শ্যাওলা

ক’দিন ধরে বৃষ্টি যেন আর শেষ হয় না। শ্রাবণ মাস বলে কথা, আকাশটা মনে হয় ফুটো হয়ে গেছে। দিন নাই রাত নাই, বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই।

চড়ুইকোল গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে কুমার নদ। পাশ দিয়ে বের হয়ে গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে ছোট একটা বিল। তবে বিলটা আসলে ছোট থাকে শুকনোর সময়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মাঠের মাঝ দিয়ে কালো রঙের লম্বা একটা লাইন চলে গেছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, ওটা আসলে চড়ুইবিল। বর্ষাকালে বিলের চেহারা পুরোপুরি পালটে যায়। বৃষ্টির পানি দু’কূল ছাপিয়ে এক হাওরের মতো হয়ে যায়। তখন শুরু হয় গ্রামের মানুষজনের মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। বড় বড় রুই, কাতল, বোয়াল ধরা পড়ে খ্যাপা জালে। অনেকে আবার সারারাত জেগে বড়শি দিয়েও মাছ ধরে।

গল্পটা মুবারককে নিয়ে, বয়স ২৪–২৫ হবে। তার বাবা জন্মের পর “মুবারক” নাম রাখলেও মানুষজন তাকে মুবারেক নামেই ডাকে। চড়ুইকোলের পশ্চিমপাড়ায় বাড়ি ওর। পূবপাড়ায় স্কুল থাকলেও ক্লাস ফাইভের পরে মুবারেক আর স্কুলে যায়নি – ভাল লাগে না, তাই। বাপের ফসলি জমিতে কাজ করে। আর সাথে সারাদিন ধরে বিড়ি টানে, নেশাখোরের মতো। তবে বর্ষা এলে সাথে আরেক নেশা যোগ হয় – সারারাত বিলে মাছ ধরা, তাও আবার বড়শি দিয়ে। ভোররাত পর্যন্ত বিলের পাড়ে বসে মাছ ধরে, আর মাঝে মাঝে মালেক মাঝির নৌকা পেলে তো কথাই নেই, সেদিন নৌকা নিয়ে বিলের মাঝে যায় মাছ ধরতে।

শুক্রবার রাতের কথা। মুবারেক রাতে খাওয়া–দাওয়া করে চার ব্যাটারির টর্চ, ছাতা আর বড়শি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্যে। বিল গ্রামের পূর্বদিকে, ওর বাড়ি থেকে ১০–১৫ মিনিটের হাঁটা পথ। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে; মুবারেকের এক হাতে ছাতা, আরেক হাতে টর্চ জ্বালাচ্ছে, বগলে বড়শি। মাটির রাস্তা, গত কদিনের বৃষ্টিতে নিচু জায়গাগুলোতে হাবড়া (প্যাঁক-কাদা) হয়ে গেছে; জোর পায়ে হাঁটা যাচ্ছে না। ১০ মিনিটের পথ হেঁটে যেতে আধা ঘণ্টা লেগে যাবে মনে হচ্ছে। ওর ভয় হল, মালেক মাঝি আবার তার নৌকা বিলের ওইপাড়ে চড়পাড়া ঘাটে বেঁধে চলে যায় কিনা! যদিও মুবারেক সকালে মালেক মাঝিকে বলে এসেছিল যে, আজকে মাঝির নৌকা নিয়ে যাবে মাছ ধরতে। মালেক মাঝির বাড়ি ওদের বাড়ির পাশেই, পশ্চিমপাড়ায়; আর বিয়ে করেছে পাশের চড়পাড়া গ্রামে, বিলের ওইপাড়ে। কয়দিন আগে মালেক মাঝির বউ বাপের বাড়িতে গেছে, তাই মাঝি মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতেও আসে, আবার শ্বশুরবাড়িতেও যায়।

মুবারেক বিলের কাছাকাছি পৌঁছে নৌকাঘাটের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই নৌকা দেখতে পেল। মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল। কিন্তু আশেপাশে মালেক মাঝি চোখে পড়ল না। মুবারেক কিছুক্ষণ ভাবল, কী করবে? মালেক মাঝির জন্যে কিছু সময় অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু মনে হয়, সে বাড়ি চলে গেছে, আর এই বৃষ্টিতে এদিকে আবার আসার সম্ভাবনা কমই। তবে, মালেক ভাই যদি বাড়িতে গিয়ে থাকে, তাহলে আসার পথে মুবারেকের সাথে দেখা হল না কেন? যাই হোক, মুবারেক মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলল, নৌকায় উঠবে বলে। নৌকাঘাটের চারপাশে আরেকবার টর্চ মারল – দেখে নিল সব ঠিক আছে কিনা। টর্চ বন্ধ করতে হবে এখন, তা না হলে অন্ধকারে চোখ সইবে না। সারারাত তো আর টর্চ জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব না।

টর্চটা বন্ধ করতেই মুবারেকের মনে হল, ওর একটু দূরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। মুবারেক একটা বিড়ি বের করে আগুন ধরানোর জন্যে মাথা নিচু করে ম্যাচ বের করল। আগুন ধরিয়ে মাথা তুলে বলল – কিডা, মালেক ভাই নাকি?

কিন্তু তাকিয়ে কাউকে চোখে পড়ল না। আরেকবার চারপাশে তাকাল, কাউকে দেখা গেল না। ততক্ষণে অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। চোখের ভুল ভেবে মুবারেক আর এসব নিয়ে গুরুত্ব দিল না। ততক্ষণে বৃষ্টিও থেমে গেছে।

সব মিলিয়ে মুবারেকের আজকের রাতটাকে বেশ ভালো মনে হচ্ছে। সবকিছুই নিজের সুবিধামতো পাচ্ছে। নৌকা পাবে কিনা, বুঝতে পারছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেয়েছে। আবার সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল, এখন আল্লাহর মেহেরবানিতে থেমে গেছে। আসার সময় ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে এসেছে। মুবারেকের মনে ভয় ছিল, ছাতা মাথায় দিয়েই হয়তো আজকে মাছ ধরতে যাওয়া লাগবে। নৌকার ওপর ছাতা মাথায় বড়শি হাতে বসে থাকতে সমস্যা হয়; বড়শি টান দেওয়ার সময় হাতে জোর পাওয়া যায় না। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় আর সেই ভয়টাও চলে গেছে।

