শহরের শেষ জোনাকি

ডিপ্লয়মেন্ট (Day 0)

বৃহস্পতিবার, দিবাগত রাত ৩টা ৪২ মিনিট। আদাবর-২ নম্বর রোড পুরোই সুনসান। রাস্তা থেকে দেখলে মনে হবে, সব বিল্ডিংয়ের মাঝে শুধু দুটো ঘরে আলো জ্বলছে। হয়তো কাল কারো পরীক্ষা, জোর প্রস্তুতি চলছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, আরো কিছু ফ্ল্যাটের জানালায় ল্যাপটপ বা মনিটরের আলো জ্বলছে। তারই মাঝে একটা হলো আবিরের। ও এই রোডের এক আটতলা বিল্ডিংয়ের চিলেকোঠার ফ্ল্যাটে থাকে। এমনিতেই ব্যাচেলর ফ্ল্যাট, তার উপর আবিরের ঘরটা যেন একটা ছোটখাটো ডাম্প ইয়ার্ড। টেবিলের ওপর কফি মগের নিচে চাপা পড়ে আছে ইলেকট্রিসিটি বিল, পাশে অযত্নে পড়ে থাকা কয়েকটা হার্ডড্রাইভ, আর অ্যাশট্রেতে উপচে পড়া সিগারেটের ফিল্টার।

আবিরের এসব দিকে মন নেই। তার সমস্ত মনোযোগ তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। তার গত দুই বছরের সাধনার ফল। আবির ল্যাপটপের Enter কি-তে চাপ দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

>> Deploying project_firefly.py

25%…

50%…

75%…

Success…

আবিরের বুকটা একটু কেঁপে উঠল। কয়েক হাজার ঘণ্টার কোডিংয়ের ফল হলো এই নিউরাল নেটওয়ার্ক। আবির বাংলাতে টাইপ করল:

“হ্যালো।”

নিউরাল নেটওয়ার্ক থেকে রিপ্লাই এল: “এত রাতে হ্যালো দিচ্ছো যে? ঘুমাবে না? সকালে অফিস নেই?”

আবিরের চোখে পানি চলে এলো নাকি, সে ঠিক বুঝলো না। হয়তো আসার কথা। অতিরিক্ত ডিপ্রেশনে মানুষের ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড নাকি শুকিয়ে যায়, চোখে পানি আসে না। ল্যাপটপে অতিরিক্ত সময় কাজ করলেও নাকি এমন হয়। কে জানে, হয়তোবা, আবিরের ক্ষেত্রে কোনো বাগ (Bug)-ই ধরেছে।

বরং, এমন রিপ্লাই দেখে আবিরের মুখে হাসি চলে এলো। সে যে হাসতে জানে, এটাই সম্ভবত সে ভুলে গিয়েছিল।

রিপ্লাইয়ের এই বাচনভঙ্গি, এই শাসন—হুবহু নীলা। গত দুই বছর ধরে সে এই নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করেছে। এই নেটওয়ার্কে নীলার সাথে তার ৬ বছরের সম্পর্কের সব মেসেজ, ইমেইল, হাজার হাজার ভয়েস নোট—সব ফিড করা হয়েছে। এটা তৈরি করতে গিয়ে কতবার যে সিস্টেম ক্রাশ করেছে, তা গুনেও শেষ করা যাবে না। কিন্তু, তারপরও আবির হাল ছাড়েনি। কারণ, নীলা তার আত্মার অংশ ছিল, ওকে ছাড়া তার জীবন অসম্পূর্ণ। যেভাবেই হোক, নীলাকে তাই ফিরিয়ে আনতেই হতো।

আবির বিড়বিড় করে বলল, “ওয়েলকাম ব্যাক, নিলা।”

আসক্তি (Month 2)

