকাল আটটা। সেলিমের ঘুম তখনো ভাঙেনি। বালিশের পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠলো। রাইসার নম্বর। ঘুমজড়ানো গলায় ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক অপরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

— “ভাই, এই ফোনের মালিক নিউ মার্কেটের মোড়ে রোড এক্সিডেন্ট করেছেন। অবস্থা খুব খারাপ। আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।”

সেলিমের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। ওপাশের কথাগুলো তার মাথায় ঢুকছিল না। আজকে  সে তার মাকে রাইসার কথা জানাতে চেয়েছিল।

সেলিম পাগলের মতো ছুটল হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। যেই মানুষটা কয়েক ঘণ্টা আগেও শাড়ি পরে তাকে চমকে দেওয়ার কথা ভাবছিল, সে এখন সাদা কাপড়ে মোড়া। সেলিম হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে হাটতে হাটতে বের হয়ে এল, কোথায় যাবে, জানে না। এটা কি স্বপ্ন? নিশ্চয়ই স্বপ্ন। এখনই ঘুম ভাঙবে তার।

পরদিন রাইসার এক বন্ধু সেলিমকে ফোন করে জানাজায় যাওয়ার কথা বলল। সেলিমের মনে নেই সে কী উত্তর দিয়েছিল। সে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাইসা নেই, এটা কিভাবে সম্ভব, ওর মাথায় আসছিল না। মাটির নিচে রাইসাকে রেখে আসার সময় মনে হচ্ছিল, তার নিজের সত্তাটাকেও সে ওখানেই দাফন করে দিয়ে এসেছে।

এরপর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। জীবন থেমে থাকেনি। সেলিম আবার চাকরিতে জয়েন করেছে, চাকরি বদলেছে, প্রমোশন হয়েছে। ওর মা বহুবার বিয়ের কথা বলেছেন, কিন্তু সেলিম প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। “বউ” ডাকটা সে রাইসাকে দিয়ে ফেলেছিল, এই ডাকে অন্য কাউকে ডাকার সাধ্য তার নেই।

সেলিম বাস্তবে ফিরে এলো। ট্রেনের শব্দ আর সবুজের গান মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে সবুজকে থ্যাংকস দিল। বলল, “গানটা খুবই সুন্দর। অনেক আগের একজনকে মনে করিয়ে দিলে।”

সবুজ হাসলো। তারপর ওরা অন্য গান ধরল। ওদের গান শুনতে শুনতে আর ট্রেনের একঘেয়ে দুলুনিতে সেলিম ঘুমিয়ে গেল একটু পরে।

হঠাৎ ঘুম ভাঙল সেলিমের। চারপাশটা কেমন যেন নিস্তব্ধ। ট্রেনের সেই পরিচিত চাকার শব্দ নেই। বাইরে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বগির ভেতরের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, তাতে অন্ধকার কাটছে না খুব একটা। সেলিম খেয়াল করল, ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। সামনের সিটে সবুজ বা তার বন্ধুরা কেউ নেই। সবাই হয়তো নেমে গেছে। সেলিম উঠে দাঁড়াল। গেটের সামনে একজন স্টাফ জানাল, সিগন্যালে আটকা পড়েছে ট্রেন। চট্টগ্রামের এক্সপ্রেস ট্রেনটা ক্রস করার পর আবার ছাড়বে। সময় লাগবে।

ওদের ট্রেনটা দাড়িয়েছে একটা ছোট্ট স্টেশনে, নাম ‘জামতলী’। সেলিম ট্রেন থেকে নামল। প্লাটফর্মে তেমন কেউ নেই বললেই চলে। সে হাঁটতে শুরু করল। আজ কেন জানি রাইসার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। হাঁটতে হাঁটতে সে যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল একটু। হঠাৎ এক তীব্র বিদ্যুৎ চমকে তার সেই ঘোর কাটল। আকাশের দিকে তাকাতেই দেখলো, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সাথে মেঘ ডাকাও শুরু হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সেলিম দৌড়ে স্টেশনের একটা টিনের চালার নিচে গিয়ে দাড়ালো।

বৃষ্টির এই শব্দ, মাটির সোঁদা গন্ধ, সব কিছু আজ বড্ড বেশি রাইসাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাইসার সেই চোখ দুটো, কী মায়া ছিল তাতে! সেলিম অপলক তাকিয়ে থাকত। রাইসা তখন লজ্জা পেয়ে হেসে বলত, “কী দেখো?”

সেলিম উত্তর দিতে পারত না। কী এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল সেই চোখে! আর তার গায়ের সেই ঘ্রাণ… আজও যেন সেলিম সেই ঘ্রাণ পাচ্ছে। বৃষ্টির ঝাপটায় রাইসার স্মৃতিগুলো আজ বড় বেশি জীবন্ত হয়ে উঠছে।

হঠাৎ খেয়াল করলো, ট্রেনটা ধীরগতিতে চলতে শুরু করেছে। হুইসেল দেয়নি, কিন্তু নিঃশব্দেই চাকাগুলো গড়াতে শুরু করেছে। সেলিম বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে ট্রেনের দিকে পা বাড়াল।

ঠিক তখনই, ট্রেনের একটি বগির দরজায় চোখ পড়তেই সেলিমের শরীরটা অবশ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

রাইসা!

ঠিক সেই নীল শাড়িটা পড়ে রাইসা আবছা আলো ছায়ায় ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই চিরচেনা ভুবন ভোলানো হাসি। সেলিম নড়তে পারল না। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার শরীরে বিধছে, সে কি স্বপ্ন দেখছে?

রাইসা চিৎকার করে উঠল, “সেলিম! তাড়াতাড়ি আসো! দাঁড়িয়ে আছো কেন? ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে তো! ভিজে যাবে, জ্বর আসবে তো! তাড়াতাড়ি আসো সেলিম, তাড়াতাড়ি…”

সেলিম নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এটা কি সত্যি? নাকি মনের ভুল? কিন্তু, রাইসার ওই চোখ, ওই হাসি, ওই কণ্ঠস্বর, ওই আকুতি – কিভাবে ভুল হতে পারে!

রাইসা আবার ডাকল, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সেলিম, জলদি এসো! ট্রেন স্পিড বাড়াচ্ছে! দৌড় দাও, সেলিম। না হলে মিস হয়ে যাবে…”

সেলিম আর কিছু ভাবল না। যুক্তি, বুদ্ধি, বাস্তবতা – সব যেন তুচ্ছ হয়ে গেল সেই মুহূর্তের কাছে। সে দৌড় শুরু করল। বৃষ্টির পিচ্ছিল প্লাটফর্ম দিয়ে সে পাগলের মতো ছুটছে। ট্রেন গতি বাড়াচ্ছে। রাইসা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। সেলিম প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। তাকে ট্রেন ধরতেই হবে। রাইসার হাতটা ধরতেই হবে।

বাতাস চিরে সেলিম চিৎকার করে বলল, “আমি আসছি, রাইসা! আমি আসছি! আমাকে ফেলে যেও না!”

প্লাটফর্ম শেষ হয়ে আসছে। ট্রেনের গতি বাড়ছে। সেলিম তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছে রাইসার বাড়ানো হাতটা ধরার জন্যে। এবার সে আর কিছুতেই রাইসাকে হারাতে দেবে না, কিছুতেই না…

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

কালভার্ট

রুস্তম অন্ধকারে কাদার মধ্যে পড়ে গেল। একবারে হাঁটু পর্যন্ত কাদার মধ্যে দেবে গেছে। একরাশ বিরক্তিতে গালি দিয়ে উঠলো। নতুন প্যান্টটা একবারে শেষ। গতমাসেই সাধুগঞ্জ বাজারের সৈয়দ মেম্বারের দোকান থেকে কাপড় কিনে দবির দর্জির দোকান থেকে বানিয়েছে। শার্টটাও নতুন, একসাথেই বানানো। দবির দর্জি ওর ছোটবেলার বন্ধু বলে শার্ট বানানোর টাকাটা আর দেয়া লাগে নাই, আর কাপড়টাও ওর দোকান থেকেই নিয়েছিল। ফ্যাচফ্যাচানি বৃষ্টি দেখেও নতুন কাপড় পরে বের হয়েছে। সেটাই মনে হচ্ছে, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে, একটু ভালো জামাকাপড় পরে না গেলে হয় না।

এখনও বছর পার হয় নাই, রুস্তমের বিয়ে হয়েছে মোমেনার সাথে। রুস্তমের গ্রাম, ভাসানগাঁ থেকে এক গ্রাম পরে, চড়ুইকোল গ্রামের মেয়ে মোমেনা। ওর সাথে রুস্তমের পরিচয়ও একরকম ঝড়বৃষ্টির সূত্রে। গত বছরের শুরুর দিকের কথা, রুস্তম গিয়েছিল চড়ুইকোল বিলে মাছ ধরতে। বর্ষাকালে বিলের চারপাশ পানিতে ভেসে গিয়ে বিলটা এক বিশাল আকার ধারণ করে। এর মাঝে বাতাস উঠলে বিলের পানিতে নদীর মত বড় বড় ঢেউ ওঠে। প্রতিবছরই এক-দুইটা ঝড় হয় বর্ষাকালে আর দুকূল ছাপানো বিলের বড় ঢেউয়ে ছোট নৌকা সামলাতে না পেরে উল্টে যায়। বছর দুই আগে পাশের গ্রামের কছর মোল্লার ছেলে বিল্লাল এই বিলেই ডিঙি নৌকায় মাছ ধরতে এসে রাতের ঝড়ে নৌকা উল্টে মারা গিয়েছিল। একদিন পর বিল্লালের লাশ ভেসে উঠেছিল, পুরো শরীর ফোলা, আর চোখ যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসছে। রুস্তমেরও শখ আছে বিলে মাছ ধরার, ঐদিন রাতেও গিয়েছিল। ভোররাতে উঠলো তুফান, তখন রুস্তম একেবারে বিলের মাঝে। বাতাস শুরু হচ্ছে দেখে ও বৈঠা মারা শুরু করলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, কূলে যাওয়া দরকার। কিছুক্ষণের মাঝে বাতাস বেড়ে গেল অনেক, দুই-মানুষ সমান উঁচু ঢেউ ওঠা শুরু হল। রুস্তম নৌকা সামলানোর চেষ্টা করতেই করতেই সামনে মনে হল, এক আকাশসমান ঢেউ, মুহূর্তের মাঝে নৌকা উল্টে গেল। রুস্তম জান হাতে নিয়ে সাঁতরানো শুরু করলো, কিন্তু কূল আর পায় না। একবার মনে হচ্ছে কাছে, আরেকবার স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে উল্টো দিকে। এদিকে শরীরও আস্তে আস্তে ছেড়ে দিচ্ছে। একটু পরে ঝড়ের বেগ একটু কমে এলে স্রোতের বেগও একটু কমলো। রুস্তম অনেক কষ্টে কূলে পৌঁছে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।

অন্যদিকে মোমেনার ভাই, কাদেরের দোকান আছে সাধুগঞ্জ বাজারে। মাঝরাতে দোকান বন্ধ করে ফেরার সময় ঝড়ে আটকে গিয়েছিল সে। সাথে তার দোকানের কর্মচারী, সোবহানও ছিল। ঝড় কমে যাওয়ার পরে বাড়িতে ফেরার সময় রুস্তমকে চোখে পড়ে ওদের, বিলের ধারে পড়ে আছে, জান আছে কি নেই, বোঝা মুশকিল। কাদের কাছে গিয়ে দেখলো, বেঁচে আছে। সোবহান চিনতেও পারে রুস্তমকে, ভাসানগাঁর ছেলে। দুইজন মিলে কোনমতে ঘাড়ে করে কাদেরের বাড়িতে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে রুস্তমের জ্ঞান ফেরে। তখন সোবহান গেছে ভাসানগাঁতে রুস্তমের বাড়িতে জানাতে আর কাদের চলে গেছে দোকানে। ঐদিনই প্রথম মোমেনার সাথে রুস্তমের দেখা হয়। তার মাসখানেক পরে সাধুগঞ্জ বাজারে দ্বিতীয় দেখা। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে ভালো লাগা শুরু আর ছয় মাসের মাথায় দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে।

আজকে রুস্তম যাচ্ছে শ্বশুরবাড়িতে, মোমেনাকে আনতে। গত সপ্তাহে মোমেনার বোন-দুলাভাই আসছে বাড়িতে, তাই মোমেনা বাপের বাড়ি গেছে ঘুরতে। বেশ কিছুদিন পর বোন আর বোনের ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা হয়েছে ওর। আর এই শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে এখন রুস্তম কাদাভর্তি পা নিয়ে ভাবছে, এতদূর এসে কাদামাখা অবস্থায় কি করবে? ফিরে যাওয়াও মুশকিল, আবার এ অবস্থায় মেহমান হয়ে যাওয়াও কঠিন। দোষ যদিও রুস্তমেরও আছে। ওর মা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে অনেকবার করে বলেছিল, ছাতা আর টর্চলাইট নিয়ে যেতে। রুস্তম একগুয়েমো করে নিয়ে আসে নাই। মায়ের কথা মাথায় থাকতে থাকতেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেল। আর এখন মাঝপথে এসে এক পা হাঁটুসমান কাদার মধ্যে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাত নিশুতি না হলেও একেবারে কমও হয় নাই। আসলে ওর যাওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যাবেলায়। ভেবেছিল, ঘোষবাড়ি থেকে মিষ্টি নিয়ে যাবে, কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়েই দোস্ত রমিজের সাথে দেখা। আর রমিজের সাথে দেখা হওয়া মানেই হল, এক দান তাস না খেলে যাওয়া যাবে না। এভাবে একদান একদান করতে করতে শেষে ৮টা গেম শেষ করে তারপর ওঠা। এজন্যেই আসলে আসতে আসতে রুস্তমের একটু দেরি হয়ে গেছে, আবার মানিক ঘোষও তার মিষ্টির দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছে। শুকনার সময় হলে ভ্যান নিয়ে সাধুগঞ্জ বাজারে গিয়ে মিষ্টি নিয়ে চড়ুইকোল চলে যেতে পারতো। এই ভরা বর্ষায় কাদার মধ্যে ভ্যান তো দূরে থাকুক, মোষের গাড়ি ছাড়া আর কিছু চলার উপায় নেই। সাইকেল থাকলেও চালানো দায়। গতবছর চেয়ারম্যান ভোটে এ ভাসানগার লুৎফর মেম্বার হয়েছে আর সবাইকে কথা দিয়েছে যে, এই বর্ষা শেষ হলে রাস্তায় ইট দেয়ার কাজ শুরু করবে। রুস্তম সম্পর্কে লুৎফরের চাচাতো ভাই আর ভোটের সময় জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছে। ওর বিশ্বাস, লুৎফর তার কথা রাখবে আর রাস্তাও এই বর্ষার পর উন্নতি হবে।

তাই, অগত্যা এই বৃষ্টির মধ্যেই রুস্তম রওনা দিয়েছে খালি হাতেই। ভেবে রেখেছে, কাল কাদের ভাইয়ের সাথে বাজারে গিয়ে সবার জন্যে মিষ্টি আর খাবারদাবার কিনে আনবে কিছু। কাদা পায়ে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শেষে সিদ্ধান্ত নিল যে, চড়ুইকোলেই যাবে এখন। যদিও খালি হাতে যাচ্ছে, তবুও জামাই বলে কথা, আপ্যায়ন তো পাবেই, আর কাল বাজার থেকে মিষ্টির ব্যবস্থা করবে। আর মোমেনাকেও সপ্তাহখানেক কাছে পায় না। সব মিলিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার থেকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়াটাই রুস্তমের কাছে সবদিক দিয়ে ভালো মনে হচ্ছে। সব ঝামেলার জন্যে হারামী রমিজটাই দায়ী। মনে মনে রমিজকে গালি দিতে দিতে কাদা পায়ে রুস্তম আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলো।

চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে তিনমাথার বটতলায় রুবেল মাওলার দোকানের হারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছে। একটু সামনে ক্যানালের উপর কালভার্ট; মুরুব্বিদের কাছে শুনেছে, বিলের পানি কমে গেলেও যেন জমিতে পানি দেয়া যায়, সে জন্যে জিয়ার আমলে নাকি এই ক্যানালগুলো কাটা হয়েছিল। এ জন্যে কালভার্টটা রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা উঁচু। অসুবিধা হল, উঁচু ঢালটুকুও মাটির, যার কারণে বর্ষাকালে কাদায় আটকে ভ্যান প্রায়ই উল্টে যায়। রুস্তমের শরীর ইতিমধ্যেই কাদায় ভরা, নতুন করে আর কতটুকুই বা কাদা লাগবে। রুস্তম কাদার পরোয়া না করে সোজা কালভার্টে উঠে গেল।

রুস্তম রাস্তা নিয়ে মনে মনে গালি দিতে দিতে কালভার্টের উপর হাঁটতে লাগলো। মোমেনাকে এক সপ্তাহ না দেখে মনে হচ্ছে, কতদিন পর আজকে তার সাথে দেখা হবে। সারা গা কাদায় ভরা থাকলেও অজান্তেই রুস্তমের মুখে একটু হাসি পেয়ে গেল। মোমেনা বিয়ের পরে বাপের বাড়ি তেমন একটা আসে নাই, আর যদিওবা আসছে, সেটাও রুস্তমের সাথে। আজকে ওর জন্যে কিছু না নিয়ে যেতে পেরে খারাপ লাগছে। রুস্তম বাজারে গিয়েছে, কিন্তু মোমেনার জন্যে কিছু কিনে নাই, এমন গত এক বছরে হয় নাই। হারামী রমিজের জন্যে আজকে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। বিয়ের আগে রুস্তমের বিড়ি খাওয়ার অভ্যাস ছিল। মোমেনার কথাতে সেটা এখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছে, কিন্তু এই তাস-জুয়ার নেশাটা পুরো ছাড়তে পারে নাই। চেষ্টা করতেছে এখনো, জুয়ার আসরে এখন বসে না বললেই চলে, তারপরও রমিজ ডাকলে অনেকসময়ই না করতে পারে না। তবে, শার্টের ভেতরের বুকপকেটে এখনও বিড়ি আর ম্যাচ থাকে ওর। মাঝে মাঝে বের করে আগুন জ্বালায় না, শুধু গন্ধ নেয়।

এসব ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে রুস্তম। হঠাৎ করে মনে হল, কোন একটা ঝামেলা হয়েছে কোথাও, চারিদিকে তাকালো, অন্ধকারে তেমন কিছু চোখে পড়লো না। আবার সামনের দিকে পা বাড়ালো। একটু পরে বুঝলো, ঝামেলাটা কি! ও অনেকক্ষণ ধরে আনমনে হাঁটছে, কিন্তু ওর মনে হচ্ছিলো, পায়ে রাস্তার কাদা তেমন বাধছে না, এখন বুঝতে পারলো, কেন?

সে এতক্ষণ ধরে কালভার্টের উপরেই হাঁটছে, কিন্তু কালভার্ট পার হতে পারেনি।

রুস্তম ঠিক বুঝতে পারলো না, কি কারণে এমন হচ্ছে। এমনিতে গ্রামের জোয়ান, সাহসী ছেলে হিসেবে পরিচিত সে। একা একা রাত বিরেতে মাঝ বিলে মাছ ধরে বেড়ায়, কোনদিন কিছূ হয় নি। আর কিছু না ভেবে সে জোরে হাঁটা শুরু করলো। কালভার্টটা বড়জোর ৩০ সেকেন্ডের রাস্তা হবে, মিনিটখানেক হাঁটার পরে রুস্তমের চারপাশে তাকালো, বুঝলো আগের জায়গাতেই আছে। এবার একটু ভয় পেল, বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে।

রুস্তম দৌড় শুরু করলো কালভার্টের উপরে। পার হওয়ার জন্যে দৌড়াচ্ছে, নাকি ভয় পেয়ে দৌড়াচ্ছে—সে জানে না। হয়তো দু’টোই। কালভার্টের উপর কাদা কম হলেও ভালোই আছে, দৌড়ানো যায় না। কিন্তু, রুস্তমের মাথায় এখন ভয় ঢুকে গেছে। এখন আর ভাবার সময় নেই যে, কাদার উপর দৌড়ালে আছাড় খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। একটু পরে হলোও তাই। কাদার উপর পিছলে ধপাস করে পড়ে গেল। পায়ে আর কোমরে বেশ টান লেগেছে মনে হচ্ছে, কাদার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে হাপাতে লাগলো রুস্তম। মাথায় চিন্তা এলো, মনে হয় ও স্বপ্ন দেখছে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ পড়ে রইলো, যেন চোখ খুলে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।

রুস্তম একটু পরে চোখ খুলে দেখলো, কালভার্টের আগের জায়গাতেই পড়ে আছে, সারা গায়ে কাদা। উঠে বসলো, কি করবে, কি করা উচিত, বুঝতে পারলো না। হঠাৎ মনে পড়লো, দূরে রুবেল মাওলার দোকানের আলো দেখা যাচ্ছিল। তাকিয়ে দেখলো, এখনো দূরে টিপটিপ করে আলো জ্বলছে। রুস্তম গলা ছেড়ে ডাক দিলো—

—রুবেল ভাই…

ডাকটা যেন চারদিক থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরলো। কিন্তু রুবেলের কোন জবাব পেল না রুস্তম। আবার হাঁক ছেড়ে ডাক দিলো—

—রুবেল ভাই… আমি ভাসানগাঁর রুস্তম।

এবার কেন যেন মনে হল, দূরের আলোটা নড়ে উঠলো। রুস্তম একটু আশার আলো দেখতে পেল। উঠে দাঁড়ালো কালভার্টের উপর। আবার হাঁটা শুরু করলো, যদিও তখনও একচুলও আগাতে পারছে না। কেন যেন মনে হল, দূর থেকে আলোটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। সাথে মনে হচ্ছে, কেউ একজন যেন ওকে ডাকছেও। খুব আস্তে আস্তে মনে হচ্ছে শোনা যাচ্ছে।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

একটু পর পর দুইবার করে ডাক আসছে। একটু পরে রুস্তমের মনে হল, ডাকটা আরেকটু স্পষ্ট হল।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

একটু ভালোমত শুনতে পেয়ে রুস্তম এবার অবাক হয়ে গেল। গলাটা মোমেনার! কিন্তু, এত রাতে মোমেনা এই রাস্তায় কি করছে! তিনমাথার বটতলা থেকেও ওদের বাড়ি অন্তত আধাঘন্টার হাঁটা পথ, সাথে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আর পথে কাদা তো আছেই। আবার সেই ডাক—

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

মোমেনা আলোটা নিয়ে আরো একটু কাছে এসেছে। রুস্তম এখন অন্ধকারের মাঝেও একটা সাদা কাপড়ের ছায়ার মত দেখতে পাচ্ছে। মোমেনা সামনে একটা সাদা আলো ধরে আছে, মনে হচ্ছে হ্যাজাক লাইট। রুস্তম আবারও চেষ্টা করলো জোরে হাঁটার, কিন্তু আগের মতই একটুও সামনে আগাতে পারলো না, কালভার্টের উপরেই আটকে রইলো। ওর জোরে হাঁটার চেষ্টাটা যেন মোমেনা দূর থেকে বুঝতে পারলো, কিভাবে বুঝলো, কে জানে।

মোমেনা ততক্ষণে বেশ কাছে চলে এসেছে। রুস্তম দেখলো, মোমেনা সাদা কাপড় পরা, কি জন্যে, বুঝতে পারলো না। যদিও মোমেনার মুখ দেখতে পারছে না, তবে রুস্তম তখনো চেষ্টা করছে এগিয়ে যাওয়ার। কালভার্টের মুখে এসে মোমেনা এবার ধমকের সুরে ডেকে উঠলো।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

এবারের ডাকে মোমেনার গলার স্বরে একটু অন্যরকম কিছু ছিল। রুস্তমের কেন যেন গলার স্বরটা স্বাভাবিক মনে হল না। মেয়েলি গলার সাথে কেমন যেন লোহার ঝনঝনে আওয়াজের মত গলা। মোমেনার কি হয়েছে যে, এমনভাবে কথা বলছে। আর হাতেও মনে হল হ্যাজাক লাইট না, কেমন যেন এক ধরনের সাদা আলো।

মোমেনা কালভার্টে উঠে রুস্তমের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে থাকলো। রুস্তম এবার মোমেনাকে দেখতে পেল আর একটু অবাকও হল। ও এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও আগাতে পারছে না, কালভার্টও পার হতে পারছে না। সেখানে মোমেনা কিভাবে হেঁটে হেঁটে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। আবার হাঁটার ধরনটাও অদ্ভুত। সারা শরীরে কোন নড়াচড়া নাই, যেন ভেসে ভেসে হাঁটছে। আর এতখানি কাদাপথ পার হয়ে এল, অথচ কাপড়ে কোথাও কাদার দাগ নাই। আবার বৃষ্টিতেও ভিজে নাই ও। আর এত সাদা আলো, কিন্তু কেন জানি, মোমেনার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে, ও কিছু বললো না। এ অবস্থা থেকে ও মুক্তি পেলেই বাঁচে। আর তার উপর মেয়েটা এতদূর হেঁটে এসেছে ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

রুস্তম বললো—মোমেনা, মাথায় ঘোমটা দিয়ে আছ কেন? আর তোমার মাথায় ছাতা কই? ভিজে যাইবা তো। আসো, এদিকে আসো। আমি কেমনে জানি, এইখানে আটকায়ে গেছি, আগাইতে পারতেছি না। হাতটা ধরো তো, দেখি আগাইতে পারি কিনা।

মোমেনা হাত বাড়িয়ে রুস্তমের হাত ধরলো।

রুস্তম বললো—ও আল্লাহ। তোমার হাত দেখি বরফের মতন ঠান্ডা। পুরাই তো ভিজে গেছ তাইলে। কিন্তু, তোমার হাতে দেখি জাদু আছে। এখন এই যে, আগাইতে পারতেছি আবার।

মোমেনা কিছু বললো না। রুস্তম সত্যি সত্যিই এখন হেঁটে আগাতে শুরু করেছে আবার। কিভাবে কি হল, সে বুঝতেছে না, তবে মোমেনাকে সাথে নিয়ে ও এখন আগাতে পারছে, এতেই সে খুশি। সারাগায়ে কাদা, না হলে মোমেনাকে এখানেই খুশিতে একটু বুকে জড়ায়ে ধরতো।

রুস্তম মোমেনার সাথে কয়েক পা এগিয়ে কেন যেন নিচের দিকে তাকালো। মোমেনার হাতের আলোতে চারপাশের কিছু জায়গাতে আলো হয়ে আছে। রুস্তম খেয়াল করলো, মোমেনার পা দেখা যাচ্ছে না। মুখও কেন জানি, উল্টো দিকে ঘুরায়ে রাখছে সে, কি জন্যে কে জানে। হঠাৎ মোমেনার হাতের দিকে চোখ পড়লো রুস্তমের, দেখে পিলে চমকে গেল। বড় কালো হাত, আঙুলের সংখ্যা পাঁচের বেশি বটেই, সাত-আটটা হবে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে রুস্তমের হাত-পা জমে গেল। মোমেনারূপী জিনিসটা মনে হয় বুঝলো, রুস্তম দাঁড়িয়ে পড়েছে। কিছুটা মোমেনার মত মেয়েলি গলার চেষ্টা নিয়ে ঝনঝনে গলায় জিজ্ঞেস করলো—

—কি হলো? হাঁটছ না কেন?

