মনের বারান্দায়

তুমি আমার পাশে বন্ধু হে,

বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো।

ট্রেনের বগির মাঝে টেবিলে কয়েকটা ছেলে গান ধরেছে। হাতে গিটার, সাথে ব্যাকপ্যাক দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোন কলেজে বা, ভার্সিটিতে পড়ে।

সেলিম ছেলেগুলোর পেছনের সিটেই বসে আছে। ও বাড়িতে যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে ডিউটি পড়াতে বাড়িতে যাওয়া হয়নি। ঈদের ৩য় দিন আজ, ট্রেন স্টেশন বেশ ফাকা ছিল। ট্রেনেও ভিড় তেমন নাই, তার উপরে ও বসে আছে এসি বগিতে। বেশ কিছুদিন পরে বাড়ি যাচ্ছে সেলিম। মা আর ছোটবোনটার সাথে বেশ কিছুদিন পরে দেখা হবে। গত বছর কুরবানী ঈদে ঘুরে এসেছে, আর যাওয়া হয় নি। এখন যাচ্ছে, তাও আবার রোজার ঈদের ২ দিন পর।

ছেলেগুলোর মাঝে একজনের হাতে গিটার, সাথে আরেকজন ট্রেনের টেবিলটাকে তবলা বানিয়ে ফেলেছে। আর ওদের সাথে আরো দুইজন ফ্রেন্ড গলা মিলাচ্ছে। এরা সবাইই সম্ভবত নন-এসি কোচে টিকেট কেটে উঠেছিল। কিছুক্ষণ আগে টিকেট চেকার এসে টিকেট আপগ্রেড করে দিয়ে গেছে। ছেলেগুলোর গানের আসর বেশ জমে উঠেছে। গিটার হাতে, সবুজ নামের ছেলেটা বেশ ভালোই গাইছে। একেকজন একটু পর পর “সবুজ, এই গানটা ধর”, বা “ঐ গানটা ধর”। আর সবুজ উৎসাহ নিয়ে সেই গানটা গাওয়া শুরু করছে। কিছুক্ষন পরে সেলিমও ওদের গানে তাল দেয়া শুরু করলো। এক ফাঁকে সবুজকে বললো – সবুজ ভাই, আপনার কোন গান নাই? নিজের জন্যে কোন গান লিখেন নাই? সেরকম কিছু গেয়ে শোনান।

সবুজ ছেলেটা একটু থেমে গেল। সেলিমের দিকে ঘুরে বললো – সত্যি শুনতে চান? সেলিম আগ্রহ নিয়ে ঘাড় নাড়লো। সবুজ গাইতে শুরু করলো–

বদ্ধ দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে আছি মনের বারান্দায়,

শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়,

হৃদয় জানালা দিয়েছি খুলে…

(গীটার ব্রেক)

হৃদয় জানালা দিয়েছি খুলে…

তোমার পাওয়ার আশায়।

শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়।

শুধু তোমার দেখা পাবার আশায়।

……………………

সেলিম কিছুটা আনমনা হয়ে গেল গানটা শুনতে শুনতে। কয়েক বছর আগেও একজনের দেখা পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতো। অপেক্ষার প্রহর শেষ করে সে অন্যপাড়ে চলে গেছে। অসম্ভব জেনেও সেলিম মাঝে মাঝে মনের অজান্তেই তার দেখা পাওয়ার আশায় থাকে এখনো, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে সম্ভবত। এই পাড়ে সেলিম এখন একা। মানুষ নাকি সামাজিক জীব! তবুও, প্রকৃতি মানুষের ডিএনএ’র মাঝে কোথাও একাকিত্বের জীন রেখে দিয়েছে। এজন্যেই শত প্রাচুর্যের মাঝে থাকলেও মানুষ অনেক সময়ই একাকী ফিল করে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে – invisible in the midst of the multitude. আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ভাষায়, “আমি সবসমই একা, এমনকি যখন আমি মানুষের ভীড়ে থাকি”।

সেলিমের প্রাচুর্য নেই, তবে অজানাতে হারিয়ে যাওয়া একজনের জন্যে একাকিত্ব আছে। কথায় বলে, সময়ে নাকি সব সেরে যায়। সেলিম এই কথার সাথে একমত না। সময়ের সাথে মানুষ কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে যায়। অনেকটা অভ্যাসের মত, কিন্তু তারপরও মাঝে মাঝে অভ্যাসের বাইরের জীবন চলে আসে। আজকে যেমন সেলিম নিজের অজান্তেই আবার রাইসাকে মনে করলো।

রাইসার সাথে পরিচয় হয়েছিল বছর চারেক আগে, এই ট্রেনেই বাড়ি যাওয়ার সময়। প্রথম দেখাতেই দু’জনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন, অনেক বিষয় নিয়ে। রাইসা সম্ভবত কথা বলেছিল, কারন সেলিম তাকে একজন মেয়ের থেকে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছিল, যেটা ও খুব বেশি ছেলেদের কাছে পায়নি। তার উপর কিছুদিন আগে রাইসার ব্রেক আপ হয়েছিল তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে, যার কাজ ছিল রাইসার প্রতিটা বিষয়ে খবরদারি আর নিয়ন্ত্রণ করা। একরোখা আর মুখের উপর কথা বলা টাইপ স্বভাবের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও রাইসার কাছে প্রথমে খারাপ লাগে নি। মনে হত, তার কথা শোনা আর কাজে সাপোর্ট দেয়ার জন্যে কেউ একজন তো আছে। কিন্তু, কিছুদিন পরে ধীরে ধীরে ছেলেটা রাইসার ছোট ছোট বিষয় নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করা শুরু করলো। রাইসাকে সবসময়ই কোন কিছু “এভাবে না করে ওভাবে করলে ভালো হত” বলাটা যেন তার অভ্যাস হয়ে পড়েছিলো। আর এভাবে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত ছেলেটাই সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়, যদিও রাইসা চেয়েছিল এভাবে সম্পর্কটা না ভাঙতে।