মুবারেক আর দেরি না করে জিনিসপত্র নিয়ে নৌকায় উঠে পড়ল। আজকে মাছ ধরার জন্যে লাল পিঁপড়ার ডিম এনেছে। সাথে কেঁচোও আছে। সেদিন পূবপাড়ার সুবল নাকি ৬-৭ কেজি ওজনের এক কাতল পেয়েছে। আজকে রাতের বেলা ওরকম বড় কিছু পেলে মন্দ হয় না। আর নৌকা নিয়ে মাছ মারার সুবিধা হল, বিলের মাঝে চলে যাওয়া যায়, আরও একটু গভীর পানির মাছ ধরার চেষ্টা করা যায়। নৌকার মাঝে জিনিসপত্র সব রেখে এসে লগিটা ধরল। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে লগিতে ঠেলা দিয়ে নৌকা কোমরপানিতে নিয়ে লগি রেখে বৈঠা নিয়ে বসল। আস্তে আস্তে বৈঠা বাইতে বাইতে নৌকা এগোচ্ছে। আজকে মুবারেক ঠিক করেছে, বিলের মাঝ বরাবর গিয়ে মাছ ধরবে। আর আজ বিলের মাঝে আর কাউকে চোখেও পড়ছে না। সবাই হয়তো বৃষ্টির জন্যে বের হয়নি আজ রাতে।

বিলের মাঝবরাবর এসে মুবারেক নৌকা থামাল, বৈঠা তুলে পাটাতনের ওপর রেখে নৌকার মাঝে গিয়ে বসল। হারিকেন জ্বালিয়ে পাশে রেখে বড়শিতে টোপ লাগানোর কাজ শুরু করল। হালকা বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা বাতাস বইছে আর আকাশে মেঘের ফাঁক থেকে চাঁদ থেমে থেমে উঁকি দিচ্ছে। সবকিছু ভালো যাচ্ছে; মুবারেক গুনগুন করে গান গাওয়া শুরু করল –

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়?
ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম
পাখির পায়।

মালেক মাঝির সাথে মাছ ধরতে গিয়ে তার গলায় গানটা শুনেছে বেশ কয়েকবার। এত ভাবের অর্থ না বুঝলেও গানটা মুবারেকের বেশ পছন্দের। মনবেড়ি সে নিজেও এক পাখির পায়ে বাঁধতে চায়। মালেক মাঝির শালী, ঝুমুরকে তার বেশ পছন্দ। মালেকের বউ, সুরমা ভাবির সাথে ভাব জমিয়েছে এই কারণে। ভাবি বাপের বাড়ি থাকলে তার হাতে চা খাওয়ার নাম করে মুবারেক ঝুমুরকে দেখতে যায়। তবে ঝুমুরকে কিছু বলতে পারেনি এখনো – নিজে খায় বাপের হোটেলে, তার ওপর কাজকর্ম তেমন কিছু করে না। যদিও মুবারেকের মা ইতিমধ্যে ছেলের জন্যে পাত্রী দেখা শুরু করেছে।

এসব ভেবে, গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে মুবারেক বেশ কয়েকবার বড়শির টোপ ফেলেছে। একটু পর পর বিড়ি ধরাচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মাঝে বেশ কিছু মাছ পেয়ে গেল – বেশ কয়েকটা নউছি, টাকি, আর একটা কেজিখানেক সাইজের রুই। আনন্দে মুবারেকের মন তখন আরও ভালো। নাহ, আজকের দিনটা আসলেই ভালো। আরেকটা নউছি মাছ বড়শি থেকে ছাড়িয়ে মাছের ঝুড়িতে রেখে আবার টোপ দিয়ে বসল। ওর মন বলছে, আজকে সে আরও বড় কিছু একটা পাবে। একটু পরে আরেকটা নউছি বাঁধল বড়শিতে। ওটা ঝুড়িতে রেখে কী মনে করে একটু টর্চ মারল ঝুড়ির ভেতরে।

চমকে উঠল। মাত্র একটা নউছি আর দুটো টাকি পড়ে আছে ঝুড়িতে; আর কিছু নেই। আনন্দের ভাবটা মুহূর্তে কেটে গেল। নৌকার পাটাতনে দাঁড়িয়ে চারপাশে টর্চ মারল। কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। অনেক দূরে আরেকটা নৌকা দেখা যাচ্ছে, মনে হয় ওর মতো মাছ ধরছে। কিন্তু ও তাহলে এত মাছ মারল, সেই মাছ গেল কোথায়? আশপাশে তো কাউকে দেখা যায় না। চিৎকার করে উঠল – এই, কোন হারামির বাচ্চা রে, আমার মাছ চুরি করছিস? কই লুকায়ে আছিস? বের হ। বের হ কইলাম! – এই বলে বৈঠা দিয়ে আশপাশের পানিতে বাড়ি মারতে লাগল। পানিতে একটু ঢেউ উঠে নৌকা নড়ে উঠল, আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মুবারেক নৌকায় বসে আরেকটা বিড়ি ধরাল, মাথা ঠান্ডা করা দরকার।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে মুবারেক হাতেনাতে চোর ধরার জন্যে একটা বুদ্ধি বের করল। মাছের ঝুড়িটা নিয়ে ওর পাশে রেখে আবার বড়শি নিয়ে বসল।

বেশ কিছুক্ষণ বসে আছে, এবার আর কোনো মাছই টোপ গিলছে না। বৈঠার বাড়ির শব্দে হয়তো সব মাছ একটু দূরে চলে গেছে। অনেকক্ষণ বসে থেকে একটু ঝিমুনিও চলে এসেছে। এই সময় হাতে ধরা বড়শিটা একটু নড়ে উঠল – মাছ ঠোকর দিয়েছে। মুবারেকের ঝিমুনি ছুটে গেল; ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাছ ধরার কাজে। একটু পরে ৭–৮ কেজি ওজনের এক বিশাল কাতল মাছ নৌকায় তুলে রাখল। ঝুড়িতে এত বড় মাছ রাখার জায়গা নেই। মুবারেক বুদ্ধি করে মাছের মাথা–কানকোতে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল, সাথে দড়ির আরেক মাথা বেঁধে রাখল নৌকার পাটাতনের বাঁশের সাথে। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাল। আজকের সারাদিনের কষ্ট, একটু আগে মাছ হারানোর রাগ – সব চলে গেল এই এক মাছ দেখে।