রুস্তম ততক্ষণে বুঝে গেছে, সে বিপদে পড়েছে। আর সাথে যে আছে, সে তো মোমেনা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বলে উঠলো—

—কে তুমি? তুমি তো আমার মোমেনা না।

রুস্তমের এ কথা শুনে জিনিসটা মনে হল, ওর দিকে ঘুরে তাকানোর চেষ্টা করলো। রুস্তম দেখলো, জিনিসটা ঘাড় ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে ওর দিকে ঘুরে মাথা উঁচু করলো। না ঘোরালেই মনে হয়, ভালো ছিল। জিনিসটাকে দেখে রুস্তম চিৎকার করে হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো, পারলো না। চিৎকার করে দোয়া ইউনুস পড়ে আরেকবার চেষ্টা করলো, তবুও জিনিসটা ওকে ধরে রইলো।

—লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্জালিমিন

জিনিসটা দেখতে কেমন, রুস্তম সেটা বুঝতে পারছে না। শুধু একবার দেখেছে, জিনিসটা মোমেনার মত চেহারা ধরে রাখার জন্যে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না, মুখটা যেন নড়ছে। হাত ছাড়ানোর জন্যে চিৎকার করতে করতে রুস্তম কালভার্টের উপর পড়ে গেল। দেখলো, জিনিসটার সাত আঙুলের হাত ওর মুখের দিকে এগিয়ে আসছে।

এমন সময় দূর থেকে কারো গলায় “রুস্তম, রুস্তম” বলে ডাক শোনা গেল। রুস্তম গলা চিনলো, রুবেল মাওলার। জিনিসটা ততক্ষণে রুস্তমকে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে কালভার্টের সাথে। এক হাত মুখের উপর, আরেক হাত বুকের উপর। রুস্তম যেন জীবনের শেষ শ্বাস নিয়ে একবার চিৎকার করলো—“রুবেল ভাই, বাঁচাও”। রুস্তমের মনে হল, কালভার্টের মেঝে যেন ফাঁক হয়ে ওকে কবরের মাঝে টেনে নিচ্ছে। বুকের বাতাস শেষ হয়ে আসছে। আরেকবার শ্বাস নেয়ার চেষ্টায় পুরো শরীর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। বাতাস আর পাচ্ছে না। একটুখানি বাতাসের জন্যে হাহাকার।

রুবেল মাওলা দূর থেকে টর্চের আলোতে দেখলো, কালভার্টের উপর একটা সাদা কিছু একজন মানুষের উপর বসে আছে। বেশ কিছুক্ষণ আগে সে রুস্তমের গলা শুনেছে। পাশে গ্রামের ছেলে, এত রাতে কি করছে, কে জানে। একটু আগে একটা গগনবিদারী চিৎকার শুনে একটা বিড়ি জ্বালিয়ে হাতে চার-ব্যাটারির টর্চ নিয়ে বের হইছে। কাছাকাছি গিয়ে বুঝলো, কেস খারাপ। এর আগেও কালভার্টের উপর এমন হইছে, রাতে মানুষের চিৎকার শোনা গেছে, আর সকালে ক্ষতবিক্ষত লাশ। আর সাদা জিনিসটা আর যাই হোক, মানুষ না। তখনই রুস্তম যেন শেষ ডাক দিলো, “রুবেল ভাই, বাঁচাও”। রুবেল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে কাদার মধ্যে দৌড় দিলো, হাতে টর্চ, আর ঠোঁটে বিড়ি। কালভার্টে উঠে কোনমতে জিনিসটাকে টর্চ দিয়ে উল্টো দিকে বাড়ি মারলো। জিনিসটা ছিটকে পাশে পড়লো, কেমন যেন গর্জে উঠলো। রুবেল কি মনে করে ঠোঁটের বিড়িটাতে শেষ টান দিয়ে জিনিসটার দিকে ছুড়ে মারলো। এতে কিছু একটা হল। জিনিসটা যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলো। আর কিছুক্ষণের মাঝে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

কালভার্টের চারিদিকে এখন সুনশান নীরবতা। কে বলবে, একটু আগে এখানে নরক নেমে এসেছিল। রুবেল তাড়াতাড়ি রুস্তমের কাছে গেল, নাকে হাত দিয়ে দেখলো, নিশ্বাস নিচ্ছে। সে নিজে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। একটু পরে রুস্তমের জ্ঞান ফিরে এলে রুবেলের কাছে খুলে বললো সব। এই নিয়ে দুইবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলো সে। জানে না, তৃতীয়বার এমন হবে কিনা।

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

শ্যাওলা

ক’দিন ধরে বৃষ্টি যেন আর শেষ হয় না। শ্রাবণ মাস বলে কথা, আকাশটা মনে হয় ফুটো হয়ে গেছে। দিন নাই রাত নাই, বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই।

চড়ুইকোল গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে কুমার নদ। পাশ দিয়ে বের হয়ে গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে ছোট একটা বিল। তবে বিলটা আসলে ছোট থাকে শুকনোর সময়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মাঠের মাঝ দিয়ে কালো রঙের লম্বা একটা লাইন চলে গেছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, ওটা আসলে চড়ুইবিল। বর্ষাকালে বিলের চেহারা পুরোপুরি পালটে যায়। বৃষ্টির পানি দু’কূল ছাপিয়ে এক হাওরের মতো হয়ে যায়। তখন শুরু হয় গ্রামের মানুষজনের মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। বড় বড় রুই, কাতল, বোয়াল ধরা পড়ে খ্যাপা জালে। অনেকে আবার সারারাত জেগে বড়শি দিয়েও মাছ ধরে।

গল্পটা মুবারককে নিয়ে, বয়স ২৪–২৫ হবে। তার বাবা জন্মের পর “মুবারক” নাম রাখলেও মানুষজন তাকে মুবারেক নামেই ডাকে। চড়ুইকোলের পশ্চিমপাড়ায় বাড়ি ওর। পূবপাড়ায় স্কুল থাকলেও ক্লাস ফাইভের পরে মুবারেক আর স্কুলে যায়নি – ভাল লাগে না, তাই। বাপের ফসলি জমিতে কাজ করে। আর সাথে সারাদিন ধরে বিড়ি টানে, নেশাখোরের মতো। তবে বর্ষা এলে সাথে আরেক নেশা যোগ হয় – সারারাত বিলে মাছ ধরা, তাও আবার বড়শি দিয়ে। ভোররাত পর্যন্ত বিলের পাড়ে বসে মাছ ধরে, আর মাঝে মাঝে মালেক মাঝির নৌকা পেলে তো কথাই নেই, সেদিন নৌকা নিয়ে বিলের মাঝে যায় মাছ ধরতে।

শুক্রবার রাতের কথা। মুবারেক রাতে খাওয়া–দাওয়া করে চার ব্যাটারির টর্চ, ছাতা আর বড়শি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্যে। বিল গ্রামের পূর্বদিকে, ওর বাড়ি থেকে ১০–১৫ মিনিটের হাঁটা পথ। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে; মুবারেকের এক হাতে ছাতা, আরেক হাতে টর্চ জ্বালাচ্ছে, বগলে বড়শি। মাটির রাস্তা, গত কদিনের বৃষ্টিতে নিচু জায়গাগুলোতে হাবড়া (প্যাঁক-কাদা) হয়ে গেছে; জোর পায়ে হাঁটা যাচ্ছে না। ১০ মিনিটের পথ হেঁটে যেতে আধা ঘণ্টা লেগে যাবে মনে হচ্ছে। ওর ভয় হল, মালেক মাঝি আবার তার নৌকা বিলের ওইপাড়ে চড়পাড়া ঘাটে বেঁধে চলে যায় কিনা! যদিও মুবারেক সকালে মালেক মাঝিকে বলে এসেছিল যে, আজকে মাঝির নৌকা নিয়ে যাবে মাছ ধরতে। মালেক মাঝির বাড়ি ওদের বাড়ির পাশেই, পশ্চিমপাড়ায়; আর বিয়ে করেছে পাশের চড়পাড়া গ্রামে, বিলের ওইপাড়ে। কয়দিন আগে মালেক মাঝির বউ বাপের বাড়িতে গেছে, তাই মাঝি মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতেও আসে, আবার শ্বশুরবাড়িতেও যায়।

মুবারেক বিলের কাছাকাছি পৌঁছে নৌকাঘাটের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই নৌকা দেখতে পেল। মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল। কিন্তু আশেপাশে মালেক মাঝি চোখে পড়ল না। মুবারেক কিছুক্ষণ ভাবল, কী করবে? মালেক মাঝির জন্যে কিছু সময় অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু মনে হয়, সে বাড়ি চলে গেছে, আর এই বৃষ্টিতে এদিকে আবার আসার সম্ভাবনা কমই। তবে, মালেক ভাই যদি বাড়িতে গিয়ে থাকে, তাহলে আসার পথে মুবারেকের সাথে দেখা হল না কেন? যাই হোক, মুবারেক মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলল, নৌকায় উঠবে বলে। নৌকাঘাটের চারপাশে আরেকবার টর্চ মারল – দেখে নিল সব ঠিক আছে কিনা। টর্চ বন্ধ করতে হবে এখন, তা না হলে অন্ধকারে চোখ সইবে না। সারারাত তো আর টর্চ জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব না।

টর্চটা বন্ধ করতেই মুবারেকের মনে হল, ওর একটু দূরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। মুবারেক একটা বিড়ি বের করে আগুন ধরানোর জন্যে মাথা নিচু করে ম্যাচ বের করল। আগুন ধরিয়ে মাথা তুলে বলল – কিডা, মালেক ভাই নাকি?

কিন্তু তাকিয়ে কাউকে চোখে পড়ল না। আরেকবার চারপাশে তাকাল, কাউকে দেখা গেল না। ততক্ষণে অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। চোখের ভুল ভেবে মুবারেক আর এসব নিয়ে গুরুত্ব দিল না। ততক্ষণে বৃষ্টিও থেমে গেছে।

সব মিলিয়ে মুবারেকের আজকের রাতটাকে বেশ ভালো মনে হচ্ছে। সবকিছুই নিজের সুবিধামতো পাচ্ছে। নৌকা পাবে কিনা, বুঝতে পারছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেয়েছে। আবার সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল, এখন আল্লাহর মেহেরবানিতে থেমে গেছে। আসার সময় ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে এসেছে। মুবারেকের মনে ভয় ছিল, ছাতা মাথায় দিয়েই হয়তো আজকে মাছ ধরতে যাওয়া লাগবে। নৌকার ওপর ছাতা মাথায় বড়শি হাতে বসে থাকতে সমস্যা হয়; বড়শি টান দেওয়ার সময় হাতে জোর পাওয়া যায় না। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় আর সেই ভয়টাও চলে গেছে।

মুবারেক আর দেরি না করে জিনিসপত্র নিয়ে নৌকায় উঠে পড়ল। আজকে মাছ ধরার জন্যে লাল পিঁপড়ার ডিম এনেছে। সাথে কেঁচোও আছে। সেদিন পূবপাড়ার সুবল নাকি ৬-৭ কেজি ওজনের এক কাতল পেয়েছে। আজকে রাতের বেলা ওরকম বড় কিছু পেলে মন্দ হয় না। আর নৌকা নিয়ে মাছ মারার সুবিধা হল, বিলের মাঝে চলে যাওয়া যায়, আরও একটু গভীর পানির মাছ ধরার চেষ্টা করা যায়। নৌকার মাঝে জিনিসপত্র সব রেখে এসে লগিটা ধরল। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে লগিতে ঠেলা দিয়ে নৌকা কোমরপানিতে নিয়ে লগি রেখে বৈঠা নিয়ে বসল। আস্তে আস্তে বৈঠা বাইতে বাইতে নৌকা এগোচ্ছে। আজকে মুবারেক ঠিক করেছে, বিলের মাঝ বরাবর গিয়ে মাছ ধরবে। আর আজ বিলের মাঝে আর কাউকে চোখেও পড়ছে না। সবাই হয়তো বৃষ্টির জন্যে বের হয়নি আজ রাতে।

বিলের মাঝবরাবর এসে মুবারেক নৌকা থামাল, বৈঠা তুলে পাটাতনের ওপর রেখে নৌকার মাঝে গিয়ে বসল। হারিকেন জ্বালিয়ে পাশে রেখে বড়শিতে টোপ লাগানোর কাজ শুরু করল। হালকা বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা বাতাস বইছে আর আকাশে মেঘের ফাঁক থেকে চাঁদ থেমে থেমে উঁকি দিচ্ছে। সবকিছু ভালো যাচ্ছে; মুবারেক গুনগুন করে গান গাওয়া শুরু করল –

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়?
ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম
পাখির পায়।

মালেক মাঝির সাথে মাছ ধরতে গিয়ে তার গলায় গানটা শুনেছে বেশ কয়েকবার। এত ভাবের অর্থ না বুঝলেও গানটা মুবারেকের বেশ পছন্দের। মনবেড়ি সে নিজেও এক পাখির পায়ে বাঁধতে চায়। মালেক মাঝির শালী, ঝুমুরকে তার বেশ পছন্দ। মালেকের বউ, সুরমা ভাবির সাথে ভাব জমিয়েছে এই কারণে। ভাবি বাপের বাড়ি থাকলে তার হাতে চা খাওয়ার নাম করে মুবারেক ঝুমুরকে দেখতে যায়। তবে ঝুমুরকে কিছু বলতে পারেনি এখনো – নিজে খায় বাপের হোটেলে, তার ওপর কাজকর্ম তেমন কিছু করে না। যদিও মুবারেকের মা ইতিমধ্যে ছেলের জন্যে পাত্রী দেখা শুরু করেছে।

এসব ভেবে, গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে মুবারেক বেশ কয়েকবার বড়শির টোপ ফেলেছে। একটু পর পর বিড়ি ধরাচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মাঝে বেশ কিছু মাছ পেয়ে গেল – বেশ কয়েকটা নউছি, টাকি, আর একটা কেজিখানেক সাইজের রুই। আনন্দে মুবারেকের মন তখন আরও ভালো। নাহ, আজকের দিনটা আসলেই ভালো। আরেকটা নউছি মাছ বড়শি থেকে ছাড়িয়ে মাছের ঝুড়িতে রেখে আবার টোপ দিয়ে বসল। ওর মন বলছে, আজকে সে আরও বড় কিছু একটা পাবে। একটু পরে আরেকটা নউছি বাঁধল বড়শিতে। ওটা ঝুড়িতে রেখে কী মনে করে একটু টর্চ মারল ঝুড়ির ভেতরে।

চমকে উঠল। মাত্র একটা নউছি আর দুটো টাকি পড়ে আছে ঝুড়িতে; আর কিছু নেই। আনন্দের ভাবটা মুহূর্তে কেটে গেল। নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে চারপাশে টর্চ মারল। কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। অনেক দূরে আরেকটা নৌকা দেখা যাচ্ছে, মনে হয় ওর মতো মাছ ধরছে। কিন্তু ও তাহলে এত মাছ মারল, সেই মাছ গেল কোথায়? আশপাশে তো কাউকে দেখা যায় না। চিৎকার করে উঠল – এই, কোন হারামির বাচ্চা রে, আমার মাছ চুরি করছিস? কই লুকায়ে আছিস? বের হ। বের হ কইলাম! – এই বলে বৈঠা দিয়ে আশপাশের পানিতে বাড়ি মারতে লাগল। পানিতে একটু ঢেউ উঠে নৌকা নড়ে উঠল, আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মুবারেক নৌকায় বসে আরেকটা বিড়ি ধরাল, মাথা ঠান্ডা করা দরকার।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে মুবারেক হাতেনাতে চোর ধরার জন্যে একটা বুদ্ধি বের করল। মাছের ঝুড়িটা নিয়ে ওর পাশে রেখে আবার বড়শি নিয়ে বসল।

বেশ কিছুক্ষণ বসে আছে, এবার আর কোনো মাছই টোপ গিলছে না। বৈঠার বাড়ির শব্দে হয়তো সব মাছ একটু দূরে চলে গেছে। অনেকক্ষণ বসে থেকে একটু ঝিমুনিও চলে এসেছে। এই সময় হাতে ধরা বড়শিটা একটু নড়ে উঠল – মাছ ঠোকর দিয়েছে। মুবারেকের ঝিমুনি ছুটে গেল; ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাছ ধরার কাজে। একটু পরে ৭–৮ কেজি ওজনের এক বিশাল কাতল মাছ নৌকায় তুলে রাখল। ঝুড়িতে এত বড় মাছ রাখার জায়গা নেই। মুবারেক বুদ্ধি করে মাছের মাথা–কানকোতে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল, সাথে দড়ির আরেক মাথা বেঁধে রাখল নৌকার পাটাতনের বাঁশের সাথে। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাল। আজকের সারাদিনের কষ্ট, একটু আগে মাছ হারানোর রাগ – সব চলে গেল এই এক মাছ দেখে।

মাছটাকে পাশে রেখে আবার বড়শি নিয়ে বসল। আরেক পাশে টর্চটা রেখে দিল। চার ব্যাটারির টর্চ, কায়দা করে কাউকে মারতে পারলে দারুণ একটা অস্ত্র। মাছটাকে পাহারা দিয়ে রাখতে হবে, যেন এটা কোনোভাবে হাতছাড়া না হয়। বড়শি নিয়ে বসে থাকতে থাকতে আবার একটু ঝিমুনির মতো এল। হঠাৎ মনে হল, নৌকাটা খুব হালকা ভাবে দুলে উঠল, যেন কেউ খুব আলতো করে নৌকাকে ধাক্কা দিল। মুবারেকের ঝিমুনি কেটে গেল, কিন্তু সে চুপ করেই বসে রইল। এটাই মাছ–চোর ধরার সবচেয়ে মোক্ষম উপায়, কেউ একজন আছে আশেপাশে; মুবারেক অপেক্ষায় রইল হাতেনাতে ধরবে।

এবার মনে হল, কেউ একজন বড় মাছটা ধরে টান দিল। বড় মাছ, একটু শব্দ তো হবেই। মুবারেক ঠিক করল, ঘাড় না ঘুরিয়ে মাছের লেজের দিকে হাত বাড়িয়ে চোরের হাত ধরার চেষ্টা করবে, যেন চোর যেই হোক, তার হাত ধরতে পারে। খপ করে হাতটা বাড়াল ওভাবে।

একজনের হাত ধরতে পারল। মুখে বলল – হারামীর বাচ্চা, ধরছি তোরে এইবার – বলে যেই কিনা ঘাড় ঘুরাতে যাবে, কেউ একজন ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে গলায় ধমক দিয়ে উঠল – এই মুবারেক, পিছনে তাকাবি না; জানে মেরে ফেলব।

গলা শুনে মুবারেক চমকে উঠল – এরকম শব্দ কোন মানুষ করতে পারে না, কারো গলা এমন হতে পারে না। আর ততক্ষণে সে বুঝতে পারছে, যেই হাতটা ‘চোর’ মনে করে ধরেছে, সেটা বরফের মতো ঠান্ডা আর পিছলা শ্যাওলার মতো, যেন পুরা হাতে শ্যাওলা মেখে আছে। মুবারেক কী করবে বুঝতে পারছে না, কিন্তু হাতও ছাড়ছে না। ওই ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে গলা আবার বলে উঠল – মুবারেক, বেঁচে ফিরতে চাইলে হাত ছেড়ে দে এখনই। আমার এলাকায় মাছ ধরতে আসছিস, এই মাছ আমার।

মাছের কথা শুনে মুবারেকের মাথায় আগুন ধরে গেল। এত কষ্ট করে মাছ ধরেছে – আরেকজন নিয়ে যাবে, এটা হবে না, তা সে যেই হোক! সে ডান হাতে টর্চটা নিল, তারপর অনেক দ্রুততার সাথে পেছনে ফিরে চোর বা ঐ জিনিসটার গায়ে মারার চেষ্টা করল। কিছু একটাতে ও আঘাত করল নিশ্চিত, কিন্তু কাকে মারল – সেটা ঠিক বুঝতে পারল না।

ততক্ষণে মুবারেক ওই ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে গলার ‘লোকটার’ দিকে ঘুরে তাকিয়েছে। দেখে মনে হল, কেউ একজন শ্যাওলা গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর টর্চের বাড়ি খেয়ে একটু ডানদিকে বেকে গেছে। টর্চটা মুবারেকের হাতেই ছিল। কী মনে করে, শ্যাওলা-গায়ে লোকটার দিকে টর্চ দিয়ে আলো ফেলল। বুঝল, কাজটা তার ঠিক হয়নি। যা দেখল, তাতে তার গায়ের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল, হাত-পা ওখানেই জমে গেল।

ওর সামনে নৌকার পাশে মানুষের মতো কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এটা মানুষ না, হতেই পারে না। আলো পড়তেই জিনিসটা মুবারেকের দিকে তাকাল। শ্যাওলা দিয়ে জিনিসটা বহু কষ্টে মানুষের চেহারা ধরে রেখেছে। পুরো ‘চেহারার’ মাঝে ২–৩টা চোখ নড়ে বেড়াচ্ছে, যেন কোথায় থাকা উচিত বুঝতে পারছে না; সম্ভবত টর্চের বাড়িতে এই অবস্থা হয়েছে। জিনিসটার কোনো নির্দিষ্ট মুখ নেই; একটু পর পর চেহারার একেকটা জায়গায় কিছু গর্ত দেখা যায়, যার ভেতরে দাঁত আছে, মনে হচ্ছে।

মুবারেক সাহসী ছেলে, কিন্তু এমন কিছু দেখে ভয়ে তার শরীর কাঁপতে লাগল। জ্ঞান হারানোর আগে তার শুধু মনে আছে – জিনিসটা নৌকার ওপর উঠে আসছে, আর ঠান্ডা হাতের মতো কিছু একটা দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে। অজ্ঞান হওয়ার আগে অনেক কষ্টে একটা চিৎকার দিল; তারপর আর কিছু মনে নেই।

মুবারেককে প্রায় আধা ঘণ্টা পরে আরেকটা নৌকা এসে উদ্ধার করে, ওরাও বিলে মাছ ধরছিল। তারা এসে দেখে, মুবারেক অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে; সারা শরীর শ্যাওলায় ঢাকা আর মৃগীরোগীর মতো কাঁপছে। একদিন পরে মুবারেকের জ্ঞান ফেরে। কয়েক দিন পরে ওই আরেক নৌকার লোকদের কাছ থেকে জানতে পারে – তার নৌকায় কোনো মাছের চিহ্ন তারা পায়নি, আর পুরো নৌকা মাছের আঁশটে গন্ধে ভরা ছিল। তবে, ওরা নৌকাতে বা নৌকার আশেপাশে ঐদিন আর কাউকে দেখে নাই, কিংবা আর কাউকে মাছ ধরতেও দেখ নাই।

তাহলে, মুবারেক ঐদিন কাকে দেখলো? কি ছিল ঐ জিনিসটা?