ট্রেনে সেদিন কথা বলা আসলে সেলিমই শুরু করেছিল। কোন এক কারনে ঐদিনের কথাগুলো সেলিমের খুব ভালো মনে নেই। শুধু মনে আছে, অসম্ভব সুন্দর চোখের একজন মানুষের সাথে ঐদিন তার দেখা হয়েছিল। হতে পারে, ভালবাসার মানুষদের এ কারনে বার বার দেখতে মন চায়। আর শত্রুদের একবার দেখলেই দীর্ঘদিন তাদের চেহারা মনে থাকে। কথাও মনে থাকে। হয়তো একই কারণে সেলিম চোখ বন্ধ করলে কেন জানি রাইসার সবটুকু দেখতে পায় না। শুধু মাথায় আসে, একজোড়া চোখ আর সুন্দর হাসির মায়ায় পড়েছিল সে। কোথায় যেন একবার পড়েছিল –  উড়ে যায় পাখি, পড়ে থাকে পালক। মানুষ মরে যায়, কিংবা হারিয়ে যায়, কিন্তু তার জন্যে মায়া হারায় না। হয়তোবা, না পাওয়া আর হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্যেই মানুষের মায়া থাকে বেশি। সব হারিয়ে গেলেও মায়া রয়ে যায়।

আজ অনেকদিন পর রাইসার কথা মনে পড়লো। সেই ট্রেনে প্রথম দেখার সময় সেলিমের সাহস হয়নি রাইসার ফোন নাম্বার চাওয়ার। তবে, নিয়তি যেন লিখে রেখেছিল, ওদের দু’জনের কথা, যেন আবার তাদের দেখা হবে। হয়েও ছিল তাই। প্রথম দেখার মাস দুই পরে আবার দেখা হয় দু’জনের। সেলিম ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ছিল বাসের অপেক্ষায়। আর সেই বাসের অপেক্ষাই যেন শাপেবর হলো ওর জন্যে। হঠাৎ কাঁধে টোকা পড়তেই ঘুরে তাকিয়ে দেখে রাইসা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আবারও কথা হলো সেদিন। বাস আসতে দেরি ছিল, সেই ফাঁকে দু’জনের জমে থাকা সংকোচগুলোও যেন বাসের ধোঁয়ার মতোই উবে গেল। ফোন নম্বর আদান-প্রদান হলো। সেই থেকে শুরু।

ফোনে কথা বলতে বলতে কখন যে রাত ভোর হতো, দু’জনের কেউই টের পেত না। রাইসা সেলিমের মাঝে এক অদ্ভুত মুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। আগের সম্পর্কের সেই দমবন্ধ করা শাসন বা খবরদারি সেলিমের মধ্যে ছিল না। সেলিম বরং চাইত, রাইসা তার বন্ধুদের সাথে সময় কাটাক, নিজের মতো করে বাঁচুক। রাইসার বন্ধুদের সাথে সেলিমেরও ভালো খাতির হয়ে গিয়েছিল। এই স্বাধীনতা আর বিশ্বাসের মাঝেই রাইসা নতুন করে সেলিমের প্রেমে পড়ে। তবে, প্রেমটা ছিল অনেক ধীরস্থির, অনেক বেশি গভীর। রাইসা মনে মনে অপেক্ষা করত, কবে সেলিম তাকে ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলবে।

তিন মাস পরে এক বুধবারের কথা। সেদিন রাইসার জন্মদিন আর আকাশজুড়ে আষাঢ়ে মেঘের ঘনঘটা, যেন শহরকে ধুয়ে মুছে বিশুদ্ধ করবে, এই প্রয়াস । সকালে ঘুম ভেঙে এমন আবহাওয়া দেখে সেলিম ভাবলো, আজকে রাইসাকে ওর ভালোবাসার কথা বলবে, যদিও ঠিক শিওর না, কিভাবে বলবে। যাওয়ার পথে ফুটপাথে দেখলো, এক পিচ্চি কয়েক গুচ্ছ কদম ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রি করার জন্যে। সেলিম কিছু না ভেবে বললো, সবগুলো কদম ফুল দিয়ে একটা তোড়া বানিয়ে দিতে। পিচ্চি একটু অবাক হয়ে ওর মা’কে ডাকলো। সেলিম বুঝিয়ে বলার পরে ঐ পিচ্চির মা মুচকি হেসে ৪টা তোড়া ভেঙ্গে একটা বিশাল তোড়া বানিয়ে দিলো। বর্ষাকালের মেঘ আর কদমফুলের ভক্ত অনেক পাগল আছে, ফুটপাথের থাকা মানুষেরা এটা জানে।

রাইসা হলের সামনের বাগানবিলাসের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পরে সেলিমকে দেখলো, একটু অবাকই হলো। সেলিমের হাতে বিশাল আকারের এক কদম ফুলের তোড়া। রাস্তার সবাই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার হলেও ঘুরে দেখছে। ও জানে, সেলিম অন্যদের থেকে আলাদা, অন্য রকমের রোমান্টিক মানুষ, প্রকাশ করে না। আর আজকে তার হাতে এত ফুল অবাক না হয়ে উপায় নেই। সেলিম এসে কোন কথা না বলে একটু হেসে, রাইসার হাতে ফুলের তোড়াটা তুলে দিলো। রাইসার চোখে যেন হাসির ঝিলিক দেখতে পেল সেলিম। তবে, তোড়াটা এতই বড়, যে এটা হাতে ধরে রাখাও মুশকিল। রাইসা ফিক করে হেসে ফেললো। সেলিমও হেসে ফেললো ওর হাসি দেখে। যারা তখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তারা খুব সুন্দর একটা দৃশ্য দেখলো। দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে একটা বিশাল কদম ফুলের তোড়া হাতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

সেলিম হাসতে হাসতে বললো, “জানো রাইসা, আমার খুব শখ – কোনো এক ঝুম বৃষ্টির দিনে আমার ভালোবাসার মানুষটার হাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় ভিজব। তুমি কি আমার সেই স্বপ্নটা সত্যি করবে, চাইলে সাথে এই কদম ফুলগুলোও রাখতে পারো?”

