তুমি আমার পাশে বন্ধু হে,
বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো।
ট্রেনের বগির মাঝে টেবিলে কয়েকটা ছেলে গান ধরেছে। হাতে গিটার, সাথে ব্যাকপ্যাক দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোন কলেজে বা, ভার্সিটিতে পড়ে।
সেলিম ছেলেগুলোর পেছনের সিটেই বসে আছে। ও বাড়িতে যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে ডিউটি পড়াতে বাড়িতে যাওয়া হয়নি। ঈদের ৩য় দিন আজ, ট্রেন স্টেশন বেশ ফাকা ছিল। ট্রেনেও ভিড় তেমন নাই, তার উপরে ও বসে আছে এসি বগিতে। বেশ কিছুদিন পরে বাড়ি যাচ্ছে সেলিম। মা আর ছোটবোনটার সাথে বেশ কিছুদিন পরে দেখা হবে। গত বছর কুরবানী ঈদে ঘুরে এসেছে, আর যাওয়া হয় নি। এখন যাচ্ছে, তাও আবার রোজার ঈদের ২ দিন পর।
ছেলেগুলোর মাঝে একজনের হাতে গিটার, সাথে আরেকজন ট্রেনের টেবিলটাকে তবলা বানিয়ে ফেলেছে। আর ওদের সাথে আরো দুইজন ফ্রেন্ড গলা মিলাচ্ছে। এরা সবাইই সম্ভবত নন-এসি কোচে টিকেট কেটে উঠেছিল। কিছুক্ষণ আগে টিকেট চেকার এসে টিকেট আপগ্রেড করে দিয়ে গেছে। ছেলেগুলোর গানের আসর বেশ জমে উঠেছে। গিটার হাতে, সবুজ নামের ছেলেটা বেশ ভালোই গাইছে। একেকজন একটু পর পর “সবুজ, এই গানটা ধর”, বা “ঐ গানটা ধর”। আর সবুজ উৎসাহ নিয়ে সেই গানটা গাওয়া শুরু করছে। কিছুক্ষন পরে সেলিমও ওদের গানে তাল দেয়া শুরু করলো। এক ফাঁকে সবুজকে বললো – সবুজ ভাই, আপনার কোন গান নাই? নিজের জন্যে কোন গান লিখেন নাই? সেরকম কিছু গেয়ে শোনান।
সবুজ ছেলেটা একটু থেমে গেল। সেলিমের দিকে ঘুরে বললো – সত্যি শুনতে চান? সেলিম আগ্রহ নিয়ে ঘাড় নাড়লো। সবুজ গাইতে শুরু করলো–
বদ্ধ দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে আছি মনের বারান্দায়,
শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়,
হৃদয় জানালা দিয়েছি খুলে…
(গীটার ব্রেক)
হৃদয় জানালা দিয়েছি খুলে…
তোমার পাওয়ার আশায়।
শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়।
শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়।
……………………
সেলিম কিছুটা আনমনা হয়ে গেল গানটা শুনতে শুনতে। কয়েক বছর আগেও একজনের দেখা পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতো। অপেক্ষার প্রহর শেষ করে সে অন্যপাড়ে চলে গেছে। অসম্ভব জেনেও সেলিম মাঝে মাঝে মনের অজান্তেই তার দেখা পাওয়ার আশায় থাকে এখনো, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে সম্ভবত। এই পাড়ে সেলিম এখন একা। মানুষ নাকি সামাজিক জীব! তবুও, প্রকৃতি মানুষের ডিএনএ’র মাঝে কোথাও একাকিত্বের জীন রেখে দিয়েছে। এজন্যেই শত প্রাচুর্যের মাঝে থাকলেও মানুষ অনেক সময়ই একাকী ফিল করে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে – invisible in the midst of the multitude. আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ভাষায়, “আমি সবসমই একা, এমনকি যখন আমি মানুষের ভীড়ে থাকি”।
সেলিমের প্রাচুর্য নেই, তবে অজানাতে হারিয়ে যাওয়া একজনের জন্যে একাকিত্ব আছে। কথায় বলে, সময়ে নাকি সব সেরে যায়। সেলিম এই কথার সাথে একমত না। সময়ের সাথে মানুষ কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে যায়। অনেকটা অভ্যাসের মত, কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে অভ্যাসের বাইরের জীবন চলে আসে। আজকে যেমন সেলিম নিজের অজান্তেই আবার রাইসাকে মনে করলো।