মাছটাকে পাশে রেখে আবার বড়শি নিয়ে বসল। আরেক পাশে টর্চটা রেখে দিল। চার ব্যাটারির টর্চ, কায়দা করে কাউকে মারতে পারলে দারুণ একটা অস্ত্র। মাছটাকে পাহারা দিয়ে রাখতে হবে, যেন এটা কোনোভাবে হাতছাড়া না হয়। বড়শি নিয়ে বসে থাকতে থাকতে আবার একটু ঝিমুনির মতো এল। হঠাৎ মনে হল, নৌকাটা খুব হালকা ভাবে দুলে উঠল, যেন কেউ খুব আলতো করে নৌকাকে ধাক্কা দিল। মুবারেকের ঝিমুনি কেটে গেল, কিন্তু সে চুপ করেই বসে রইল। এটাই মাছ–চোর ধরার সবচেয়ে মোক্ষম উপায়, কেউ একজন আছে আশেপাশে; মুবারেক অপেক্ষায় রইল হাতেনাতে ধরবে।

এবার মনে হল, কেউ একজন বড় মাছটা ধরে টান দিল। বড় মাছ, একটু শব্দ তো হবেই। মুবারেক ঠিক করল, ঘাড় না ঘুরিয়ে মাছের লেজের দিকে হাত বাড়িয়ে চোরের হাত ধরার চেষ্টা করবে, যেন চোর যেই হোক, তার হাত ধরতে পারে। খপ করে হাতটা বাড়াল ওভাবে।

একজনের হাত ধরতে পারল। মুখে বলল – হারামীর বাচ্চা, ধরছি তোরে এইবার – বলে যেই কিনা ঘাড় ঘুরাতে যাবে, কেউ একজন ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে গলায় ধমক দিয়ে উঠল – এই মুবারেক, পিছনে তাকাবি না; জানে মেরে ফেলব।

গলা শুনে মুবারেক চমকে উঠল – এরকম শব্দ কোন মানুষ করতে পারে না, কারো গলা এমন হতে পারে না। আর ততক্ষণে সে বুঝতে পারছে, যেই হাতটা ‘চোর’ মনে করে ধরেছে, সেটা বরফের মতো ঠান্ডা আর পিছলা শ্যাওলার মতো, যেন পুরা হাতে শ্যাওলা মেখে আছে। মুবারেক কী করবে বুঝতে পারছে না, কিন্তু হাতও ছাড়ছে না। ওই ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে গলা আবার বলে উঠল – মুবারেক, বেঁচে ফিরতে চাইলে হাত ছেড়ে দে এখনই। আমার এলাকায় মাছ ধরতে আসছিস, এই মাছ আমার।

মাছের কথা শুনে মুবারেকের মাথায় আগুন ধরে গেল। এত কষ্ট করে মাছ ধরেছে – আরেকজন নিয়ে যাবে, এটা হবে না, তা সে যেই হোক! সে ডান হাতে টর্চটা নিল, তারপর অনেক দ্রুততার সাথে পেছনে ফিরে চোর বা ঐ জিনিসটার গায়ে মারার চেষ্টা করল। কিছু একটাতে ও আঘাত করল নিশ্চিত, কিন্তু কাকে মারল – সেটা ঠিক বুঝতে পারল না।

ততক্ষণে মুবারেক ওই ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে গলার ‘লোকটার’ দিকে ঘুরে তাকিয়েছে। দেখে মনে হল, কেউ একজন শ্যাওলা গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর টর্চের বাড়ি খেয়ে একটু ডানদিকে বেকে গেছে। টর্চটা মুবারেকের হাতেই ছিল। কী মনে করে, শ্যাওলা-গায়ে লোকটার দিকে টর্চ দিয়ে আলো ফেলল। বুঝল, কাজটা তার ঠিক হয়নি। যা দেখল, তাতে তার গায়ের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল, হাত-পা ওখানেই জমে গেল।

ওর সামনে নৌকার পাশে মানুষের মতো কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এটা মানুষ না, হতেই পারে না। আলো পড়তেই জিনিসটা মুবারেকের দিকে তাকাল। শ্যাওলা দিয়ে জিনিসটা বহু কষ্টে মানুষের চেহারা ধরে রেখেছে। পুরো ‘চেহারার’ মাঝে ২–৩টা চোখ নড়ে বেড়াচ্ছে, যেন কোথায় থাকা উচিত বুঝতে পারছে না; সম্ভবত টর্চের বাড়িতে এই অবস্থা হয়েছে। জিনিসটার কোনো নির্দিষ্ট মুখ নেই; একটু পর পর চেহারার একেকটা জায়গায় কিছু গর্ত দেখা যায়, যার ভেতরে দাঁত আছে, মনে হচ্ছে।

মুবারেক সাহসী ছেলে, কিন্তু এমন কিছু দেখে ভয়ে তার শরীর কাঁপতে লাগল। জ্ঞান হারানোর আগে তার শুধু মনে আছে – জিনিসটা নৌকার ওপর উঠে আসছে, আর ঠান্ডা হাতের মতো কিছু একটা দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে। অজ্ঞান হওয়ার আগে অনেক কষ্টে একটা চিৎকার দিল; তারপর আর কিছু মনে নেই।

মুবারেককে প্রায় আধা ঘণ্টা পরে আরেকটা নৌকা এসে উদ্ধার করে, ওরাও বিলে মাছ ধরছিল। তারা এসে দেখে, মুবারেক অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে; সারা শরীর শ্যাওলায় ঢাকা আর মৃগীরোগীর মতো কাঁপছে। একদিন পরে মুবারেকের জ্ঞান ফেরে। কয়েক দিন পরে ওই আরেক নৌকার লোকদের কাছ থেকে জানতে পারে – তার নৌকায় কোনো মাছের চিহ্ন তারা পায়নি, আর পুরো নৌকা মাছের আঁশটে গন্ধে ভরা ছিল। তবে, ওরা নৌকাতে বা নৌকার আশেপাশে ঐদিন আর কাউকে দেখে নাই, কিংবা আর কাউকে মাছ ধরতেও দেখ নাই।

তাহলে, মুবারেক ঐদিন কাকে দেখলো? কি ছিল ঐ জিনিসটা?