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

কালো বেনারসি

মুহিব বড় রাস্তা ছেড়ে গলিতে ঢুকলো। কানে ইয়ারবাডস, গান বাজছে, চিরকুটের “মরে যাবো রে মরে যাবো”। সুমি দরদভরা গলায় গাইছেন, “মরে যাব রে, মরে যাব. কি অসহায় আমি একবার ভাবো।” মুহিবের মনে হল, আসলেই আমরা কত অসহায়। জীবনের কোন কিছুই একা একা করতে পারি না। সব জায়গাতেই কারো না কারো কাছে ঋণী। জীবন পাওয়ার জন্যে বাবা-মা, শৈশব আর কৈশোরে ভাইবোন আর বন্ধুরা, যৌবনে বন্ধুদের সাথে নিজের প্রেমিক/প্রেমিকা, আর পরবর্তীতে স্বামী/স্ত্রী, সন্তান। এ যেন হাজার লক্ষ বছর ধরে, এক অনন্ত ইউনিভার্সেল রিদমে সাইকেল চলছে, যার আপাত শেষ শুধু মৃত্যুতে।

মুহিবের মাঝে মাঝে এ ধরনের দার্শনিক চিন্তাভাবনা করতে ভালো লাগে। ও এসব চিন্তা করতে করতে রাস্তায় হাটে। ওর ছোটবেলার বন্ধু ফয়সাল বলে, এগুলা হল ভরা পেটের দার্শনিকতা। কাম কাজ না থাকলে এমন হয়। ফয়সালের নিজের যদিও এসব ভাবার সময় নাই, সে এখন টাকা কামাচ্ছে। গোটা পাচেক ইন্ডাস্ট্রি করেছে ইতিমধ্যে, সামনে আরো বড় প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে। মুহিব মাঝে মাঝে যায় ওর অফিসে দেখা করতে। আলিশান অফিস, ২ জন পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট, চেয়ার থেকে শুরু করে সবার কাপড় চোপড় পর্যন্ত সবই পরিপাটিভাবে সাজানো। দেখা করতে গেলে ফয়সাল বলে, আমিও ভাবছি তোর মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। তবে, তোর এইসব ভরা পেটের দার্শনিকতা আরো ৮-১০টা ইন্ডাস্ট্রি করার পরে করবো। মুহিব কিছু না বললেও জানে, ফয়সাল কখনো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে না ওর মত। টাকা মানুষকে শুধু স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না, সাথে জীবনের সময়টাও নিয়ে নেয়। সাথে একটা নেশাও বানায়ে ফেলে, টাকা কামানোর নেশা। আর সেই নেশাটা একসময় হয়ে যায় অভ্যাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করার মত টাকা কামানোর অভ্যাস। মানুষ চেষ্টা করলে নেশা ছাড়তে পারে, তবে অভ্যাস বদলানো আরো কঠিন কাজ।

ইদানীং মুহিব ভাবছে, রাস্তায় ভিক্ষা করতে বসে পড়বে কিনা। যদিও ওর আব্বা দেখলে ঘর থেকে বের করে দেয়ার চান্স আছে ভালোরকম। সাথে সিলভারও তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। বলে রাখা ভালো, সিলভার হল মুহিবের ভালবাসার মানুষ, নাম রুপা। তবে, হুমায়ূন আহমেদের হিমুর প্রেমিকার নামের সাথে মিলে যায়, তাই মুহিব রুপাকে ডাকে সিলভার। কিছুদিন যাবত সিলভারকে নিয়েও মুহিব অনেক সমস্যায় আছে। মাস্টার্স শেষ করে গত ৩ বছরে ৫টা চাকরি চেঞ্জ করেছে, এটা সিলভারের পছন্দ না। তার সাথে আরেক উটকো ঝামেলা হল, সিলভার নিজে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে এবং তার বাসা থেকে পাত্র দেখা শুরু করে দিয়েছে। আর মুহিবের নেশা হয়ছে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর। থালা হাতে শুধু বিজয় সরণির মোড়ে ভিক্ষা করাটা বাকি।

মুহিব যদিও ভিক্ষাকে মহৎ পেশা মনে করে। অন্তত কয়েক হাজার মানুষ ঢাকা শহরে একজন ভিক্ষুকের কাছে প্রতিদিন মাফ চায়। মানে, ভিক্ষা না দিতে পারলে “মাফ করেন, বাবা” বলে আর কি! এটাই বা কম কি! তিন বছরের রিলেশনে সিলভার তার কাছে একবারও মাফ চাই নাই। বরং প্রতিবারেই কোন না কোন কারনে তার নিজের সরি বলা লাগছে সিলভারের কাছে। তবে, এতে মুহিবের আক্ষেপ নাই, তার প্রধান কারন হল, এই সরি বলার মাধ্যমেই সিলভারের সাথে তার পরিচয়। মুহিব কয়েক বছর আগে আবাহনী মাঠের সামনের ফুটপাত দিয়ে বিকেল বেলা হাটার সময় টিয়া মানে টিয়াপাখির ডাক শুনে আনমনা হয়ে হাটতে হাটতে এক কলেজপড়ুয়া মেয়ের সাথে প্রবল ধাক্কা খায়। সেদিন পাবলিকের হাতে দু’চার ঘা খেয়েছিলও বটে। কোনমতে, সরি বলে পার পায়। সেই মেয়েটিই ছিল এই সিলভার, বা রুপা। সেদিন যে কারনেই হোক, রুপা সিন ক্রিয়েট করতে চায়নি।

ওদের দ্বিতীয় দেখা হয়, ধানমন্ডি লেকে পরের সপ্তাহে এবং সেখানেও মুহিব মন দিয়ে সুইচোরা পাখির ঘর-সংসার দেখছিল। ঢাকা শহরে মানুষই বাস করতে পারে না। কিন্তু, এই পাখিগুলো এত সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়ে আছে, মুহিবের দেখে অবাক লাগে। আর রুপা তখন ওখানে গিয়েছিল কান্নাকাটি করতে। এটা ও মাঝে মাঝে করে, গলা ভেঙ্গে চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছা করে তার, পারে না। বাসায় তো আরো পারে না, তাই মাঝে মাঝে ধানমন্ডি লেকে যায় কান্নাকাটি করতে। ঢাকা শহর অদ্ভুত এক জায়গা, যেখানে সবাই কষ্ট বিলিয়ে বেড়াতে পছন্দ করে। মুহিবের ধারণা, এই কষ্টে থাকা মানুষগুলোর জন্যে সৃষ্টিকর্তা কাউকে না কাউকে বানিয়েছেন, যে ওদের জন্যে আনন্দের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে। কেউ ঐ মানুষগুলোকে খুজে নিতে পারে, কিংবা খুজে পায়। বাকিরা খুজতে খুজতেই জীবন পার করে দেয়। সম্ভবত, আমাদের রুপা বা সিলভারের জীবনে মুহিব এরকম একজন মানুষ, যে হয়তো কিছু করতে পারে না, তবে কষ্টের সময় পাশে থাকতে পারে। আবার এটাও হতে পারে যে, ঐ কষ্ট পাওয়া মানুষগুলোর জন্যে হয়তো ঐ পাশে থেকে সঙ্গ দেয়াটাই যথেষ্ট।

যাই হোক, মুহিব গলিতে ঢুকে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলো, পুরা রাস্তা ভর্তি পানি। সম্ভবত কাল রাতে এই এলাকাতে বৃষ্টির ফলাফল। তবে ইন্টারেস্টিং হল গলির কুকুরগুলো। তারা পানির ঐপারে আটকে গেছে, তাই মুহিবের মত বিশালাকার চুল-দাড়িওয়ালা মানুষ দেখে সামান্য ঘেউ ঘেউ করলেও পানির এই পাড়ে আসতে পারছে না। মুহিব ভাবলো, কুকুরদের সাথে এই মুহূর্তে কথা বলতে পারলে কেমন হত? ওরা কেন ওকে দেখে এত বিচলিত? সামনের সাদা-কালো কালারের কুকুরটাকে এদের লিডার মনে হচ্ছে।

(ঘেউ ঘেউ ঘেউ) – এই কুদ্দুস, দেখতো, এই মালটা কি এই পাড়ায় নতুন?

(ঘেউ ঘেউ) – আরে নাহ, এই মালটার মাথায় ছিট আছে। দেখস না, চুল দাড়ি বড় রাইখা কি এক ভং ধরছে!

(ঘেউ ঘেউ ঘেউউউউ) – মালটা যাই হোক, ভাব-চক্কর ভাল লাগছে না আমার কাছে। দাবড়ানি দেয়া দরকার। তাইলে ভং ধরার শখ চলে যাবে।

(ঘেউ ঘেউউউ) – তো যা না, আটকে রাখছে কে! আমি এই ময়লা পানিতে নামতে পারবো না।

(ঘেউ ঘেউ) – তাইলে এইডারে একটু চিল্লাচিল্লি কইরা খেদায়ে দেয়ার চেষ্টা করি, চল।

(ঘেউ) – ওকে।

মুহিব দেখলো, কোন এক কারনে হঠাৎ সবগুলা কুকুর একসাথে ঘেউ ঘেউ করা শুরু করলো, যেন কোনমতে পানিটা পার হতে পারলেই ওর খবর আছে। মুহিব আর তাদের বিরক্ত করবে না ভেবে গলি থেকে বের আবার রাস্তায় এল। কিছুক্ষন চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলো, ফয়সালের অফিসে যাবে। বেশ কিছুদিন ভালমন্দ খাওয়া হয় না। এই ভরদুপুরে গেলে বন্ধুকে নিশ্চয়ই না খাইয়ে ফেরত পাঠাবে না। ইন্টারেস্টিং হল – রওনা দেয়ার পর দেখলো, গলির কুকুরদের নেতা লেজ নাড়তে নাড়তে তার পিছে পিছে আসতেছে। যদিও কিসের জন্যে, এটা বোঝা মুশকিল।

(ঘেউ ঘেউ ঘেউ) – ওস্তাদ, একটু আগে চিল্লাচিল্লির জন্যে মাইন্ড কইরেন না।

মুহিব আগ্রহ নিয়ে কুকুরটার মাথায় হাত রেখে আদর করলো। বললো – কি রে, কেমন আছিস? নাম কি তোর? যাহ আমি তর নাম দিলাম, ঝন্টু। ঝন্টু, কি পছন্দ হইছে?

(ঘেউ ঘেউ ঘেউ) – জ্বি ওস্তাদ। ইচ্ছা হইলে রাইতের বেলা আইসেন, এইদিকে ফাকা থাকে, আরামে ঘুরাঘুরি করতে পারবেন। যদিও এরিয়াটা ভাল না। সেই আমলে বহুত খুনখারাবি হইত তো। মাগার, আমি আছি, আপনারে প্রটেকশন দিয়া রাখমু। কুনু টেনশন নাই।

মুহিব বললো – আচ্ছা ঝন্টু, আজকে থাক তাইলে। আরেক দিন এলে তোর জন্যে খাবার নিয়ে আসবো। আজকে পকেটে তেমন কিছু নাই। তোকে কিছু খাওয়াতে পারলাম না।

(ঘেউ ঘেউ) – নো প্রব্লেম, ওস্তাদ।

মুহিব হাটা শুরু করলো। ওয়ারীতে এই গলির সামনে ঝন্টুর সাথে পরিচয় হল। ফয়সালের অফিস পল্টনে। ব্যস্ত এরিয়া, কয়দিন পর পর পলিটিক্যাল ঝামেলাতে রাস্তা বন্ধ থাকাতে কিছুদিন হল ও গুলশানে আরেক অফিস খুলেছে। ফয়সাল আজকে কোন অফিসে আছে, আগে থেকে জানা সম্ভব না মুহিবের পক্ষে। কারন সিম্পল, কাছে ফোন নাই। মানে, ও হাটতে বের হলে বাসায় ফোন রেখে বের হয়। সেই আমলের ছোট এক এমপি3 প্লেয়ার কিনেছে, সেটা দিয়েই গান শুনে রাস্তায় হাটার সময়। সাথে ঢাকা শহর এতই ব্যস্ত জায়গা, এখানে মোবাইল হাতে নিয়ে ড্রাইভিং তো দূরে থাক, হাটাহাটি করাও সেফ না। তার উপর সাথে ফোন থাকলে দিনের ১২ ঘন্টার মাঝে অন্তত ১৮ বার ফোন আসবে। একবার ভাই ফোন দিবে, তো আরেকবার সিলভার। এত ফোনের মাঝে হাটাহাটিতে মনোযোগ দেয়া মুশকিল। মুহিবের কাছে মনে হয়, জগতের সবাইকে কাজ করতে হবে, এটা কি কোথাও লিখা আছে? আট বিলিয়ন মানুষের মাঝে একজন না হয় কাজ না করেই জীবন কাটায়ে দিলো। যদিও এ কথা সিলভারকে বোঝাবে কে? তার কথা হল, সে বেকার ছেলের কথা বাসায় বলতে পারবে না। বহুত কষ্টে মুহিবকে সে রাজি করিয়েছি যে, এর পরের চাকরিটা সে ছাড়তে পারবে না। তবে, এই কথা নিয়েও সিলভার আরেক ঝামেলায় পড়েছে। মুহিব চাকরি খোজাই বন্ধ করে দিয়েছে। আপাতত, পদব্রজই মুহিবের একমাত্র পেশা। এই ভাব-লক্ষন সিলভারের কাছে ভাল ঠেকছে না। আপাতত সে মনে মনে ডিসিশান নিয়ে রেখেছে যে, ওর বাসায় বেশি ঝামেলা করলে সোজা ব্যাগ নিয়ে মুহিবের বাড়িতে গিয়ে উঠবে। তারপরে যা হওয়ার হবে।

=====================১ম অধ্যায় শেষ=====================

মুহিবের বাবা, কায়েস সাহেব ইদানীং অনেক টেনশনে আছেন। তিনি রিটায়ার করেছেন বছর পাচেক হল আর তার স্ত্রী রাবেয়া গত হয়েছেন বছর দুয়েক আগে। এই বয়সে ঝামেলা ভাল লাগে না তার। কিন্তু, মুহিবকে নিয়ে তার চিন্তার অন্ত নাই। তার বড়ো ছেলে, মুন্না সংসারের সবদিকে সামলাচ্ছে। মুহিবও ভালোই করছিল। কিন্তু, ওর মা, মানে রাবেয়া বেগম মারা যাওয়ার পরে মুহিব কেমন যেন সংসারছাড়া হয়ে গেল। ওর সাথে কায়েস সাহেবের দেখা হয় না বললেই চলে। ইদানীং, ও নাকি দিনরাত রাস্তায় রাস্তায় হাটে, অনেক দিনই সারারাত হাটাহাটি করে ভোরবেলা বাসায় ঢোকে। রাতে কোথাও নেশা টেশা করে কিনা, সে বিষয় নিয়ে তার সন্দেহ ছিল। মুন্নাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু আসলে ও পরিস্কারভাবে জানে না। তিনি গত মাসখানেক ধরে চেষ্টা করছেন, মুহিবের সাথে কথা বলার। পারছেন না, কারন ছেলেটা তার সাথে চোর-পুলিশ খেলতেছে। তিনি সারাজীবন রুটিন মেনে জীবন চালিয়েছেন, এখনো সেটাই চেষ্টা করেন, আর তার ছোট ছেলে মুহিব সেই সুযোগটাই নেয়। ভোরে ঢুকে সারাদিন মরার মত ঘুমায় আর বিকালে যখন কায়েস সাহেব বাইরে হাটাহাটি করতে যান, সে সময় মুহিব ঘুম থেকে উঠে বের হয়ে যায়। আবার কোন সময় কয়েকদিন বাড়িতেই ফেরে না।

আজকে কায়েস সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, সারারাত বাইরের ঘরে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়বেন। ছেলের সাথে কথা বলে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাবেন। এই বয়সে কষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু কিছু করার নাই। ছেলে উৎছন্নে যাওয়ার আগে তাকে ঠিক করা অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব। রাবেয়া থাকলে তার আর এত চিন্তা করা লাগতো না। ছেলেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা বয়স পর্যন্ত মায়ের সাথে ফ্রি ভাবে কথা বলে আর বাবাদের এড়িয়ে চলে। যতদিনে তারা সংসারে বাবার মূল্য বুঝতে শিখে, ততদিনে সেই ছেলেকে এড়িয়ে চলার জন্যে তার সন্তানেরা চলে আসে।

কায়েস সাহেব সাধারনত দুপুরে ঘুমান না, বারান্দায় বসে খবরের কাগজ কিংবা বই পড়েন। আজকে রাতে জাগা লাগবে বলে ঘুমাতে গেলেন। অদ্ভুত এক স্বপ্নও দেখে ফেললেন। দেখলেন, তার বাড়িতে সাজ-সাজ রব। রাবেয়াকেও দেখলেন, বেনারসি পড়ে সংসার সামলাচ্ছে। তার কাছে মনে হল, বাড়িতে কারো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, তবে কার বিয়ে, স্বপ্নের মাঝে সেটা বুঝলেন না। তবে, আরেকটু পরে বুঝলেন যে, তার ছোট ছেলে, মুহিবের বিয়ে। বেটার বউ নিয়ে তিনি বাড়িতে ঢুকছেন, আর রাবেয়া বেগম তখন বউ বরণ করে নিচ্ছে। তবে, কেন যেন মুহিবের বউ কালো রঙের বেনারসি পড়েছে বিয়ের দিনে আর তিনি রাবেয়াকে বলছেন, তোমাদের সমস্যা কি? বিয়ের শাড়ী কেউ কালো রঙের কিনে? মেয়েটা এই শুভ দিনে কালো শাড়ি কেন পড়েছে। – এই অবস্থায় কায়েস সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাড়ালেন। কাজের লোক, দুলাল এসে বললো – চাচা, ছোট ভাইয়ার সাথে একটা মেয়ে দেখা করতে আসছে। ভাইয়া তো বাসায় নাই, ভাবীও তো বের হইছে একটু। মেয়েটাকে আমি আগেও ছোটভাইয়ের সাথে দেখছি। বাইরে দাড়ায়ে কানতেছিল। আমি ভেতরে আইনা বাইরের ঘরে বইতে দিছি। আপনি একটু কথা কইবেন? কায়েস সাহেব একটু ঘাড় নেড়ে বললেন, তুই ওকে চা-নাশতা কিছু দে। আমি এসে দেখতেছি।

কায়েস সাহেব একটু ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরে গেলেন। এবং গিয়ে মেয়েটাকে দেখেই একটা ধাক্কা খেলেন। একটু আগে এই মেয়েটাকেই উনি স্বপ্নে দেখেছেন, মুহিবের নতুন বউ হিসেবে, কালো বেনারসি পড়া।

মেয়েটা এগিয়ে এসে তাকে সালাম দিল, বললো – আংকেল, আমার নাম রুপা। আপনি কি মুহিবের কোন খোজ জানেন? আমি গত কয়েকদিন ধরে ওকে খুজে পাচ্ছি না। এদিকে আমার বাসায়ও সমস্যা চলছে কিছু।

কায়েস সাহেব একটু কথা বলে বুঝলেন যে, মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে, কাল বিয়ে। তাই, নিরুপায় হয়ে মুহিবের জন্যে এক কাপড়ে বাড়ী থেকে চলে এসেছে। কায়েস সাহেব সব শুনে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন। মেয়েটার পরিবার-পরিচয় কিছুই জানেন না। কি করবেন, বুঝতে পারছেন না। মেয়েটাকে এখন কড়া ভাষায় কিছু বললে উল্টাপাল্টা কিছু করে বসবে কিনা, বলা মুশকিল। এমনিতেই বোঝা যাচ্ছে যে, ইমোশনাল হয়ে আছে। তাছাড়া, মুহিবের মত ভ্যাগাবন্ড টাইপের পাগলা ছেলেটাকে এই রুপা নামের মেয়েটা যে পাগলের মত ভালবাসে, সেটা বুঝতে পারছেন। এটাও বুঝতে পারছেন, তার ছেলেকে সংসারে মনোযোগী করতে এই মেয়েটাই মনে হচ্ছে শেষ ভরসা। তিনি পজিটিভ ডিসিশান নিলেন। ইতিমধ্যে তার বড় বৌমা, ঝুমুরও চলে এসেছে। রুপার সাথে কথা বলা দেখে বুঝলেন, ঝুমুর সম্ভবত মুহিব আর রুপার বিষয়ে জানে। এখন বাকি রইলো একটা কাজই, মুহিবকে খুজে বের করা। দুলালকে জিজ্ঞেস করলে বললো, ছোটভাই তো ৩ দিন হইলো বাসায় আসে না। তিনি ঝুমুরকে ডেকে বললেন, বিয়ের আয়োজন করতে। সাথে মুন্নাকে ফোন দিতে বললেন, যেন মুহিবকে খুজে বের করতে পারে।

=====================২য় অধ্যায় শেষ=====================

মুহিব ফয়সালের অফিসে গিয়ে বন্ধুর রুমে বসে ভরপেট লাঞ্চ করে আরামে সোফায় গা এলিয়ে দিল। ফয়সাল পল্টনের অফিসে নেই আজকে। ভাগ্য ভাল, ফয়সালের এক পি.এ. মুহিবকে চিনলো। শুধু চিনলো বললে ভুল হবে, রীতিমত ভালো আপ্যায়ন করলো, কাচ্চি, রোস্ট, ইলিশ মাছ, সাথে আবার চিংড়ির মালাইকাড়ী। ফয়সাল নাকি ৩ জন মানুষের লিস্ট দিয়েছে, যারা তার অফিসে এলেই যেন সর্বোচ্চ আপ্যায়ন পায়, তার মধ্যে মুহিব একজন।