রাইসার সাথে পরিচয় হয়েছিল বছর চারেক আগে, এই ট্রেনেই বাড়ি যাওয়ার সময়। প্রথম দেখাতেই দু’জনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন, অনেক বিষয় নিয়ে। রাইসা সম্ভবত কথা বলেছিল, কারন সেলিম তাকে একজন মেয়ের থেকে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছিল, যেটা ও খুব বেশি ছেলেদের কাছে পায়নি। তার উপর কিছুদিন আগে রাইসার ব্রেক আপ হয়েছিল তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে, যার কাজ ছিল রাইসার প্রতিটা বিষয়ে খবরদারি আর নিয়ন্ত্রণ করা। একরোখা আর মুখের উপর কথা বলা টাইপ স্বভাবের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও রাইসার কাছে প্রথমে খারাপ লাগে নি। মনে হত, তার কথা শোনা আর কাজে সাপোর্ট দেয়ার জন্যে কেউ একজন তো আছে। কিন্তু, কিছুদিন পরে ধীরে ধীরে ছেলেটা রাইসার ছোট ছোট বিষয় নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করা শুরু করলো। রাইসাকে সবসময়ই কোন কিছু “এভাবে না করে ওভাবে করলে ভালো হত” বলাটা যেন তার অভ্যাস হয়ে পড়েছিলো। আর এভাবে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত ছেলেটাই সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়, যদিও রাইসা চেয়েছিল এভাবে সম্পর্কটা না ভাঙতে।
ট্রেনে সেদিন কথা বলা আসলে সেলিমই শুরু করেছিল। কোন এক কারনে ঐদিনের কথাগুলো সেলিমের খুব ভালো মনে নেই। শুধু মনে আছে, অসম্ভব সুন্দর চোখের একজন মানুষের সাথে ঐদিন তার দেখা হয়েছিল। হতে পারে, ভালবাসার মানুষদের এ কারনে বার বার দেখতে মন চায়। আর শত্রুদের একবার দেখলেই দীর্ঘদিন তাদের চেহারা মনে থাকে। কথাও মনে থাকে। হয়তো একই কারণে সেলিম চোখ বন্ধ করলে কেন জানি রাইসার সবটুকু দেখতে পায় না। শুধু মাথায় আসে, একজোড়া চোখ আর সুন্দর হাসির মায়ায় পড়েছিল সে। কোথায় যেন একবার পড়েছিল – উড়ে যায় পাখি, পড়ে থাকে পালক। মানুষ মরে যায়, কিংবা হারিয়ে যায়, কিন্তু তার জন্যে মায়া হারায় না। হয়তোবা, না পাওয়া আর হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্যেই মানুষের মায়া থাকে বেশি। সব হারিয়ে গেলেও মায়া রয়ে যায়।
আজ অনেকদিন পর রাইসার কথা মনে পড়লো। সেই ট্রেনে প্রথম দেখার সময় সেলিমের সাহস হয়নি রাইসার ফোন নাম্বার চাওয়ার। তবে, নিয়তি যেন লিখে রেখেছিল, ওদের দু’জনের কথা, যেন আবার তাদের দেখা হবে। হয়েও ছিল তাই। প্রথম দেখার মাস দুই পরে আবার দেখা হয় দু’জনের। সেলিম ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ছিল বাসের অপেক্ষায়। আর সেই বাসের অপেক্ষাই যেন শাপেবর হলো ওর জন্যে। হঠাৎ কাঁধে টোকা পড়তেই ঘুরে তাকিয়ে দেখে রাইসা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আবারও কথা হলো সেদিন। বাস আসতে দেরি ছিল, সেই ফাঁকে দু’জনের জমে থাকা সংকোচগুলোও যেন বাসের ধোঁয়ার মতোই উবে গেল। ফোন নম্বর আদান-প্রদান হলো। সেই থেকে শুরু।