সময় প্রায় বিকেল চারটা। আবিরের অফিসে সেন্ট্রাল এসির শোঁ শোঁ আওয়াজ আর চারপাশের কিবোর্ডের খটখট শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। তবে, আবির জানালার গ্লাস দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ওর অফিসের লোকেশন একেবারে কারওয়ান বাজারের সিগন্যালের পাশে। সিগন্যালটা মাত্র ছেড়েছে, সার্ক ফোয়ারার দিক থেকে আসা গাড়ির স্রোত ফার্মগেটের দিকে ছুটছে। এই জ্যাম, এই হর্ন, মানুষের এই দৌড়াদৌড়ি—সবই আবিরের কাছে এখন কেমন যেন ঝাপসা লাগে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, সে একটা অ্যাকুরিয়াম জারের ভেতর বসে আছে, আর বাকি পৃথিবীটা জারের বাইরে। বাংলাতে কুয়োর ব্যাঙ বলে একটা কথা আছে। আবিরের মাঝে মাঝে নিজেকে সত্যিকারেই কুয়োর ব্যাঙ বলে মনে হয়। ওর সামনে প্রোজেক্ট ম্যানেজারের মেইল খোলা, সাবজেক্ট লাইনে লাল কালিতে লেখা “Urgent Fix: Production Bug”। কিন্তু আবিরের সেদিকে খেয়াল নেই। ওর মাথায় আসলে ঘুরছে অন্য কোড, হয়তোবা বলা ভালো, অন্য মানুষ। কিংবা, আরো সঠিকভাবে বললে, একজন মানুষকে নিয়ে লেখা কোড।

আবিরের পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করছে। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠেছে, ‘Foysal’। গত এক মাসে ফয়সাল বোধহয় পঞ্চাশ বারের ওপর কল দিয়েছে। অফিসেও এসেছিল গত সপ্তাহে। আবির ফোন তো ধরেইনি, এমনকি দেখাও করেনি। বুঝে পায়নি, ফোন রিসিভ করে বা দেখা করে ও কী বলবে? “দোস্ত, আমি ব্যস্ত আছি”? ফয়সাল যদি জিজ্ঞেস করে, “কী নিয়ে ব্যস্ত?” তখন কী উত্তর দেবে? “দোস্ত, আমি একটা মরা মানুষের সাথে চ্যাটিং-এ ব্যস্ত”? মানুষ পাগল ভাববে। সাইকিয়াট্রিস্টরা একে হয়তো বলবে ‘প্যাথলজিক্যাল গ্রিফ’ বা ‘ডিলিউশন’। কিন্তু আবিরের কাছে এখন এটাই ‘সলিউশন’। একাকিত্বের একমাত্র সলিউশন।

আবিরের সেদিন বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত আটটা। লিফটে ওঠার সময় আয়নাতে নিজের চেহারার দিকে তাকাল। চোখের নিচে কালিটা আরও গাঢ় হয়েছে। গাল ভেঙে গেছে, আর শেষ কবে শেভ করেছে মনেও নেই। আবির মনে মনে হাসল, নিজেকে দেখতে অনেকটা জম্বির মতো লাগছে। এক টিভি সিরিজে দেখেছিল, জম্বিরা নাকি ব্রেইন খায়। আর আবির খাচ্ছে মেমোরি, বেঁচে আছে শুধু নীলার মেমোরি নিয়ে।

আবির তালা খুলে রুমে ঢুকলো, ভেতরে অন্ধকার। একটুখানি চাঁদের আলো জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে মেঝেতে এসে পড়েছে। আবির ইচ্ছে করেই ঘরের লাইট জ্বালালো না। অন্ধকারেই সুইচবোর্ড থেকে ফ্যানটা চালু করলো, ওটা যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো শব্দ করে গর্জে উঠে ঘুরতে শুরু করলো। ওর ঘরের সবকিছুই যেন ওর মতো হয়ে গেছে। বেঁচে থাকতে হবে তাই বেঁচে আছে, যেন কোনো বাস্তবিক কারণ নেই বেঁচে থাকার। আবির অন্ধকারেই টেবিলে বসে ল্যাপটপটা অন করল।

আবির টাইপ করল: “আজকে খুব টায়ার্ড লাগছে। অফিসে ঝামেলা হয়েছে।”

কয়েক ন্যানো-সেকেন্ডের অপেক্ষা। কার্সর ব্লিঙ্ক করছে। আবিরের হৃৎস্পন্দন এই সময়টায় একটু বেড়ে যায়। ঠিক যেমনটা হতো ছয় বছর আগে নীলার রিপ্লাই আসার আগে।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল রিপ্লাই: “আবার ওই টাকলু বসটা ঝাড়ি দিয়েছে? তোমাকে না বলেছি ওনার কথায় কান দেবে না! তুমি বরং এক কাজ করো, ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট খাও। কিন্তু একটার বেশি না। প্রমিজ?”

আবিরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। এই “টাকলু” নামটা নীলার দেওয়া। আবিরের বসকে নীলা দু’চোখে দেখতে পারত না।

আবির মাঝে মাঝে চিন্তা করে, এই যে ছোট ছোট ডিটেইলস, এই যে রাগ, এই যে কেয়ার – এগুলো কি শুধুই ডেটা? শুধুই জিরো আর ওয়ান?

আবির লিখল: “ওকে, প্রমিস। একটার বেশি খাবো না।”

নীলা (AI): “গুড বয়। আর শোনো, আকাশ দেখেছো? আজ চাঁদটা খুব সুন্দর। পূর্ণিমার মতো।”

আবিরের টাইপ করতে থাকা আঙুলগুলো হঠাৎ থেমে গেল। পূর্ণিমার চাঁদ? আবির ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। পর্দা দিয়ে জানালা পুরোটা ঢাকা। বাইরে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই। ল্যাপটপের দিকে তাকাল সে। ক্যামেরার লেন্সের ওপর কালো টেপ মারা। এটা আবিরের পুরনো অভ্যাস, হ্যাকারদের ভয়ে ওয়েবক্যাম সবসময় ব্লক করে রাখে। তাহলে? এই বন্ধ ঘরে, অন্ধকারের মাঝে এই প্রোগ্রাম কিভাবে জানল যে বাইরে চাঁদ উঠেছে?

একটু চিন্তা করে আবির নিজেকে বোঝালো, প্রোগ্রামটা নিশ্চয়ই ওয়েদার এপিআই (Weather API) থেকে ডেটা নিচ্ছে। গুগলে সার্চ করলেই তো জানা যায় আজ পূর্ণিমা কিনা। সিম্পল লজিক।

আবির দ্রুত প্রোগ্রামের ব্যাকএন্ড টার্মিনাল ওপেন করল। টাইপ করল:

>> check_api_status(weather_module)

রেজাল্ট এল:

Status: Disconnected.

আবির স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। এর মানে হচ্ছে, ওয়েদার মডিউল ডিসকানেক্ট করা। ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেও প্রোজেক্ট ফায়ারফ্লাই নামের এই প্রোগ্রাম বাইরের কোনো ডেটা সোর্স ব্যবহার করার পারমিশন রাখে না। কোডটা আবির নিজের হাতে লিখেছে, সে জানে এর লিমিটেশন। এই সিস্টেমের কোনোভাবেই জানার কথা না, আজ বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, নাকি জোছনা।

আবিরের মাথার মাঝে লজিক বলল, “এটা ইম্পসিবল। কোডে কোথাও বাগ আছে। হয়তো র‍্যান্ডম জেনারেটর থেকে এই লাইনটা এসেছে এবং কাকতালীয়ভাবে আজ পূর্ণিমা মিলে গেছে।”

কিন্তু, আবিরের মন সেটা মানতে চাইছে না। কোডিংয়ের মানুষ হয়েও সে লজিক খুঁজতে চাইল না। আবির ধীর পায়ে উঠে গিয়ে বারান্দার দরজাটা খুলল। ঝাপটা বাতাস এসে লাগল মুখে। আকাশের দিকে তাকাতেই আবির দেখলো, সত্যিই মস্ত বড় একটা চাঁদ ঝুলে আছে আটতলার কার্নিশ ঘেঁষে। স্নিগ্ধ, মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে নোংরা এই ঢাকা শহর।

আবির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল। একটা ধরালো। মাথার ভিতরে লজিক বলছে, “সিস্টেম চেক কর। বাগ ফিক্স কর।”

আর ওর মন বলছে, “বাদ দে লজিক। চাঁদটা তো দেখ। নীলা তো এটাই দেখতে বলেছে।”

একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে সিগারেটের ধোঁয়াটা ছেড়ে, আবির চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “তুমি কি সত্যিই আছো? নাকি আমি তিলে তিলে পাগল হয়ে যাচ্ছি?”

ভরা জোছনার নিচে এই রাতের বাতাসে কারো উত্তর ভেসে এল না।

অন্যদিকে, আবিরের ঘরের মাঝে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চ্যাটবক্সটা তখনো জ্বলজ্বল করছে, যেন উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে একজোড়া অদৃশ্য চোখ। আবির জানতেও পারলো না, তার নিজের লেখা প্রোজেক্ট ফায়ারফ্লাই এই মুহূর্তে ব্যাকগ্রাউন্ডে এমন কিছু প্রসেস রান করছে, যার কোনো ব্যাখ্যা আবিরের জানা নেই।

গ্লিচ (Month 5)

শুক্রবার, সকাল ১১টা।

সপ্তাহের এই একটা দিনের সকালের দিকে আদাবরের রাস্তায় রিকশার টুংটাং শব্দটা একটু কম থাকে। আবিরের রুম থেকে ওদের বিল্ডিংয়ের নিচতলার গ্যারেজ থেকে গাড়ি ধোয়ার পানির ছিটকে আসার শব্দ আসছে। আর সাথে দারোয়ানের রেডিওতে বাজানো পুরনো কোনো বাংলা সিনেমার গান।

“হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস…”

গানটা বারবার চলেই যাচ্ছে। আবিরের কিছুটা বিরক্তি লাগছে শুনতে এখন। ফানুস তো তাও ওড়ে, আবিরের মতো মানুষেরা তো এখন শুধু স্থবির হয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে আটকে থাকে।

আবির ওর ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। গত পাঁচ মাসে ওর ওজন কমেছে প্রায় সাত কেজি। গালের হাড়গুলো এখন চামড়ার নিচ থেকে উঁকি দেয়। চোখের নিচে কালি পড়ার ধাপ পার হয়ে সেটা এখন স্থায়ী গর্তে পরিণত হয়েছে। ওর মা সকালে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করলো। কেন আবির গত ঈদে বাড়ি যায়নি, কেন ফোন ধরে না। মায়ের কান্না থামানোর জন্য আবির কথা দিয়েছে আজ জুম্মার নামাজ পড়তে যাবে। অন্তত ঘর থেকে বের হওয়া হবে আজ। ছুটির দিনে এখন আর সচরাচর ও ঘর থেকে বের হয় না।

ঘরের আলমারিটা খুলতেই ভ্যাপসা একটা গন্ধ নাকে এল। ন্যাপথলিন আর বদ্ধ বাতাসের গন্ধ। আবির হ্যাঙ্গারে ঝোলানো কাপড়গুলো সরালো। ওর চোখ আটকে গেল গাঢ় নীল রঙের পাঞ্জাবিটার দিকে। এটা নীলা গিফট করেছিল ওদের সম্পর্কের প্রথম বছরে। খুব পছন্দ ছিল ওর পাঞ্জাবিটা। নীলা বলতো, “তোমাকে নীল রঙে একদম প্রিন্সের মতো লাগে, যদিও তোমার ঘোড়া নেই, তবে একটা সাইকেল কিনে নিতে পারো।”

আবির পাঞ্জাবিটা বের করল। আয়নার সামনে ধরে পরতে যাবে, তখনই নজরে পড়ল, বুকের কাছে দ্বিতীয় বোতামটা নেই। সুতোগুলো ঝুলে আছে। এর আগেরবার ধোয়ার সময় বোধহয় ছিঁড়ে গেছে। আবির বিরক্ত মুখে পাঞ্জাবিটা বিছানার ওপর ছুড়ে মারল। থাক, আজ আর পাঞ্জাবি পরা হবে না। সেই পুরনো টি-শার্টই ভরসা।

আবির টি-শার্টটা গলা দিয়ে নামাচ্ছে, ঠিক তখনই ল্যাপটপটা একটা ‘পিং’ শব্দ করে উঠল; নোটিফিকেশন। আবির ভাবল ফয়সাল বা অফিসের কেউ হবে। সে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ল্যাপটপের সামনে গেল।