খাওয়ার পরে ফয়সালের রুমে সোফায় গা এলিয়ে মুহিব শুধু ঘুমিয়ে গেল, তাই না, স্বপ্ন দেখা শুরু করলো। দেখলো, ওদের বাড়িতে সাজ-সাজ রব, মনে হচ্ছে কারো বিয়ের অনুষ্ঠান। ওর মাকেও দেখলো, বেনারসি পড়ে মেহমানদের সাথে কথা বলছে। তবে, বাড়িতে কার বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, স্বপ্নের মাঝে সেটা বুঝলো না। মা কাকে যেন ফোনে বললো, মুহিবের বউ চলে এসেছে। মুহিবের পাশ দিয়ে ওর মা হেটে বাড়ির বাইরের দিকে গেল, পেছন পেছন বয়স্করা সবাই গেল। মুহিবের মনে হল, ও যেন ওখানে ছায়ার মত দাড়িয়ে আছে, আর কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছে না। ওর কাজিনদের মাঝে সুরমাকে দেখলো ওখানে। ওকে কাছে গিয়ে ডাক দিলো, কিন্তু সুরমা শুনলো বলে মনে হয় না। ঘুরে একবার হাত তুলে মুহিব ওর মাকে ডাকলো। কেন জানি মনে হল, ওর মা ডাক শুনলো। রাবেয়া খুব আস্তে আস্তে মুহিবের দিকে ঘুরে তাকালেন। তারপর যেন স্নেহমাখা একটা হাসি দিয়ে মুহিবকে হাতের ইসশারাতে কাছে ডাকলেন। তারপর, আবার উলটা দিকে ঘুরে গেটের দিকে যেতে লাগলেন। মুহিবও ওর মায়ের পিছে পিছে গেল গেট পর্যন্ত। একটু পরে বাসার সামনে বিয়ের গাড়ি এসে দাঁড়ালো। মুহিবের মা এগিয়ে গিয়ে গেট খুলে বউকে নামালেন। মুহিব দেখে অবাক হল, মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে। হঠাৎ বুঝলো, মেয়েটা আর কেউ না, সিলভার। মেকআপের জন্যে প্রথমে বুঝে নাই। তবে, কেন যেন সিলভার একটা কালো রঙের বেনারসি পড়েছে, এটা কি নতুন ট্রেন্ড কিনা, মুহিব জানে না। ঐ সময় রাবেয়া মুহিবকে ডাক দিলেন। স্বপ্নের ভেতর মুহিব বুঝতে পারলো না, ওর মা ওকে ডাকছে কেন? ও তো স্বপ্ন দেখছে, সিলভার যখন গাড়ী থেকে ওদের বাড়ীতে বেনারসি পড়ে নামলো, তার মানে গাড়ীর ভেতরে সেও আছে। কিন্তু, স্বপ্নের ভিতরে ওর মা কিভাবে তাকে ডাকতেছে, সেটা সে বুঝতে পারলো না। সে একটূ এগিয়ে গেল, ওর মায়ের দিকে। গাড়ির ঐপাশ থেকে বর নামলো। মুহিব অপেক্ষা করছে, স্বপ্নের ভেতর সে এখন নিজেকে বরের সাজে দেখবে, এটা ইন্টারেস্টিং হবে, ওর কাছে মনে হয়। বর গাড়ীর পাশ ঘুরে এসে রাবেয়া বেগমের সামনে আসছে।

বরকে দেখে স্বপ্নের ভেতরে মুহিব ভয়ে কাপতে লাগলো। ওর সামনে, বধুরূপে সিলভারের পাশে বরের সাজে দাঁড়িয়ে আছে একটা মানুষ, যার মুখের জায়গাতে একটা আয়না সেট করা, বরের আসলে কোন ফেস নাই। মুহিব প্রাণপণে চেষ্টা করছে ঘুম থেকে জেগে ওঠার, কিন্তু পারছে না। উপরন্তু, আয়নামুখের বরের দিকে মুহিব চম্বুকের মত আকর্ষন অনুভব করছে, যেন মুহিবকে ডাকছে, ঐ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার জন্যে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও মুহিব সামনে এগিয়ে গেল আর সম্মোহিতের মত ঐ বরের আয়নার দিকে তাকালো। আয়নার মাঝে নিজেকে দেখলো, তবে কেন যেন মনে হল, মানুষটা ও নিজে না, কারন আয়নার ভিতরে মুহিবের মুখে হাসি, কিন্তু মুহিব তো হাসছে না। তাহলে আয়নার কে এই লোকটা? মুহিবের মত দেখতে? কয়েক সেকেন্ড পরে আয়নার ভিতরের মুহিব হো হো করে হাসতে লাগলো। আর আয়নার বাইরের মুহিব অসহায় দৃষ্টিতে সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইলো।

কুকুরের ডাকে মুহিবের ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভেঙে মুহিব দেখলো, ওয়ারীতে ঐ গলির ভেতরে শুয়ে আছে, আর পাশে ঝন্টু দাঁড়িয়ে আছে। সে ফয়সালের অফিস থেকে ওখানে কি করে গেল, মনে করতে পারলো না। ঝন্টু স্বভাবতই ঘেউ ঘেউ করে উঠলো।

(ঘেউ ঘেউ ঘেউউউ) – ওস্তাদ কি স্বপ্ন দেখছিলেন? ঘুমের মাঝে আপনাকে চিৎকার করতে শুনলাম।

মুহিবের কোন কিছ ভালো লাগছে না। কোথাও একটা গন্ডগোল মনে হচ্ছে। আর সে স্বপ্নের ভেতরে এগুলা কি দেখলো! ভয়টা মনে হচ্ছে এখনো ভেতরে আছে, তবুও সেটাকে ও পাত্তা না দেয়ার চেষ্টা করলো।

মুহিবের মনে হল, অনেকদিন সিলভারের সাথে দেখা হয় না। তবে, “দেখা হয় না” কথাটা ভুল, সিলভার সবসময়ই মুহিবের সাথে দেখা করতে চায়। সমস্যা হল, মুহিবের কাছে ফোন না থাকার কারণে তাকে খুজে পাওয়া যায় না। আর মুহিবও ইদানীং সিলভারের কাছ থেকে একটু দূরে থাকে, কারণ দেখা হলেই সিলভার মুহিবের চাকরি নিয়ে কথা বলা শুরু করে। সব মিলিয়ে মুহিব পড়েছে পড়েছে মহা ফ্যাকড়াতে, সিলভারকে না দেখে ওর জন্যে থাকাও মুশকিল, আবার দেখা হলেই সিলভারের মুখে বিয়ে আর চাকরি নিয়ে বানী। তবুও কেন জানি, মুহিবের মনে হল, সিলভারের সাথে ওর দেখা করা খুবই দরকার। কেমন যেন অস্থির লাগছে। মুহিব হাটা ধরলো, ওর নিজের বাসার দিকে। সিলভারকে দেখতে হলে ওকে ফোন দিতে হবে আর ফোন রয়েছে বাসায়।

ঘন্টা দুই পরে মুহিব ওদের লালমাটিয়ার বাসাতে পৌছে গেল, প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হল, বাসায় অনেক মানুষ। কয়েকজন বাইরের মানুষকে দেখলো, বাসা সাজাচ্ছে। ওদের জিজ্ঞেস করতেই বললো, এই বাড়ীর ছোট ছেলের বিয়ে। মুহিব আকাশ থেকে পড়লো। এ বাড়ির ছোট ছেলে তো সে নিজে, আর তার আজকে বিয়ে? কই, কেউ তো তাকে বলে নি?

লন পেরিয়ে দরজার সামনে এসে দাড়াতেই ওর পা আটকে গেল। দরজা খোলা, দরজার ওপাশে ওর মা, রাবেয়া বেগম কারো সাথে কথা বলছেন। রাবেয়া বেগম দুই বছর আগে মারা গেছেন। মুহিব নিজে ওর মাকে কবরে নামিয়েছে। দরজার বাইরে মুহিবকে দেখে রাবেয়া হেঁটে এসে বললেন – তুই কোথায় গেছিলি, হ্যা? আজকে না তোর বিয়ে? রুপাদের বাড়িতে যেতে হবে না? সন্ধ্যা হয়ে গেল প্রায়। তুই তো রুপার বিয়ের শাড়ীই দেখিস নাই। এত তাড়াহুড়ো করে শপিং করলাম আজকে। এদিকে আয়।

রাবেয়া ছেলেকে ডাক দিয়ে বাসার ভিতরে নিয়ে নতুন মুহিবের বউয়ের জন্যে কেনা বিয়ের শাড়ী দেখালেন। কালো বেনারসি। মুহিবের মাথায় কিছু ঢুকছে না। ও এক দৃষ্টিতে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। বিয়ের জন্যে কালো বেনারসি কেন, এটাও তার মাথায় ঢুকলো না। সবই স্বপ্নের সাথে মিলে যাচ্ছে। তাহলে কি ওর মুখও একটু পরে আয়না হয়ে যাবে, স্বপ্নে দেখা সিলভারের বরের মত?

নাকি মুহিব এখনো স্বপ্নের ভিতরে আছে?

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

সমান্তরাল

শুভ্র আর সারথি।

অল্পদিনের পরিচয় ওদের। শুভ্র’র ফ্রেন্ড সেলিমের দূর সম্পর্কের কাজিন হল সারথি। সেলিমের ভাগনির জন্মদিনের প্রোগ্রামে গিয়ে ওদের প্রথম পরিচয়। দু’জনের দ্বিতীয়বার দেখা হয় মাসখানেক পরে, বেশ কাকতালীয়ভাবে, সিলেটে ঘুরতে গিয়ে, যদিও দুইজন আলাদা ট্রাভেল গ্রুপের সাথে। ওখানেই সামান্য পরিচিত হিসেবে ফোন নাম্বার বিনিময়, ঢাকাতে ফিরে ফোনে কথা বলা, তারপর একসাথে টুকটাক ঘোরাঘুরি, রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন কথা বলা। এক মাসের মাথায়, ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র কয়েক দিন পরে শুভ্র সারথিকে প্রপোজ করে। সারথির একটু সময় চাওয়ার কথা বলে সপ্তাহ দুই নিরব থাকে, তারপর সেটা নিয়ে দু’জনের অভিমান, যোগাযোগ বন্ধ।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সারথি রোড এক্সিডেন্টে পড়লো। “সিরিয়াস না, কিন্তু সিরিয়াস হতে পারতো” টাইপ সিএনজি এক্সিডেন্ট। ফলাফল, পা মচকে দুই সপ্তাহ ঘরে শুয়ে থাকা। ঘরে বসে থাকার প্রথম দিনই কোন এক কারনে শুভ্র’র ফোন, সারথি ধরবে না, ধরবে না করেও শেষে ধরলো। শুভ্র এক্সিডেন্টের কথা শুনে পুরো চুপ করে গেল, একটু পরে ফোন রেখেও দিলো, সারথির কাছে একটু অবাক লাগলেও কিছু বললো না। ঘন্টাখানেক পরে একটা মেসেজ এলো, “তোমার এক্সিডেন্ট শুনে মনে হল, জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি এক মূহুর্তের ভিতরে। তোমাকে পছন্দ করি, সেটা আগেও বলেছি। কিন্তু কতখানি, নিজেও বুঝতাম না, একটু আগে বুঝলাম। সম্ভবত আমার কাছে এটা আর পছন্দের পর্যায়ে নেই। আমাকে তোমার কাছে আসতে না দিলেও, নিজে সাবধান থেকো।”

দুই দিন পরে, মার্চের ১৭ তারিখ, শুভ্র একটা মেসেজ পেলো সারথির কাছ থেকে, “কাছে আসার অনুমতি দিলাম”।

সারথি’র পা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর দুইজনের আবার দেখা, তবে দু’জনের অনুভুতিই একটু আলাদা। কিছুদিন পরে দেখা গেল, দু’জনের দিনে একবার দেখা না হলে দুইজনই অস্থির থাকে। ওদের দু’জনের রিলেশনের কথা সেলিম প্রথম জানে শুভ্র’র কাছ থেকে। শুনে একটু গম্ভীর হয়ে বললো, তুই কি ওর বিষয়ে সবকিছু জানিস? শুভ্র না জানার কথা বললে সেলিম বলে, সারথি হয়তো তোকে কয়েকদিন পরে বলবে এম্নিতেও। তবে, ওর ছোটবেলা থেকেই বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, যতদূর জানি। ছেলে দেশের বাইরে থাকে। এই কারণেই সারথি কারো সাথে কখনো রিলেশনে জড়ায়নি।

মে মাসের ১০ তারিখ। শুভ্র সারথির জন্যে অপেক্ষায় বসে আছে। বেশিরভাগ দিন সারথিই সময়মত আসে আর শুভ্র আসে দেরি করে। আজকে শুভ্র একটা বিশেষ একটা চিন্তা করে এসেছে সারথির জন্যে। একটু পরে সারথি এলো। কিছু কথাবার্তা বলে শুভ্র একটু চুপ করে যায়। ও চুপ করে আছে দেখে সারথি বলে,

-কি হলো, এত চুপ কেন? কি নিয়ে চিন্তা করতেছ এত?

-একটা বিষয় নিয়ে ভাবতেছি। কিভাবে বলবো, বুঝতেছি না।

-বলো। তারপরে, আমিও ভাবি সেটা নিয়ে। দুইজনে আজকে ভাবতে ভাবতে দিন পার করে দিবো। (বলে হেসে ফেলে)।

-(কিছুক্ষন মুগ্ধ দৃষ্টিতে সারথির হাসির দিকে তাকিয়ে) আমাকে ভালোবাসো?

-(একটু হতচকিত হলেও সামলে নিয়ে) তোমার কি মনে হয়? আমার তো মনে হয়, বাসি। (মুচকি হাসি)

-(একটু সিরিয়াস ভয়েসে) তাহলে ঐদিন সেলিম বললো, বাইরে থাকা একজন্ ভদ্রলোকের কথা। (সারথি একবারেই বুঝে গেলো কি বিষয়)

-(কিছুক্ষন চুপ থেকে) সবকিছু কি সবাই সবসময় কন্ট্রোল করতে পারে? ধরে নাও, আমার লাইফের ওই পার্টটা আমি কন্ট্রোলে আনতে পারি নি এখনো, চেষ্টায় আছি, জানিনা সামনে পারবো হয়তো।

-(রাগী গলায়) কন্ট্রোল করতে না পারলে আমার সাথে এখানে বসে আছো কেন? ভিসা নিয়ে বাইরে চলে যাও। আটকায়ে রাখছে কে?

বলে শুভ্র রাগে একটূ দূরে চলে গেল। সারথি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নিঃশব্দে চোখে পানি ফেলতে শুরু করলো। শুভ্র এই প্রথম ওর সাথে রাগী গলায় কথা বললো। কয়েক মিনিট পরে শুভ্র খেয়াল করলো, সারথির চোখেও পানি। আস্তে আস্তে হেটে গিয়ে মাটিতে সারথির সামনে বসে ওর হাতদুটো ধরলো।

-(নরম গলায়) একটু তাকাও আমার দিকে।

-(সারথি তাকায়। চোখের পানিতে কাজল মিশে অদ্ভুত অবস্থা)।

-বিয়ে করবা আমাকে?

-(সারথি কেপে ওঠে) মানে, কি বলো? এভাবে হয় নাকি?

-তবে, কিভাবে হয়? তুমি যদি ওইদিকে কন্ট্রোল করতে না পারো, তাহলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ কি? আজ হোক, কাল হোক, পালিয়েই তো বিয়ে করতে হবে। সেলিমকে বললে ও বুঝবে আমার ধারণা।

-(সারথি চুপ করে থাকে)।

-তোমাকে এখনি উত্তর দিতে হবে না। ভেবে দেখো। তোমার জায়গাতে অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে সম্ভব না। জানিনা, তোমার দিক থেকেও চিন্তাটা এমন কিনা। ভাবনা চিন্তা করে দেখো, কি করতে চাও।

ওরা আরো কিছুক্ষন বসে থেকে চলে যায় ওই দিনের মত। রাত আড়াইটার দিকে শুভ্র’র কাছে সারথির একটা মেসেজ আসে, “হ্যাঁ”।

পরদিন সকালে শুভ্র সেলিমকে জানায়। সেলিম বেশ খুশিই হয়। শুধু বলে, আমি এখন থেকে তোর শ্বশুরপক্ষের লোক, বড়ভাই বলে ডাকবি। সিদ্ধান্ত হয়, পরদিন, মানে ১২ই মে কাজি ওফিসে গিয়ে বিয়ে করবে ওরা।

শুভ্র ওর বাড়িতে পছন্দের কথা আগেই জানিয়ে রেখেছিল। বাসা থেকে কিছু টাকা চেয়ে নেয়। ওর বাবা বলে দেয়, বিয়ের পর বউকে নিয়ে সোজা ওদের বাড়িতে চলে যেতে, রাজশাহীতে। শুভ্র সারথিকে সাথে নিয়ে বিয়ের কেনাকাটা করে। আগে শুনেছে, এটা ঝামেলার কাজ। কিন্তু কোন লেভেলের ঝামেলা, কেনাকাটা করতে গিয়ে টের পায়। সব শেষ মার্কেটিং শেষ করে জিনিসপত্র ওর আরেক ফ্রেন্ড, ইমরানের বাসায় রেখে আসে। প্লান ঠিক হয়, পরদিন শুভ্র আর সারথি আগে ইমরানের বাসায় আসবে, সাথে সেলিমও আসবে। ওখান থেকে সবাই রেডি হয়ে যাবে কাজি অফিসে। বিয়ের পর্ব শেষ করে ইমরানের বাসার গাড়িতেই রাজশাহী রওনা হবে।

সারথিকে যখন বাসার কাছে পৌছে দিয়ে এল, তখন বিকাল হয়ে গেছে। আসার পথে শুভ্র বেশ অনেকক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সারথি একটু লজ্জা পায়। জিজ্ঞেস করে, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? শুভ্র বলে, আমার প্রেমিকাকে শেষ দেখা দেখতেছি, কাল থেকে তো বউকে দেখবো!! দুইটার ভিতর অনেক তফাত, তুমি বুঝবা না!!

সারথিকে নামিয়ে দিয়ে শুভ্র হাটতে হাটতে ফিরতেছে। সন্ধ্যা হয় হয় ভাব। ইমরান আর সেলিম সম্ভবত এখন শুভ্র’র বাসায়, মানে ৩ ব্যাচেলরের ফ্লাট আর কি। ওরা ব্যাচেলর পার্টি করবে, ঘোষণা দিয়েছে। কি কি প্লান করতেছে, শুভ্র নিজেও তেমন কিছু জানেনা। এত হঠাৎ করে এত কিছু হয়ে যাবে, ও নিজেও ভাবেনি।

আজিমপুর থেকে মোহাম্মদপুর হেটে আসা, বেশ দূর। শুভ্র তখন ধানমন্ডির ভেতর দিয়ে হাটছে। রাত ১০টা মত বাজে। আকাশে হঠাৎ মেঘ করা শুরু হয়েছে, সাথে হালকা ঠান্ডা বাতাস। মনে হচ্ছে, ঝড় শুরু হবে। শুভ্র ঠিক করলো, আজকে বৃষ্টিতে ভিজবে, যতক্ষন বৃষ্টি হয়। একটু পরেই শুরু হল তুমুল বাতাস, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া টাইপ। আরেকটু পরে এল তুমুল বৃষ্টি। শুভ্র তখনো রাস্তায় হাটছে আস্তে আস্তে, ভিজতে ভিজতে। বৃষ্টির তোড়ে হাটা মুশকিল, সাথে একটার পর একটা বাজ পড়তেছে। হাটতে হাটতে ধানমন্ডি লেকের ব্রিজের উপর এসে দাড়ালো। অন্ধকারের ভেতর এত বৃষ্টিতে রিকশাও তেমন চলতেছে না। হঠাৎ চোখের সামনে একটা আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। তারপর আর কিছু মনে নেই।

শুভ্র’র জ্ঞান ফিরে দেখলো, সে হাসপাতালে। সারা গায়ে কেমন যেন একটা জড়তা। একটু পরে জানতে পারলো, ও যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার একেবার পাশে বাজ পড়েছে। বাজের পুরোটা সম্ভবত লেকের পানিতেই পড়েছে। সে অল্পের জন্যে বেচে গেছে। শুধু বাম হাতের বুড়ো আঙুলের নখের নিচে একটু কালো দাগ পরে গেছে। সম্ভবত, ওখানে পুড়ে যাওয়ার কারনে।

হাসপাতাল থেকে সেলিম আর ইমরানকে ফোন দিল। ওরা প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে এলো। সেলিম একটু বেশিই ঘাবড়ে গেছে শুনে, হাজার হলেও মেয়েপক্ষের লোক বলে কথা। হাসপাতাল থেকে একদিন অবজার্ভেশনে রাখতে চাচ্ছিল। ওরা নিজেরা কথা বলে রিলিজ নিয়ে ভোররাতে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে শুভ্র’কে নিয়ে বাসায় গেল। শুভ্র ওদের বললো, কাউকে না জানাতে, সারথি কিংবা ওর বাসায়। বললো, অনেক টায়ার্ড লাগছে, ঘুম দেয়া দরকার। সেলিম বললো, ঠিক আছে, রুমে গিয়ে ঘুমা। আমরা তোকে ১১ নাগাদ তুলে দিবো, বাদ যোহর তোদের বিয়ে কাজি ওফিসে, আমরা কথা বলে রেখেছি।

শুভ্র “আচ্ছা” বলে নিজের রুমে চলে গেল। অসম্ভব ঘুম পাচ্ছে ওর, যেন কত বছর ঘুমায় না। কাপড় চোপড় না চেঞ্জ করেই বিছানায় শুয়ে পড়লো। শোয়ামাত্রই যেন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। মনে হল, ঘুমের রাজ্য থেকে কেউ ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলে ডাকছে।

ওদের বিয়েটা প্লানমাফিক ভালোমতই শেষ হল। ইমরানের বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার শেষে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিল। গাড়িতে সারথি চুপচাপ বসে আছে, শুভ্র সারথির হাত ধরে নিরবতা ভেঙে ওকে বললো, মন খারাপ করো না, রাজশাহী থেকে ফিরে তোমাদের বাসায় দেখা করতে যাবে। যদি মেয়ে চুরির অপরাধে মেরে না ফেলে, তাহলে ইনশাল্লাহ শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে দেখা করে আসবো। সারথি বলে ওঠে, কি বলো এসব, মারবে কেন? আমি কি এতই ফেলনা নাকি! শুভ্র বলে, সেটাও কথা, তাছাড়া সেলিম বড়ভাইও আছে। বড়ভাই আমাদেরকে রক্ষা করবে। বলে গাড়ীর সামনে সিটে বসা সেলিমের ঘাড়ে একটা বাড়ি মারে, বলে, কি বড়ভাই, ঠিক আছে না? সেলিম ঘাড় ঘুরে তাকিয়ে হাসে। সেও যাচ্ছে ওদের সাথে রাজশাহী, মেয়েপক্ষের কেউ না কেউ মেয়ের সাথে যাওয়া উচিত।

শুভ্র’র বাসায় সবাই বউ বরণের প্রিপারেশন নিয়েই ছিল। সে বাড়ির মেজ ছেলে, ২ ভাই আর ১ বোনের মাঝে। ওর ছোটবোন, নিঝুম আর ভাতিঝি, ঝুমুর সারাদিন ধরে ওদের জন্যে বাসরঘর সাজাচ্ছে। ওর মা আর ভাবী, নূপুর ঘরবাড়ি গোছানো আর রান্নার তদারকিতে কাটিয়েছে সারাদিন। শুভ্র বউ নিয়ে বাড়ী পৌছালো রাত ৮টার দিকে। সারথি ওদের বাড়ির মেইন গেটের ভেতরে ঢুকে গাড়ির ভেতর থেকে চারিদিক তাকিয়ে দেখছিল। দোতালা বাড়ী, বেশ পুরানো। কিন্তু, অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়ির এরিয়া। অনেক খোলামেলা, যেটা ঢাকাতে কখনো সে দেখে নাই।

বরণ করা শেষ হতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। শুভ্র’র বাবা যতই বলে, “ওরা এতটা জার্নি করে এসেছে, তোমরা এসব শেষ করো, ওদের একটু বিশ্রাম নিতে দাও।”, ততই যেন নিঝুম আর ঝুমুর নতুন নতুন টাকা নেয়ার ফন্দি করে আর সেলিমের সাথে ঝগড়া শুরু করে। অবশেষে ১০টার দিকে ওরা ছাড়া পেল, নূপুর দুইজনকে বাসরঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে একটু হেসে বললো, “আধা ঘন্টা সময়, যা কিছু করার, শেষ করে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসো, সাড়ে ১০টায় সবাই খেতে বসবো”।

রাতের খাওয়া শেষ করে ওরা রুমের ফিরতে ফিরতে প্রায় ১২টা। রুমে ঢুকেই সারথি বিছানায় গা এলিয়ে দিল। –শুভ্র, সারাদিন তো ফোন অফ করে রেখেছি। এখন কি একটু চালু করবো? আম্মুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।

-তোমার ইচ্ছা, তবে এখন ফোন চালু করলে একটু পরেই ফোন আসা শুরু করবে। কি বলবা এখনই উনাদের মুখের উপর। আর তাছাড়া, সেলিম অলরেডি তোমাদের বাসায় জানিয়েছে। ওর সাথে একটু আগেও কথা হইছে এটা নিয়ে। বাসার সবাই আপসেট তো বটেই। কিন্তু, সিরিয়াস কিছু হয় নাই।

সারথি আর কিছু বললো না। এমন সময় দরজায় টোকা দিয়ে ঝুমুর বলল, “চাচ্চু, দাদু তোমাকে ৫ মিনিটের জন্যে ডাকে”। শুভ্র একটু আসতেছি বলে বের হয়ে গেল। সারথি কয়েক সেকেন্ড একটু ভেবে দৌড়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। ফোন চালু করতেই দেখলো, অনেকগুলো মিসড কল এলার্ট। ওর মাকে একটা মেসেজ দিয়ে ফোন আবার বন্ধ করে দিল, “আম্মু, আমি ভালো আছি। শুভ্র অনেক ভালো একটা মানুষ। ওদের বাসার সবাই আমাদের অনেক আদর দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। তুমি প্লিজ আমার জন্যে টেনশন করো না। যদি পারো, আমাদেরকে মাফ করে দিও আর আমাদের জন্যে দোয়া করো”। একটু পরে শুভ্র রুমে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। সারথি জিজ্ঞেস করলো, আব্বু ডেকেছিল কেন? শুভ্র বললো, তোমাদের বাসায় কাল ফোন দিয়ে কথা বলবে, সেটা বলার জন্যে। সেলিমও ছিল ওখানে। মুরুব্বিরা মুরুব্বিদের সাথে কথা বলবে আর কি!