ফোনে কথা বলতে বলতে কখন যে রাত ভোর হতো, দু’জনের কেউই টের পেত না। রাইসা সেলিমের মাঝে এক অদ্ভুত মুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। আগের সম্পর্কের সেই দমবন্ধ করা শাসন বা খবরদারি সেলিমের মধ্যে ছিল না। সেলিম বরং চাইত, রাইসা তার বন্ধুদের সাথে সময় কাটাক, নিজের মতো করে বাঁচুক। রাইসার বন্ধুদের সাথে সেলিমেরও ভালো খাতির হয়ে গিয়েছিল। এই স্বাধীনতা আর বিশ্বাসের মাঝেই রাইসা নতুন করে সেলিমের প্রেমে পড়ে। তবে, প্রেমটা ছিল অনেক ধীরস্থির, অনেক বেশি গভীর। রাইসা মনে মনে অপেক্ষা করত, কবে সেলিম তাকে ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলবে।
তিন মাস পরে এক বুধবারের কথা। সেদিন রাইসার জন্মদিন আর আকাশজুড়ে আষাঢ়ে মেঘের ঘনঘটা, যেন শহরকে ধুয়ে মুছে বিশুদ্ধ করবে, এই প্রয়াস । সকালে ঘুম ভেঙে এমন আবহাওয়া দেখে সেলিম ভাবলো, আজকে রাইসাকে ওর ভালোবাসার কথা বলবে, যদিও ঠিক শিওর না, কিভাবে বলবে। যাওয়ার পথে ফুটপাথে দেখলো, এক পিচ্চি কয়েক গুচ্ছ কদম ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রি করার জন্যে। সেলিম কিছু না ভেবে বললো, সবগুলো কদম ফুল দিয়ে একটা তোড়া বানিয়ে দিতে। পিচ্চি একটু অবাক হয়ে ওর মা’কে ডাকলো। সেলিম বুঝিয়ে বলার পরে ঐ পিচ্চির মা মুচকি হেসে ৪টা তোড়া ভেঙ্গে একটা বিশাল তোড়া বানিয়ে দিলো। বর্ষাকালের মেঘ আর কদমফুলের ভক্ত অনেক পাগল আছে, ফুটপাথের থাকা মানুষেরা এটা জানে।
রাইসা হলের সামনের বাগানবিলাসের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পরে সেলিমকে দেখলো, একটু অবাকই হলো। সেলিমের হাতে বিশাল আকারের এক কদম ফুলের তোড়া। রাস্তার সবাই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার হলেও ঘুরে দেখছে। ও জানে, সেলিম অন্যদের থেকে আলাদা, অন্য রকমের রোমান্টিক মানুষ, প্রকাশ করে না। আর আজকে তার হাতে এত ফুল অবাক না হয়ে উপায় নেই। সেলিম এসে কোন কথা না বলে একটু হেসে, রাইসার হাতে ফুলের তোড়াটা তুলে দিলো। রাইসার চোখে যেন হাসির ঝিলিক দেখতে পেল সেলিম। তবে, তোড়াটা এতই বড়, যে এটা হাতে ধরে রাখাও মুশকিল। রাইসা ফিক করে হেসে ফেললো। সেলিমও হেসে ফেললো ওর হাসি দেখে। যারা তখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তারা খুব সুন্দর একটা দৃশ্য দেখলো। দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে একটা বিশাল কদম ফুলের তোড়া হাতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সেলিম হাসতে হাসতে বললো, “জানো রাইসা, আমার খুব শখ – কোনো এক ঝুম বৃষ্টির দিনে আমার ভালোবাসার মানুষটার হাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় ভিজব। তুমি কি আমার সেই স্বপ্নটা সত্যি করবে, চাইলে সাথে এই কদম ফুলগুলোও রাখতে পারো?”
সেলিমের প্রপোজালটা হয়তো সিনেমার মতো সাজানো কোনো ডায়লগ ছিল না, বরং খুব সাদামাটা। তবে, সেটাই রাইসার হৃদয়ে দাগ কাটার মতো ছিল। রাইসা ‘না’ করতে পারেনি। পরদিন সত্যিই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। দু’জনে একসাথে সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজেছিল। ইট-পাথরের এই শহরের রাস্তায় তখন ট্রাফিকের সাথে মানুষও পানিবন্দি। দু”জনে তখনও ফুটপাথে বসা। সেলিম রাইসার হাত ধরে খুব আস্তে করে বললো, “আমার বউ হবে?”