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।

কালো বেনারসি

মুহিব বড় রাস্তা ছেড়ে গলিতে ঢুকলো। কানে ইয়ারবাডস, গান বাজছে, চিরকুটের “মরে যাবো রে মরে যাবো”। সুমি দরদভরা গলায় গাইছেন, “মরে যাব রে, মরে যাব. কি অসহায় আমি একবার ভাবো।” মুহিবের মনে হল, আসলেই আমরা কত অসহায়। জীবনের কোন কিছুই একা একা করতে পারি না। সব জায়গাতেই কারো না কারো কাছে ঋণী। জীবন পাওয়ার জন্যে বাবা-মা, শৈশব আর কৈশোরে ভাইবোন আর বন্ধুরা, যৌবনে বন্ধুদের সাথে নিজের প্রেমিক/প্রেমিকা, আর পরবর্তীতে স্বামী/স্ত্রী, সন্তান। এ যেন হাজার লক্ষ বছর ধরে, এক অনন্ত ইউনিভার্সেল রিদমে সাইকেল চলছে, যার আপাত শেষ শুধু মৃত্যুতে।

মুহিবের মাঝে মাঝে এ ধরনের দার্শনিক চিন্তাভাবনা করতে ভালো লাগে। ও এসব চিন্তা করতে করতে রাস্তায় হাটে। ওর ছোটবেলার বন্ধু ফয়সাল বলে, এগুলা হল ভরা পেটের দার্শনিকতা। কাম কাজ না থাকলে এমন হয়। ফয়সালের নিজের যদিও এসব ভাবার সময় নাই, সে এখন টাকা কামাচ্ছে। গোটা পাচেক ইন্ডাস্ট্রি করেছে ইতিমধ্যে, সামনে আরো বড় প্রজেক্ট হাতে নিচ্ছে। মুহিব মাঝে মাঝে যায় ওর অফিসে দেখা করতে। আলিশান অফিস, ২ জন পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট, চেয়ার থেকে শুরু করে সবার কাপড় চোপড় পর্যন্ত সবই পরিপাটিভাবে সাজানো। দেখা করতে গেলে ফয়সাল বলে, আমিও ভাবছি তোর মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। তবে, তোর এইসব ভরা পেটের দার্শনিকতা আরো ৮-১০টা ইন্ডাস্ট্রি করার পরে করবো। মুহিব কিছু না বললেও জানে, ফয়সাল কখনো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে না ওর মত। টাকা মানুষকে শুধু স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না, সাথে জীবনের সময়টাও নিয়ে নেয়। সাথে একটা নেশাও বানায়ে ফেলে, টাকা কামানোর নেশা। আর সেই নেশাটা একসময় হয়ে যায় অভ্যাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করার মত টাকা কামানোর অভ্যাস। মানুষ চেষ্টা করলে নেশা ছাড়তে পারে, তবে অভ্যাস বদলানো আরো কঠিন কাজ।

ইদানীং মুহিব ভাবছে, রাস্তায় ভিক্ষা করতে বসে পড়বে কিনা। যদিও ওর আব্বা দেখলে ঘর থেকে বের করে দেয়ার চান্স আছে ভালোরকম। সাথে সিলভারও তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। বলে রাখা ভালো, সিলভার হল মুহিবের ভালবাসার মানুষ, নাম রুপা। তবে, হুমায়ূন আহমেদের হিমুর প্রেমিকার নামের সাথে মিলে যায়, তাই মুহিব রুপাকে ডাকে সিলভার। কিছুদিন যাবত সিলভারকে নিয়েও মুহিব অনেক সমস্যায় আছে। মাস্টার্স শেষ করে গত ৩ বছরে ৫টা চাকরি চেঞ্জ করেছে, এটা সিলভারের পছন্দ না। তার সাথে আরেক উটকো ঝামেলা হল, সিলভার নিজে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে এবং তার বাসা থেকে পাত্র দেখা শুরু করে দিয়েছে। আর মুহিবের নেশা হয়ছে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর। থালা হাতে শুধু বিজয় সরণির মোড়ে ভিক্ষা করাটা বাকি।

মুহিব যদিও ভিক্ষাকে মহৎ পেশা মনে করে। অন্তত কয়েক হাজার মানুষ ঢাকা শহরে একজন ভিক্ষুকের কাছে প্রতিদিন মাফ চায়। মানে, ভিক্ষা না দিতে পারলে “মাফ করেন, বাবা” বলে আর কি! এটাই বা কম কি! তিন বছরের রিলেশনে সিলভার তার কাছে একবারও মাফ চাই নাই। বরং প্রতিবারেই কোন না কোন কারনে তার নিজের সরি বলা লাগছে সিলভারের কাছে। তবে, এতে মুহিবের আক্ষেপ নাই, তার প্রধান কারন হল, এই সরি বলার মাধ্যমেই সিলভারের সাথে তার পরিচয়। মুহিব কয়েক বছর আগে আবাহনী মাঠের সামনের ফুটপাত দিয়ে বিকেল বেলা হাটার সময় টিয়া মানে টিয়াপাখির ডাক শুনে আনমনা হয়ে হাটতে হাটতে এক কলেজপড়ুয়া মেয়ের সাথে প্রবল ধাক্কা খায়। সেদিন পাবলিকের হাতে দু’চার ঘা খেয়েছিলও বটে। কোনমতে, সরি বলে পার পায়। সেই মেয়েটিই ছিল এই সিলভার, বা রুপা। সেদিন যে কারনেই হোক, রুপা সিন ক্রিয়েট করতে চায়নি।