সারথি তখনও বিছানায় বসে আছে। শুভ্র কথা বলতে বলতে সারথির সামনে গিয়ে বললো, তা ম্যাডাম, এখন কি একটু কাছে আসা যায়? আর কতক্ষন দুরে থাকবেন? সারথি শুভ্র’র কথা শুনে হসে ফেললো, বিছানা থেকে উঠে শুভ্র’র দিকে এগিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।

তখন প্রায় ভোররাত। দুইজনই ঘুমে। সারথি শুভ্র’র পায়ের উপর পা তুলে ঘুমিয়ে আছে। তার নাকি অভ্যাস কোলবালিশ নিয়ে ঘুমানো, এখন শুভ্রই কোলবালিশ আর কি। হঠাৎ, শুভ্র ঘুমের মাঝে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। মনে হল, কেউ ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলে ডাকছে। শুভ্র ঘুমের মাঝে সারথির হাত চেপে ধরলো। সারথি একটু ব্যাথা পেয়ে হাত ছাড়িয়ে আরেক দিকে ঘুরে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। শুভ্র প্রাণপণে চেষ্টা করছে ঘুম থেকে জেগে উঠতে, পারছে না। ওই ডাকটাও মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে কাছে আসছে। ঘুমের ভেতরে মনে হল, কেউ যেন ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলতে বলতে দূরে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু, সে তো যেতে চাই না কোনভাবেই।

শুভ্র লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। দেখলো, ও রাস্তার পাশে বসে আছে। ভরদুপুরের রোদ, রাস্তা আগুনের মত গরম। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, কি ব্যাপার! কোথায় এলাম। কয়েক মিনিট পরে বুঝতে পারলো, ঢাকায় যে ফ্লাটে থাকে, সেটার কাছে একটা মোড়ের কোণায় রাস্তায় শুয়ে আছে সে। বিড়বিড় করতে লাগলো, এখানে এলাম কিভাবে? ছিলাম তো বাসায়, সারথির সাথে,এখন এখানে কিভাবে!! কিছুক্ষন মাথায় হাত দিয়ে বসে থেকে ভাবলো, ফ্ল্যাট যখন কাছে, ওখানেই আগে যাই।

ফ্ল্যাটের কাছাকাছি যেতেই দেখলো সেলিম আর ইমরান দাঁড়িয়ে আছে বাসার নিচে। ওকে দেখেই দৌড়ে ছুটে এল। সেলিম তো বেশ রেগেই বললো, “কিরে পালাইতেছিলি নাকি? সারথির সাথে তুই এমন করার চিন্তা করবি না। জানে মেরে দিবো”। শুভ্র হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান সেলিমকে বললো, “তুই থাম তো। কালকেই ওর না একটা এক্সিডেন্ট হল। কি হইছে না হইছে, তুই বুঝবি ক্যাম্নে”। শুভ্রকে বললো, “শুভ্র, দোস্ত তুই ঠিক আছিস তো? তোর না আজকে সারথির সাথে বিয়ে, আমরা কাজি অফিসে দুপুর ২টায় টাইম দিয়ে আসছিলাম, এখন বাজে সাড়ে ৩টা। তোরে তো সকাল থেকে আমরা খুজতে খুজতে পাগল হওয়ার দশা। ভোরবেলা ঘুমানোর জন্যে তোকে রুমে দিয়ে আইলাম। সকালে তোর রুমে গিয়ে দেখি গায়েব। ফোনও রুমে পরে আছে। সারথি ওদিকে কাঁদতে কাঁদতে পাগল হওয়ার অবস্থা। তোর বাসা থেকে ফোন আসতেছে, সেটাও ধরতেছি না ভয়ে যে, কি বলবো। দোস্ত, ছিলি কই? বলবি তো।”

শুভ্র তখন হতভম্ব হয়ে আছে। কি বলবে, বুঝতেছে না। কি হয়েছে, কিছুই বুঝতেছে না। রাতে ঘুমালো সারথির সাথে, রাজশাহীতে। সকালে এখন এখানে। কি মনে করে জিজ্ঞেস করলো, “ ইমরান, দোস্ত আজকে কয় তারিখ?” প্রশ্ন শুনে সেলিম বললো, “তোর কি মাথা ঠিক আছে? নিজে বিয়ের ডেট ঠিক করলি? এখন নিজে বলিস কয় তারিখ? আজকে ১২ তারিখ, ১২ই মে। সারথি তোর জন্যে অপেক্ষা করতেছে, তোকে বিয়ে করার জন্যে”।

শুভ্র আকাশ থেকে পড়লো। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ভাবলো, মনে হয় ইমরান আর সেলিম মজা করতেছে। মাথায় একটা আইডিয়া এল। বললো, “দোস্ত, মাথার ভেতর ভালো লাগতেছে না। মোড়ে গিয়ে এককাপ চা খাই চল, তারপর কথা বলি”। ইমরান একটু চুপ করে থেকে বললো, “আচ্ছা চল। সেলিম, তুই সারথিকে ফোন দে একটু। জানা যে, ওর জামাইকে খুজে পাইছি”। শুভ্র মনে মনে ভাবলো, মানে কি, সারথিও এদের সাথে যোগ দিয়ে আমার সাথে মজা করবে!

সেলিম ফোন দিলো। তারপর শুভ্র’র দিকে ফোন বাড়িয়ে দিল, “নে ধর, তোর বউ কথা বলবে”। শুভ্র ফোন কানে নিয়েই শুনলো, ওই পাশে সারথি ফোপাচ্ছে। শুভ্র কাপা কাপা গলায় বললো, “হ্যালো”। সারথি এবার কান্নায় ভেঙে পড়লো ফোনে, “শুভ্র, তুমি কই ছিলা? ঠিক আছ তো? আমি সেই কখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি ইমরান ভাইদের বাসায়। তোমার জন্যে সব ছেড়ে আজকে চলে এসেছি। তোমার কিছু হলে আমি বাচবো না……”। এরপরে সারথি কথা বলতেই আছে, কিন্তু শুভ্র’র মাথায় কিছুই আর ঢুকছে না। এক পর্যায়ে বললো, “সারথি, মাথার ভেতর ভালো লাগছে না। তাই আমরা একটু চা খেতে যাচ্ছি। ওখান থেকে বাসায় ফিরেই তোমার কাছে চলে আসতেছি”। বলে ফোন সেলিমকে দিয়ে দিল।

মোড়ে চায়ের দোকানে এসে লাল চা অর্ডার দিয়ে চায়ের দোকানে টিভির দিকে তাকালো। টিভিতে একটা নিউজ চ্যানেল চলতেছে। টিভিস্ক্রিনের নিচের দিকে, বামপাশে বড় বড় করে লেখা, ১২ই মে। ও সারথির কান্না শোনার পরে এরকমই কিছু আশংকা করছিল। Something really weird is happening.

চা শেষ করে বাসায় ফিরলো। ফিরতে ফিরতে ভাবছিলো, হয়তো উল্টাপাল্টা কিছু না। অসুস্থ ছিল কাল রাতে, তাই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে ঘুমের ভেতর। স্বপ্নের ভেতর সারথিকে বিয়ে করা শুরু করে কাছেও পেয়ে গেছে। বাসায় ফিরে বাথরুমে গেল ফ্রেশ হতে, বের হতে হবে তাড়াতাড়ি। টি-শার্টটা খোলার পিঠের কাছে একটু জ্বলাজ্বলা ভাব বুঝতে পারলো। এটা আবার কিভাবে হলো? মনে পড়লো, গতকাল রাতে, ওদের বাসর ঘরে সারথিকে আদর করার সময় ও শুভ্র’র পিঠে খামচি দিয়েছিল বের কয়েক বার, তার মাঝে একবার বেশ জোরে।

শুভ্র এবার মাথায় হাত দিয়ে বাথরুমের মেঝেতে বসে পড়লো।

এর মানে কি? সে ১২ই মে দুপুরে সারথিকে বিয়ে করেছে, দু’জনে একই বিছানায় রাত কাটিয়েছে। তারপর ঘুমিয়ে গিয়ে আবার ১২ই মে দুপুরে চলে এসেছে। কিভাবে সম্ভব এটা? কে উত্তর দিবে?

পিতা

“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”

ফজলু ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকাবে নাকি চিন্তা করে। একটু চিন্তা করে না তাকানোটাই ঠিক বলে মনে হয় তার কাছে। তাই সে আর পিছনে ফিরে না তাকিয়ে আবার হাটা শুরু করে।

ফজলু সাধুগঞ্জ বাজারের দিকে যাচ্ছে। বাজারটা আগে অনেক ছোট ছিল। ৫-৬ বছর আগেও বর্ষাকালে বাজারের রাস্তায় কাঁদার চোটে হাঁটা যেত না। আর সৈয়দ মেম্বারের মুদির দোকানটা বাদ দিলে আর কোন বড় দোকানও ছিল না। এখন বাজারের আর সেই দিন নেই। লোকে-লোকে লোকারন্য হয়ে গেছে। এখন আশপাশের দশ গ্রামের মাঝে সাধুগঞ্জ বাজারই সবচেয়ে বড়।

ফজলু বাজারে রইস আলীর দোকানে চাকরি করে। রইস আলীর বাজারে কয়েকটা দোকান আছে। ফজলু কাপড়ের দোকানটাতে বসে। তার কাজ হল দোকানের হিসাব-নিকাশ দেখাশোনা করা। পাশাপাশি রইস আলীর সব দোকানের সার্বিক হিসাবেও সাহায্য করে। পয়সাকড়ির দিক দিয়ে রইস আলী খুবই কৃপণ হলেও কি কারণে যেন ফজলুকে তিনি খুবই বিশ্বাস করেন। তবে এটাও সত্যি যে, ফজলু তার সাথে কখনো বেঈমানী করে নাই।

আজ সোমবার। এখনও ফজরের আযান হয়নি। গতকাল রবিবার বাজারে হাটবার ছিল। ফজলু সাধারনত হাটবারের রাতে দোকানেই থাকে। সব দোকানের হিসাবের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় রাত ২-৩ টা বাজে। তারপর দোকানের চৌকির উপরই পাটি-বালিশ পেতে ঘুমিয়ে যায়।

আজ রাতে ফজলের ঘুম আসছিল না। চৈত্র মাসের গরম একটা কারণ হতে পারে। তাই ফজলু ভাবলো নদী থেকে গোসল করে আসার জন্যে। বাজার থেকে নদীর ঘাট ১০ মিনিটের হাটা পথ। দোকান বন্ধ করে সে বেড়িয়ে পড়লো। নদীর ঘাটে এসে একটা গামছা পড়ে নদীতে নেমে গেল।

ফজলের নদী নিয়ে এক ধরনের ঘোরের মত আছে। নদীতে নামলেই সে তার দম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাঁতার কাটে। আর ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাসের কারণে অনেক সময় অনেকদূরে চলে যায়। আজকে পানিতে নামার পড়ে ফজলের কেমন যেন লাগলো। কেন যেন মনে হল, বেশি দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। ফজলু এমনি কোন সময় এইসব বিষয় পাত্তা দেয় না। কিন্তু আজ কেন যেন তার মনে হল, থাক আজকে না হয় নাইবা গেলাম।

আজকে আর সাঁতার কাটবে না ভেবে সে পানিতে ডুব দিল। ডুব দেয়ার পরপরই পানির নিচ থেকে তার মনে হল কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকলো। ফজলু ভাবলো, কেউ বোধ হয় ঘাটে এসেছে আর তাকে দেখে ডাক দিয়েছে। দ্রুত পানির উপরে এসেই বললো “কে?”

কিন্তু তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। ঘাটে তো নাইই, আশেপাশে কোথাওই কেউ নেই। সে মনে ভুল ভেবে আবার পানিতে ডুব দিলো।

এবার স্পষ্ট গলা। “কি, ফজলু মিয়া, কথা কও না ক্যান?” ফজলু পানির মাঝ থেকে একেবারে লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু উপরে উঠে দেখে কেউ নেই। ফজলু ভয় পেল কিনা, নিজেও ঠিক বুঝলো না। গ্রামে তার সাহসের তারিফ করে সবাই। আর গরিবের ছেলে হওয়ায় পড়ালেখাতে ভালো থাকলেও খরচ চালাতে না পেরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, বাবা আর বড়ভাই দুইজনই মারা যাই একই বছরে। যদিও এখন সে সংসারে একা, মা মারা গেছে গতবছর আর বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। তার বাড়িতে সে একাই থাকে। কোনদিন কোথাও ভয় পায়নি। আসলে পায়নি বলা ঠিক হবে না। ফজলু মনে করে, সে ভয় পাওয়া থেকে ভয় পাওয়ার কারণ নিয়ে চিন্তা করে বেশি। আর কারণ ধরতে পারলে সব কিছুরই প্রতিকার করা যায়। এই চিন্তা করার পদ্ধতিটা ও শিখেছিল স্কুলে, বিজ্ঞানের সমাদ্দার স্যারের কাছে। স্যার বছর দুই হলো, মারা গেছেন। ফজলুকে দেখে আফসোস করতেন, এত মেধাবী একটা ছেলে, দোকানে কাজ করে বেড়াচ্ছে।

সমাদ্দার স্যারের এই শিক্ষার কারনেই হোক, কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক, অন্য কেউ হলে যেখানে ভয়ে দৌড় দিত, ফজলু তখন নদীপাড়ে বসে চিন্তা করতে লাগলো যে সে শুনলোটা কি?

হঠাৎ করে মনে আসলো যে, আজ সোমবার, হাটবারের পরের দিন। এই দিন রইস আলী ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই দোকানে চলে আসে, আগেরদিনের হিসাব দেখার জন্যে। তাড়াতাড়ি দোকানে ফেরা দরকার। ফজলু উঠে গামছা পড়েই প্যান্টটা গলায় ঝুলিয়ে হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।

নদীর কিনার ধরে আসতে আসতে রাস্তায় উঠতেই ফজলু স্পষ্ট শুনলো,

“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”

কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ফজলের মাথায় অনেক কিছু খেলে গেল। তারপর পিছনে না ফিরে সে আগের মতই হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।

বাজারের দিকের রাস্তাটা একটু পরেই গিয়ে ক্ষেতের মাঝে পড়েছে। ক্ষেতের মাঝে মানে রাস্তার দু’ধারে যতদূর চোখ যায়, শুধু মাঠ। রাস্তাটা অনেকখানি উঁচু মাঠ থেকে। বর্ষাকালে আউশের ক্ষেত ডুবে যায়, কিন্তু রাস্তাটা ডোবে না। কৃষকেরা হাঁটু পানিতে শুয়ে পড়ে থাকা ধান কেটে নিয়ে যায়। অঞ্চলে সবারই বাড়িঘর গ্রামের একপাশে আর অন্যপাশ দিয়ে এই বিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা। বৃষ্টির সময় নদী আর এই বিল এক হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সাগরের মাঝ দিয়ে আরেক দ্বীপে রাস্তাটা চলে গেছে। এই জন্যেই বোধ হয় ফজলের গ্রামের নাম ভাসানগা। তবে এই রাস্তাটা খুব যে লম্বা, তাও না। আধা কিলো, এক কিলো মত হবে হয়তো। ভাসানগা থেকে সাধুপুর বাজার প্রায় এক কিলোর একটু বেশি। শুকনো মৌসুমে বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায় আর থাকে শুধু নদী।

ফজলু বেশ জোরে জোরে পা চালাচ্ছে। আজকে কি সে ভয় পেয়েছে নাকি দোকানে তাড়াতাড়ি পৌছানোর জন্যে, সেটা পরিস্কার না। আগেও একবার এরকম হয়েছে। সেটা যদিও অনেক আগের কথা।

তখন সে ক্লাস টেনে পরে সম্ভবত। এরকম সময়েরই ঘটনা, মানে চৈত্র মাসে। সে রাতে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল তার বড়ভাইয়ের নৌকা নিয়ে। বেশ অনেকদূর চলে গিয়েছিল। দুই ধারে শুধু ক্ষেত। কোন মানুষজনও নেই। সে তখন জাল তুলে বিছাইতেছে। ওইদিন মাছ পাচ্ছিল না। সেজন্যে মেজাজও একটু খারাপ ছিলো। এমন সময় হঠাৎ কে যেন জিজ্ঞেস করলো, “কি ফজলু মিয়া, এই কয়ডা মাছ দিয়া চলবো??” ফজলু মাথা না তুলেই বললো “হ, নদীর মাছ আজকে মনে হয় পলাইছে। এতগুলা খ্যাপ মারলাম, মাছই পাইলাম না।” এই বলে মাথা তুলে দেখে কেউ নেই। সে মনে করেছিল, পাশ থেকে কোন নৌকা যাওয়ার সময় মাঝি কথাগুলো বলছিল।

ফজলু টান পায়ে হাঁটছে। কিছুক্ষণের মাঝেই বাজারে পৌছে গেল। বাজারের মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে দোকানে ঢুকে কাপড় ছেড়ে আজকে না ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, একটু পরেই রইস আলী চলে আসবে। শুধু শুধু বিছানা পাতার ঝামেলা করা ঠিক হবে না।

———————–১ম অধ্যায় শেষ—————–

রইস আলীর আজকে মেজাজ যথেষ্টই খারাপ। কালকে হাটবারে বেচাকেনা খুব ভালো হয়নি। এমনিতেই ছোট বাজার। তাই সব ব্যবসায়ীই হাটবারের আশায় থাকে, যে ঐদিন বেচাকেনা ভালো হলে সারা সপ্তাহের হিসাব উঠে যাবে। কিন্তু গতকাল হাটবারে তার দোকানে কর্মচারীরা নিজেদের মাঝে একটু ঝামেলা করে ফেলেছে। অনেক খদ্দের এসে ফিরে চলে গেছে। গ্রামের মানুষ এগুলো মনে রাখে। দেখা যাবে পরের হাটবারে তার দোকানে ওরা আর আসে নাই। আবার কম বেতনে এখন কর্মচারী পাওয়াও আরেক সমস্যা। তিনি এমনিতেই কাউকে বিশ্বাস করেন না। তবে অন্যদের চেয়ে ফজলু ছেলেটা আলাদা। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। আবার পরিবারে কেউ নাই বলে বেতন কম দিলেও কিছু বলে না। এই ফজরের ওয়াক্তের পরে গিয়েই তিনি দেখবেন এরই মধ্যে ফজলু অনেক খানি হিসাবের কাজ গুছিয়ে ফেলেছে। এমন কর্মচারী মালিকের পছন্দ না হয়ে যায় না।

যদিও আজকে রইস আলীর মন খারাপ অন্য কারণে। তার ছেলে, খসরু ইদানীং বেশ বেয়াড়া হয়ে গেছে। গেল অঘ্রানে ১৪ তে পা দিয়েছে ছেলেটা। এই বয়সেই সে তার বড় বোন আর মাকে মারধর করা শুরু করেছে। তিনি নিজে মানুষটা কৃপণ হলেও মেয়েছেলের গায়ে হাত তোলা তার পছন্দ না। তার কথা হল, মেয়েছেলে হল ঘরের আসবাবপত্রের মত, ঘরের সৌন্দর্য। মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হলে অন্য কথা। কিন্তু পারতপক্ষে তিনি ওদের গায়ে হাত তোলেন না। সেখানে তার ছেলে এই বয়সেই যা শুরু করেছে, বড় হলে যে কি করবে সেটাই চিন্তার বিষয়। তিনি নিজেও ছোটবেলায় বড় বোনদের সাথে মারামারি করেছেন। কিন্তু তার ছেলে যা করে, সেটাকে একই অর্থে বলা যায় না।

গতকাল সন্ধ্যায় ছেলেটা তার বড় বোনকে কাটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এমন মার মেরেছে যে সারা গায়ে রক্তের দাগ পড়ে গেছে। মেয়েটার বিয়ের কথা চলছে। ছেলে ঢাকায় থাকে। মাসখানেক পরে সামনের বড় ঈদে ছেলে বাড়ি ফিরলে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। রইস আলীর বউ মাজেদা বেগমও তার মেয়ে নাসরিনকে নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তার মাঝে আছেন। উপযুক্ত মেয়ে ঘরে থাকলে তাকে মায়ের টেনশন যদিও নতুন কিছু না, কিন্তু মাজেদার চিন্তার কারণ হল তার ছেলে খসরু। ভাই-বোনের মাঝে কত মিল-মহব্বত থাকে। অথচ তার এই ছেলে বড় বোনকে দেখতেই পারে না। কালকে রাতে বোনকে যে মারটা মারছে, মাজেদা নিজেও মনে হয় মেয়েকে কখনো এত মারেন নাই। মেয়ের চেহারার এখন যে অবস্থা হইছে, তাতে আল্লাহই জানে মাসখানেকের মাঝে সারবে কিনা। এখন সেই মেয়ে হাটতেই পারছে না। বিবাহযোগ্যা এমন মেয়েকে মাইরের কথা বাইরে ছড়ালে লোকে ছিঃ ছিঃ করবে। তাই তিনি কাউকে না জানিয়ে রইস আলী নিজেই মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। অন্যসময় হলে কাউকে দিয়ে পাঠাতেন। কালকে তার মা সফেদা বেগম এমনভাবে চিল্লানো শুরু করলেন যে না নিয়ে গিয়ে পারেন নি। মেয়ের চিকিৎসাতে অনেকগুলো টাকা জলে গেল। তারপরও কিছু করারও নেই। মান-সম্মান হারালে সেটা ফেরত পাওয়া মুশকিল। মেয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে গেলে বাঁচা। নাহলে ছেলেপক্ষের কাছে কি লজ্জা পাওয়া লাগবে, কে জানে।