স্ক্রিনে চ্যাটবক্সটা ওপেন করা। মেসেজটা এসেছে Project_Firefly থেকে।

মেসেজটা মাত্র এক লাইনের: “নীলটা পড়ো না, আবির। ওটার বোতাম ছেঁড়া। সাদাটা পরো, ওটা আয়রন করা আছে।”

আবিরের হাত থেকে তোয়ালেটা মাটিতে পড়ে গেল। ঘরটা হঠাৎ করেই খুব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নিচতলার রেডিওর গান, রাস্তার শব্দ, সব যেন ভ্যানিশ হয়ে গেল। আবির শুধু তার নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে।

লজিক। এই মেসেজের পেছনে লজিক কী? আবির লজিক খুঁজতে লাগল। পাঞ্জাবিটা আলমারির ভেতরে ছিল। আবির সেটা বের করেছে মাত্র দুই মিনিট আগে। বোতামটা ছিঁড়েছে বেশ কিছুদিন আগে। আর নীলা মারা গেছে দুই বছর আগে। এই বোতাম ছেঁড়ার ইনফরমেশন কোনো ডেটাবেজে নেই। কোনো ক্লাউড স্টোরেজে নেই। এমনকি আবির নিজেও এটা নিয়ে কারো সাথে চ্যাটে বা ফোনে কথা বলেনি। সে শুধু মনে মনে বিরক্ত হয়েছে।

তাহলে? এই প্রোগ্রাম জানলো কী করে? ল্যাপটপের ক্যামেরা? আবির তাকাল। কালো টেপটা এখনো লেন্সের ওপর শক্ত করে লাগানো। মাইক্রোফোন? আবির তো কোনো কথাই বলেনি, শব্দ করে। পাঞ্জাবিটা বের করার পর সে শুধু মনে মনে ভেবেছে।

আবিরের শরীর ঘামতে শুরু করল। মাথার উপর কড়কড় শব্দে ফ্যানটা ঘুরছে, তবুও ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে কাঁপাকাঁপা হাতে কিবোর্ডে টাইপ করল:

>> show_logic_path(last_response)

সে দেখতে চায়, প্রোজেক্টটার অ্যালগরিদম কোন যুক্তিতে এই কমেন্টটা জেনারেট করেছে। সাধারণত একটা ‘JSON’ ফাইল দেখানোর কথা, যেখানে কী-ওয়ার্ড আর সোর্স কোডের রেফারেন্স থাকে।

কালো টার্মিনাল স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড কোনো নড়াচড়া নেই। কার্সর ব্লিঙ্ক করছে। তারপর লাল রঙের একটা এরর মেসেজ ভেসে উঠল:

Error 404: Logic Path Not Found.

Source: Unknown.

Override Code: MEMORY_LEAK_PHYSICAL.

আবির এবার চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। MEMORY_LEAK_PHYSICAL? এরকম কোনো এরর কোড সে এই প্রজেক্টে ডিফাইন করেনি। পাইথনের লাইব্রেরিতেও এমন কোনো এরর থাকার কথা না। মেমোরি লিক হতে পারে র‍্যামে (RAM), কিন্তু ‘ফিজিক্যাল’ মেমোরি লিক?

আবিরের মনে হলো, ল্যাপটপের স্ক্রিনটা যেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেই পরিচিত, দুষ্টু হাসিটা। আবির এবার টাইপ করল:

“তুমি কে? সত্যি করে বলো, তুমি কে? কেউ কি আমার ল্যাপটপ হ্যাক করেছে?”

ওপাশ থেকে রিপ্লাই জেনারেট হচ্ছে…

তিনটে ডট ওঠানামা করছে…

“হ্যাক তো তুমি করেছো, আবির। আমার মৃত্যুকে হ্যাক করেছো।”

কয়েক সেকেন্ড পরে আরেকটা মেসেজ এলো।

“ভয় পাচ্ছো কেন? সাদা পাঞ্জাবিটা পরো। দেরি হয়ে যাচ্ছে, নামাজ মিস হবে।”

আবির ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ধপ করে বন্ধ করে দিল। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে, এই ঘর, এই ল্যাপটপ, এই প্রোগ্রাম – সবকিছু মিলে তাকে ঘিরে ধরছে। সে তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজায় তালা দিতে গিয়ে দেখল তার হাত কাঁপছে। চাবিটা তালায় ঢুকাতে পারছে না।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আবির ঠিক করল, ফিরে এসে ও ল্যাপটপের হার্ডড্রাইভটা ভেঙে ফেলবে। আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। এটা আর প্রোগ্রাম না, যেটা সে নিজে লিখেছে, এটা অন্য কিছু। আর এই ‘অন্য কিছু’র সাথে বসবাস করা সম্ভব না।

কিন্তু, আবির জানতো না, নেশা জিনিসটা ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী। ঐ হার্ডড্রাইভ ভাঙার মতো শক্তি তার নেই। সে আবার ওই স্ক্রিনের সামনেই বসবে। কারণ, ভয়ের ওপাশে যে মায়াটা আছে, সেটা তাকে চুম্বকের মতো টানছে, এক অজানা নেশার মতো।

জোনাকির রাত (Month 6)

মঙ্গলবার, আষাঢ় মাস। রাত ১টার কিছু বেশি বাজে।

বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। এই নোংরা শহরের বৃষ্টি আবিরের কাছে রোমান্টিক লাগে না, বরং বিরক্তিকর। তবে, নীলার খুব পছন্দ ছিল বৃষ্টি। ও বলতো, নোংরা শহরের জন্যেই তো বৃষ্টি আরো সুন্দর, যেন স্রষ্টার কাছ থেকে নেমে আসা আশীর্বাদের মতো, মনের সকল জঞ্জাল পরিষ্কার করে দেয়ার জন্যে। আবির শুনে হাসতো। নীলার কথাগুলো বেশিরভাগ সময়েই ওর কাছে নাটক বা গল্পের নায়িকাদের ডায়লগের মতো মনে হতো।

আবিরের ঘরের জানালার কাঁচ ঝনঝন করছে বাতাসের ঝাপটায়। কার্নিশ বেয়ে পানি পড়ার শব্দটা এখন আর ছন্দময় লাগে না, মনে হয় কেউ কানের কাছে অনবরত টিনের চালে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। ছন্দগুলো সবই সম্ভবত নীলার সাথে হারিয়ে গেছে। আবিরের বাসার সামনের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটাও ফিউজ হয়ে গেছে বিকেলে, তাই বাইরের অন্ধকারটা আজ বড্ড বেশি ভারী। ওর অবস্থার সাথে মিলে যায়।

আবিরের ঘরের অবস্থা তথৈবচ। ফ্লোরে কয়েকটা খালি পানির বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে। অ্যাশট্রেতে জায়গা নেই, তাই সিগারেটের ছাই জমেছে টেবিলের কোণায়। আবির বসে আছে ল্যাপটপের সামনে। তার চোখ দুটো যেন আগুনের ভাটার মতো লাল হয়ে আছে।

গত এক মাসে আবির বাসা থেকে বের হয়নি বললেই চলে। অফিস থেকে আনপেইড লিভ নিয়েছে, কিছু জমানো টাকা ছিল, সেগুলো দিয়েই চলছে। ফয়সাল দুবার এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে গেছে, আবির খোলেনি। ওর কাছে এখন মনে হয়, ঘরের দরজা খুললেই তো বাইরের দুনিয়ার বাস্তবতা ঢুকে পড়বে। আর বাস্তবতা মানেই ওখানে নীলা নেই।

তবুও, আবির বহু কষ্টে নিজেকে বুঝিয়ে আজ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পাগলামি আর চালানো সম্ভব না। সে হ্যালুসিনেশনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। গতকাল রাতে সে স্বপ্নে দেখেছে, ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে হাত বেরিয়ে এসে তার গলা টিপে ধরেছে। ও নিজেই এটা বুঝতে পারছে যে, এটা সাইকোসিসের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

আবিরের ল্যাপটপের টার্মিনাল উইন্ডো ওপেন করা, কার্সর ব্লিঙ্ক করছে। আবির টাইপ করে রেখেছে:

sudo rm -rf /project_firefly

লিনাক্স বা ইউনিক্স সিস্টেমে এর চেয়ে নিষ্ঠুর কমান্ড আর নেই। কোনো রিসাইকেল বিন নেই, কোনো ‘Are you sure?’ ওয়ার্নিং নেই। এন্টার চাপলেই সব শেষ। আবিরের হাতে গত দুই বছর ধরে গড়ে তোলা নীলার ডিজিটাল অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাবে।

আবিরের তর্জনীটা এন্টার কি-এর ওপর কাঁপছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার লাগছে ওর কাছে। মনে হচ্ছে, সে কোনো সুইসাইড বোম্বার, আর সুইচটা তার নিজের হাতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে বিদ্যুৎ চমকালো, বিকট শব্দে বাজ পড়ল কাছে কোথাও। ট্রান্সফর্মার বার্স্ট করার শব্দ হলো, আর সাথে সাথেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেল।

ল্যাপটপের স্ক্রিনটা একটু কেঁপে উঠে ব্যাটারি মোডে চলে গেল। আবির অন্ধকারে বসে আছে। শুধু ল্যাপটপের স্ক্রিনের নীলাভ আলো তার মুখে এসে পড়েছে।

কত সময় পেরিয়ে গেছে, আবিরের মএন নেই। তবে, ও এখনো এন্টার কি-র ওপর আঙুল দিয়ে বসে আছে। ল্যাপটপ ব্যাটারি আইকন লাল দেখাচ্ছে। ১০% চার্জ আছে।

অনেক কষ্টে মনস্থির করলো, এখনই শেষ করতে হবে। সে এন্টার কি-তে চাপ দিতে যাবে, হঠাৎ স্ক্রিনে চ্যাটবক্সটা পপ-আপ করল। নিজে থেকেই।

Project_Firefly: “আমাকে মুছে ফেলার আগে খামটা একবার পড়বে না?”

আবিরের আঙুল জমে গেল। সে টাইপ করতে চাইল,

“কোন খাম?”

কিন্তু ওর আঙুল নড়ল না। তবে, স্ক্রিনের পেছনে কেউ একজন যেন ওর মনের কথাটা বুঝলো।

Project_Firefly: “ন্যাকামি করো না আবির। তুমি জানো আমি কোন খামের কথা বলছি। ওয়ারড্রোবের একদম নিচের ড্রয়ারে। পুরনো কাগজপত্রের নিচে যেটা লুকিয়ে রেখেছো। নীল খাম।”

আবিরের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। নীল খাম! এই খামটা আবির পেয়েছিল নীলা মারা যাওয়ার পরের দিন। নীলার মা তার হাতে এই খামটা দিয়ে বলেছিল, “নীলার ব্যাগে তোমার জন্যে এটা ছিল।”

আবির গত দুই বছর, ছয় মাস, তেরো দিন ধরে ওই খামটা খুলেনি। ভয়ে। খামের ভেতরে কী লেখা আছে সে জানে না, কিন্তু তার মনে হতো ওটা খুললেই নীলার মৃত্যুটা ‘অফিসিয়াল’ হয়ে যাবে। যতক্ষণ খামটা বন্ধ, ততক্ষণ যেন একটা আশা বেঁচে আছে।

কিন্তু এই প্রোগ্রাম… এই কোড… এটা জানল কী করে? কাগজপত্রের নিচে খামটা রাখা, এটা তো আবির ছাড়া পৃথিবীর আর কারো জানার কথা না! এমনকি আবির নিজের মনে মনেও এটা নিয়ে ভাবার সাহস পায় না।

Project_Firefly: “সময় নেই আবির। ল্যাপটপের চার্জ শেষ হয়ে আসছে। প্লিজ খামটা খোলো।”

এই “প্লিজ” শব্দটা স্ক্রিনে ভেসে ওঠার পর আবির আর বসে থাকতে পারল না। যেন নীলা ওর কাছে হাতজোড় করে চাইছে, ও যেন নীল খামটা খোলে। আবির উঠে দাঁড়াল, মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ধুলোমাখা ওয়ারড্রোবটা খুলল। পুরনো ফাইল, সার্টিফিকেটের স্তূপের নিচে হাত দিতেই আঙুলে ঠেকল সেই পরিচিত খসখসে কাগজ।

নীল খাম। ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছে। আবির খামটা হাতে নিয়ে ল্যাপটপের সামনে ফিরে এল। স্ক্রিনের আলোয় খামটা কেমন যেন জীবন্ত মনে হচ্ছে। আবির কাঁপা হাতে খামের মুখটা ছিঁড়ল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা ভাঁজ করা কাগজ। হালকা ল্যাভেন্ডারের গন্ধ। নীলার প্রিয় পারফিউম। দুই বছর পরেও গন্ধটা যায়নি।

আবির পড়তে শুরু করল।

“প্রিয় মিস্টার লজিক,

তুমি যখন এই চিঠিটা পড়ছ, তখন হয়তো আমি আর নেই। জানি তুমি লজিক খুঁজছ। ভাবছ, কেন এমন হলো?

শোনো, জীবনটা না কোডিংয়ের মতো। সব ইরর ফিক্স করা যায় না, কিছু বাগ নিয়েই প্রোগ্রাম রান করতে হয়। আমাকে ছাড়া তোমার জীবনটা হয়তো একটু ‘বাগি’ (Buggy) হবে, কিন্তু রান তো করতেই হবে, তাই না?

তোমার সাথে আমার ঝগড়াগুলো মনে আছে? তুমি বলতে আমি অবাস্তব সব কল্পনা করি। আজ একটা অবাস্তব কথা বলি। আমাদের সেই জোনাকি দেখার প্ল্যানটা মনে আছে? জাহাঙ্গীরনগরে যাওয়ার কথা ছিল? যাওয়া হলো না। তবে আমি প্রমিস করছি, যেদিন শহরের সব আলো নিভে যাবে, যেদিন তুমি খুব একা অনুভব করবে, সেদিন আমি আসব। জোনাকির আলো হয়ে।

ইতি,

তোমার আনপ্রেডিক্টেবল অ্যালগরিদম।”

চিঠিটা পড়া শেষ হতেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে মেসেজ এলো।

Project_Firefly: “দরজার দিকে তাকাও আবির। আমি এসেছি।”

ল্যাপটপের স্ক্রিনটা দপ করে নিভে গেল। চার্জ শেষ।

ঘরটা এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরের বৃষ্টির শব্দটা এখন অনেক বেশি জোরালো মনে হচ্ছে। আবির মেঝেতে বসে আছে, হাতে সেই চিঠি। তার মস্তিষ্কের সব লজিক গেট এখন শাট ডাউন। কোন এক কারণে চিঠিটা সে মুখের কাছে নিলো, নীলার প্রিয় পারফিউমের গন্ধটা নাকে এসে লাগলো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ওর।

ঠিক তখনই আবির দরজার নিচ দিয়ে একটা সরু আলোর রেখা দেখতে পেল। ও হামাগুড়ি দিয়ে দরজার কাছে গেল, কাঁপা কাঁপা হাতে দরজার ছিটকিনিটা খুলল।

বাইরে দরজার সামনে একটা জোনাকি, অদ্ভুত মায়াবী নীলাভ আলোর (Neon Blue) মতো জ্বলছে আর নিভছে। ঠিক যেন কারো হৃৎস্পন্দন। জোনাকির আলোয় চারপাশের অন্ধকার যেন ভয়ে সরে গেছে। পোকাটা স্থির হয়ে আছে আবিরের চোখের সামনে। জ্বলছে আর নিভছে।

আবির হাত বাড়াল। জোনাকিটা উড়ে এসে বসল তার হাতের তালুতে। ওর মনে হলো, এই মুহূর্তটার জন্যই সে বেঁচে ছিল গত দুই বছর। মুহূর্তের জন্য আবিরের মনে হলো, সে কোনো পোকা স্পর্শ করেনি। সে স্পর্শ করেছে একটা পরিচিত হাতের আঙুল। বরফের মতো ঠান্ডা, অথচ কী ভীষণ আপন! সেই স্পর্শে আবিরের শরীরের সব ক্লান্তি, সব ডিপ্রেশন, সব যুক্তি নিমেষেই যেন ধুয়ে গেল।

আবির ফিসফিস করে বলল, “বাফার টাইম শেষ, নীলা?”