ওদের দ্বিতীয় দেখা হয়, ধানমন্ডি লেকে পরের সপ্তাহে এবং সেখানেও মুহিব মন দিয়ে সুইচোরা পাখির ঘর-সংসার দেখছিল। ঢাকা শহরে মানুষই বাস করতে পারে না। কিন্তু, এই পাখিগুলো এত সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়ে আছে, মুহিবের দেখে অবাক লাগে। আর রুপা তখন ওখানে গিয়েছিল কান্নাকাটি করতে। এটা ও মাঝে মাঝে করে, গলা ভেঙ্গে চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছা করে তার, পারে না। বাসায় তো আরো পারে না, তাই মাঝে মাঝে ধানমন্ডি লেকে যায় কান্নাকাটি করতে। ঢাকা শহর অদ্ভুত এক জায়গা, যেখানে সবাই কষ্ট বিলিয়ে বেড়াতে পছন্দ করে। মুহিবের ধারণা, এই কষ্টে থাকা মানুষগুলোর জন্যে সৃষ্টিকর্তা কাউকে না কাউকে বানিয়েছেন, যে ওদের জন্যে আনন্দের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে। কেউ ঐ মানুষগুলোকে খুজে নিতে পারে, কিংবা খুজে পায়। বাকিরা খুজতে খুজতেই জীবন পার করে দেয়। সম্ভবত, আমাদের রুপা বা সিলভারের জীবনে মুহিব এরকম একজন মানুষ, যে হয়তো কিছু করতে পারে না, তবে কষ্টের সময় পাশে থাকতে পারে। আবার এটাও হতে পারে যে, ঐ কষ্ট পাওয়া মানুষগুলোর জন্যে হয়তো ঐ পাশে থেকে সঙ্গ দেয়াটাই যথেষ্ট।

যাই হোক, মুহিব গলিতে ঢুকে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলো, পুরা রাস্তা ভর্তি পানি। সম্ভবত কাল রাতে এই এলাকাতে বৃষ্টির ফলাফল। তবে ইন্টারেস্টিং হল গলির কুকুরগুলো। তারা পানির ঐপারে আটকে গেছে, তাই মুহিবের মত বিশালাকার চুল-দাড়িওয়ালা মানুষ দেখে সামান্য ঘেউ ঘেউ করলেও পানির এই পাড়ে আসতে পারছে না। মুহিব ভাবলো, কুকুরদের সাথে এই মুহূর্তে কথা বলতে পারলে কেমন হত? ওরা কেন ওকে দেখে এত বিচলিত? সামনের সাদা-কালো কালারের কুকুরটাকে এদের লিডার মনে হচ্ছে।

(ঘেউ ঘেউ ঘেউ) – এই কুদ্দুস, দেখতো, এই মালটা কি এই পাড়ায় নতুন?

(ঘেউ ঘেউ) – আরে নাহ, এই মালটার মাথায় ছিট আছে। দেখস না, চুল দাড়ি বড় রাইখা কি এক ভং ধরছে!

(ঘেউ ঘেউ ঘেউউউউ) – মালটা যাই হোক, ভাব-চক্কর ভাল লাগছে না আমার কাছে। দাবড়ানি দেয়া দরকার। তাইলে ভং ধরার শখ চলে যাবে।

(ঘেউ ঘেউউউ) – তো যা না, আটকে রাখছে কে! আমি এই ময়লা পানিতে নামতে পারবো না।

(ঘেউ ঘেউ) – তাইলে এইডারে একটু চিল্লাচিল্লি কইরা খেদায়ে দেয়ার চেষ্টা করি, চল।

(ঘেউ) – ওকে।

মুহিব দেখলো, কোন এক কারনে হঠাৎ সবগুলা কুকুর একসাথে ঘেউ ঘেউ করা শুরু করলো, যেন কোনমতে পানিটা পার হতে পারলেই ওর খবর আছে। মুহিব আর তাদের বিরক্ত করবে না ভেবে গলি থেকে বের আবার রাস্তায় এল। কিছুক্ষন চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলো, ফয়সালের অফিসে যাবে। বেশ কিছুদিন ভালমন্দ খাওয়া হয় না। এই ভরদুপুরে গেলে বন্ধুকে নিশ্চয়ই না খাইয়ে ফেরত পাঠাবে না। ইন্টারেস্টিং হল – রওনা দেয়ার পর দেখলো, গলির কুকুরদের নেতা লেজ নাড়তে নাড়তে তার পিছে পিছে আসতেছে। যদিও কিসের জন্যে, এটা বোঝা মুশকিল।

(ঘেউ ঘেউ ঘেউ) – ওস্তাদ, একটু আগে চিল্লাচিল্লির জন্যে মাইন্ড কইরেন না।

মুহিব আগ্রহ নিয়ে কুকুরটার মাথায় হাত রেখে আদর করলো। বললো – কি রে, কেমন আছিস? নাম কি তোর? যাহ আমি তর নাম দিলাম, ঝন্টু। ঝন্টু, কি পছন্দ হইছে?

(ঘেউ ঘেউ ঘেউ) – জ্বি ওস্তাদ। ইচ্ছা হইলে রাইতের বেলা আইসেন, এইদিকে ফাকা থাকে, আরামে ঘুরাঘুরি করতে পারবেন। যদিও এরিয়াটা ভাল না। সেই আমলে বহুত খুনখারাবি হইত তো। মাগার, আমি আছি, আপনারে প্রটেকশন দিয়া রাখমু। কুনু টেনশন নাই।

মুহিব বললো – আচ্ছা ঝন্টু, আজকে থাক তাইলে। আরেক দিন এলে তোর জন্যে খাবার নিয়ে আসবো। আজকে পকেটে তেমন কিছু নাই। তোকে কিছু খাওয়াতে পারলাম না।