কালকে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। তখন ছেলেকে সামনে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেন নাই। ধরে রামপিটুনি দিয়েছেন। সেই পিটুনিতে ছেলেও এখন শয্যাগত। এখন আবার রইস আলী ভয়ে আছেন যে, ছেলে সুস্থ হয়ে উঠলে কি করবে? কারণ, এত মার খেয়েও সে একটুও কাদে নি। তিনি তো ছোটবেলায় এমন ছিলেন না। কারো হাতে মার খেলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেদেছেন। ছেলে এমন হল কিভাবে? সফেদা বেগম বলেন, “রইস হল ওর বাপের মত। লগে আছে, কিন্তু পিছে নাই। সাথে আমার শ্বশুরের গুণ পাইছে, কিপটামো। আর ওর পোলাডা আইছে আসমান থেইকা সগির আলীর মত হয়ে।” সগির আলী হল সফেদা বেগমের দেবর। দুনিয়ার বদ একটা লোক। সবার কপাল ভালো যে, অল্প বয়সে সাপের কামড়ে মরছে। কিন্তু ঐ অল্প বয়সেই যতরকম খারাপ কাজ আছে, তার সবই করেছে আর কত মানুষের বদদোয়া যে কুড়াইছে, তার ঠিক নাই।

রইস আলী দোকানের সামনে গিয়ে দেখলেন, দোকান বন্ধ। বাইরে থেকে তালা দেয়া। হাটবারের দিন রাতে ফজলু সবসময় দোকানে থাকে। নিজের অজান্তেই তার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই দোকানে বেচাকেনা ভাল হয় নাই, তার উপর বাড়িতে এইসব ঝামেলা। হারামজাদা ফজলুডা বেশি লাই পেয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কুত্তারে বেশি লাই দিতে নাই, দিলে মাথার উপর উঠে বসে থাকে। ছেলেটারে তিনি বিশ্বাস করেন, তাই বলে এখন তাকে এই রাস্তার কুত্তাটার জন্যে দোকানের বাইরে বসে থাকতে হবে। এই হারামীটার কাছে দোকানের চাবি দেয়াটাই ভুল হয়েছে। আজকেই এইডারে লাত্থি দিয়ে বের করে দিতে হবে। হারামজাদাটা কতক্ষণ তাকে বাইরে দাঁড় করায়ে রাখবে, আল্লাহই জানে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি দোকানের পাশে চায়ের স্টলের বাইরে রাখা বেঞ্চে বসে রাগে ফুঁসতে লাগলেন । বসে থাকতে থাকতে তার মাথায় এলো, ফজলু আবার তার দোকানের ক্যাশ গাপ করে সরে পড়লো না তো? আজকাইলকের পোলাপাইন বলে বিশ্বাস নেই।

একটু পরে মনে হল, ধুর, তিনি কি চিন্তা করছেন? তিনি নিজে মানুষ চিনতে এত বড় ভুল করতেই পারেন না। খসরুর বয়সে তিনি মানুষের বাড়িতে কাপড় ফেরি করে বেচে বেড়াতেন। সেখান থেকে এতদূর এসেছেন। আজ বাজারে তার তিনটা দোকান। তিনি মানুষ চিনতে ভুল করার লোক না। আচ্ছা ফজলুর কোন বিপদ হয়নি তো আবার? এতবড় বাজারে হাতে গোনা কয়েকটা লোক রাতে থাকে। তাও দোকানের ভেতর থেকে কিছু হলে বাইরের কেউ টেরও পাবে না যে কি হয়ছে। বাজারে পাহারাদার আছে। কিন্তু বিপদের সময় দেখা যায় এরা ঘুমাচ্ছে, এটা তার নিজের অভিজ্ঞতা। মানুষজন চিনতে ভুল করেন না, কিন্তু তার সম্পদের উপর অনেক মানুষেরই নজর আছে। আর হাটবারের রাতে ক্যাশের টাকা হিসাবের জন্যে দোকানেই থাকে। ফজলু একা মানুষ। তার উপর একটু সরল সোজা। ওকে সরায়ে দিয়ে লুট করে নিয়ে যাওয়া খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা না।

নাহ, সেটাই বা কি করে সম্ভব? দোকান তো তালা দেয়া বাইরে থেকে। আর তালা দেয়ার ধরন থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, ফজলু দিছে। তাহলে পোলাডা গেল কই? কয়েকদিন আগে আবার বাজারের পিছনের খালে কারা কল্লাফেলা লাশ ফেলে গেছিল। তারপর থেকে নাকি বাজারে রাতে প্রতিদিন নিশির ডাক শোনা যায়। ছেলেটা আবার এসব জিনিসের পাল্লায় পড়লো  না তো? যদিও ফজলুকে কোনদিন এসব জিনিসে ভয় পেতে শোনেন নাই। উল্টা পোলাডা একদিন তারে বুঝাইছে যে, ওগুলো হল মানুষের কল্পনা। যে কয়দিন নিশির ডাক শোনা যায়, সবদিনই বাইরে বেশ বাতাস ছিলো। আর বাজারের পেছনে সৈয়দ মেম্বারের ভুট্টার ক্ষেত। বাতাসে ভুট্টার মোচায় বাড়ি লেগে, আর পাতার ঘষার শব্দ থেকে ঐসব নিশির ডাক শোনা যায়। রইস আলী জীবনে অনেকের কাছ থেকে অনেক কথা শুনেছেন নিশির ডাক নিয়ে। কিন্তু এমন অদ্ভুত ব্যাখ্যা ফজলু ছাড়া আর কারো কাছে শোনেন নাই। এমন ছেলে আর যাই হোক, ভয় পাওয়ার কথা না।

বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলেন বেঞ্চে। নাহ, এখন ছেলেটার জন্যে আসলেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। দূরে বাজারের জেলেদের ভ্যান দেখতে পাচ্ছেন। মাছের নিলাম আর ভাগ-বাটোয়ারা বেচাকেনা শুরুর আগেই করতে হয়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বেড়িয়ে পড়লেন ফজলুর খোঁজে। ছেলেটা বাড়িতে যাবে না নিশ্চিত, কারণ ওর নাকি বাড়িতে থাকতে ভাল লাগে না। তবে মাছ ধরতে যেতে পারে। বর্ষার সময় রাতে মাছ ধরার নেশা আছে ছেলেটার। ভোরবেলা খলুই ভরে মাছ নিয়ে রইস মিয়ার বাড়ি চলে যায়। তার স্ত্রী, মাজেদার হাতে মাছের খলুই ধরায়ে দিয়ে চলে আসে দোকানে। মাজেদা বেগম মাছ রান্না করে সকালে খাবার পাঠায়ে দেয় দোকানে রইস আলী আর ফজলুর জন্যে।

বাজার থেকে নদী বেশি দূরে না। তাই ফজলুর বাড়িতে যাবার আগে নদীর পাড়টা ঘুরে যাবার চিন্তা করলেন রইস আলী। একটু জোর পায়েই হাটছেন। ছেলেটার জন্যে তার আসলেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

————————-২য় অধ্যায় শেষ————-

ফজলু চোখ মেলে দেখলো সে খড়ের পালার উপর পড়ে আছে। সে ঘুমাইছে কোন সময় আর এখন কোথায় আছে, কিছুই মনে করতে পারলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, সে তাদের বংশের পুরাতন ভিটার পাশে খড়ের উপরে পড়ে আছে। নাম যদিও পুরাতন ভিটা, মানুষ এখনো বাস করে। গ্রামের একেবারে আরেক প্রান্তে এই ভিটা। ফজলুর দাদা খাজা মিয়া এই ভিটা তার শরিকদের কাছে বেচে দিয়ে যান। তবে গ্রামের লোকেরা বলে যে ঠিক বেচে না, ফজলুর দাদার কাছ থেকে তার শরিকরা এটা জোর করে লিখে নেয়।

ফজলু এই ভিটায় এসেছে অনেক ছোটবেলায়। আজ এখানে কেন এসেছিল, সে তাও মনে করতে পারলো না। ভিটা পুরাতন হওয়ায় এখানে গাছপালা অনেক বেশি। তাদের শরিকদের কয়েকজন এখনো এখানে বাস করে। যদিও এদের সাথে তার সম্পর্ক খুবই খারাপ।

কেমন জানি ক্লান্ত লাগছে তার। ইচ্ছা করছে আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে। কিন্তু গাছের ফাক দিয়ে রোদ এসে একেবারে চোখের উপরে লাগছে। হাত দিয়ে আলোটা একটু আড়াল করতে গিয়ে ফজলু দেখলো তার হাতে চামড়ার হাতমোজা আর হাতমোজা রক্তে ভিজে আছে।

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলো ফজলু। কিন্তু চোখে প্রায় কিছুই দেখছে না, ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথায় বসে আছে, সেটাও বুঝলো না। কি এক উলটা পালটা স্বপ্ন দেখছিল, যে নিজেও বুঝলো না। একেবারে বাস্তব মনে হচ্ছিলো হাতের রক্ত লেগে থাকা। ফজলু একটু ভয় পেয়েছে, বুক ধুকধুক করছে। বসে থেকে অন্ধকারে একটু পরে চোখ সয়ে এলে বুঝলো, সে আসলে ভুট্টাক্ষেতের ভেতরে। ক্ষেতের ভেতরেই অল্প দূরে মনে হল, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কে বুঝতেছে না, কিন্তু অন্ধকারের মাঝেও একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে। ফজলু জিজ্ঞেস করলো, কে ওখানে? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে অজান্তেই গলাটা একটূ কেপেও উঠলো তার।

লোকটা সামনে এগিয়ে এল আস্তে আস্তে। ফজলু তখনো মাটিতে বসে আছে, হাতে হেলান দিয়ে বসে আছে, অনেকটা ক্লান্ত হয়ে। লোকটা অন্ধকারে আস্তে আস্তে ফজলুর মুখের সামনে আসছে। ফজলু অন্ধকারে চিনতে পারছে না, কে লোকটা। লোকটা আরো কাছে এগিয়ে এলো, আরো কাছে, ফজলুর একেবারে মুখের সামনে চোখে চোখে রেখে তাকালো। ফজলু ভীত চোখে তাকিয়ে রইলো লোকটার মুখের দিকে। হঠাৎ করে অনেক চেনা মনে হল লোকটাকে। ফজলু কিছু সময় লোকটার মুখ আর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝলো, লোকটা দেখতে অবিকল ফজলুর মত, শুধু একটু বয়স্ক। ফজলুর শিরদাড়া দিয়ে ভয়ের একটা স্রোত বয়ে গেল, গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। এবার লোকটা কথা বললো, ফজলুকে জিজ্ঞেস করলো, “ফজলু মিয়া, কেমন আছো?”

শুনে ফজলু সম্ভবত ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, কিংবা এরকমই কিছু, কিন্তু সে কিছু বুঝলো না, কি হচ্ছে। পরে যখন আস্তে আস্তে দুলুনিতে চেতনা ফিরলো, তখন বুঝলো যে, ওর হাত-পা মুখ বেধে লোকটা ওকে ঘাড়ে করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।

ওর উউ শব্দ শুনের লোকটা সম্ভবত বুঝলো যে, ওর জ্ঞান ফিরেছে। লোকটা কথা বলা শুরু করলো,

– ফজলু, ভয় পাইও না। তোমারে মারার জন্যে আমি আসি নাই, বরং তোমার ভবিষ্যৎ বাচাইতে আসছি। তুমি যদি আমার কথা কাউরে না কও, তাইলে তোমারে মাইরা আমার ফায়দা কি? তুমি আর আমি তো একই কথা, নাকি? খালি একাল আর সেকালের পার্থক্য।

– উউ উউউউ উউউ (ফজলু মুখ বাধা অবস্থায় সম্ভবত প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলো, যেটা তার হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টাতে বোঝা গেল।)

– শুনো ফজলু, তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা আমার নাই। তুমি শান্ত হও, তারপর তুমার সাথে কথা বলবো। অনেক কথা পড়ে আছে, যা তুমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। কিন্তু, তুমারে কথা দিতে হবে যে, ঝাপাঝাপি করবা না। করলে তোমার ক্ষতি করা লাগবো আমার। আমি চাইতেছি না, সেটা করতে, কারন তোমার ক্ষতি হইলে আমারও ক্ষতি। চলো, বাড়ীতে গিয়া বসে কথা বলি।

(কার বাড়ি, সেটা ফজলুকে না বললেও সে বুঝি নিলো, ওর নিজের বাড়ির কথাই বলছে। লোকটার কথা শুনেই মনে হয়, সে ফজলুকে নিয়ে সবকিছু জানে। আবার, দেখতেও অবিকল ফজলুর মত। ফজলুর মনে হচ্ছে, যে সম্ভবত এখনো স্বপ্নের মাঝে আছে। একটু পরেই ঘুম ভেঙে দেখবে, দোকানের বাইরে চৌকিতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু, ফজলুর ঘুম ভাঙলো না। লোকটা ওকে ঘাড়ে নিয়ে ওদের বাড়ীর দিকে যেতে থাকলো। একটু দূরে বাড়ী। আর মেঠো পথ। কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। ফজলু কিছু আর বলার চেষ্টা করলো না। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কিছু করার নাই। লোকটা ফজলুর বাড়িতে এসে থামলো। বাড়ি এমনিতেও ফাকা, কেউ তো থাকে না ফজলু ছাড়া। বাড়ির ভেতরে গিয়ে বারান্দায় ফজলুকে ঘাড় থেকে নামিয়ে রেখে বললো – )

– ফজলু, শোনো, আমি তুমার সাথে কথা কইতে আসছি এখানে। অনেক কথা পড়ে আছে, সময় আজকে রাতটাই শুধু। তুমি ছাড়া এগুলো অন্য কাউকে বলেও লাভ নাই। মুখ খুইলা দিলে তুমি কি করবা, বুঝতাছি না। তাই কিছু মনে কইরো না, তোমার মুখটা আপাতত বান্ধাই থাকুক।

(ফজলু ঘাড় নাড়লো। বিশ্বাস করা ছাড়া আর কিছু করারও নাই ওর। লোকটা বলা শুরু করলো।)

– শোন, আমার এই গল্পের শুরু আসলে তুমারে দিয়া। আমাদের চেহারাতে অনেক মিল, এটা তুমি আগেই বুঝে গেছ, আমি ধরে নিচ্ছি। কারন, আমিই আসলে তুমি, শুধু বয়সে আলাদা। তোমার, আমার আমাদের একখান ক্ষমতা আছে। আমরা চাইলে আগের জীবনে যাইতে পারি, তবে সেটা শুধু এক রাতের জন্যে। তবে পরের জীবনে যাইতে পারি না, মানে ভালো বাংলায় যেইডারে কয় ভবিষ্যৎ। যেমন ধরো, আমি এই যে আসছি তোমার কাছে, ১৭ বছর ভবিষ্যৎ থেকে, কিন্তু থাকতে পারুম খালি আজকের রাতটা।

(ফজলু মুখ বাধা অবস্থায়ই হাসার চেষ্টা করলো। লোকটা বলে কি!)

– তুমি কি হাসতেছো? হ, শুনলে হাসি পাওয়ারই কথা। কিন্তু, যা কইলাম, তার পুরোটাই সত্যি। তুমার ছোটবেলার কথা মনে আছে? ৫-৬ বছর বয়সে একবার পানিতে ডুবতে গেছিলা?

(ফজলু ঘাড় নাড়লো। মনে আছে ওর।)

– আসলে অত মনে থাকার কথা না। মিঞা ভাই কইছিল, পানিতে ডুইবা গেছিলাম। সে আমারে ঘাড়ে করে তুলে আনছিল। আমার নাকি অনেকক্ষন জ্ঞান ছিল না, নিশ্বাস নিতেছিলাম না। ৫-১০ মিনিট পরে নাকি জ্ঞান ফিরছিল। আমি যদিও বিশ্বাস করি নাই। ১০ মিনিট নিঃশ্বাস না নিলে কেউ আবার বাচে নাকি! মিঞা ভাই কইছিল, আমি নাকি জ্ঞান ফিরে কইছিলাম, আব্বার সাথে কথা হইছে।

(ফজলু ঘাড় নাড়লো। ও শুনেছে মিঞাভাইয়ের কাছে।)

– বুঝলা ফজলু, আমি বহুত চিন্তাভাবনা করে বাইর করছি। ঐ পানিতে ডুবে যাওয়ার পরই আমাদের আগের সময়ে যাওয়ার ক্ষমতাটা জন্ম নেয়। চিন্তা করে দেখো, অনেকবার তুমার কাছে মনে হইছে যে, এইরম ঘটনা কালকেও তো হইছে। এ রকম মনে হওয়ার কারন হল, তুমি নিজেই অনেকবার এভাবে অতীতে গেছো না বুঝেই। এটা আমার তুমার, মানে আমাদের কাছে নিত্য রুটিনের মত।

(ফজলু কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো। লোকটা বলে কি‼ তবে, কথা সত্যি যে, অনেকবার এমন হয়ছে।)

– যাই হোক, এইবার বলি এখন তোমার কাছে আইছি ক্যান। আর তুমার সাথে কথা বলারই বা কারন কি!

– ফজলু, তুমার বিয়া সামনে সপ্তাহে, নাসরিনের সাথে। অবাক হইও না। আমি জানি, তুমি তারে পছন্দ করো। তুমার নিজের কিছু নাই, তাই তুমি তারে বলতে চাও নাই। সামনের সপ্তাহের নাসরিনের বিয়ে নিয়ে কিছু ঝামেলা হইবো, তুমি রেডি থাইকো, তুমি তারে পাইবা।

– আর কাইলকা রাতে খসরু আমার হাতে মারা গেছে। আমি ওর ধড়-মাথা আলাদা কইরা দিছি। ভয় পাইবা না। তোমার, মানে আমার কথা এর মাঝে কেউ জানতে পারবো না।

(ফজলু খসরুর কথা শুনে একটু নড়াচড়া করার চেষ্টা করলো। লোকটা বলে কি! রইস আলীর ছেলে, খসরুরে মেরে ফেলেছে! নিজেকে মুক্তু করার চেষ্টা করতে লাগলো। লোকটা উৎসুক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষন চেষ্টা করে ফজলু ক্ষান্ত দিলো। লোকটা আবার কথা বলা শুরু লাগলো।)

– ফজলু, আমারে খুনী ভাইবো না। তুমিও যা, আমিও তাই। আমাদের রক্তে খুনি হওয়ার ইচ্ছা নাই। কিন্তু, ঐ শুয়োরের বাচ্চা আমার মেয়েটারে শেষ কইরা দিছে।

– হ, ফজলু, আমার মেয়ে, তোমারও ভবিষ্যতের মেয়ে, আঁখি। মাইয়াটারে আমি বাইরের মানুষ থেকে রক্ষা করতে পারলেও কখনো বুঝি নাই, ওর নিজের মামা এত বড় সর্বনাশ করবো। খসরুর চরিত্র ভালো কোন আমলেও ছিল না, এটা তুমিও জানো। তাই বলে, নিজের আপন ভাগ্নির এত বড় ক্ষতি করবো, কখনো ভাবি নাই। মাইয়াটা আমারে কইলো, “আব্বা, তুমি মামারে আগে চিনতে পারলা না ক্যান! সে মানুষ কেমন, তুমি আগে থেকেই জানতা।” বইলা আম্মা আমার তার ঘরে গিয়া ঢুকলো। আর ঘর থেকে বের হইলো না। সকালে ডাকতে গিয়া দেখি, মা আমার ঘরের ফ্যানের সাথে ঝুইলা আছে। না পারলাম মেয়েডার মান-সম্মান রাখতে, না পারলাম ওর জীবনডা বাচাইতে।

– বুঝলা ফজলু, অনেকদিন পেছনের জীবনে আসতাম না। তোমার, মানে আমার জীবনে তো আসলে আপন বলে কেউ নাই। নাসরিন আমার জীবনে আকাশের চাদের আলোর মত। বিয়ার কয় বছর পরই সংসারে আখি চইলা আইলো। আমার জীবনে আর কি লাগে, কও। এখন আমার সব শেষ, কিছুই নাই আর। তাই আমি তুমার জীবনটা বাচাইতে আইছি।

(ফজলু চুপচাপ রইলো। কি করবে, বুঝতেছে না। বিশ্বাস করেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।)

– ফজলু, আমার গল্প কিন্তু শেষ। আমি জানি, আমার কথা তোমার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু, তুমি আমার আজকের কাজের ফলাফলটুকু যেন পাও, এটা আমি চাই। আমার আখি মা তোমার কোলে আসুক আর বেচে থাকুক তোমার কাছে।

– ভোর হয়ে আসতেছে। তোমার মুখের আর হাতে বাধন আমি খুলে দিতেছি। তুমি দোকানে যাও। রইস আলী তোমারে পাগলের মত খুজতেছে। সে ভাবছে, তোমার সাথে খারাপ কিছু হয়ছে।

(লোকটা ফজলুর মুখ আর হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে লম্বা পায়ে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ফজলু তাড়াতাড়ি পায়ের বাধন খুলে বাড়ির বাইরে এসে দেখল, কেউ নেই।)

কিছুক্ষন হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থেকে ফজলু বাজারের পথ ধরলো। দোকানে হেটে যেতে যেতে আলো ফুটে গেল ভালভাবেই। দোকানে পৌছে দেখলো বাজারে জেলেদের জটলা ওর দোকান, মানে রইস আলীর দোকানের সামনে। জিজ্ঞেস করতেই জানলো, আজকেও নাকি বাজারের পিছনে মাথাছাড়া লাশ পড়ে আছে। একটু আগে এক জেলের চোখে পড়েছে।

ফজলুকে কেউ না বললেও ফজলু বুঝলো, ওটা খসরুর লাশ। সে কিছু একটা অজুহাত দিতে লাশের দিকে না গিয়ে দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসে রইলো। এর মানে কি? ওর মত দেখতে লোকটা যা যা বলেছিল, সেগুলো তাহলে সত্যি?