সেলিমের প্রপোজালটা হয়তো সিনেমার মতো সাজানো কোনো ডায়লগ ছিল না, বরং খুব সাদামাটা। তবে, সেটাই রাইসার হৃদয়ে দাগ কাটার মতো ছিল। রাইসা ‘না’ করতে পারেনি। পরদিন সত্যিই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। দু’জনে একসাথে সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজেছিল। ইট-পাথরের এই শহরের রাস্তায় তখন ট্রাফিকের সাথে মানুষও পানিবন্দি। দু”জনে তখনও ফুটপাথে বসা। সেলিম রাইসার হাত ধরে খুব আস্তে করে বললো, “আমার বউ হবে?”

রাইসা থমকে গিয়েছিল। সম্ভবত চোখে পানিও চলে এসেছিলো, কিন্তু সেটা হয়তো বৃষ্টির জন্যে বোঝা যায় নি। সে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

সেদিন দু’জনেই একবুক আনন্দ নিয়ে ফিরেছিল। রাইসা ঠিক করল, পরদিন সকালে সে তার সবচেয়ে প্রিয় নীল শাড়িটা পরে সেলিমকে সারপ্রাইজ দিতে যাবে।

পরদিন সকাল আটটা। সেলিমের ঘুম তখনো ভাঙেনি। বালিশের পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠলো। রাইসার নম্বর। ঘুমজড়ানো গলায় ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক অপরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

— “ভাই, এই ফোনের মালিক নিউ মার্কেটের মোড়ে রোড এক্সিডেন্ট করেছেন। অবস্থা খুব খারাপ। আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি।”

সেলিমের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। ওপাশের কথাগুলো তার মাথায় ঢুকছিল না। আজকে  সে তার মাকে রাইসার কথা জানাতে চেয়েছিল।

সেলিম পাগলের মতো ছুটল হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। যেই মানুষটা কয়েক ঘণ্টা আগেও শাড়ি পরে তাকে চমকে দেওয়ার কথা ভাবছিল, সে এখন সাদা কাপড়ে মোড়া। সেলিম হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে হাটতে হাটতে বের হয়ে এল, কোথায় যাবে, জানে না। এটা কি স্বপ্ন? নিশ্চয়ই স্বপ্ন। এখনই ঘুম ভাঙবে তার।

পরদিন রাইসার এক বন্ধু সেলিমকে ফোন করে জানাজায় যাওয়ার কথা বলল। সেলিমের মনে নেই সে কী উত্তর দিয়েছিল। সে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাইসা নেই, এটা কিভাবে সম্ভব, ওর মাথায় আসছিল না। মাটির নিচে রাইসাকে রেখে আসার সময় মনে হচ্ছিল, তার নিজের সত্তাটাকেও সে ওখানেই দাফন করে দিয়ে এসেছে।

এরপর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। জীবন থেমে থাকেনি। সেলিম আবার চাকরিতে জয়েন করেছে, চাকরি বদলেছে, প্রমোশন হয়েছে। ওর মা বহুবার বিয়ের কথা বলেছেন, কিন্তু সেলিম প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। “বউ” ডাকটা সে রাইসাকে দিয়ে ফেলেছিল, এই ডাকে অন্য কাউকে ডাকার সাধ্য তার নেই।

সেলিম বাস্তবে ফিরে এলো। ট্রেনের শব্দ আর সবুজের গান মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে সবুজকে থ্যাংকস দিল। বলল, “গানটা খুবই সুন্দর। অনেক আগের একজনকে মনে করিয়ে দিলে।”

সবুজ হাসলো। তারপর ওরা অন্য গান ধরল। ওদের গান শুনতে শুনতে আর ট্রেনের একঘেয়ে দুলুনিতে সেলিম ঘুমিয়ে গেল একটু পরে।

হঠাৎ ঘুম ভাঙল সেলিমের। চারপাশটা কেমন যেন নিস্তব্ধ। ট্রেনের সেই পরিচিত চাকার শব্দ নেই। বাইরে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বগির ভেতরের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, তাতে অন্ধকার কাটছে না খুব একটা। সেলিম খেয়াল করল, ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। সামনের সিটে সবুজ বা তার বন্ধুরা কেউ নেই। সবাই হয়তো নেমে গেছে। সেলিম উঠে দাঁড়াল। গেটের সামনে একজন স্টাফ জানাল, সিগন্যালে আটকা পড়েছে ট্রেন। চট্টগ্রামের এক্সপ্রেস ট্রেনটা ক্রস করার পর আবার ছাড়বে। সময় লাগবে।

ওদের ট্রেনটা দাড়িয়েছে একটা ছোট্ট স্টেশনে, নাম ‘জামতলী’। সেলিম ট্রেন থেকে নামল। প্লাটফর্মে তেমন কেউ নেই বললেই চলে। সে হাঁটতে শুরু করল। আজ কেন জানি রাইসার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। হাঁটতে হাঁটতে সে যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল একটু। হঠাৎ এক তীব্র বিদ্যুৎ চমকে তার সেই ঘোর কাটল। আকাশের দিকে তাকাতেই দেখলো, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সাথে মেঘ ডাকাও শুরু হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সেলিম দৌড়ে স্টেশনের একটা টিনের চালার নিচে গিয়ে দাড়ালো।

বৃষ্টির এই শব্দ, মাটির সোঁদা গন্ধ, সব কিছু আজ বড্ড বেশি রাইসাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাইসার সেই চোখ দুটো, কী মায়া ছিল তাতে! সেলিম অপলক তাকিয়ে থাকত। রাইসা তখন লজ্জা পেয়ে হেসে বলত, “কী দেখো?”

