সমান্তরাল

শুভ্র আর সারথি।

অল্পদিনের পরিচয় ওদের। শুভ্র’র ফ্রেন্ড সেলিমের দূর সম্পর্কের কাজিন হল সারথি। সেলিমের ভাগনির জন্মদিনের প্রোগ্রামে গিয়ে ওদের প্রথম পরিচয়। দু’জনের দ্বিতীয়বার দেখা হয় মাসখানেক পরে, বেশ কাকতালীয়ভাবে, সিলেটে ঘুরতে গিয়ে, যদিও দুইজন আলাদা ট্রাভেল গ্রুপের সাথে। ওখানেই সামান্য পরিচিত হিসেবে ফোন নাম্বার বিনিময়, ঢাকাতে ফিরে ফোনে কথা বলা, তারপর একসাথে টুকটাক ঘোরাঘুরি, রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন কথা বলা। এক মাসের মাথায়, ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র কয়েক দিন পরে শুভ্র সারথিকে প্রপোজ করে। সারথির একটু সময় চাওয়ার কথা বলে সপ্তাহ দুই নিরব থাকে, তারপর সেটা নিয়ে দু’জনের অভিমান, যোগাযোগ বন্ধ।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সারথি রোড এক্সিডেন্টে পড়লো। “সিরিয়াস না, কিন্তু সিরিয়াস হতে পারতো” টাইপ সিএনজি এক্সিডেন্ট। ফলাফল, পা মচকে দুই সপ্তাহ ঘরে শুয়ে থাকা। ঘরে বসে থাকার প্রথম দিনই কোন এক কারনে শুভ্র’র ফোন, সারথি ধরবে না, ধরবে না করেও শেষে ধরলো। শুভ্র এক্সিডেন্টের কথা শুনে পুরো চুপ করে গেল, একটু পরে ফোন রেখেও দিলো, সারথির কাছে একটু অবাক লাগলেও কিছু বললো না। ঘন্টাখানেক পরে একটা মেসেজ এলো, “তোমার এক্সিডেন্ট শুনে মনে হল, জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি এক মূহুর্তের ভিতরে। তোমাকে পছন্দ করি, সেটা আগেও বলেছি। কিন্তু কতখানি, নিজেও বুঝতাম না, একটু আগে বুঝলাম। সম্ভবত আমার কাছে এটা আর পছন্দের পর্যায়ে নেই। আমাকে তোমার কাছে আসতে না দিলেও, নিজে সাবধান থেকো।”

দুই দিন পরে, মার্চের ১৭ তারিখ, শুভ্র একটা মেসেজ পেলো সারথির কাছ থেকে, “কাছে আসার অনুমতি দিলাম”।

সারথি’র পা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর দুইজনের আবার দেখা, তবে দু’জনের অনুভুতিই একটু আলাদা। কিছুদিন পরে দেখা গেল, দু’জনের দিনে একবার দেখা না হলে দুইজনই অস্থির থাকে। ওদের দু’জনের রিলেশনের কথা সেলিম প্রথম জানে শুভ্র’র কাছ থেকে। শুনে একটু গম্ভীর হয়ে বললো, তুই কি ওর বিষয়ে সবকিছু জানিস? শুভ্র না জানার কথা বললে সেলিম বলে, সারথি হয়তো তোকে কয়েকদিন পরে বলবে এম্নিতেও। তবে, ওর ছোটবেলা থেকেই বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, যতদূর জানি। ছেলে দেশের বাইরে থাকে। এই কারণেই সারথি কারো সাথে কখনো রিলেশনে জড়ায়নি।

মে মাসের ১০ তারিখ। শুভ্র সারথির জন্যে অপেক্ষায় বসে আছে। বেশিরভাগ দিন সারথিই সময়মত আসে আর শুভ্র আসে দেরি করে। আজকে শুভ্র একটা বিশেষ একটা চিন্তা করে এসেছে সারথির জন্যে। একটু পরে সারথি এলো। কিছু কথাবার্তা বলে শুভ্র একটু চুপ করে যায়। ও চুপ করে আছে দেখে সারথি বলে,

-কি হলো, এত চুপ কেন? কি নিয়ে চিন্তা করতেছ এত?

-একটা বিষয় নিয়ে ভাবতেছি। কিভাবে বলবো, বুঝতেছি না।

-বলো। তারপরে, আমিও ভাবি সেটা নিয়ে। দুইজনে আজকে ভাবতে ভাবতে দিন পার করে দিবো। (বলে হেসে ফেলে)।

-(কিছুক্ষন মুগ্ধ দৃষ্টিতে সারথির হাসির দিকে তাকিয়ে) আমাকে ভালোবাসো?