সাদা কাপড়

সময়টা ১৯৯৩ সাল।

গল্পের মূল চরিত্রের নাম সাফিয়া। বয়স ২৭-২৮ হবে, সুন্দরী এবং বিবাহিত। জামাই সরকারী একটা ব্যাঙ্কে অফিসার। সাড়ে ৬ বছরের এক ছেলে আছে তাদের, নাম আসিফ।

সাফিয়া গিয়েছে তার নানার বাড়ি। গ্রামের নাম চড়ুইপাড়া। সাথে তার নানী খাইরুন্নেসা আর ছেলে আসিফ। খাইরুন্নেসা গত মাসে গিয়েছিলেন নাতনীর বাড়িতে ঘুরতে। আসিফের স্কুল বন্ধ, তাই সাফিয়া এই সুযোগে নানীকে নিয়েই তার বাড়ী যাচ্ছে।

মেইন রোড থেকে গ্রামের বাড়িটা বেশ ভিতরে। ৩-৪ মাইল হবে। ভ্যানে যেতে হয়। রাস্তা মানে এবড়ো-থেবড়ো মাটির রাস্তা, তবে শুকনা। মেইন রোড থেকে বাড়ীতে পৌছাতে প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেল। ঝাকুনি তো আছেই। পৌঁছাতে পৌছাতে বিকেল গড়িয়ে যায়।

সাফিয়ার নানাবাড়িটা বেশ বড়। প্রায় ২ বিঘা জমির উপর বাড়ি। ওর ছোটখালা এই বাড়ীতেই থাকে। ওর নানা গ্রামের মাতব্বর ছিল সেই আমলে।

রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে সব খালাতো ভাই-বোন মিলে আড্ডা দিতে বসে একসাথে। এই গ্রামে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নেই। একে তো ফাল্গুন মাস, গ্রামে শীতের ভাব এখনো আছে। তার উপর ৮টা বাজতে বাজতেই মনে হয় নিশুতি রাত। আড্ডায় সিদ্ধান্ত হয়, পরের দিন VCV ভাড়া করে আনা হবে, সাথে ব্যাটারী। সবাই মিলে কাল রাতে ছবি (মুভি) দেখা হবে। বিদ্যুৎ না থাকায় সবাই রাত ৮-৯টার মাঝেই ঘুমায়ে পড়ে। শুধু ওর খালাতো বোন, মিনি জাগে রাত ১২টা অব্দি। তার সামনে এসএসসি পরীক্ষা।

সাফিয়ার ঘুমানোর অভ্যাস জানালার পাশে। জানালার পাশে শুয়ে বাইরের অন্ধকার দেখতে তার অদ্ভুত রকম ভাল লাগে। কি কারনে, কে জানে। বাইরে ফাল্গুন মাসের কুয়াশা, বেশ ঘন, তবে শীত অনেক কম। গায়ে মোটা কাথা দিলে লেপ আর লাগে না। তার ছেলে আসিফ এই বাড়ীতে আসলে তার মাকে প্রায় ভুলেই যায়। মামাতো ভাইবোন আর গ্রামের ছেলেপেলের দল নিয়ে সারাদিন ঘোরে, আবার রাতে ঘুমায়ও তার মামা, নাহলে খালাদের সাথে। শুধু ক্ষিদা লাগলে মায়ের কাছে এসে ক্যান ক্যান করে। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমায়ে গেল সাফিয়া। সারাদিন ধকল তো আর কম যায় নি।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। নতুন জায়গায় এলে যা হয় আর কি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে একটু সময় লাগে বুঝতে যে, কোথায় আছি। এত রাতে ঘুম কেন ভাঙলো, বুঝলো না সাফিয়া। আবার ঘুমানোর চেষ্টা করার সময় মনে হল, একটু হয়তো বাথরুমে যাওয়া দরকার।

এই বাড়ীতে বাথরুমে যাওয়া এক বিশাল সমস্যা। এমনিতেই ভালো বাথরুম নাই, তার উপর যা ছিল, সেটাও নাকি পরশু ভেঙে গেছে। এখন একমাত্র উপায় হল বাড়ীর পাশে একটু বনের মত আছে, সেখানে যাওয়া। ওর নানী শুয়ে ছিল ওর পাশে। দেখলো, উনি তখনো জেগে আছে। সাফিয়া তাকে ডেকে তুললো, একা যেতে ভয় লাগে।

নানীকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হল। বদনাতে পানি নিয়ে হাটতে হাটতে বেশ একটু দূরে চলে গেল। বন এদিকটায় বেশ ঘন, কিন্তু সামনে গিয়ে হালকা হয়ে গেছে। নানীকে দাঁড়াতে বলে সে আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল। একটু দূরে আমিন মন্ডলের বাড়ি দেখা যাচ্ছে, সাফিয়ার দূরসম্পর্কের মামা। মাঝে বেশ বড় একটা খোলা মাঠ। সাফিয়া একটু এগিয়ে কিছুক্ষন দাড়ালো, আশেপাশে কেউ আছে কিনা বোঝার জন্যে। খুব যে অন্ধকার, তা না। আকাশে মনে হয় চাঁদ আছে, কিন্তু কুয়াশাতে অত ভাল দেখা যাচ্ছে না। আর তাছাড়া আসার সময় কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে, সাথে কেউ আসতেছে। যাই হোক, কিছুক্ষন দাড়ায়ে থেকে যেই না চিন্তা করতেছে যে বাথরুম করতে বসবে এখন, ঠিক তখনি “ঝুপ” করে একটা শব্দ হল।

সাফিয়া ঘুরে নানীকে জিজ্ঞেস করলো যে, উনি কিছু কিছু শুনছে নাকি !! খাইরুন বেগম উল্টা বিরক্ত হয়ে বললেন যে, বনের ভিতরে আসছিস, শব্দ তো একটু হবিই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর।

সাফিয়া ভাবলো আসলেই তো তাই। বনের ভিতরে এমন শব্দ তো স্বাভাবিক।

হঠাৎ কি কারনে তখন তার চোখ চলে আমিন মামার বাড়ির পাশের বরই গাছের দিকে। চারিদিকেই কুয়াশা, কিন্তু একটু ভাল করে তাকিয়ে মনে হল, গাছটার উপর কিছু একটা বসে আছে, কুয়াশার থেকে একটু বেশি সাদা, ধবধবে সাদা রঙের। একটু ভাল করে তাকিয়ে থাকার পর সাফিয়ার মনে হল, ওটা জীবন্ত কিছু একটা, নড়তেছে এবং ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

নানী পেছন থেকে তাগাদা দেয় “কিরে, হইছে তোর?”

সাফিয়া তখন কিছুটা আবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে আছে বরই গাছটার দিকে। হঠাৎ তার মনে হল, ঐটা পাখি জাতীয় কিছু হবে হয়তো। কিন্তু কোন পাখি কি এত সাদা হয়?

এবার সে স্পষ্ট দেখলো, গাছের উপর থেকে ধবধবে সাদা জিনিসটা ধুপ করে নিচে পড়লো। একটা “ধপ” করে শব্দও শুনলো সে। নানী ততক্ষনে বুঝছে যে, কিছু একটা সমস্যা বোধ হয় হইছে। সে জিজ্ঞেস করলো, কিরে ঐদিকে তাকায়ে এতক্ষন ধরে কি দেখিস?

সাফিয়া বলল, নানী ঐখানে বরই গাছের নিচে কি ধবধবে সাদা রঙের কিছু দেখতেছো? খাইরুন বেগম চোখে খুবই কম দেখেন, এক চোখ প্রায় নষ্ট আর আরেক চোখে ছানি পড়া। তবে তিনি জানেন যে, ঐ বরই গাছটার আছে। আগেও শুনেছেন। একটু ঘাবড়ে গেলেও তিনি এগিয়ে এসে একটু তাকিয়ে থেকে নাতনীকে সাহস দিয়ে বললেন, ও কিছু না। সাদা কাপড়-টাপড় কিছু হবে, আমিনদের বাড়ি থেকে হয়তো উড়ে এসে পড়ে আছে, নয়তো দেখ গিয়ে ওদের শয়তান কুকুরটার কাজ। তুই তাড়াতাড়ি তোর কাজ শেষ কর।

সাফিয়া দেখলো, তার নানির কথা ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বলল, আচ্ছা নানী, ঠিক আছে, তুমি ঐ দিকে গিয়ে বস, আমি শেষ করে আসতেছি।

খাইরুন বেগম একটু সরে গিয়ে দাড়ালেন। সাফিয়া বাথরুম করার জন্যে আবার বসতে যাবে, ঠিক তখন ঐ সাদা কাপড়টার দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন ঐটা একটু উচু ঢিবির মত হইছে, আগে পুরাটাই মাটিতে লেপ্টে ছিল। একটু তাকিয়ে থেকে সাফিয়ার মনে হল, জিনিসটা জীবন্ত এবং আস্তে আস্তে নড়তেছে এবং উচু হচ্ছে, কিন্তু পুরাটাই সাদা কাপড়ে ঢাকা।

কিছুক্ষনের মাঝেই সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা প্রায় অর্ধেক মানুষ সমান উচু হয়ে গেল। সাফিয়া কিছুটা সম্মোহিতের মতই তাকিয়ে ছিল। ওর তাকিয়ে থাকা দেখে ওর নানী আবার জিজ্ঞেস করলো, কিরে তাকিয়ে আছিস কেন এখনো ঐদিকে?

সাফিয়া বলল, নানী জিনিসটা নড়তেছে আর আস্তে আস্তে বড় হইতেছে। খাইরুন বেগম বুঝলেন আর যাই হোক, জিনিসটা ভালো না, আর সুন্দরী মেয়েদের এরকম অনেক সময়ই হয়, এমনকি বিয়ের পরেও। তিনি শুনেই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, দেখি চলে আয় তো। তোর কিছু করা লাগবে না। চলে আয় আমার সাথে।

কিন্তু মনে হল, সাফিয়া ওর নানীর কথা শুনতে পেল না, কোন উত্তরও দিল না। খাইরুন বেগম বুঝলেন যে, অবস্থা সুবিধার না। এত রাতে কেউ পাশেও নেই যে, ডাক দিবেন। তিনি উঠে দাড়িয়ে সাফিয়ার দিকে যাওয়া শুরু করলেন। একটু অবাক হলেও তিনি লক্ষ করলেন, তার হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার শরীরের ওজন দুই মানুষ সমান, কিংবা ঘাড়ে কেউ বসে আছে। এবার তিনি ভয় পেলেন। ছোটবেলা থেকে অনেক কিছুই দেখেছেন, এমন কখনো হয়নি। তিনি জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলেন, আর তার নাতনীর দিকে এগুতে থাকলেন। কিন্তু এই কয়েক কদম পথ যেতেই তার যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার দশা।

অন্যদিকে, সাফিয়া তখন পুরোপুরি সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। সে দেখতেছে যে, সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা আস্তে আস্তে বড় হতে হতে প্রায় তার সমান লম্বা হয়ে গেছে। হঠাৎ তার মনে হল, এটা আর কেউ না, এটা সে নিজে। কাফনের ধবধবে সাদা কাপড়ে ঢাকা সে নিজে। হঠাৎ দেখলো জিনিসটা তার দিকে এগিয়ে আসা শুরু করেছে। খুব আস্তে আস্তে, কিন্তু এগিয়ে আসছে। ভয়ে তার আত্তি শুকিয়ে গেল। চেষ্টা করলো দৌড়ে পালানোর জন্যে। কিন্তু পা একটুও নাড়াতে পারলো না। যেন অনন্তকাল ধরে দাড়িয়ে আছে, নড়বার কোন শক্তিও নাই। সাদা কাফনের ভেতরে থাকা অন্য জগতের কেউ তাকে ছোয়ার জন্যে আসছে।

হঠাৎ বুঝলো, কেউ তার শরীর ধরে নাড়া দিচ্ছে। অনেক কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, তার নানী। অন্যদিকে খাইরুন বেগম তার নাতনীর চেহারা দেখে চমকে উঠলেন। সাফিয়ার চোখ এমনিতেই অনেক অনেক ভাসা-ভাসা। এখন যেন চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার দশা। উপরন্তু, সাফিয়া সাধারণ মেয়েদের থেকে বেশি লম্বা হওয়ায় আবছা অন্ধকারের মাঝে ওর পুরো চেহারায় একটা দানবীয় ভাব চলে এসেছে। খাইরুন বেগম জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়ছেন আর সাফিয়াকে ধরে ঝাকি দিচ্ছেন।

অন্যদিকে সাফিয়া বুঝতেছে তার এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। তার নানী তাকে ক্রমাগত ঝাকাচ্ছে আর ডাকছে। কিন্তু ডাকটা মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে আসা। সে অনেক চেষ্টা করছে পা নাড়ানোর জন্যে। সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা তার দিকে এগুচ্ছে আস্তে আস্তে। আর কিছুক্ষনের মাঝেই সেটা মাঠ ছেড়ে বনের মাঝে চলে আসবে। তার পালানো উচিত। অনেক চেষ্টা করছে সে তার পা নাড়ানোর জন্যে। একটু পরে মনে হল, পায়ে একটু বল পাচ্ছে। কিন্তু সাদা জিনিসটাও মনে হল তার স্পিড বাড়িয়েছে। কিছুক্ষনের মাঝে সে পায়ে বল পুরোটাই ফিরে পেল। তখন সাদা জিনিসটা বেশ কাছে চলে এসেছে। হঠাৎই তার পায়ে যেন অসুরের বল চলে এল। নানীর হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে দিল দৌড়। পিছে ঘুরে দেখল, সাদা জিনিসটা তাদের থেকে একটু দূরে, পিছে পিছে আসছে, বেশ জোরে। সাফিয়া তখন দৌড়াচ্ছে। তার নানীও ভয় পেয়েছে, তাই সেও চেষ্টা করছিলো তাল রাখার জন্যে। কিন্তু সাফিয়ার গায়ে তখন যেন রাজ্যের শক্তি। সে তার নানীকে মোটামুটি হিচড়ায়ে নিয়ে এগিয়ে চললো। কিছুক্ষনের মাঝেই তারা তাদের বাড়ির উঠানের সীমানায় পৌছে গেল। সাফিয়া পিছে তাকিয়ে আর কিছু দেখলো না।

দৌড়ানোর পায়ের আওয়াজে সাফিয়ার খালার ঘুম ভেঙে গেছে। সেও ওদের সাথেই শুয়ে ছিল। সে তাকিয়ে দেখলো, পাশে তার মা আর সাফিয়া কেউই নেই, উল্টোদিকের জানালা দিয়ে বাড়ির বাইরে উঠানে সাফিয়ার মত লম্বা কাউকে দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে হারিকেন নিয়ে উনি বাইরে চলে এলেন। দেখলেন, তার মায়ের শাড়ী কয়েক জায়গা ছড়ে গেছে। সাফিয়া মাটিতে বসে দরদর করে ঘামছে আর হাপাচ্ছে। খাইরুন্নেসা অল্প কথায় তার মেয়েকে বোঝাচ্ছেন যে, ওদের সাথে কি হয়েছে। বাইরের উঠানে আলো আর কথার শব্দ শুনে বাড়ীর প্রায় সবাই জেগে গেছে।

সাফিয়া জানে না, সাদা জিনিসটা কি ছিল। জানার কোন কৌতুহলও তার  নাই। শুধু এইটুকু জানে, আজকে ওখান থেকে পালিয়ে না আসতে পারলে এই প্রিয় মানুষদের মুখ হয়তো আর দেখতে পেত না।

মা…নুষের মতো…

আজকে একটা ছেলেকে নিয়ে গল্প। ছেলে বলার থেকে বোধ হয় বালক বলাই শ্রেয়, নাম জিন্না। গল্পের শুরু ১৯৬৫ সালে। তখন জিন্নার বয়স ১১ বছর।

গ্রামের নাম আদনপুর। পুরোটাই গ্রাম জুড়েই বনে ভরা। মাঝে মাঝে জংলা পরিস্কার করে কিছু বাড়ীঘর গড়ে উঠেছে। তেমনই একটা বাড়ীতে জিন্না থাকে। জিন্নার বাবা খুলনা চিনিকলে অফিসার, তাই সে তার মা সহকারে সবসময়ই তার নানাবাড়িতেই থাকে।

নানাবাড়িতে সে ঘুমায় বারান্দায়, তার এক নানীর সাথে, খাদিজা বেগম। ঐ বাড়ীর চারিধারে পুরাটা জুড়েই জঙ্গল। হাঁসেলের (রান্নাঘরের আঞ্চলিক নাম) পিছে বিশাল উচু এক তালগাছ। আর বাড়িভর্তি আম-জাম গাছ তো আছেই।

সেদিন ছিল পূর্নিমার ৩-৪ দিন আগে। আকাশ ভর্তি চাঁদের আলো। আশ্বিন মাসের পুরা ঝকঝকা আকাশ। জিন্না বারান্দায় শুয়ে আছে। পাশে তার নানী গভীর ঘুম। জোস্নার আলো এতই বেশি যে, জিন্নার চোখে লাগতেছে। ঘুমও আসে না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে, আবার স্থির হয়ে শুয়ে থাকে, কিন্তু ঘুম আর আসে না।

একটু পরে মনে হল একটু ঝিমানী আসছে, তখনি জিন্নার মনে হল চোখের উপর দিয়ে যেন একটা সূর্য চলে গেল। প্রচন্ড তীব্র আলো। সাথে আলোর  তাপ। চোখ মেলতে পারলো না আলোতে। একটু পরে যেন আলোটা তার কাছ থেকে একটু দূরে সরে যাওয়া শুরু করলো। জিন্না চোখ মেললো। আলোটা তখন চোখে পড়লো।

আলোটা বেশ বড়। অনেকটা বড় আগুনের গোলার মত, কিন্তু শবধবে সাদা রঙের। আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। এখন হাঁসেলের ছাদের উপর স্থির হয়ে আছে। সে ভয়ে নানীকে ডাকা দিল, “এ নানী, দেখতো এডা কি?”

পোলাপান মানুষ, খাদিজা বেগম কোন গুরুত্ব দিলেন না। ধমক দিয়ে বললেন, ঘুমা।

জিন্না তাকিয়ে দেখলো, আলোটা আস্তে আস্তে উপরে উঠতেছে আর ছোট হইতেছে। একটু পরে মনে হল, ওটা তালগাছে মাথার দিকে আগাচ্ছে। আলোটা খুব আস্তে আস্তে যাচ্ছে আর জিন্নাও অপলক দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। তাকিয়ে থাকতেই থাকতেই কিছুক্ষন পরে জিন্না কিভাবে যেন ঘুমায়ে গেল।

বোধ হয়, তখন মাঝরাত হবে। গ্রামের নিশুতি রাত। জিন্নার ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। ঘুম ভাঙলো প্রচন্ড ভয় নিয়ে। উঠে বসে রইলো ভয়ে। ভয়টা কি জন্যে, কিছুই মাথায় এলো না তার। কিন্তু ভিতরে ভয়টা এমন যা মৃত্যুর সময়েই বোধ হয় মানুষকে তাড়া করে ফিরে। সে বুঝতে পারলো, ভয়ে তার গলা-বুক শুকিয়ে গেছে, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু কি কারণে ?

তার কি কারনে যেন মনে হল, ঘুমানোর আগে ঐ আলোর জন্যেই হয়তো এই ভয়টা পেয়েছে। আশেপাশে এখন কোন আলো চোখে পড়লো না তার। হঠাৎ মনে পড়লো আলোটা ঐ সময় তালগাছের দিকে উঠতে দেখেছিল। মনে পড়তেই সে ঘুরে তালগাছের দিকে, তালগাছের মাথার দিকে।

ভয়ে মানুষের শিরদাঁড়াতে কাঁপুনি ধরার কথা সে শুনেছে, কিন্তু কখনো অনুভব করে নি। আজকে এখন তার মনে হল তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা ভয়ের একটা স্রোত বয়ে গেল। সে এইটাই বোধ হয় দেখেছিল আবছা ঘুমের ঘোরে, কিন্তু কি জিনিস, সেটা বোঝে নাই।

জিনিসটা যে কি, সেটা এখনও সে বোঝে নি। জিনিসটা লম্বায় তালগাছ থেকেও উচু। পুরাটা জিনিস আবছা কালচে কিছু দিয়ে ঢাকা। চাঁদের আলোতে বোঝা যাচ্ছে যে, সেই কালচে কিছুর নিচে সবসময়ই কিছু একটা নড়ছে। জিনিসটার মাথা এত উচুতে যে, চেহারা দেখা যায় না। তবে, উপর থেকে জিনিসটার চুল জাতীয় কিছু মাটি পর্যন্ত নেমে এসেছে। এটা যে চুল, তা বোঝা যাচ্ছে, কারন চাদের আলোয় একটু চিকচিক করছে।

জিন্নার বোধ হয় ভয়ের চোটে চিৎকার দেয়ার শক্তিটাও আর ছিল না। সে কিছুটা আবিষ্ট হয়ে তাকিয়েছিল। কি কারণে যেন আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে উঠানে এসে দাড়ালো। উপরে তাকিয়ে বুঝলো, জিনিসটা তার দিকে আস্তে আস্তে ঝুকতেছে। দৌড়ে পালানোর প্রবল ইচ্ছাটা থাকলেও কেন জানি তার পা দু’টো এক কদমও সরলো না।

জিন্না দেখলো, জিনিস আস্তে আস্তে নিচে ঝুকছে, তার দিকে। যেন তাকে ভালোভাবে দেখার জন্যে আসছে। এবার সে জিনিসটার মুখটা দেখতে পেলো। বিশাল মুখ। কিছুটা সাদাটে। চেহারার ভেতরটা নড়ছে, একটু পর পর মনে হচ্ছে ঐটা অন্য কেউ। জিনিসটা তার মুখ জিন্নার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আনছে, সে এখন জিনিসটার মুখের ভিতরের অনেক কিছুও দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সবই কালচে। সারা মুখের সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুতভাবে নড়ছে। জিনিসটা আরো কাছে আসছে, আরো কাছে, আরো কাছে।

এরপর জিন্নার আর কিছুই খেয়াল নাই। ঐ সময় তার নানীর ঘুম ভেঙে যায়। সে তাকিয়ে দেখে, আবছা ছায়া-ছায়ার মত বিশাল বড় কিছু একটা তার নাতিকে উচু করে আকাশের দিকে তুলে ধরে আছে। খাদিজা বেগমের ভয়াবহ চিৎকার কিংবা অন্য যে কারনেই হোক, জিনিসটা জিন্নাকে উপর থেকেই ফেলে দিয়ে হাওয়ায় মিলায়ে যায়। বাড়ীর সবাই ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে আসে। তখন জিন্নার অনবরত খিঁচুনি হচ্ছে আর মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। আর সারা শরীর আগুনে পোড়ার মত লাল হয়ে আছে।

জিন্নার জ্ঞান ফেরে পরের দিন। জিনিসটা কি ছিল, তা সে জানে না। জানার কখনো চেষ্টাও করেনি। হয়তো ওটা কোন দুঃস্বপ্ন ছিল, কিংবা নিছকই কল্পনা। কিন্তু জিন্না ঐ ঘটনার পরে তালগাছওয়ালা কোন বাড়ীতে কখনো রাত কাটায়নি। আর কখনো বারান্দাতে ঘুমায় নি।

অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি

“আমার কোন সমস্যা নেই”।

মতিনের কথা শুনে শুভ্র কিছুক্ষণ কপাল কুচকে উত্তর দিলো – তোর আসলেই কোন সমস্যা নেই, সিরিয়াসলি? তোকে চিনি ছোটবেলা থেকে, কিন্তু ইদানীং তোকে আগের মত মেলানো যায় না। বুঝতেছি, তোর লাইফের উপর দিয়ে একটা ঝড় চলে গেছে। কিন্তু…

– কিন্তু, কি? তোকে মিলাতে বলতেছে কে? আমি তো তোকে বলি নাই যে, আমি বিপদে পড়ছি, আমাকে হেল্প কর!!

মতিনের এই উত্তরে শুভ্র একটু কষ্ট পেলেও কিছু বলে না। যদিও, ওর সাথে মতিন এভাবে কথা বলবে, এটা ও আশা করে নাই। মতিন ওর ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে পড়েছে। ভার্সিটিতে যদিও আলাদা ডিপার্টমেন্টে ছিল, তারপরও যোগাযোগটা খুব ভালোই ছিল। রোজ সন্ধ্যায় আড্ডা দেয়া, মতিনের বাসায়ও ওর নিয়মিত যাতায়াত, মতিনের গাড়িতেই শুভ্র প্রথম ড্রাইভিং শিখেছে। ভার্সিটির গরমের ছুটিতে ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঘুরতে যাওয়া একটা নেশার মত ছিল। এমনকি মতিনের প্রেমিকাও ছিল শুভ্র’র ডিপার্টমেন্টের, ওদের ৩ বছরের জুনিয়র ব্যাচের, পায়েল। ছটছটে ধরনের একটা মেয়ে, সে তুলনায় মতিন অনেকটা চুপচাপ ধরনের। ওদের পরিচয়ের শুরু থেকে প্রপোজ করা পর্যন্ত শুভ্র’র ভূমিকাও অনেক। সামনের শীতে মতিন আর পায়েল বিয়েটা সেরে ফেলবে, এমন প্লান করছিল। তবে, এখন মতিনের সাথে কথা বলাটাই টাফ। সবসময়ই মেজাজ খারাপ থাকে ওর। যদিও এর পেছনে কারনটাও শুভ্র জানে, কিন্তু কিছু করার নাই।

মাসখানেক আগে পায়েলকে নিয়ে মতিন মাওয়াঘাটে ঘুরতে গিয়েছিল। মতিন নিজেই গাড়ী ড্রাইভ করছিল। যদিও ঐদিন পায়েল বলছিল যে, ওর শরীর ভাল লাগছে না, মাথার ভিতর কেমন যেন লাগছে। তারপরও মতিনের আগ্রহ দেখে সে আর না করে নাই। ওখানে পৌছে গাড়ি থেকে নামার সময় পায়েলের কিছু একটা হয়, নামার সাথে সাথে একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। মতিন তখনো গাড়ি থেকে নামতেও পারেনি। চিৎকার শুনে আশেপাশের মানুষ এসে উল্টা মতিনকে ধরে। তারা ধরে নেয় যে, মতিন গাড়ির ভেতর মেয়েটার সাথে খারাপ কিছু একটা করেছে। মতিন অনেক কষ্টে ওদেরকে বুঝায়ে পায়েলের কাছে যেতে পারে। কিন্তু গিয়ে দেখে, ওর কোন সাড়াশব্দ নেই, কোনভাবেই ওর জ্ঞান ফেরাতে পারে না। তাড়াতাড়ি ওকে গাড়িতে নিয়ে ওখানে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়। ডিউটি ডাক্তার দেখে বলে, তাড়াতাড়ি ঢাকায় নিতে।

ঢাকায় আনার পর হাসপাতাল থেকে বলে, রোগী কোমায় চলে গেছে। ডাক্তার বলে দেয়, উপরওয়ালাকে ডাকেন, সবই উনার হাতে। সম্ভবত cerebral embolism হয়েছিল কোনভাবে, সেখান থেকে ম্যাসিভ স্ট্রোক। ১১ দিনের মাথায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে পায়েলের জ্ঞান ফেরে। পায়েলের বাসার সবাই তখন হাসপাতালের ICU এর বাইরেই ছিল, তবে মতিন ছিল না। ঐ ১১ দিন মতিন হাসপাতাল ছেড়ে যায় নি, ঘুমাইছেও কিনা সন্দেহ আছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, বয়স ১০ বছর বেড়ে গিয়েছে। পায়েলের মা ঐদিন সন্ধ্যায় জোর করে মতিনকে বাসায় পাঠিয়েছিল, ঘুমানোর জন্যে।

মতিন বাসায় গিয়ে কাপড়-চোপড় না ছেড়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। মাঝরাতে “পায়েলের জ্ঞান ফিরেছে” শুনে ঐ অবস্থাতেই আবার দৌড় দেয়। পায়েলের জ্ঞান ফেরার পর ডাক্তাররা বলে যেন একজন করে রোগীর সাথে দেখা করতে যায়, রোগীর অবস্থা খুব ভালো না, তবে সবাইকে দেখতে চাইছে, কিন্তু কেউ যেন কোনভাবেই কান্নাকাটি না করে ভিতরে গিয়ে। সবাই একে একে ভিতরে গিয়ে পায়েলকে দেখে আসে।

পায়েলের মা প্রথমে গিয়েছিলেন। উনি ভিতরে গেলেও মেয়ের পাশ ছেড়ে আর আসেন নাই। নার্সরা বললেও উনি বারবার বলছিলেন, সবার সাথে দেখা করা শেষ হলে উনিও বের হয়ে যাবেন। কয়েকজন ঘুরে যাওয়ার পর পায়েল তার মাকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, মতিন আসে নি?

পায়েলের মা, মনিরা বেগম একটু ভেবে উত্তর দিলেন, এই কয়দিন এখানেই ছিলোরে মা। ছেলেটা এই কয়দিন ঘুমায়ও নি। আজকে একটু ওকে বাসায় পাঠিয়েছি। জানিয়েছি ওকে, এইতো চলে এল বলে। কথা বলা শেষ করতে না করতেই মনিরা বেগম দেখলেন, তার মেয়ের মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল। ঐ সময়টাতে কয়েকটা মেশিন একসাথে শব্দ করে উঠলো। পায়েলের মা ভয় পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। একজন নার্স এসে উনাকে ওখান থেকে সরিয়ে বাইরে দিয়ে গেল। অন্যদেরও জানায়ে গেল, অবস্থা ভালো না।

মতিন ICU এর সামনে এসে দেখে, সবাই হাউমাউ করে কাঁদতেছে। মতিন ICU এর গেট ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে। নার্স বলে তাকে বের হয়ে যেতে, কিন্তু তখনি পায়েলের বেড থেকে ডাক্তার ডাক দিলে নার্স সেদিকে দৌড় দেয়। মতিন সে সময় পায়েলের বেড থেকে এক বেড দূরে দাঁড়ানো। ডাক্তার-নার্স পায়েলকে বাচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর মতিন সেখানে হতবিহব্বল চোখে পায়েলের দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড পরে পায়েল ঘাড় ঘুরিয়ে মতিনের দিকে তাকায়। অক্সিজেনের টিউব নাকে নিয়েও মুখে একটা হাসি দেয়ার চেষ্টা করে। একটা হাত মতিনের দিকে বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। পারে না, হাতটা আবার বিছানার উপর পড়ে যায়। উপরের মেশিনটা দেখায়, হার্ট-বিট ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। মুখে তখনো হাসিটা লেগে আছে, তবে চোখের মণিটা স্থির হয়ে আছে আর জ্যোতিটা কেমন যেন চলে গেছে।  ডাক্তাররা তখন ডিফিব্রিলেটর দিয়ে চেষ্টা করতেছে ওর হার্ট চালু করার। প্রতিবার শকে পায়েলের শরীর কেপে ঊঠছে। কয়েকবার চেষ্টা করে উনারা হাল ছেড়ে দেয়। একজন হাতের ঘড়িতে টাইম দেখে, “টাইম অফ ডেথ ভোর চারটা চল্লিশ”। মতিন তখনো পায়েলের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু ছোট ছোট পায়ে পায়েলের কাছে যায়। নার্সরা এখন আর বাধা দেয় না। মতিন্ বেডের পাশে গিয়ে পায়েলের হাতটা ধরে। পায়েলের কাছে এলে ওর শরীর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ পেত আগে। সেটা আজ আর পায় না, পরিবর্তে হাসপাতালের কটু গন্ধ নাকে আসে। ওর চুলের গন্ধ নেয়ার জন্যে মুখটা ওর কপালের কাছে নেয়। চুলের গন্ধটা এখনো সামান্য আছে। কপালে একটা চুমু দেয়। চুলের মাঝে হাত দিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে ওভাবে। শুনতে পায় বাইরে কান্নার আওয়াজ। নার্সরা ডাক দেয়, ওরা বডি সরাবে বেড থেকে, এতজন আত্মীয়কে ICU তে ঢুকতে দেয়া যাবে না। একটু আগেও পায়েলের সম্বোধন ছিল “পেশেন্ট” আর এখন সেটা হয়ে গেছে “বডি”। জীবন আসলেই হয়তো এতখানিই ঠুনকো। মতিন পায়েলের হাত ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে যায়, পায়েল তখনো হাসিমুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পরে নার্স গিয়ে পায়েলের চোখ বন্ধ করে দেয়। আর মুখটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়।

এরপরের ঘটনাগুলো অনেক দ্রুত ঘটে। পায়েলের পরিবার কখনো না বললেও মতিন মনে মনে নিজেকেই দায়ী করে পায়েলের মৃত্যুর জন্যে। যদিও ডাক্তারদের মতামত ছিল, এটা আগে থেকে জানা পসিবল ছিল না। মতিন সবার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। একটা প্রাইভেট ফার্মে এক্সিকিউটিভ ছিল সে। ওই চাকরিও ছেড়ে দেয় কিছুদিন পরে। অদ্ভুত এক অস্থিরতা ভর করে ওর উপর। মতিনের বাসা থেকে ওকে জোর করে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠায়। একগাদা ঘুমের ওষুধ ধরায়ে দেয় ওকে। কয়েকদিন ওষুধ খেয়ে আর কন্টিনিউ করে না। বলে, ওষুধ খেলে ও পায়েলকে মনে করতে পারে না।

শুভ্র এসব নিয়ে সবকিছুই জানে। মতিনকে বুঝিয়েছেও বেশ কয়েকবার। তাই, আজকে নতুন করে আর কিছু বলে না। শুধু বলে – দোস্ত, আমি জানি তুই ভাল নেই। অন্তত, আমার সাথে শেয়ার কর। জানি, হয়তো কিছুই করতে পারবো না। কিন্তু, তোর কথা শোনার জন্যে আমার সময় নাই, এমন কথা তো কখনো বলি নাই। বল, বলেছি?

মতিন কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে- না, বলিস নাই।

তারপর আস্তে আস্তে বলে, – তুই এখন যা, শুভ্র। আমার তোর সাথে এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না। যখন কথা বলতে ইচ্ছে করবে, তোকে নক করবো। বলে মতিন আস্তে আস্তে উলটা দিকে হাটা শুরু করে। শুভ্র ওর পথের দিকে তাকিয়ে রইলো, কিছুক্ষন পরে রিকশা নিয়ে নিজের কাজে চলে গেল।

মানুষ আর মানুষের জীবন কারো জন্যে আটকে থাকে না, সময়ের সাথে এগিয়ে যায়। তবে, অনেক সময় কিছু মানুষ অতীতের সাথে এমনভাবে আটকে যায় যে, তারা অতীত ছেড়ে আর বর্তমানে ফিরতে পারে না।

=প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি=

পায়েল চলে যাওয়ার পরে মতিন নিজের ভিতরে পুরো একা হয়ে যায়। ওর নিজের ধারণার বাইরে ছিল যে, সে পায়েলকে এতখানি ভালবাসে। মাঝে মাঝে মনে হত, নিজের একটা অংশ পায়েলের সাথে কবরে চলে গেছে। বাসাতেও কারো সাথে তেমন কথা বার্তা বলে না। চাকরিতে পারফর্মেন্স ভালো ছিল, তাই অফিস থেকে কিছুদিন সাপোর্ট দেয় ওকে। কিন্তু, একদিন হঠাৎ অফিসে গিয়ে ও রিজাইন লেটার দিয়ে আসে। তাও কারো সাথে কথা না বলে।

এরকম অবস্থা ওর বাসা থেকে মেনে নিতে পারে না স্বভাবতই। শুভ্রকেও একদিন ডাকে মতিনের মা। শুভ্র খুব বেশি হেল্প করতে পারে না, কারন তার নিজের সাথেই এখন মতিনের যোগাযোগ খুবই কম। অন্য সব বন্ধুর সাথেও তাই। মতিনের বড়ভাই জিজ্ঞেস করে যে, মতিন ড্রাগস নেয়া শুরু করেছে কিনা। শুভ্র চুপ করে থাকলেও একটু পরে বলে যে, তার মনে হয় না, মতিন ঐ পথে যাবে।

মতিনের ভাই চেষ্টা করতে থাকে যে, মতিনকে কোন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নেয়া যায় কিনা। সমস্যা হল, মতিনের সাথে কথা বলাই মুশকিল। কিছু বললেই ক্ষেপে গিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তারপর কয়েকদিন আর বাসায় ফেরে না। পায়েল মারা যাওয়ার পর ছয়মাসে ইতিমধ্যে চারবার এই কাহিনি করেছে। ওদিকে মতিনের মা গোপনে মতিনের বিয়ের জন্যে মেয়েও দেখা শুরু করে।

মতিন একদিন রাতে বাসায় ঢুকার পর ওর মা ডাক দেয়। সে বসার ঘরে গিয়ে দেখে, ৩ জন অপরিচিত লোক বসে ওর ভাই আর মায়ের সাথে কথা বলতেছে। মতিনের মা ওকে বসতে বলে। মতিন বসে এবং মিনিট দুয়েকের মাঝে বুঝে যায় যে, ওর বিয়ের বিষয়ে কথা চলছে। ভিতরে কিছুটা রেগে গেলেও কিছু বলে না। এটা নতুন কিছু না। ওর কয়েকজন বন্ধু, এমনকি শুভ্রও এর মাঝে চেষ্টা করেছে অন্য কারো সাথে মতিনকে রিলেশনে জড়ানোর। লাভ হয়নি তেমন।

শুভ্র যার সাথে মতিনকে জড়ানোর চেষ্টা করছিল, মেয়েটার নাম নাবিলা, দেখতে বেশ সুন্দর, ছিমছাম, পায়েলের বয়সী এবং ওর মতই বেশ চটপটে। মতিন প্রথমদিন কথা বলেই বুঝে, শুভ্র অনেক চিন্তাভাবনা করে নাবিলাকে মতিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কারন, অনেক কিছুই মিল পাচ্ছিল পায়েলের সাথে। প্রথমদিন দেখা হওয়ার সময় নাবিলা একটু ভালো লাগার পরেও মতিন আর যোগাযোগ করে নি। এর মাঝে শুভ্র একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, মতিন উত্তর দেয় – মেয়েটাকে ভালো মনে হইছে, কিন্তু ওর জন্যে আমি ভালো না। আমি প্রতি মুহূর্তেই ওকে পায়েলের সাথে তুলনা করছিলাম যেটা নাবিলার জন্যে অপমান বলে মনে হইছে আমার কাছে। তাই আর যোগাযোগ করি নি। আমার অপরাধের ঘানি আরেকজন আমার সাথে টানবে কি জন্যে।

শুনে শুভ্র তেমন আর কিছু বলতে পারেনি।

মতিন জানে, অন্য কারো সাথে তার পক্ষে জড়ানো সম্ভব না। কারন, কোন মেয়েই একটা ছেলেকে মেনে নিতে চাইবে না, যে কিনা একজন মৃত মানুষের স্মৃতি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। তাই রেগে গেলেও ওর মা আর বড়ভাইকে  বিয়ে নিয়ে কিছু বলে না। যে কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে গেলে, মেয়ে সব শুনে এমনিতেই পিছিয়ে যাবে।

সেদিন রাতে মতিন মেয়েপক্ষের সাথে বেশ ভালভাবেই কথা বলল। ওর মা আর ভাই মনে মনে বেশি খুশি ছিল এই বিষয়টা নিয়ে। মতিন মেয়ের সাথে দেখা করতেও রাজি হল। মেহমান চলে গেলেও মতিন কারো সাথে তেমন চিল্লাচিল্লি করলো না, যেটা আগে করতো। মতিনের মা যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

সমস্যা বাধলো পরের দিন সকালে। মতিনের ভাতিজি রুমে গিয়ে ওকে না পেয়ে ওর বাবাকে বললো। মতিনের ভাই তখন শুধু বাড়ী নয়, পুরো এলাকা খুজেও মতিনকে পেল না। এমনকি মোড়ের গার্ডরাও নাকি মতিনকে দেখে নাই। মতিনের পরিবার ঐ পাড়াতে আছে ৪০ বছরের উপর। মোটামুটি সবাইই তাদের চিনে। মতিনের ভাই হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ী ফিরে গেল, ভাবলো, মতিন আবার উধাও হয়ে গেছে। কয়দিন পর হয়তো আবার চলে আসবে।

তবে, এটা কেবল শুরু ছিল। মতিন এবার আর ৩-৪ দিন পরে ফিরে এলো না। যেন হঠাৎ করেই মতিন সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেলো। সবাই ভেবেছিল, আগের মতই কয়েকদিন পরে ফিরে আসবে, কিন্তু কেউ এলো না। দিনের পরে সপ্তাহ গেল। মতিন ফিরে এলো না। শুভ্র চেষ্টা করেছিলো, সবার সাথে যোগাযোগ করে বের করার যে, মতিন যদি কারো সাথে যোগাযোগ করে থাকে। পুলিশে জানানো হলো। তারাও কিছু পেল না। শুভ্র ফেসবুকে লেখালেখি করলো, মতিনকে খুজে বের করতে। সবার সাহায্য চাইলো। কেউ কেউ চেষ্টা করলোও, কিন্তু মতিনকে পাওয়া গেল না। এভাবে মাসের পর মাস গেল, তারপর বছর। মতিনের মা ছেলের শোকে একবছর পর মারা গেলেন। শুভ্র আরো কয়েক বছর লেগে থাকলো, কিছু পেল না। পরে আস্তে আস্তে সেও নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এর ভেতরে ও নিজেও নাবিলার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আসলে নাবিলা জানতে চেয়েছিল মতিনের বিষয়ে। একটু একটু করে কথা বলতে বলতে শুভ্র আর নাবিলা দুজনেই বুঝে যে, তারা একে অন্যের কতটা কাছে চলে এসেছে। বাসাতেও অমত করে না। মতিন নিরুদ্দেশ হওয়ার কয়েক বছর পরেই নাবিলার সাথে শুভ্র’র বিয়ে হয়ে যায়। বছর খানেকের মাঝে ওদের মাঝে চলে আসে প্রথম সন্তান। অন্যদিকে, মতিনের ভাই নিজের ব্যবসা আর পরিবার সামলাতেই হিমসিম খেতে থাকে। শুধু মতিনের ভাতিজি কয়েক বছর মতিনের জন্মদিনটা পালন করতো। আস্তে আস্তে সেও বড় হতে থাকলো আর সেও নিজের ফ্রেন্ড সার্কেলে অভ্যস্ত হয়ে গেল। এভাবে মতিউর রহমান মতিনের নামটা আস্তে আস্তে দুনিয়ার বুক থেকে বিস্মৃত হয়ে গেল। জীবনটা সম্ভবতঃ সবার জন্যেই এরকম, মানুষের স্মৃতিতেই বেচে থাকে। স্মৃতি শেষ হয়ে যাওয়া মানেই কারো আসল মৃত্যু হয়ে যাওয়া।

=দ্বিতীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি=

শুভ্র আর নাবিলার সংসারের বয়স প্রায় ১০ বছর হতে চললো। সামনের মে মাসে anniversary। ওদের ছেলে, মতিনের বয়স ৮ বছর হতে চললো। শুভ্র’র বন্ধু, মতিন হারিয়ে যাওয়ার ৫ বছর পরে ওদের ছেলের জন্ম হয়। প্রিয় বন্ধুর নামেই ছেলের নাম রাখে শুভ্র। নামের কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক, ছেলে মতিন বেশ চুপচাপ স্বভাবের, যেন বন্ধু মতিনের সাথে সামান্য হলেও মিল আছে।

তবে, শুভ্রর জীবন গত ১০ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিধাতা সৌভাগ্যের প্রায় সবটুকুই শুভ্রকে ঢেলে দিয়েছেন। ২ বছর চাকরি করে বিয়ের পরে শুভ্র নিজের ব্যবসা শুরু করে। শুরুতে নাবিলা আরেকটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে সংসার চালিয়েছে। কিন্তু, বছর কয়েকের মাঝেই শুভ্র বিজনেসে ভাল করা শুরু করে। ওদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। এত অল্প বয়সে শুভ্র ইতিমধ্যে ৪টা ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করেছে। আরেকটার জন্যে জমি কেনা শুরু করেছে। নাবিলা বাইরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুভ্র’র সাথেই কোম্পানিতে জয়েন করেছে, ফিন্যান্স ডিভিশন চালায় ও।

সামনে ওদের বিবাহবার্ষিকী আসতেছে, মে মাসের ১৫ তারিখ। আগের দিন শুভ্র অফিসে যাওয়ার সময় দেখলো, ওদের বাড়ীর সামনে বড় একটা জটলা। ওর তাড়া ছিল, দাড়ানোর সময় নেই। রাতে এসে গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলো, সকালের জটলা নিয়ে। দারোয়ান জাহাঙ্গীর বললো, আর বইলেন না, স্যার। সকাল সকাল এক রাস্তার লোক এসে বলে, সে নাকি আপনার সাথে কথা বলবে। সে নাকি আপনার ফ্রেন্ড, নামটা কি যেন বললো…মতিন। জ্বি স্যার, মতিন। আমি তো হো হো করে হাসতে হাসতে খুন। মতিন তো আমাদের ছোট স্যারের নাম। যতই বলি, দেখা হবে না, সে ততই গো ধরে বসে থাকে যে, সে আপনার সাথে দেখা না করে যাবে না। স্যার মনে হয়, পাগল।

শুভ্র অনেকক্ষন ধরে জাহাঙ্গীরের কথা শুনছিল। ১৩ বছর হতে চললো, মতিন হারিয়ে গেছে। ও এখনো বুঝতে পারছে না, জাহাঙ্গীর আসলেই কি বলছে। আসলেই কি মতিন এসেছিল? জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করে, সেই মতিন কোথায় এখন? খুজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয়? জাহাঙ্গীর বললো, স্যার যেমনে পাগলামো করতেছিল, মনে হয় স্যার এখনো আশেপাশেই আছে। খুজে দেখতেছি, স্যার।

জাহাঙ্গীর গেট খুলে খুজতে গেল। শুভ্র পাজেরো থেকে নেমে কিছুক্ষন দাড়ালো ওখানে। ওর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, মতিন ফিরে আসতে পারে! কোথায় থাকতে পারে ও এতদিন?

ভাবতে ভাবতেই জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন মাথা নিচু করে আরেকজন ঢুকলো।

শুভ্র’র বন্ধু মতিন।

শুভ্র কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে, ১৩ বছর পর মতিনের সাথে ওর দেখা আর মতিন ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আগের মতই আছে, শুধু বয়সটা বেড়ে গেছে একটু। চুল দাড়িতে পাক ধরেছে। তবে, হারিয়ে যাওয়ার আগের উদভ্রান্ত ভাবটা নাই। মতিনই আগে কথা বললো – শুভ্র, কেমন আছিস?

শুভ্র বুঝে পাচ্ছে না, কি বলবে। মতিনকে ও পাগলের মত খুজেছে একসময়। কোথাও পায়নি। এত বছর পর সামনে মতিন দাড়িয়ে আছে, বিশ্বাস হচ্ছে না। আস্তে করে বললো, আছি। তুই কেমন আছিস? এতদিন কোথায় ছিলি?

মতিন – সে অনেক কথা। বলবো আস্তে আস্তে। আজকেই এসেছি এখানে! থাকার জায়গা নাই। তাই ভাবলাম, তোকে খুজে বের করি। তোর তো দেখছি, এলাহী ব্যাপার স্যাপার।

শুভ্র – তাহলে চল। বাসায় চল।

মতিন বাসায় গিয়ে নাবিলাকে দেখে চিনতে পারলো, যেন আগে থেকেই জানত যে, শুভ্র আর নাবিলার বিয়ে হয়েছে। তবে, শুভ্র’র ছেলের নাম মতিন, শুনে একটু অবাক হল। কথায় কথায় শুভ্র জিজ্ঞেস করলো – মতিন, তোর কি অবস্থা? বিয়ে থা করেছিস? কিছু তো জানি না তোকে নিয়ে।

মতিন – জানবি কিভাবে? এখানে ছিলাম নাকি?

শুভ্র – কোথায় গেছিলি তুই। এমন কোন জায়গা নাই, তোকে খুজি নাই।

মতিন – পায়েলকে খুজতে খুজতে আরেক জগতে চলে গেছিলাম। এতদিন ওখানেই ছিলাম। আমাদের সংসারেও এক ছেলে আছে। ওর নাম সাব্বির। কালকে রাতে হঠাৎ দেখি, তোদের জগতে চলে আসছি। এই দেখ ওদের ছবি।

বলে একটা ছবি শুভ্র’র দিকে বাড়ায়ে দেয়। শুভ্র হাতে নিয়ে ছবিটা দেখে, ছোট সাইজের প্রিন্ট, অনেকটা মানিব্যাগে রাখার সাইজ। মতিনের সাথে একটা মেয়ে শাড়ী পড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর সাথে একটা ছেলে। মেয়েটা যে পায়েল, এতে শুভ্র’র কোন সন্দেহ নাই। মধ্যবয়সী, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এটা পায়েল। শুভ্র কি বিশ্বাস করবে, বুঝতে পারলো না।

মতিন বলে, জানি তোর বিশ্বাস হবে না। তবু দেখালাম। খুব ঘুম পাচ্ছে, কাল কথা বলি, চল। শুভ্র ভদ্রতার খাতিরে বললো, হ্যা অবশ্যই। কিন্তু, খাওয়া দাওয়া করবি না?

মতিন বলে, নাহ, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। কালকে রাত থেকে আর ঘুমানো হয়নি। ঘুমানোর জায়গা পায়নি আসলে। শুভ্র বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। চল, গেস্ট রুমে গিয়ে ঘুম দে। পরে খাওয়ার সময় ডাক দিবো তোকে।

মতিনকে রুমে দিয়ে শুভ্র কপাল কুচকে ওর নিজের রুমে এল। ছবিটা ওর হাতে এখনও আছে। নাবিলাকেও দেখালো। ২ জনের কেউই বুঝতেছে না, কি হয়েছে। পায়েল বললো, ঘুম থেকে উঠলে মতিন ভাইয়ের সাথে কথা বলে দেখো।

কিন্তু, খাবার আগে শুভ্র ডাকতে গিয়ে মতিনকে আর খুজে পেল না। পুরো বাড়ী, এমনকি সিকিউরিটি ক্যামেরা ঘেটেও কিছু পেলো না। ১৩ বছর আগের মত আবার যেন মতিন হারায়ে গেছে। হঠাৎ করে ছবিটার কথা মনে পড়লো। গিয়ে দেখলো, ছবিটা এখনো আগের জায়গায় আছে। আগের তিনজন মানুষ এখনও ছবিতে আছে। শুভ্র মাথায় চুপচাপ বসে রইলো। মতিনের আসা, চলে যাওয়া, আর এই ছবি – কোন কিছুরই ব্যাখ্যা তার কাছে নাই। কেউ কি তাকে বোঝাবে?

==========================সমাপ্তি==============================