সেলিম উত্তর দিতে পারত না। কী এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল সেই চোখে! আর তার গায়ের সেই ঘ্রাণ… আজও যেন সেলিম সেই ঘ্রাণ পাচ্ছে। বৃষ্টির ঝাপটায় রাইসার স্মৃতিগুলো আজ বড় বেশি জীবন্ত হয়ে উঠছে।

হঠাৎ খেয়াল করলো, ট্রেনটা ধীরগতিতে চলতে শুরু করেছে। হুইসেল দেয়নি, কিন্তু নিঃশব্দেই চাকাগুলো গড়াতে শুরু করেছে। সেলিম বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে ট্রেনের দিকে পা বাড়াল।

ঠিক তখনই, ট্রেনের একটি বগির দরজায় চোখ পড়তেই সেলিমের শরীরটা অবশ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

রাইসা!

ঠিক সেই নীল শাড়িটা পড়ে রাইসা আবছা আলো ছায়ায় ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই চিরচেনা ভুবন ভোলানো হাসি। সেলিম নড়তে পারল না। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার শরীরে বিধছে, সে কি স্বপ্ন দেখছে?

রাইসা চিৎকার করে উঠল, “সেলিম! তাড়াতাড়ি আসো! দাঁড়িয়ে আছো কেন? ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে তো! ভিজে যাবে, জ্বর আসবে তো! তাড়াতাড়ি আসো সেলিম, তাড়াতাড়ি…”

সেলিম নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এটা কি সত্যি? নাকি মনের ভুল? কিন্তু, রাইসার ওই চোখ, ওই হাসি, ওই কণ্ঠস্বর, ওই আকুতি – কিভাবে ভুল হতে পারে!

রাইসা আবার ডাকল, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সেলিম, জলদি এসো! ট্রেন স্পিড বাড়াচ্ছে! দৌড় দাও, সেলিম। না হলে মিস হয়ে যাবে…”

সেলিম আর কিছু ভাবল না। যুক্তি, বুদ্ধি, বাস্তবতা – সব যেন তুচ্ছ হয়ে গেল সেই মুহূর্তের কাছে। সে দৌড় শুরু করল। বৃষ্টির পিচ্ছিল প্লাটফর্ম দিয়ে সে পাগলের মতো ছুটছে। ট্রেন গতি বাড়াচ্ছে। রাইসা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। সেলিম প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। তাকে ট্রেন ধরতেই হবে। রাইসার হাতটা ধরতেই হবে।

বাতাস চিরে সেলিম চিৎকার করে বলল, “আমি আসছি, রাইসা! আমি আসছি! আমাকে ফেলে যেও না!”

প্লাটফর্ম শেষ হয়ে আসছে। ট্রেনের গতি বাড়ছে। সেলিম তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছে রাইসার বাড়ানো হাতটা ধরার জন্যে। এবার সে আর কিছুতেই রাইসাকে হারাতে দেবে না, কিছুতেই না…

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

কালভার্ট

রুস্তম অন্ধকারে কাদার মধ্যে পড়ে গেল। একবারে হাঁটু পর্যন্ত কাদার মধ্যে দেবে গেছে। একরাশ বিরক্তিতে গালি দিয়ে উঠলো। নতুন প্যান্টটা একবারে শেষ। গতমাসেই সাধুগঞ্জ বাজারের সৈয়দ মেম্বারের দোকান থেকে কাপড় কিনে দবির দর্জির দোকান থেকে বানিয়েছে। শার্টটাও নতুন, একসাথেই বানানো। দবির দর্জি ওর ছোটবেলার বন্ধু বলে শার্ট বানানোর টাকাটা আর দেয়া লাগে নাই, আর কাপড়টাও ওর দোকান থেকেই নিয়েছিল। ফ্যাচফ্যাচানি বৃষ্টি দেখেও নতুন কাপড় পরে বের হয়েছে। সেটাই মনে হচ্ছে, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে, একটু ভালো জামাকাপড় পরে না গেলে হয় না।

এখনও বছর পার হয় নাই, রুস্তমের বিয়ে হয়েছে মোমেনার সাথে। রুস্তমের গ্রাম, ভাসানগাঁ থেকে এক গ্রাম পরে, চড়ুইকোল গ্রামের মেয়ে মোমেনা। ওর সাথে রুস্তমের পরিচয়ও একরকম ঝড়বৃষ্টির সূত্রে। গত বছরের শুরুর দিকের কথা, রুস্তম গিয়েছিল চড়ুইকোল বিলে মাছ ধরতে। বর্ষাকালে বিলের চারপাশ পানিতে ভেসে গিয়ে বিলটা এক বিশাল আকার ধারণ করে। এর মাঝে বাতাস উঠলে বিলের পানিতে নদীর মত বড় বড় ঢেউ ওঠে। প্রতিবছরই এক-দুইটা ঝড় হয় বর্ষাকালে আর দুকূল ছাপানো বিলের বড় ঢেউয়ে ছোট নৌকা সামলাতে না পেরে উল্টে যায়। বছর দুই আগে পাশের গ্রামের কছর মোল্লার ছেলে বিল্লাল এই বিলেই ডিঙি নৌকায় মাছ ধরতে এসে রাতের ঝড়ে নৌকা উল্টে মারা গিয়েছিল। একদিন পর বিল্লালের লাশ ভেসে উঠেছিল, পুরো শরীর ফোলা, আর চোখ যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসছে। রুস্তমেরও শখ আছে বিলে মাছ ধরার, ঐদিন রাতেও গিয়েছিল। ভোররাতে উঠলো তুফান, তখন রুস্তম একেবারে বিলের মাঝে। বাতাস শুরু হচ্ছে দেখে ও বৈঠা মারা শুরু করলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, কূলে যাওয়া দরকার। কিছুক্ষণের মাঝে বাতাস বেড়ে গেল অনেক, দুই-মানুষ সমান উঁচু ঢেউ ওঠা শুরু হল। রুস্তম নৌকা সামলানোর চেষ্টা করতেই করতেই সামনে মনে হল, এক আকাশসমান ঢেউ, মুহূর্তের মাঝে নৌকা উল্টে গেল। রুস্তম জান হাতে নিয়ে সাঁতরানো শুরু করলো, কিন্তু কূল আর পায় না। একবার মনে হচ্ছে কাছে, আরেকবার স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে উল্টো দিকে। এদিকে শরীরও আস্তে আস্তে ছেড়ে দিচ্ছে। একটু পরে ঝড়ের বেগ একটু কমে এলে স্রোতের বেগও একটু কমলো। রুস্তম অনেক কষ্টে কূলে পৌঁছে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।