-(একটু হতচকিত হলেও সামলে নিয়ে) তোমার কি মনে হয়? আমার তো মনে হয়, বাসি। (মুচকি হাসি)

-(একটু সিরিয়াস ভয়েসে) তাহলে ঐদিন সেলিম বললো, বাইরে থাকা একজন্ ভদ্রলোকের কথা। (সারথি একবারেই বুঝে গেলো কি বিষয়)

-(কিছুক্ষন চুপ থেকে) সবকিছু কি সবাই সবসময় কন্ট্রোল করতে পারে? ধরে নাও, আমার লাইফের ওই পার্টটা আমি কন্ট্রোলে আনতে পারি নি এখনো, চেষ্টায় আছি, জানিনা সামনে পারবো হয়তো।

-(রাগী গলায়) কন্ট্রোল করতে না পারলে আমার সাথে এখানে বসে আছো কেন? ভিসা নিয়ে বাইরে চলে যাও। আটকায়ে রাখছে কে?

বলে শুভ্র রাগে একটূ দূরে চলে গেল। সারথি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নিঃশব্দে চোখে পানি ফেলতে শুরু করলো। শুভ্র এই প্রথম ওর সাথে রাগী গলায় কথা বললো। কয়েক মিনিট পরে শুভ্র খেয়াল করলো, সারথির চোখেও পানি। আস্তে আস্তে হেটে গিয়ে মাটিতে সারথির সামনে বসে ওর হাতদুটো ধরলো।

-(নরম গলায়) একটু তাকাও আমার দিকে।

-(সারথি তাকায়। চোখের পানিতে কাজল মিশে অদ্ভুত অবস্থা)।

-বিয়ে করবা আমাকে?

-(সারথি কেপে ওঠে) মানে, কি বলো? এভাবে হয় নাকি?

-তবে, কিভাবে হয়? তুমি যদি ওইদিকে কন্ট্রোল করতে না পারো, তাহলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ কি? আজ হোক, কাল হোক, পালিয়েই তো বিয়ে করতে হবে। সেলিমকে বললে ও বুঝবে আমার ধারণা।

-(সারথি চুপ করে থাকে)।

-তোমাকে এখনি উত্তর দিতে হবে না। ভেবে দেখো। তোমার জায়গাতে অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে সম্ভব না। জানিনা, তোমার দিক থেকেও চিন্তাটা এমন কিনা। ভাবনা চিন্তা করে দেখো, কি করতে চাও।

ওরা আরো কিছুক্ষন বসে থেকে চলে যায় ওই দিনের মত। রাত আড়াইটার দিকে শুভ্র’র কাছে সারথির একটা মেসেজ আসে, “হ্যাঁ”।

পরদিন সকালে শুভ্র সেলিমকে জানায়। সেলিম বেশ খুশিই হয়। শুধু বলে, আমি এখন থেকে তোর শ্বশুরপক্ষের লোক, বড়ভাই বলে ডাকবি। সিদ্ধান্ত হয়, পরদিন, মানে ১২ই মে কাজি ওফিসে গিয়ে বিয়ে করবে ওরা।

শুভ্র ওর বাড়িতে পছন্দের কথা আগেই জানিয়ে রেখেছিল। বাসা থেকে কিছু টাকা চেয়ে নেয়। ওর বাবা বলে দেয়, বিয়ের পর বউকে নিয়ে সোজা ওদের বাড়িতে চলে যেতে, রাজশাহীতে। শুভ্র সারথিকে সাথে নিয়ে বিয়ের কেনাকাটা করে। আগে শুনেছে, এটা ঝামেলার কাজ। কিন্তু কোন লেভেলের ঝামেলা, কেনাকাটা করতে গিয়ে টের পায়। সব শেষ মার্কেটিং শেষ করে জিনিসপত্র ওর আরেক ফ্রেন্ড, ইমরানের বাসায় রেখে আসে। প্লান ঠিক হয়, পরদিন শুভ্র আর সারথি আগে ইমরানের বাসায় আসবে, সাথে সেলিমও আসবে। ওখান থেকে সবাই রেডি হয়ে যাবে কাজি অফিসে। বিয়ের পর্ব শেষ করে ইমরানের বাসার গাড়িতেই রাজশাহী রওনা হবে।

সারথিকে যখন বাসার কাছে পৌছে দিয়ে এল, তখন বিকাল হয়ে গেছে। আসার পথে শুভ্র বেশ অনেকক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সারথি একটু লজ্জা পায়। জিজ্ঞেস করে, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? শুভ্র বলে, আমার প্রেমিকাকে শেষ দেখা দেখতেছি, কাল থেকে তো বউকে দেখবো!! দুইটার ভিতর অনেক তফাত, তুমি বুঝবা না!!