রাইসা থমকে গিয়েছিল। সম্ভবত চোখে পানিও চলে এসেছিলো, কিন্তু সেটা হয়তো বৃষ্টির জন্যে বোঝা যায় নি। সে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সেদিন দু’জনেই একবুক আনন্দ নিয়ে ফিরেছিল। রাইসা ঠিক করল, পরদিন সকালে সে তার সবচেয়ে প্রিয় নীল শাড়িটা পরে সেলিমকে সারপ্রাইজ দিতে যাবে।
পরদিন সকাল আটটা। সেলিমের ঘুম তখনো ভাঙেনি। বালিশের পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠলো। রাইসার নম্বর। ঘুমজড়ানো গলায় ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক অপরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— “ভাই, এই ফোনের মালিক নিউ মার্কেটের মোড়ে রোড এক্সিডেন্ট করেছেন। অবস্থা খুব খারাপ। আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।”
সেলিমের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। ওপাশের কথাগুলো তার মাথায় ঢুকছিল না। আজকে সে তার মাকে রাইসার কথা জানাতে চেয়েছিল।
সেলিম পাগলের মতো ছুটল হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। যেই মানুষটা কয়েক ঘণ্টা আগেও শাড়ি পরে তাকে চমকে দেওয়ার কথা ভাবছিল, সে এখন সাদা কাপড়ে মোড়া। সেলিম হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে হাটতে হাটতে বের হয়ে এল, কোথায় যাবে, জানে না। এটা কি স্বপ্ন? নিশ্চয়ই স্বপ্ন। এখনই ঘুম ভাঙবে তার।
পরদিন রাইসার এক বন্ধু সেলিমকে ফোন করে জানাজায় যাওয়ার কথা বলল। সেলিমের মনে নেই সে কী উত্তর দিয়েছিল। সে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাইসা নেই, এটা কিভাবে সম্ভব, ওর মাথায় আসছিল না। মাটির নিচে রাইসাকে রেখে আসার সময় মনে হচ্ছিল, তার নিজের সত্তাটাকেও সে ওখানেই দাফন করে দিয়ে এসেছে।
এরপর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। জীবন থেমে থাকেনি। সেলিম আবার চাকরিতে জয়েন করেছে, চাকরি বদলেছে, প্রমোশন হয়েছে। ওর মা বহুবার বিয়ের কথা বলেছেন, কিন্তু সেলিম প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। “বউ” ডাকটা সে রাইসাকে দিয়ে ফেলেছিল, এই ডাকে অন্য কাউকে ডাকার সাধ্য তার নেই।
সেলিম বাস্তবে ফিরে এলো। ট্রেনের শব্দ আর সবুজের গান মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে সবুজকে থ্যাংকস দিল। বলল, “গানটা খুবই সুন্দর। অনেক আগের একজনকে মনে করিয়ে দিলে।”
সবুজ হাসলো। তারপর ওরা অন্য গান ধরল। ওদের গান শুনতে শুনতে আর ট্রেনের একঘেয়ে দুলুনিতে সেলিম ঘুমিয়ে গেল একটু পরে।
হঠাৎ ঘুম ভাঙল সেলিমের। চারপাশটা কেমন যেন নিস্তব্ধ। ট্রেনের সেই পরিচিত চাকার শব্দ নেই। বাইরে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বগির ভেতরের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, তাতে অন্ধকার কাটছে না খুব একটা। সেলিম খেয়াল করল, ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। সামনের সিটে সবুজ বা তার বন্ধুরা কেউ নেই। সবাই হয়তো নেমে গেছে। সেলিম উঠে দাঁড়াল। গেটের সামনে একজন স্টাফ জানাল, সিগন্যালে আটকা পড়েছে ট্রেন। চট্টগ্রামের এক্সপ্রেস ট্রেনটা ক্রস করার পর আবার ছাড়বে। সময় লাগবে।
ওদের ট্রেনটা দাড়িয়েছে একটা ছোট্ট স্টেশনে, নাম ‘জামতলী’। সেলিম ট্রেন থেকে নামল। প্লাটফর্মে তেমন কেউ নেই বললেই চলে। সে হাঁটতে শুরু করল। আজ কেন জানি রাইসার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। হাঁটতে হাঁটতে সে যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল একটু। হঠাৎ এক তীব্র বিদ্যুৎ চমকে তার সেই ঘোর কাটল। আকাশের দিকে তাকাতেই দেখলো, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সাথে মেঘ ডাকাও শুরু হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সেলিম দৌড়ে স্টেশনের একটা টিনের চালার নিচে গিয়ে দাড়ালো।
বৃষ্টির এই শব্দ, মাটির সোঁদা গন্ধ, সব কিছু আজ বড্ড বেশি রাইসাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাইসার সেই চোখ দুটো, কী মায়া ছিল তাতে! সেলিম অপলক তাকিয়ে থাকত। রাইসা তখন লজ্জা পেয়ে হেসে বলত, “কী দেখো?”