অন্যদিকে মোমেনার ভাই, কাদেরের দোকান আছে সাধুগঞ্জ বাজারে। মাঝরাতে দোকান বন্ধ করে ফেরার সময় ঝড়ে আটকে গিয়েছিল সে। সাথে তার দোকানের কর্মচারী, সোবহানও ছিল। ঝড় কমে যাওয়ার পরে বাড়িতে ফেরার সময় রুস্তমকে চোখে পড়ে ওদের, বিলের ধারে পড়ে আছে, জান আছে কি নেই, বোঝা মুশকিল। কাদের কাছে গিয়ে দেখলো, বেঁচে আছে। সোবহান চিনতেও পারে রুস্তমকে, ভাসানগাঁর ছেলে। দুইজন মিলে কোনমতে ঘাড়ে করে কাদেরের বাড়িতে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে রুস্তমের জ্ঞান ফেরে। তখন সোবহান গেছে ভাসানগাঁতে রুস্তমের বাড়িতে জানাতে আর কাদের চলে গেছে দোকানে। ঐদিনই প্রথম মোমেনার সাথে রুস্তমের দেখা হয়। তার মাসখানেক পরে সাধুগঞ্জ বাজারে দ্বিতীয় দেখা। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে ভালো লাগা শুরু আর ছয় মাসের মাথায় দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে।

আজকে রুস্তম যাচ্ছে শ্বশুরবাড়িতে, মোমেনাকে আনতে। গত সপ্তাহে মোমেনার বোন-দুলাভাই আসছে বাড়িতে, তাই মোমেনা বাপের বাড়ি গেছে ঘুরতে। বেশ কিছুদিন পর বোন আর বোনের ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা হয়েছে ওর। আর এই শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে এখন রুস্তম কাদাভর্তি পা নিয়ে ভাবছে, এতদূর এসে কাদামাখা অবস্থায় কি করবে? ফিরে যাওয়াও মুশকিল, আবার এ অবস্থায় মেহমান হয়ে যাওয়াও কঠিন। দোষ যদিও রুস্তমেরও আছে। ওর মা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে অনেকবার করে বলেছিল, ছাতা আর টর্চলাইট নিয়ে যেতে। রুস্তম একগুয়েমো করে নিয়ে আসে নাই। মায়ের কথা মাথায় থাকতে থাকতেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেল। আর এখন মাঝপথে এসে এক পা হাঁটুসমান কাদার মধ্যে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাত নিশুতি না হলেও একেবারে কমও হয় নাই। আসলে ওর যাওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যাবেলায়। ভেবেছিল, ঘোষবাড়ি থেকে মিষ্টি নিয়ে যাবে, কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়েই দোস্ত রমিজের সাথে দেখা। আর রমিজের সাথে দেখা হওয়া মানেই হল, এক দান তাস না খেলে যাওয়া যাবে না। এভাবে একদান একদান করতে করতে শেষে ৮টা গেম শেষ করে তারপর ওঠা। এজন্যেই আসলে আসতে আসতে রুস্তমের একটু দেরি হয়ে গেছে, আবার মানিক ঘোষও তার মিষ্টির দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছে। শুকনার সময় হলে ভ্যান নিয়ে সাধুগঞ্জ বাজারে গিয়ে মিষ্টি নিয়ে চড়ুইকোল চলে যেতে পারতো। এই ভরা বর্ষায় কাদার মধ্যে ভ্যান তো দূরে থাকুক, মোষের গাড়ি ছাড়া আর কিছু চলার উপায় নেই। সাইকেল থাকলেও চালানো দায়। গতবছর চেয়ারম্যান ভোটে এ ভাসানগার লুৎফর মেম্বার হয়েছে আর সবাইকে কথা দিয়েছে যে, এই বর্ষা শেষ হলে রাস্তায় ইট দেয়ার কাজ শুরু করবে। রুস্তম সম্পর্কে লুৎফরের চাচাতো ভাই আর ভোটের সময় জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছে। ওর বিশ্বাস, লুৎফর তার কথা রাখবে আর রাস্তাও এই বর্ষার পর উন্নতি হবে।

তাই, অগত্যা এই বৃষ্টির মধ্যেই রুস্তম রওনা দিয়েছে খালি হাতেই। ভেবে রেখেছে, কাল কাদের ভাইয়ের সাথে বাজারে গিয়ে সবার জন্যে মিষ্টি আর খাবারদাবার কিনে আনবে কিছু। কাদা পায়ে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শেষে সিদ্ধান্ত নিল যে, চড়ুইকোলেই যাবে এখন। যদিও খালি হাতে যাচ্ছে, তবুও জামাই বলে কথা, আপ্যায়ন তো পাবেই, আর কাল বাজার থেকে মিষ্টির ব্যবস্থা করবে। আর মোমেনাকেও সপ্তাহখানেক কাছে পায় না। সব মিলিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার থেকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়াটাই রুস্তমের কাছে সবদিক দিয়ে ভালো মনে হচ্ছে। সব ঝামেলার জন্যে হারামী রমিজটাই দায়ী। মনে মনে রমিজকে গালি দিতে দিতে কাদা পায়ে রুস্তম আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলো।

চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে তিনমাথার বটতলায় রুবেল মাওলার দোকানের হারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছে। একটু সামনে ক্যানালের উপর কালভার্ট; মুরুব্বিদের কাছে শুনেছে, বিলের পানি কমে গেলেও যেন জমিতে পানি দেয়া যায়, সে জন্যে জিয়ার আমলে নাকি এই ক্যানালগুলো কাটা হয়েছিল। এ জন্যে কালভার্টটা রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা উঁচু। অসুবিধা হল, উঁচু ঢালটুকুও মাটির, যার কারণে বর্ষাকালে কাদায় আটকে ভ্যান প্রায়ই উল্টে যায়। রুস্তমের শরীর ইতিমধ্যেই কাদায় ভরা, নতুন করে আর কতটুকুই বা কাদা লাগবে। রুস্তম কাদার পরোয়া না করে সোজা কালভার্টে উঠে গেল।

রুস্তম রাস্তা নিয়ে মনে মনে গালি দিতে দিতে কালভার্টের উপর হাঁটতে লাগলো। মোমেনাকে এক সপ্তাহ না দেখে মনে হচ্ছে, কতদিন পর আজকে তার সাথে দেখা হবে। সারা গা কাদায় ভরা থাকলেও অজান্তেই রুস্তমের মুখে একটু হাসি পেয়ে গেল। মোমেনা বিয়ের পরে বাপের বাড়ি তেমন একটা আসে নাই, আর যদিওবা আসছে, সেটাও রুস্তমের সাথে। আজকে ওর জন্যে কিছু না নিয়ে যেতে পেরে খারাপ লাগছে। রুস্তম বাজারে গিয়েছে, কিন্তু মোমেনার জন্যে কিছু কিনে নাই, এমন গত এক বছরে হয় নাই। হারামী রমিজের জন্যে আজকে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। বিয়ের আগে রুস্তমের বিড়ি খাওয়ার অভ্যাস ছিল। মোমেনার কথাতে সেটা এখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছে, কিন্তু এই তাস-জুয়ার নেশাটা পুরো ছাড়তে পারে নাই। চেষ্টা করতেছে এখনো, জুয়ার আসরে এখন বসে না বললেই চলে, তারপরও রমিজ ডাকলে অনেকসময়ই না করতে পারে না। তবে, শার্টের ভেতরের বুকপকেটে এখনও বিড়ি আর ম্যাচ থাকে ওর। মাঝে মাঝে বের করে আগুন জ্বালায় না, শুধু গন্ধ নেয়।

এসব ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে রুস্তম। হঠাৎ করে মনে হল, কোন একটা ঝামেলা হয়েছে কোথাও, চারিদিকে তাকালো, অন্ধকারে তেমন কিছু চোখে পড়লো না। আবার সামনের দিকে পা বাড়ালো। একটু পরে বুঝলো, ঝামেলাটা কি! ও অনেকক্ষণ ধরে আনমনে হাঁটছে, কিন্তু ওর মনে হচ্ছিলো, পায়ে রাস্তার কাদা তেমন বাধছে না, এখন বুঝতে পারলো, কেন?

সে এতক্ষণ ধরে কালভার্টের উপরেই হাঁটছে, কিন্তু কালভার্ট পার হতে পারেনি।

রুস্তম ঠিক বুঝতে পারলো না, কি কারণে এমন হচ্ছে। এমনিতে গ্রামের জোয়ান, সাহসী ছেলে হিসেবে পরিচিত সে। একা একা রাত বিরেতে মাঝ বিলে মাছ ধরে বেড়ায়, কোনদিন কিছূ হয় নি। আর কিছু না ভেবে সে জোরে হাঁটা শুরু করলো। কালভার্টটা বড়জোর ৩০ সেকেন্ডের রাস্তা হবে, মিনিটখানেক হাঁটার পরে রুস্তমের চারপাশে তাকালো, বুঝলো আগের জায়গাতেই আছে। এবার একটু ভয় পেল, বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে।

রুস্তম দৌড় শুরু করলো কালভার্টের উপরে। পার হওয়ার জন্যে দৌড়াচ্ছে, নাকি ভয় পেয়ে দৌড়াচ্ছে—সে জানে না। হয়তো দু’টোই। কালভার্টের উপর কাদা কম হলেও ভালোই আছে, দৌড়ানো যায় না। কিন্তু, রুস্তমের মাথায় এখন ভয় ঢুকে গেছে। এখন আর ভাবার সময় নেই যে, কাদার উপর দৌড়ালে আছাড় খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। একটু পরে হলোও তাই। কাদার উপর পিছলে ধপাস করে পড়ে গেল। পায়ে আর কোমরে বেশ টান লেগেছে মনে হচ্ছে, কাদার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে হাপাতে লাগলো রুস্তম। মাথায় চিন্তা এলো, মনে হয় ও স্বপ্ন দেখছে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ পড়ে রইলো, যেন চোখ খুলে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।

রুস্তম একটু পরে চোখ খুলে দেখলো, কালভার্টের আগের জায়গাতেই পড়ে আছে, সারা গায়ে কাদা। উঠে বসলো, কি করবে, কি করা উচিত, বুঝতে পারলো না। হঠাৎ মনে পড়লো, দূরে রুবেল মাওলার দোকানের আলো দেখা যাচ্ছিল। তাকিয়ে দেখলো, এখনো দূরে টিপটিপ করে আলো জ্বলছে। রুস্তম গলা ছেড়ে ডাক দিলো—

—রুবেল ভাই…

ডাকটা যেন চারদিক থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরলো। কিন্তু রুবেলের কোন জবাব পেল না রুস্তম। আবার হাঁক ছেড়ে ডাক দিলো—

—রুবেল ভাই… আমি ভাসানগাঁর রুস্তম।

এবার কেন যেন মনে হল, দূরের আলোটা নড়ে উঠলো। রুস্তম একটু আশার আলো দেখতে পেল। উঠে দাঁড়ালো কালভার্টের উপর। আবার হাঁটা শুরু করলো, যদিও তখনও একচুলও আগাতে পারছে না। কেন যেন মনে হল, দূর থেকে আলোটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। সাথে মনে হচ্ছে, কেউ একজন যেন ওকে ডাকছেও। খুব আস্তে আস্তে মনে হচ্ছে শোনা যাচ্ছে।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

একটু পর পর দুইবার করে ডাক আসছে। একটু পরে রুস্তমের মনে হল, ডাকটা আরেকটু স্পষ্ট হল।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

একটু ভালোমত শুনতে পেয়ে রুস্তম এবার অবাক হয়ে গেল। গলাটা মোমেনার! কিন্তু, এত রাতে মোমেনা এই রাস্তায় কি করছে! তিনমাথার বটতলা থেকেও ওদের বাড়ি অন্তত আধাঘন্টার হাঁটা পথ, সাথে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আর পথে কাদা তো আছেই। আবার সেই ডাক—

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

মোমেনা আলোটা নিয়ে আরো একটু কাছে এসেছে। রুস্তম এখন অন্ধকারের মাঝেও একটা সাদা কাপড়ের ছায়ার মত দেখতে পাচ্ছে। মোমেনা সামনে একটা সাদা আলো ধরে আছে, মনে হচ্ছে হ্যাজাক লাইট। রুস্তম আবারও চেষ্টা করলো জোরে হাঁটার, কিন্তু আগের মতই একটুও সামনে আগাতে পারলো না, কালভার্টের উপরেই আটকে রইলো। ওর জোরে হাঁটার চেষ্টাটা যেন মোমেনা দূর থেকে বুঝতে পারলো, কিভাবে বুঝলো, কে জানে।

মোমেনা ততক্ষণে বেশ কাছে চলে এসেছে। রুস্তম দেখলো, মোমেনা সাদা কাপড় পরা, কি জন্যে, বুঝতে পারলো না। যদিও মোমেনার মুখ দেখতে পারছে না, তবে রুস্তম তখনো চেষ্টা করছে এগিয়ে যাওয়ার। কালভার্টের মুখে এসে মোমেনা এবার ধমকের সুরে ডেকে উঠলো।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

—রুস্তম, দাঁড়াও। আমি আসছি।

এবারের ডাকে মোমেনার গলার স্বরে একটু অন্যরকম কিছু ছিল। রুস্তমের কেন যেন গলার স্বরটা স্বাভাবিক মনে হল না। মেয়েলি গলার সাথে কেমন যেন লোহার ঝনঝনে আওয়াজের মত গলা। মোমেনার কি হয়েছে যে, এমনভাবে কথা বলছে। আর হাতেও মনে হল হ্যাজাক লাইট না, কেমন যেন এক ধরনের সাদা আলো।

মোমেনা কালভার্টে উঠে রুস্তমের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে থাকলো। রুস্তম এবার মোমেনাকে দেখতে পেল আর একটু অবাকও হল। ও এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও আগাতে পারছে না, কালভার্টও পার হতে পারছে না। সেখানে মোমেনা কিভাবে হেঁটে হেঁটে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। আবার হাঁটার ধরনটাও অদ্ভুত। সারা শরীরে কোন নড়াচড়া নাই, যেন ভেসে ভেসে হাঁটছে। আর এতখানি কাদাপথ পার হয়ে এল, অথচ কাপড়ে কোথাও কাদার দাগ নাই। আবার বৃষ্টিতেও ভিজে নাই ও। আর এত সাদা আলো, কিন্তু কেন জানি, মোমেনার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে, ও কিছু বললো না। এ অবস্থা থেকে ও মুক্তি পেলেই বাঁচে। আর তার উপর মেয়েটা এতদূর হেঁটে এসেছে ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

রুস্তম বললো—মোমেনা, মাথায় ঘোমটা দিয়ে আছ কেন? আর তোমার মাথায় ছাতা কই? ভিজে যাইবা তো। আসো, এদিকে আসো। আমি কেমনে জানি, এইখানে আটকায়ে গেছি, আগাইতে পারতেছি না। হাতটা ধরো তো, দেখি আগাইতে পারি কিনা।

মোমেনা হাত বাড়িয়ে রুস্তমের হাত ধরলো।

রুস্তম বললো—ও আল্লাহ। তোমার হাত দেখি বরফের মতন ঠান্ডা। পুরাই তো ভিজে গেছ তাইলে। কিন্তু, তোমার হাতে দেখি জাদু আছে। এখন এই যে, আগাইতে পারতেছি আবার।

মোমেনা কিছু বললো না। রুস্তম সত্যি সত্যিই এখন হেঁটে আগাতে শুরু করেছে আবার। কিভাবে কি হল, সে বুঝতেছে না, তবে মোমেনাকে সাথে নিয়ে ও এখন আগাতে পারছে, এতেই সে খুশি। সারাগায়ে কাদা, না হলে মোমেনাকে এখানেই খুশিতে একটু বুকে জড়ায়ে ধরতো।

রুস্তম মোমেনার সাথে কয়েক পা এগিয়ে কেন যেন নিচের দিকে তাকালো। মোমেনার হাতের আলোতে চারপাশের কিছু জায়গাতে আলো হয়ে আছে। রুস্তম খেয়াল করলো, মোমেনার পা দেখা যাচ্ছে না। মুখও কেন জানি, উল্টো দিকে ঘুরায়ে রাখছে সে, কি জন্যে কে জানে। হঠাৎ মোমেনার হাতের দিকে চোখ পড়লো রুস্তমের, দেখে পিলে চমকে গেল। বড় কালো হাত, আঙুলের সংখ্যা পাঁচের বেশি বটেই, সাত-আটটা হবে। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে রুস্তমের হাত-পা জমে গেল। মোমেনারূপী জিনিসটা মনে হয় বুঝলো, রুস্তম দাঁড়িয়ে পড়েছে। কিছুটা মোমেনার মত মেয়েলি গলার চেষ্টা নিয়ে ঝনঝনে গলায় জিজ্ঞেস করলো—

—কি হলো? হাঁটছ না কেন?

রুস্তম ততক্ষণে বুঝে গেছে, সে বিপদে পড়েছে। আর সাথে যে আছে, সে তো মোমেনা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বলে উঠলো—

—কে তুমি? তুমি তো আমার মোমেনা না।

রুস্তমের এ কথা শুনে জিনিসটা মনে হল, ওর দিকে ঘুরে তাকানোর চেষ্টা করলো। রুস্তম দেখলো, জিনিসটা ঘাড় ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে ওর দিকে ঘুরে মাথা উঁচু করলো। না ঘোরালেই মনে হয়, ভালো ছিল। জিনিসটাকে দেখে রুস্তম চিৎকার করে হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো, পারলো না। চিৎকার করে দোয়া ইউনুস পড়ে আরেকবার চেষ্টা করলো, তবুও জিনিসটা ওকে ধরে রইলো।

—লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্জালিমিন

জিনিসটা দেখতে কেমন, রুস্তম সেটা বুঝতে পারছে না। শুধু একবার দেখেছে, জিনিসটা মোমেনার মত চেহারা ধরে রাখার জন্যে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না, মুখটা যেন নড়ছে। হাত ছাড়ানোর জন্যে চিৎকার করতে করতে রুস্তম কালভার্টের উপর পড়ে গেল। দেখলো, জিনিসটার সাত আঙুলের হাত ওর মুখের দিকে এগিয়ে আসছে।

এমন সময় দূর থেকে কারো গলায় “রুস্তম, রুস্তম” বলে ডাক শোনা গেল। রুস্তম গলা চিনলো, রুবেল মাওলার। জিনিসটা ততক্ষণে রুস্তমকে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে কালভার্টের সাথে। এক হাত মুখের উপর, আরেক হাত বুকের উপর। রুস্তম যেন জীবনের শেষ শ্বাস নিয়ে একবার চিৎকার করলো—“রুবেল ভাই, বাঁচাও”। রুস্তমের মনে হল, কালভার্টের মেঝে যেন ফাঁক হয়ে ওকে কবরের মাঝে টেনে নিচ্ছে। বুকের বাতাস শেষ হয়ে আসছে। আরেকবার শ্বাস নেয়ার চেষ্টায় পুরো শরীর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। বাতাস আর পাচ্ছে না। একটুখানি বাতাসের জন্যে হাহাকার।

রুবেল মাওলা দূর থেকে টর্চের আলোতে দেখলো, কালভার্টের উপর একটা সাদা কিছু একজন মানুষের উপর বসে আছে। বেশ কিছুক্ষণ আগে সে রুস্তমের গলা শুনেছে। পাশে গ্রামের ছেলে, এত রাতে কি করছে, কে জানে। একটু আগে একটা গগনবিদারী চিৎকার শুনে একটা বিড়ি জ্বালিয়ে হাতে চার-ব্যাটারির টর্চ নিয়ে বের হইছে। কাছাকাছি গিয়ে বুঝলো, কেস খারাপ। এর আগেও কালভার্টের উপর এমন হইছে, রাতে মানুষের চিৎকার শোনা গেছে, আর সকালে ক্ষতবিক্ষত লাশ। আর সাদা জিনিসটা আর যাই হোক, মানুষ না। তখনই রুস্তম যেন শেষ ডাক দিলো, “রুবেল ভাই, বাঁচাও”। রুবেল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে কাদার মধ্যে দৌড় দিলো, হাতে টর্চ, আর ঠোঁটে বিড়ি। কালভার্টে উঠে কোনমতে জিনিসটাকে টর্চ দিয়ে উল্টো দিকে বাড়ি মারলো। জিনিসটা ছিটকে পাশে পড়লো, কেমন যেন গর্জে উঠলো। রুবেল কি মনে করে ঠোঁটের বিড়িটাতে শেষ টান দিয়ে জিনিসটার দিকে ছুড়ে মারলো। এতে কিছু একটা হল। জিনিসটা যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলো। আর কিছুক্ষণের মাঝে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

কালভার্টের চারিদিকে এখন সুনশান নীরবতা। কে বলবে, একটু আগে এখানে নরক নেমে এসেছিল। রুবেল তাড়াতাড়ি রুস্তমের কাছে গেল, নাকে হাত দিয়ে দেখলো, নিশ্বাস নিচ্ছে। সে নিজে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। একটু পরে রুস্তমের জ্ঞান ফিরে এলে রুবেলের কাছে খুলে বললো সব। এই নিয়ে দুইবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলো সে। জানে না, তৃতীয়বার এমন হবে কিনা।

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।