সারথিকে নামিয়ে দিয়ে শুভ্র হাটতে হাটতে ফিরতেছে। সন্ধ্যা হয় হয় ভাব। ইমরান আর সেলিম সম্ভবত এখন শুভ্র’র বাসায়, মানে ৩ ব্যাচেলরের ফ্লাট আর কি। ওরা ব্যাচেলর পার্টি করবে, ঘোষণা দিয়েছে। কি কি প্লান করতেছে, শুভ্র নিজেও তেমন কিছু জানেনা। এত হঠাৎ করে এত কিছু হয়ে যাবে, ও নিজেও ভাবেনি।

আজিমপুর থেকে মোহাম্মদপুর হেটে আসা, বেশ দূর। শুভ্র তখন ধানমন্ডির ভেতর দিয়ে হাটছে। রাত ১০টা মত বাজে। আকাশে হঠাৎ মেঘ করা শুরু হয়েছে, সাথে হালকা ঠান্ডা বাতাস। মনে হচ্ছে, ঝড় শুরু হবে। শুভ্র ঠিক করলো, আজকে বৃষ্টিতে ভিজবে, যতক্ষন বৃষ্টি হয়। একটু পরেই শুরু হল তুমুল বাতাস, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া টাইপ। আরেকটু পরে এল তুমুল বৃষ্টি। শুভ্র তখনো রাস্তায় হাটছে আস্তে আস্তে, ভিজতে ভিজতে। বৃষ্টির তোড়ে হাটা মুশকিল, সাথে একটার পর একটা বাজ পড়তেছে। হাটতে হাটতে ধানমন্ডি লেকের ব্রিজের উপর এসে দাড়ালো। অন্ধকারের ভেতর এত বৃষ্টিতে রিকশাও তেমন চলতেছে না। হঠাৎ চোখের সামনে একটা আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। তারপর আর কিছু মনে নেই।

শুভ্র’র জ্ঞান ফিরে দেখলো, সে হাসপাতালে। সারা গায়ে কেমন যেন একটা জড়তা। একটু পরে জানতে পারলো, ও যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার একেবার পাশে বাজ পড়েছে। বাজের পুরোটা সম্ভবত লেকের পানিতেই পড়েছে। সে অল্পের জন্যে বেচে গেছে। শুধু বাম হাতের বুড়ো আঙুলের নখের নিচে একটু কালো দাগ পরে গেছে। সম্ভবত, ওখানে পুড়ে যাওয়ার কারনে।

হাসপাতাল থেকে সেলিম আর ইমরানকে ফোন দিল। ওরা প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে এলো। সেলিম একটু বেশিই ঘাবড়ে গেছে শুনে, হাজার হলেও মেয়েপক্ষের লোক বলে কথা। হাসপাতাল থেকে একদিন অবজার্ভেশনে রাখতে চাচ্ছিল। ওরা নিজেরা কথা বলে রিলিজ নিয়ে ভোররাতে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে শুভ্র’কে নিয়ে বাসায় গেল। শুভ্র ওদের বললো, কাউকে না জানাতে, সারথি কিংবা ওর বাসায়। বললো, অনেক টায়ার্ড লাগছে, ঘুম দেয়া দরকার। সেলিম বললো, ঠিক আছে, রুমে গিয়ে ঘুমা। আমরা তোকে ১১ নাগাদ তুলে দিবো, বাদ যোহর তোদের বিয়ে কাজি ওফিসে, আমরা কথা বলে রেখেছি।

শুভ্র “আচ্ছা” বলে নিজের রুমে চলে গেল। অসম্ভব ঘুম পাচ্ছে ওর, যেন কত বছর ঘুমায় না। কাপড় চোপড় না চেঞ্জ করেই বিছানায় শুয়ে পড়লো। শোয়ামাত্রই যেন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। মনে হল, ঘুমের রাজ্য থেকে কেউ ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলে ডাকছে।

ওদের বিয়েটা প্লানমাফিক ভালোমতই শেষ হল। ইমরানের বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার শেষে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিল। গাড়িতে সারথি চুপচাপ বসে আছে, শুভ্র সারথির হাত ধরে নিরবতা ভেঙে ওকে বললো, মন খারাপ করো না, রাজশাহী থেকে ফিরে তোমাদের বাসায় দেখা করতে যাবে। যদি মেয়ে চুরির অপরাধে মেরে না ফেলে, তাহলে ইনশাল্লাহ শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে দেখা করে আসবো। সারথি বলে ওঠে, কি বলো এসব, মারবে কেন? আমি কি এতই ফেলনা নাকি! শুভ্র বলে, সেটাও কথা, তাছাড়া সেলিম বড়ভাইও আছে। বড়ভাই আমাদেরকে রক্ষা করবে। বলে গাড়ীর সামনে সিটে বসা সেলিমের ঘাড়ে একটা বাড়ি মারে, বলে, কি বড়ভাই, ঠিক আছে না? সেলিম ঘাড় ঘুরে তাকিয়ে হাসে। সেও যাচ্ছে ওদের সাথে রাজশাহী, মেয়েপক্ষের কেউ না কেউ মেয়ের সাথে যাওয়া উচিত।

শুভ্র’র বাসায় সবাই বউ বরণের প্রিপারেশন নিয়েই ছিল। সে বাড়ির মেজ ছেলে, ২ ভাই আর ১ বোনের মাঝে। ওর ছোটবোন, নিঝুম আর ভাতিঝি, ঝুমুর সারাদিন ধরে ওদের জন্যে বাসরঘর সাজাচ্ছে। ওর মা আর ভাবী, নূপুর ঘরবাড়ি গোছানো আর রান্নার তদারকিতে কাটিয়েছে সারাদিন। শুভ্র বউ নিয়ে বাড়ী পৌছালো রাত ৮টার দিকে। সারথি ওদের বাড়ির মেইন গেটের ভেতরে ঢুকে গাড়ির ভেতর থেকে চারিদিক তাকিয়ে দেখছিল। দোতালা বাড়ী, বেশ পুরানো। কিন্তু, অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়ির এরিয়া। অনেক খোলামেলা, যেটা ঢাকাতে কখনো সে দেখে নাই।

বরণ করা শেষ হতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। শুভ্র’র বাবা যতই বলে, “ওরা এতটা জার্নি করে এসেছে, তোমরা এসব শেষ করো, ওদের একটু বিশ্রাম নিতে দাও।”, ততই যেন নিঝুম আর ঝুমুর নতুন নতুন টাকা নেয়ার ফন্দি করে আর সেলিমের সাথে ঝগড়া শুরু করে। অবশেষে ১০টার দিকে ওরা ছাড়া পেল, নূপুর দুইজনকে বাসরঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে একটু হেসে বললো, “আধা ঘন্টা সময়, যা কিছু করার, শেষ করে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসো, সাড়ে ১০টায় সবাই খেতে বসবো”।

রাতের খাওয়া শেষ করে ওরা রুমের ফিরতে ফিরতে প্রায় ১২টা। রুমে ঢুকেই সারথি বিছানায় গা এলিয়ে দিল। –শুভ্র, সারাদিন তো ফোন অফ করে রেখেছি। এখন কি একটু চালু করবো? আম্মুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।

-তোমার ইচ্ছা, তবে এখন ফোন চালু করলে একটু পরেই ফোন আসা শুরু করবে। কি বলবা এখনই উনাদের মুখের উপর। আর তাছাড়া, সেলিম অলরেডি তোমাদের বাসায় জানিয়েছে। ওর সাথে একটু আগেও কথা হইছে এটা নিয়ে। বাসার সবাই আপসেট তো বটেই। কিন্তু, সিরিয়াস কিছু হয় নাই।

সারথি আর কিছু বললো না। এমন সময় দরজায় টোকা দিয়ে ঝুমুর বলল, “চাচ্চু, দাদু তোমাকে ৫ মিনিটের জন্যে ডাকে”। শুভ্র একটু আসতেছি বলে বের হয়ে গেল। সারথি কয়েক সেকেন্ড একটু ভেবে দৌড়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। ফোন চালু করতেই দেখলো, অনেকগুলো মিসড কল এলার্ট। ওর মাকে একটা মেসেজ দিয়ে ফোন আবার বন্ধ করে দিল, “আম্মু, আমি ভালো আছি। শুভ্র অনেক ভালো একটা মানুষ। ওদের বাসার সবাই আমাদের অনেক আদর দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। তুমি প্লিজ আমার জন্যে টেনশন করো না। যদি পারো, আমাদেরকে মাফ করে দিও আর আমাদের জন্যে দোয়া করো”। একটু পরে শুভ্র রুমে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। সারথি জিজ্ঞেস করলো, আব্বু ডেকেছিল কেন? শুভ্র বললো, তোমাদের বাসায় কাল ফোন দিয়ে কথা বলবে, সেটা বলার জন্যে। সেলিমও ছিল ওখানে। মুরুব্বিরা মুরুব্বিদের সাথে কথা বলবে আর কি!