(ঘেউ ঘেউ) – নো প্রব্লেম, ওস্তাদ।

মুহিব হাটা শুরু করলো। ওয়ারীতে এই গলির সামনে ঝন্টুর সাথে পরিচয় হল। ফয়সালের অফিস পল্টনে। ব্যস্ত এরিয়া, কয়দিন পর পর পলিটিক্যাল ঝামেলাতে রাস্তা বন্ধ থাকাতে কিছুদিন হল ও গুলশানে আরেক অফিস খুলেছে। ফয়সাল আজকে কোন অফিসে আছে, আগে থেকে জানা সম্ভব না মুহিবের পক্ষে। কারন সিম্পল, কাছে ফোন নাই। মানে, ও হাটতে বের হলে বাসায় ফোন রেখে বের হয়। সেই আমলের ছোট এক এমপি3 প্লেয়ার কিনেছে, সেটা দিয়েই গান শুনে রাস্তায় হাটার সময়। সাথে ঢাকা শহর এতই ব্যস্ত জায়গা, এখানে মোবাইল হাতে নিয়ে ড্রাইভিং তো দূরে থাক, হাটাহাটি করাও সেফ না। তার উপর সাথে ফোন থাকলে দিনের ১২ ঘন্টার মাঝে অন্তত ১৮ বার ফোন আসবে। একবার ভাই ফোন দিবে, তো আরেকবার সিলভার। এত ফোনের মাঝে হাটাহাটিতে মনোযোগ দেয়া মুশকিল। মুহিবের কাছে মনে হয়, জগতের সবাইকে কাজ করতে হবে, এটা কি কোথাও লিখা আছে? আট বিলিয়ন মানুষের মাঝে একজন না হয় কাজ না করেই জীবন কাটায়ে দিলো। যদিও এ কথা সিলভারকে বোঝাবে কে? তার কথা হল, সে বেকার ছেলের কথা বাসায় বলতে পারবে না। বহুত কষ্টে মুহিবকে সে রাজি করিয়েছি যে, এর পরের চাকরিটা সে ছাড়তে পারবে না। তবে, এই কথা নিয়েও সিলভার আরেক ঝামেলায় পড়েছে। মুহিব চাকরি খোজাই বন্ধ করে দিয়েছে। আপাতত, পদব্রজই মুহিবের একমাত্র পেশা। এই ভাব-লক্ষন সিলভারের কাছে ভাল ঠেকছে না। আপাতত সে মনে মনে ডিসিশান নিয়ে রেখেছে যে, ওর বাসায় বেশি ঝামেলা করলে সোজা ব্যাগ নিয়ে মুহিবের বাড়িতে গিয়ে উঠবে। তারপরে যা হওয়ার হবে।

=====================১ম অধ্যায় শেষ=====================

মুহিবের বাবা, কায়েস সাহেব ইদানীং অনেক টেনশনে আছেন। তিনি রিটায়ার করেছেন বছর পাচেক হল আর তার স্ত্রী রাবেয়া গত হয়েছেন বছর দুয়েক আগে। এই বয়সে ঝামেলা ভাল লাগে না তার। কিন্তু, মুহিবকে নিয়ে তার চিন্তার অন্ত নাই। তার বড়ো ছেলে, মুন্না সংসারের সবদিকে সামলাচ্ছে। মুহিবও ভালোই করছিল। কিন্তু, ওর মা, মানে রাবেয়া বেগম মারা যাওয়ার পরে মুহিব কেমন যেন সংসারছাড়া হয়ে গেল। ওর সাথে কায়েস সাহেবের দেখা হয় না বললেই চলে। ইদানীং, ও নাকি দিনরাত রাস্তায় রাস্তায় হাটে, অনেক দিনই সারারাত হাটাহাটি করে ভোরবেলা বাসায় ঢোকে। রাতে কোথাও নেশা টেশা করে কিনা, সে বিষয় নিয়ে তার সন্দেহ ছিল। মুন্নাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু আসলে ও পরিস্কারভাবে জানে না। তিনি গত মাসখানেক ধরে চেষ্টা করছেন, মুহিবের সাথে কথা বলার। পারছেন না, কারন ছেলেটা তার সাথে চোর-পুলিশ খেলতেছে। তিনি সারাজীবন রুটিন মেনে জীবন চালিয়েছেন, এখনো সেটাই চেষ্টা করেন, আর তার ছোট ছেলে মুহিব সেই সুযোগটাই নেয়। ভোরে ঢুকে সারাদিন মরার মত ঘুমায় আর বিকালে যখন কায়েস সাহেব বাইরে হাটাহাটি করতে যান, সে সময় মুহিব ঘুম থেকে উঠে বের হয়ে যায়। আবার কোন সময় কয়েকদিন বাড়িতেই ফেরে না।

আজকে কায়েস সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, সারারাত বাইরের ঘরে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়বেন। ছেলের সাথে কথা বলে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাবেন। এই বয়সে কষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু কিছু করার নাই। ছেলে উৎছন্নে যাওয়ার আগে তাকে ঠিক করা অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব। রাবেয়া থাকলে তার আর এত চিন্তা করা লাগতো না। ছেলেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা বয়স পর্যন্ত মায়ের সাথে ফ্রি ভাবে কথা বলে আর বাবাদের এড়িয়ে চলে। যতদিনে তারা সংসারে বাবার মূল্য বুঝতে শিখে, ততদিনে সেই ছেলেকে এড়িয়ে চলার জন্যে তার সন্তানেরা চলে আসে।

কায়েস সাহেব সাধারনত দুপুরে ঘুমান না, বারান্দায় বসে খবরের কাগজ কিংবা বই পড়েন। আজকে রাতে জাগা লাগবে বলে ঘুমাতে গেলেন। অদ্ভুত এক স্বপ্নও দেখে ফেললেন। দেখলেন, তার বাড়িতে সাজ-সাজ রব। রাবেয়াকেও দেখলেন, বেনারসি পড়ে সংসার সামলাচ্ছে। তার কাছে মনে হল, বাড়িতে কারো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, তবে কার বিয়ে, স্বপ্নের মাঝে সেটা বুঝলেন না। তবে, আরেকটু পরে বুঝলেন যে, তার ছোট ছেলে, মুহিবের বিয়ে। বেটার বউ নিয়ে তিনি বাড়িতে ঢুকছেন, আর রাবেয়া বেগম তখন বউ বরণ করে নিচ্ছে। তবে, কেন যেন মুহিবের বউ কালো রঙের বেনারসি পড়েছে বিয়ের দিনে আর তিনি রাবেয়াকে বলছেন, তোমাদের সমস্যা কি? বিয়ের শাড়ী কেউ কালো রঙের কিনে? মেয়েটা এই শুভ দিনে কালো শাড়ি কেন পড়েছে। – এই অবস্থায় কায়েস সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাড়ালেন। কাজের লোক, দুলাল এসে বললো – চাচা, ছোট ভাইয়ার সাথে একটা মেয়ে দেখা করতে আসছে। ভাইয়া তো বাসায় নাই, ভাবীও তো বের হইছে একটু। মেয়েটাকে আমি আগেও ছোটভাইয়ের সাথে দেখছি। বাইরে দাড়ায়ে কানতেছিল। আমি ভেতরে আইনা বাইরের ঘরে বইতে দিছি। আপনি একটু কথা কইবেন? কায়েস সাহেব একটু ঘাড় নেড়ে বললেন, তুই ওকে চা-নাশতা কিছু দে। আমি এসে দেখতেছি।

কায়েস সাহেব একটু ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরে গেলেন। এবং গিয়ে মেয়েটাকে দেখেই একটা ধাক্কা খেলেন। একটু আগে এই মেয়েটাকেই উনি স্বপ্নে দেখেছেন, মুহিবের নতুন বউ হিসেবে, কালো বেনারসি পড়া।