সেলিম উত্তর দিতে পারত না। কী এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল সেই চোখে! আর তার গায়ের সেই ঘ্রাণ… আজও যেন সেলিম সেই ঘ্রাণ পাচ্ছে। বৃষ্টির ঝাপটায় রাইসার স্মৃতিগুলো আজ বড় বেশি জীবন্ত হয়ে উঠছে।
হঠাৎ খেয়াল করলো, ট্রেনটা ধীরগতিতে চলতে শুরু করেছে। হুইসেল দেয়নি, কিন্তু নিঃশব্দেই চাকাগুলো গড়াতে শুরু করেছে। সেলিম বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে ট্রেনের দিকে পা বাড়াল।
ঠিক তখনই, ট্রেনের একটি বগির দরজায় চোখ পড়তেই সেলিমের শরীরটা অবশ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
রাইসা!
ঠিক সেই নীল শাড়িটা পড়ে রাইসা আবছা আলো ছায়ায় ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই চিরচেনা ভুবন ভোলানো হাসি। সেলিম নড়তে পারল না। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার শরীরে বিধছে, সে কি স্বপ্ন দেখছে?
রাইসা চিৎকার করে উঠল, “সেলিম! তাড়াতাড়ি আসো! দাঁড়িয়ে আছো কেন? ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে তো! ভিজে যাবে, জ্বর আসবে তো! তাড়াতাড়ি আসো সেলিম, তাড়াতাড়ি…”
সেলিম নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এটা কি সত্যি? নাকি মনের ভুল? কিন্তু, রাইসার ওই চোখ, ওই হাসি, ওই কণ্ঠস্বর, ওই আকুতি – কিভাবে ভুল হতে পারে!
রাইসা আবার ডাকল, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সেলিম, জলদি এসো! ট্রেন স্পিড বাড়াচ্ছে! দৌড় দাও, সেলিম। না হলে মিস হয়ে যাবে…”
সেলিম আর কিছু ভাবল না। যুক্তি, বুদ্ধি, বাস্তবতা – সব যেন তুচ্ছ হয়ে গেল সেই মুহূর্তের কাছে। সে দৌড় শুরু করল। বৃষ্টির পিচ্ছিল প্লাটফর্ম দিয়ে সে পাগলের মতো ছুটছে। ট্রেন গতি বাড়াচ্ছে। রাইসা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। সেলিম প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। তাকে ট্রেন ধরতেই হবে। রাইসার হাতটা ধরতেই হবে।
বাতাস চিরে সেলিম চিৎকার করে বলল, “আমি আসছি, রাইসা! আমি আসছি! আমাকে ফেলে যেও না!”
প্লাটফর্ম শেষ হয়ে আসছে। ট্রেনের গতি বাড়ছে। সেলিম তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছে রাইসার বাড়ানো হাতটা ধরার জন্যে। এবার সে আর কিছুতেই রাইসাকে হারাতে দেবে না, কিছুতেই না…
*** সমাপ্ত ***
গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।