সারথি তখনও বিছানায় বসে আছে। শুভ্র কথা বলতে বলতে সারথির সামনে গিয়ে বললো, তা ম্যাডাম, এখন কি একটু কাছে আসা যায়? আর কতক্ষন দুরে থাকবেন? সারথি শুভ্র’র কথা শুনে হসে ফেললো, বিছানা থেকে উঠে শুভ্র’র দিকে এগিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।

তখন প্রায় ভোররাত। দুইজনই ঘুমে। সারথি শুভ্র’র পায়ের উপর পা তুলে ঘুমিয়ে আছে। তার নাকি অভ্যাস কোলবালিশ নিয়ে ঘুমানো, এখন শুভ্রই কোলবালিশ আর কি। হঠাৎ, শুভ্র ঘুমের মাঝে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। মনে হল, কেউ ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলে ডাকছে। শুভ্র ঘুমের মাঝে সারথির হাত চেপে ধরলো। সারথি একটু ব্যাথা পেয়ে হাত ছাড়িয়ে আরেক দিকে ঘুরে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। শুভ্র প্রাণপণে চেষ্টা করছে ঘুম থেকে জেগে উঠতে, পারছে না। ওই ডাকটাও মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে কাছে আসছে। ঘুমের ভেতরে মনে হল, কেউ যেন ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলতে বলতে দূরে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু, সে তো যেতে চাই না কোনভাবেই।

শুভ্র লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। দেখলো, ও রাস্তার পাশে বসে আছে। ভরদুপুরের রোদ, রাস্তা আগুনের মত গরম। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, কি ব্যাপার! কোথায় এলাম। কয়েক মিনিট পরে বুঝতে পারলো, ঢাকায় যে ফ্লাটে থাকে, সেটার কাছে একটা মোড়ের কোণায় রাস্তায় শুয়ে আছে সে। বিড়বিড় করতে লাগলো, এখানে এলাম কিভাবে? ছিলাম তো বাসায়, সারথির সাথে,এখন এখানে কিভাবে!! কিছুক্ষন মাথায় হাত দিয়ে বসে থেকে ভাবলো, ফ্ল্যাট যখন কাছে, ওখানেই আগে যাই।

ফ্ল্যাটের কাছাকাছি যেতেই দেখলো সেলিম আর ইমরান দাঁড়িয়ে আছে বাসার নিচে। ওকে দেখেই দৌড়ে ছুটে এল। সেলিম তো বেশ রেগেই বললো, “কিরে পালাইতেছিলি নাকি? সারথির সাথে তুই এমন করার চিন্তা করবি না। জানে মেরে দিবো”। শুভ্র হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান সেলিমকে বললো, “তুই থাম তো। কালকেই ওর না একটা এক্সিডেন্ট হল। কি হইছে না হইছে, তুই বুঝবি ক্যাম্নে”। শুভ্রকে বললো, “শুভ্র, দোস্ত তুই ঠিক আছিস তো? তোর না আজকে সারথির সাথে বিয়ে, আমরা কাজি অফিসে দুপুর ২টায় টাইম দিয়ে আসছিলাম, এখন বাজে সাড়ে ৩টা। তোরে তো সকাল থেকে আমরা খুজতে খুজতে পাগল হওয়ার দশা। ভোরবেলা ঘুমানোর জন্যে তোকে রুমে দিয়ে আইলাম। সকালে তোর রুমে গিয়ে দেখি গায়েব। ফোনও রুমে পরে আছে। সারথি ওদিকে কাঁদতে কাঁদতে পাগল হওয়ার অবস্থা। তোর বাসা থেকে ফোন আসতেছে, সেটাও ধরতেছি না ভয়ে যে, কি বলবো। দোস্ত, ছিলি কই? বলবি তো।”

শুভ্র তখন হতভম্ব হয়ে আছে। কি বলবে, বুঝতেছে না। কি হয়েছে, কিছুই বুঝতেছে না। রাতে ঘুমালো সারথির সাথে, রাজশাহীতে। সকালে এখন এখানে। কি মনে করে জিজ্ঞেস করলো, “ ইমরান, দোস্ত আজকে কয় তারিখ?” প্রশ্ন শুনে সেলিম বললো, “তোর কি মাথা ঠিক আছে? নিজে বিয়ের ডেট ঠিক করলি? এখন নিজে বলিস কয় তারিখ? আজকে ১২ তারিখ, ১২ই মে। সারথি তোর জন্যে অপেক্ষা করতেছে, তোকে বিয়ে করার জন্যে”।

শুভ্র আকাশ থেকে পড়লো। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ভাবলো, মনে হয় ইমরান আর সেলিম মজা করতেছে। মাথায় একটা আইডিয়া এল। বললো, “দোস্ত, মাথার ভেতর ভালো লাগতেছে না। মোড়ে গিয়ে এককাপ চা খাই চল, তারপর কথা বলি”। ইমরান একটু চুপ করে থেকে বললো, “আচ্ছা চল। সেলিম, তুই সারথিকে ফোন দে একটু। জানা যে, ওর জামাইকে খুজে পাইছি”। শুভ্র মনে মনে ভাবলো, মানে কি, সারথিও এদের সাথে যোগ দিয়ে আমার সাথে মজা করবে!

সেলিম ফোন দিলো। তারপর শুভ্র’র দিকে ফোন বাড়িয়ে দিল, “নে ধর, তোর বউ কথা বলবে”। শুভ্র ফোন কানে নিয়েই শুনলো, ওই পাশে সারথি ফোপাচ্ছে। শুভ্র কাপা কাপা গলায় বললো, “হ্যালো”। সারথি এবার কান্নায় ভেঙে পড়লো ফোনে, “শুভ্র, তুমি কই ছিলা? ঠিক আছ তো? আমি সেই কখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি ইমরান ভাইদের বাসায়। তোমার জন্যে সব ছেড়ে আজকে চলে এসেছি। তোমার কিছু হলে আমি বাচবো না……”। এরপরে সারথি কথা বলতেই আছে, কিন্তু শুভ্র’র মাথায় কিছুই আর ঢুকছে না। এক পর্যায়ে বললো, “সারথি, মাথার ভেতর ভালো লাগছে না। তাই আমরা একটু চা খেতে যাচ্ছি। ওখান থেকে বাসায় ফিরেই তোমার কাছে চলে আসতেছি”। বলে ফোন সেলিমকে দিয়ে দিল।

মোড়ে চায়ের দোকানে এসে লাল চা অর্ডার দিয়ে চায়ের দোকানে টিভির দিকে তাকালো। টিভিতে একটা নিউজ চ্যানেল চলতেছে। টিভিস্ক্রিনের নিচের দিকে, বামপাশে বড় বড় করে লেখা, ১২ই মে। ও সারথির কান্না শোনার পরে এরকমই কিছু আশংকা করছিল। Something really weird is happening.

চা শেষ করে বাসায় ফিরলো। ফিরতে ফিরতে ভাবছিলো, হয়তো উল্টাপাল্টা কিছু না। অসুস্থ ছিল কাল রাতে, তাই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে ঘুমের ভেতর। স্বপ্নের ভেতর সারথিকে বিয়ে করা শুরু করে কাছেও পেয়ে গেছে। বাসায় ফিরে বাথরুমে গেল ফ্রেশ হতে, বের হতে হবে তাড়াতাড়ি। টি-শার্টটা খোলার পিঠের কাছে একটু জ্বলাজ্বলা ভাব বুঝতে পারলো। এটা আবার কিভাবে হলো? মনে পড়লো, গতকাল রাতে, ওদের বাসর ঘরে সারথিকে আদর করার সময় ও শুভ্র’র পিঠে খামচি দিয়েছিল বের কয়েক বার, তার মাঝে একবার বেশ জোরে।

শুভ্র এবার মাথায় হাত দিয়ে বাথরুমের মেঝেতে বসে পড়লো।

এর মানে কি? সে ১২ই মে দুপুরে সারথিকে বিয়ে করেছে, দু’জনে একই বিছানায় রাত কাটিয়েছে। তারপর ঘুমিয়ে গিয়ে আবার ১২ই মে দুপুরে চলে এসেছে। কিভাবে সম্ভব এটা? কে উত্তর দিবে?

Published by

Unknown's avatar

Lost in a broken world

A biologist by education. For now, trying hard to get my head into the scientific world. Will figure out the rest when it comes.

Leave a comment