মেয়েটা এগিয়ে এসে তাকে সালাম দিল, বললো – আংকেল, আমার নাম রুপা। আপনি কি মুহিবের কোন খোজ জানেন? আমি গত কয়েকদিন ধরে ওকে খুজে পাচ্ছি না। এদিকে আমার বাসায়ও সমস্যা চলছে কিছু।

কায়েস সাহেব একটু কথা বলে বুঝলেন যে, মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে, কাল বিয়ে। তাই, নিরুপায় হয়ে মুহিবের জন্যে এক কাপড়ে বাড়ী থেকে চলে এসেছে। কায়েস সাহেব সব শুনে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন। মেয়েটার পরিবার-পরিচয় কিছুই জানেন না। কি করবেন, বুঝতে পারছেন না। মেয়েটাকে এখন কড়া ভাষায় কিছু বললে উল্টাপাল্টা কিছু করে বসবে কিনা, বলা মুশকিল। এমনিতেই বোঝা যাচ্ছে যে, ইমোশনাল হয়ে আছে। তাছাড়া, মুহিবের মত ভ্যাগাবন্ড টাইপের পাগলা ছেলেটাকে এই রুপা নামের মেয়েটা যে পাগলের মত ভালবাসে, সেটা বুঝতে পারছেন। এটাও বুঝতে পারছেন, তার ছেলেকে সংসারে মনোযোগী করতে এই মেয়েটাই মনে হচ্ছে শেষ ভরসা। তিনি পজিটিভ ডিসিশান নিলেন। ইতিমধ্যে তার বড় বৌমা, ঝুমুরও চলে এসেছে। রুপার সাথে কথা বলা দেখে বুঝলেন, ঝুমুর সম্ভবত মুহিব আর রুপার বিষয়ে জানে। এখন বাকি রইলো একটা কাজই, মুহিবকে খুজে বের করা। দুলালকে জিজ্ঞেস করলে বললো, ছোটভাই তো ৩ দিন হইলো বাসায় আসে না। তিনি ঝুমুরকে ডেকে বললেন, বিয়ের আয়োজন করতে। সাথে মুন্নাকে ফোন দিতে বললেন, যেন মুহিবকে খুজে বের করতে পারে।

=====================২য় অধ্যায় শেষ=====================

মুহিব ফয়সালের অফিসে গিয়ে বন্ধুর রুমে বসে ভরপেট লাঞ্চ করে আরামে সোফায় গা এলিয়ে দিল। ফয়সাল পল্টনের অফিসে নেই আজকে। ভাগ্য ভাল, ফয়সালের এক পি.এ. মুহিবকে চিনলো। শুধু চিনলো বললে ভুল হবে, রীতিমত ভালো আপ্যায়ন করলো, কাচ্চি, রোস্ট, ইলিশ মাছ, সাথে আবার চিংড়ির মালাইকাড়ী। ফয়সাল নাকি ৩ জন মানুষের লিস্ট দিয়েছে, যারা তার অফিসে এলেই যেন সর্বোচ্চ আপ্যায়ন পায়, তার মধ্যে মুহিব একজন।

খাওয়ার পরে ফয়সালের রুমে সোফায় গা এলিয়ে মুহিব শুধু ঘুমিয়ে গেল, তাই না, স্বপ্ন দেখা শুরু করলো। দেখলো, ওদের বাড়িতে সাজ-সাজ রব, মনে হচ্ছে কারো বিয়ের অনুষ্ঠান। ওর মাকেও দেখলো, বেনারসি পড়ে মেহমানদের সাথে কথা বলছে। তবে, বাড়িতে কার বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, স্বপ্নের মাঝে সেটা বুঝলো না। মা কাকে যেন ফোনে বললো, মুহিবের বউ চলে এসেছে। মুহিবের পাশ দিয়ে ওর মা হেটে বাড়ির বাইরের দিকে গেল, পেছন পেছন বয়স্করা সবাই গেল। মুহিবের মনে হল, ও যেন ওখানে ছায়ার মত দাড়িয়ে আছে, আর কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছে না। ওর কাজিনদের মাঝে সুরমাকে দেখলো ওখানে। ওকে কাছে গিয়ে ডাক দিলো, কিন্তু সুরমা শুনলো বলে মনে হয় না। ঘুরে একবার হাত তুলে মুহিব ওর মাকে ডাকলো। কেন জানি মনে হল, ওর মা ডাক শুনলো। রাবেয়া খুব আস্তে আস্তে মুহিবের দিকে ঘুরে তাকালেন। তারপর যেন স্নেহমাখা একটা হাসি দিয়ে মুহিবকে হাতের ইসশারাতে কাছে ডাকলেন। তারপর, আবার উলটা দিকে ঘুরে গেটের দিকে যেতে লাগলেন। মুহিবও ওর মায়ের পিছে পিছে গেল গেট পর্যন্ত। একটু পরে বাসার সামনে বিয়ের গাড়ি এসে দাঁড়ালো। মুহিবের মা এগিয়ে গিয়ে গেট খুলে বউকে নামালেন। মুহিব দেখে অবাক হল, মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে। হঠাৎ বুঝলো, মেয়েটা আর কেউ না, সিলভার। মেকআপের জন্যে প্রথমে বুঝে নাই। তবে, কেন যেন সিলভার একটা কালো রঙের বেনারসি পড়েছে, এটা কি নতুন ট্রেন্ড কিনা, মুহিব জানে না। ঐ সময় রাবেয়া মুহিবকে ডাক দিলেন। স্বপ্নের ভেতর মুহিব বুঝতে পারলো না, ওর মা ওকে ডাকছে কেন? ও তো স্বপ্ন দেখছে, সিলভার যখন গাড়ী থেকে ওদের বাড়ীতে বেনারসি পড়ে নামলো, তার মানে গাড়ীর ভেতরে সেও আছে। কিন্তু, স্বপ্নের ভিতরে ওর মা কিভাবে তাকে ডাকতেছে, সেটা সে বুঝতে পারলো না। সে একটূ এগিয়ে গেল, ওর মায়ের দিকে। গাড়ির ঐপাশ থেকে বর নামলো। মুহিব অপেক্ষা করছে, স্বপ্নের ভেতর সে এখন নিজেকে বরের সাজে দেখবে, এটা ইন্টারেস্টিং হবে, ওর কাছে মনে হয়। বর গাড়ীর পাশ ঘুরে এসে রাবেয়া বেগমের সামনে আসছে।

বরকে দেখে স্বপ্নের ভেতরে মুহিব ভয়ে কাপতে লাগলো। ওর সামনে, বধুরূপে সিলভারের পাশে বরের সাজে দাঁড়িয়ে আছে একটা মানুষ, যার মুখের জায়গাতে একটা আয়না সেট করা, বরের আসলে কোন ফেস নাই। মুহিব প্রাণপণে চেষ্টা করছে ঘুম থেকে জেগে ওঠার, কিন্তু পারছে না। উপরন্তু, আয়নামুখের বরের দিকে মুহিব চম্বুকের মত আকর্ষন অনুভব করছে, যেন মুহিবকে ডাকছে, ঐ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার জন্যে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও মুহিব সামনে এগিয়ে গেল আর সম্মোহিতের মত ঐ বরের আয়নার দিকে তাকালো। আয়নার মাঝে নিজেকে দেখলো, তবে কেন যেন মনে হল, মানুষটা ও নিজে না, কারন আয়নার ভিতরে মুহিবের মুখে হাসি, কিন্তু মুহিব তো হাসছে না। তাহলে আয়নার কে এই লোকটা? মুহিবের মত দেখতে? কয়েক সেকেন্ড পরে আয়নার ভিতরের মুহিব হো হো করে হাসতে লাগলো। আর আয়নার বাইরের মুহিব অসহায় দৃষ্টিতে সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইলো।

কুকুরের ডাকে মুহিবের ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভেঙে মুহিব দেখলো, ওয়ারীতে ঐ গলির ভেতরে শুয়ে আছে, আর পাশে ঝন্টু দাঁড়িয়ে আছে। সে ফয়সালের অফিস থেকে ওখানে কি করে গেল, মনে করতে পারলো না। ঝন্টু স্বভাবতই ঘেউ ঘেউ করে উঠলো।

(ঘেউ ঘেউ ঘেউউউ) – ওস্তাদ কি স্বপ্ন দেখছিলেন? ঘুমের মাঝে আপনাকে চিৎকার করতে শুনলাম।

মুহিবের কোন কিছ ভালো লাগছে না। কোথাও একটা গন্ডগোল মনে হচ্ছে। আর সে স্বপ্নের ভেতরে এগুলা কি দেখলো! ভয়টা মনে হচ্ছে এখনো ভেতরে আছে, তবুও সেটাকে ও পাত্তা না দেয়ার চেষ্টা করলো।

মুহিবের মনে হল, অনেকদিন সিলভারের সাথে দেখা হয় না। তবে, “দেখা হয় না” কথাটা ভুল, সিলভার সবসময়ই মুহিবের সাথে দেখা করতে চায়। সমস্যা হল, মুহিবের কাছে ফোন না থাকার কারণে তাকে খুজে পাওয়া যায় না। আর মুহিবও ইদানীং সিলভারের কাছ থেকে একটু দূরে থাকে, কারণ দেখা হলেই সিলভার মুহিবের চাকরি নিয়ে কথা বলা শুরু করে। সব মিলিয়ে মুহিব পড়েছে পড়েছে মহা ফ্যাকড়াতে, সিলভারকে না দেখে ওর জন্যে থাকাও মুশকিল, আবার দেখা হলেই সিলভারের মুখে বিয়ে আর চাকরি নিয়ে বানী। তবুও কেন জানি, মুহিবের মনে হল, সিলভারের সাথে ওর দেখা করা খুবই দরকার। কেমন যেন অস্থির লাগছে। মুহিব হাটা ধরলো, ওর নিজের বাসার দিকে। সিলভারকে দেখতে হলে ওকে ফোন দিতে হবে আর ফোন রয়েছে বাসায়।

ঘন্টা দুই পরে মুহিব ওদের লালমাটিয়ার বাসাতে পৌছে গেল, প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হল, বাসায় অনেক মানুষ। কয়েকজন বাইরের মানুষকে দেখলো, বাসা সাজাচ্ছে। ওদের জিজ্ঞেস করতেই বললো, এই বাড়ীর ছোট ছেলের বিয়ে। মুহিব আকাশ থেকে পড়লো। এ বাড়ির ছোট ছেলে তো সে নিজে, আর তার আজকে বিয়ে? কই, কেউ তো তাকে বলে নি?

লন পেরিয়ে দরজার সামনে এসে দাড়াতেই ওর পা আটকে গেল। দরজা খোলা, দরজার ওপাশে ওর মা, রাবেয়া বেগম কারো সাথে কথা বলছেন। রাবেয়া বেগম দুই বছর আগে মারা গেছেন। মুহিব নিজে ওর মাকে কবরে নামিয়েছে। দরজার বাইরে মুহিবকে দেখে রাবেয়া হেঁটে এসে বললেন – তুই কোথায় গেছিলি, হ্যা? আজকে না তোর বিয়ে? রুপাদের বাড়িতে যেতে হবে না? সন্ধ্যা হয়ে গেল প্রায়। তুই তো রুপার বিয়ের শাড়ীই দেখিস নাই। এত তাড়াহুড়ো করে শপিং করলাম আজকে। এদিকে আয়।

রাবেয়া ছেলেকে ডাক দিয়ে বাসার ভিতরে নিয়ে নতুন মুহিবের বউয়ের জন্যে কেনা বিয়ের শাড়ী দেখালেন। কালো বেনারসি। মুহিবের মাথায় কিছু ঢুকছে না। ও এক দৃষ্টিতে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। বিয়ের জন্যে কালো বেনারসি কেন, এটাও তার মাথায় ঢুকলো না। সবই স্বপ্নের সাথে মিলে যাচ্ছে। তাহলে কি ওর মুখও একটু পরে আয়না হয়ে যাবে, স্বপ্নে দেখা সিলভারের বরের মত?

নাকি মুহিব এখনো স্বপ্নের ভিতরে আছে?

*** সমাপ্ত ***

গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ! আপনার ভালো লাগা, কিংবা সমালোচনা নিচে মন্তব্য করে শেয়ার করুন। ভবিষ্যতে নতুন গল্পের নোটিফিকেশন পেতে আমার ব্লগে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন।