“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”
ফজলু ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকাবে নাকি চিন্তা করে। একটু চিন্তা করে না তাকানোটাই ঠিক বলে মনে হয় তার কাছে। তাই সে আর পিছনে ফিরে না তাকিয়ে আবার হাটা শুরু করে।
ফজলু সাধুগঞ্জ বাজারের দিকে যাচ্ছে। বাজারটা আগে অনেক ছোট ছিল। ৫-৬ বছর আগেও বর্ষাকালে বাজারের রাস্তায় কাঁদার চোটে হাঁটা যেত না। আর সৈয়দ মেম্বারের মুদির দোকানটা বাদ দিলে আর কোন বড় দোকানও ছিল না। এখন বাজারের আর সেই দিন নেই। লোকে-লোকে লোকারন্য হয়ে গেছে। এখন আশপাশের দশ গ্রামের মাঝে সাধুগঞ্জ বাজারই সবচেয়ে বড়।
ফজলু বাজারে রইস আলীর দোকানে চাকরি করে। রইস আলীর বাজারে কয়েকটা দোকান আছে। ফজলু কাপড়ের দোকানটাতে বসে। তার কাজ হল দোকানের হিসাব-নিকাশ দেখাশোনা করা। পাশাপাশি রইস আলীর সব দোকানের সার্বিক হিসাবেও সাহায্য করে। পয়সাকড়ির দিক দিয়ে রইস আলী খুবই কৃপণ হলেও কি কারণে যেন ফজলুকে তিনি খুবই বিশ্বাস করেন। তবে এটাও সত্যি যে, ফজলু তার সাথে কখনো বেঈমানী করে নাই।
আজ সোমবার। এখনও ফজরের আযান হয়নি। গতকাল রবিবার বাজারে হাটবার ছিল। ফজলু সাধারনত হাটবারের রাতে দোকানেই থাকে। সব দোকানের হিসাবের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় রাত ২-৩ টা বাজে। তারপর দোকানের চৌকির উপরই পাটি-বালিশ পেতে ঘুমিয়ে যায়।
আজ রাতে ফজলের ঘুম আসছিল না। চৈত্র মাসের গরম একটা কারণ হতে পারে। তাই ফজলু ভাবলো নদী থেকে গোসল করে আসার জন্যে। বাজার থেকে নদীর ঘাট ১০ মিনিটের হাটা পথ। দোকান বন্ধ করে সে বেড়িয়ে পড়লো। নদীর ঘাটে এসে একটা গামছা পড়ে নদীতে নেমে গেল।
ফজলের নদী নিয়ে এক ধরনের ঘোরের মত আছে। নদীতে নামলেই সে তার দম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাঁতার কাটে। আর ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাসের কারণে অনেক সময় অনেকদূরে চলে যায়। আজকে পানিতে নামার পড়ে ফজলের কেমন যেন লাগলো। কেন যেন মনে হল, বেশি দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। ফজলু এমনি কোন সময় এইসব বিষয় পাত্তা দেয় না। কিন্তু আজ কেন যেন তার মনে হল, থাক আজকে না হয় নাইবা গেলাম।
আজকে আর সাঁতার কাটবে না ভেবে সে পানিতে ডুব দিল। ডুব দেয়ার পরপরই পানির নিচ থেকে তার মনে হল কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকলো। ফজলু ভাবলো, কেউ বোধ হয় ঘাটে এসেছে আর তাকে দেখে ডাক দিয়েছে। দ্রুত পানির উপরে এসেই বললো “কে?”
কিন্তু তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। ঘাটে তো নাইই, আশেপাশে কোথাওই কেউ নেই। সে মনে ভুল ভেবে আবার পানিতে ডুব দিলো।
এবার স্পষ্ট গলা। “কি, ফজলু মিয়া, কথা কও না ক্যান?” ফজলু পানির মাঝ থেকে একেবারে লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু উপরে উঠে দেখে কেউ নেই। ফজলু ভয় পেল কিনা, নিজেও ঠিক বুঝলো না। গ্রামে তার সাহসের তারিফ করে সবাই। আর গরিবের ছেলে হওয়ায় পড়ালেখাতে ভালো থাকলেও খরচ চালাতে না পেরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, বাবা আর বড়ভাই দুইজনই মারা যাই একই বছরে। যদিও এখন সে সংসারে একা, মা মারা গেছে গতবছর আর বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। তার বাড়িতে সে একাই থাকে। কোনদিন কোথাও ভয় পায়নি। আসলে পায়নি বলা ঠিক হবে না। ফজলু মনে করে, সে ভয় পাওয়া থেকে ভয় পাওয়ার কারণ নিয়ে চিন্তা করে বেশি। আর কারণ ধরতে পারলে সব কিছুরই প্রতিকার করা যায়। এই চিন্তা করার পদ্ধতিটা ও শিখেছিল স্কুলে, বিজ্ঞানের সমাদ্দার স্যারের কাছে। স্যার বছর দুই হলো, মারা গেছেন। ফজলুকে দেখে আফসোস করতেন, এত মেধাবী একটা ছেলে, দোকানে কাজ করে বেড়াচ্ছে।
সমাদ্দার স্যারের এই শিক্ষার কারনেই হোক, কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক, অন্য কেউ হলে যেখানে ভয়ে দৌড় দিত, ফজলু তখন নদীপাড়ে বসে চিন্তা করতে লাগলো যে সে শুনলোটা কি?
হঠাৎ করে মনে আসলো যে, আজ সোমবার, হাটবারের পরের দিন। এই দিন রইস আলী ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই দোকানে চলে আসে, আগেরদিনের হিসাব দেখার জন্যে। তাড়াতাড়ি দোকানে ফেরা দরকার। ফজলু উঠে গামছা পড়েই প্যান্টটা গলায় ঝুলিয়ে হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।
নদীর কিনার ধরে আসতে আসতে রাস্তায় উঠতেই ফজলু স্পষ্ট শুনলো,
“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”
কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ফজলের মাথায় অনেক কিছু খেলে গেল। তারপর পিছনে না ফিরে সে আগের মতই হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।
বাজারের দিকের রাস্তাটা একটু পরেই গিয়ে ক্ষেতের মাঝে পড়েছে। ক্ষেতের মাঝে মানে রাস্তার দু’ধারে যতদূর চোখ যায়, শুধু মাঠ। রাস্তাটা অনেকখানি উঁচু মাঠ থেকে। বর্ষাকালে আউশের ক্ষেত ডুবে যায়, কিন্তু রাস্তাটা ডোবে না। কৃষকেরা হাঁটু পানিতে শুয়ে পড়ে থাকা ধান কেটে নিয়ে যায়। অঞ্চলে সবারই বাড়িঘর গ্রামের একপাশে আর অন্যপাশ দিয়ে এই বিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা। বৃষ্টির সময় নদী আর এই বিল এক হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সাগরের মাঝ দিয়ে আরেক দ্বীপে রাস্তাটা চলে গেছে। এই জন্যেই বোধ হয় ফজলের গ্রামের নাম ভাসানগা। তবে এই রাস্তাটা খুব যে লম্বা, তাও না। আধা কিলো, এক কিলো মত হবে হয়তো। ভাসানগা থেকে সাধুপুর বাজার প্রায় এক কিলোর একটু বেশি। শুকনো মৌসুমে বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায় আর থাকে শুধু নদী।
ফজলু বেশ জোরে জোরে পা চালাচ্ছে। আজকে কি সে ভয় পেয়েছে নাকি দোকানে তাড়াতাড়ি পৌছানোর জন্যে, সেটা পরিস্কার না। আগেও একবার এরকম হয়েছে। সেটা যদিও অনেক আগের কথা।
তখন সে ক্লাস টেনে পরে সম্ভবত। এরকম সময়েরই ঘটনা, মানে চৈত্র মাসে। সে রাতে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল তার বড়ভাইয়ের নৌকা নিয়ে। বেশ অনেকদূর চলে গিয়েছিল। দুই ধারে শুধু ক্ষেত। কোন মানুষজনও নেই। সে তখন জাল তুলে বিছাইতেছে। ওইদিন মাছ পাচ্ছিল না। সেজন্যে মেজাজও একটু খারাপ ছিলো। এমন সময় হঠাৎ কে যেন জিজ্ঞেস করলো, “কি ফজলু মিয়া, এই কয়ডা মাছ দিয়া চলবো??” ফজলু মাথা না তুলেই বললো “হ, নদীর মাছ আজকে মনে হয় পলাইছে। এতগুলা খ্যাপ মারলাম, মাছই পাইলাম না।” এই বলে মাথা তুলে দেখে কেউ নেই। সে মনে করেছিল, পাশ থেকে কোন নৌকা যাওয়ার সময় মাঝি কথাগুলো বলছিল।
ফজলু টান পায়ে হাঁটছে। কিছুক্ষণের মাঝেই বাজারে পৌছে গেল। বাজারের মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে দোকানে ঢুকে কাপড় ছেড়ে আজকে না ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, একটু পরেই রইস আলী চলে আসবে। শুধু শুধু বিছানা পাতার ঝামেলা করা ঠিক হবে না।
———————–১ম অধ্যায় শেষ—————–
রইস আলীর আজকে মেজাজ যথেষ্টই খারাপ। কালকে হাটবারে বেচাকেনা খুব ভালো হয়নি। এমনিতেই ছোট বাজার। তাই সব ব্যবসায়ীই হাটবারের আশায় থাকে, যে ঐদিন বেচাকেনা ভালো হলে সারা সপ্তাহের হিসাব উঠে যাবে। কিন্তু গতকাল হাটবারে তার দোকানে কর্মচারীরা নিজেদের মাঝে একটু ঝামেলা করে ফেলেছে। অনেক খদ্দের এসে ফিরে চলে গেছে। গ্রামের মানুষ এগুলো মনে রাখে। দেখা যাবে পরের হাটবারে তার দোকানে ওরা আর আসে নাই। আবার কম বেতনে এখন কর্মচারী পাওয়াও আরেক সমস্যা। তিনি এমনিতেই কাউকে বিশ্বাস করেন না। তবে অন্যদের চেয়ে ফজলু ছেলেটা আলাদা। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। আবার পরিবারে কেউ নাই বলে বেতন কম দিলেও কিছু বলে না। এই ফজরের ওয়াক্তের পরে গিয়েই তিনি দেখবেন এরই মধ্যে ফজলু অনেক খানি হিসাবের কাজ গুছিয়ে ফেলেছে। এমন কর্মচারী মালিকের পছন্দ না হয়ে যায় না।
যদিও আজকে রইস আলীর মন খারাপ অন্য কারণে। তার ছেলে, খসরু ইদানীং বেশ বেয়াড়া হয়ে গেছে। গেল অঘ্রানে ১৪ তে পা দিয়েছে ছেলেটা। এই বয়সেই সে তার বড় বোন আর মাকে মারধর করা শুরু করেছে। তিনি নিজে মানুষটা কৃপণ হলেও মেয়েছেলের গায়ে হাত তোলা তার পছন্দ না। তার কথা হল, মেয়েছেলে হল ঘরের আসবাবপত্রের মত, ঘরের সৌন্দর্য। মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হলে অন্য কথা। কিন্তু পারতপক্ষে তিনি ওদের গায়ে হাত তোলেন না। সেখানে তার ছেলে এই বয়সেই যা শুরু করেছে, বড় হলে যে কি করবে সেটাই চিন্তার বিষয়। তিনি নিজেও ছোটবেলায় বড় বোনদের সাথে মারামারি করেছেন। কিন্তু তার ছেলে যা করে, সেটাকে একই অর্থে বলা যায় না।
গতকাল সন্ধ্যায় ছেলেটা তার বড় বোনকে কাটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এমন মার মেরেছে যে সারা গায়ে রক্তের দাগ পড়ে গেছে। মেয়েটার বিয়ের কথা চলছে। ছেলে ঢাকায় থাকে। মাসখানেক পরে সামনের বড় ঈদে ছেলে বাড়ি ফিরলে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। রইস আলীর বউ মাজেদা বেগমও তার মেয়ে নাসরিনকে নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তার মাঝে আছেন। উপযুক্ত মেয়ে ঘরে থাকলে তাকে মায়ের টেনশন যদিও নতুন কিছু না, কিন্তু মাজেদার চিন্তার কারণ হল তার ছেলে খসরু। ভাই-বোনের মাঝে কত মিল-মহব্বত থাকে। অথচ তার এই ছেলে বড় বোনকে দেখতেই পারে না। কালকে রাতে বোনকে যে মারটা মারছে, মাজেদা নিজেও মনে হয় মেয়েকে কখনো এত মারেন নাই। মেয়ের চেহারার এখন যে অবস্থা হইছে, তাতে আল্লাহই জানে মাসখানেকের মাঝে সারবে কিনা। এখন সেই মেয়ে হাটতেই পারছে না। বিবাহযোগ্যা এমন মেয়েকে মাইরের কথা বাইরে ছড়ালে লোকে ছিঃ ছিঃ করবে। তাই তিনি কাউকে না জানিয়ে রইস আলী নিজেই মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। অন্যসময় হলে কাউকে দিয়ে পাঠাতেন। কালকে তার মা সফেদা বেগম এমনভাবে চিল্লানো শুরু করলেন যে না নিয়ে গিয়ে পারেন নি। মেয়ের চিকিৎসাতে অনেকগুলো টাকা জলে গেল। তারপরও কিছু করারও নেই। মান-সম্মান হারালে সেটা ফেরত পাওয়া মুশকিল। মেয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে গেলে বাঁচা। নাহলে ছেলেপক্ষের কাছে কি লজ্জা পাওয়া লাগবে, কে জানে।
কালকে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। তখন ছেলেকে সামনে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেন নাই। ধরে রামপিটুনি দিয়েছেন। সেই পিটুনিতে ছেলেও এখন শয্যাগত। এখন আবার রইস আলী ভয়ে আছেন যে, ছেলে সুস্থ হয়ে উঠলে কি করবে? কারণ, এত মার খেয়েও সে একটুও কাদে নি। তিনি তো ছোটবেলায় এমন ছিলেন না। কারো হাতে মার খেলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেদেছেন। ছেলে এমন হল কিভাবে? সফেদা বেগম বলেন, “রইস হল ওর বাপের মত। লগে আছে, কিন্তু পিছে নাই। সাথে আমার শ্বশুরের গুণ পাইছে, কিপটামো। আর ওর পোলাডা আইছে আসমান থেইকা সগির আলীর মত হয়ে।” সগির আলী হল সফেদা বেগমের দেবর। দুনিয়ার বদ একটা লোক। সবার কপাল ভালো যে, অল্প বয়সে সাপের কামড়ে মরছে। কিন্তু ঐ অল্প বয়সেই যতরকম খারাপ কাজ আছে, তার সবই করেছে আর কত মানুষের বদদোয়া যে কুড়াইছে, তার ঠিক নাই।
রইস আলী দোকানের সামনে গিয়ে দেখলেন, দোকান বন্ধ। বাইরে থেকে তালা দেয়া। হাটবারের দিন রাতে ফজলু সবসময় দোকানে থাকে। নিজের অজান্তেই তার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই দোকানে বেচাকেনা ভাল হয় নাই, তার উপর বাড়িতে এইসব ঝামেলা। হারামজাদা ফজলুডা বেশি লাই পেয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কুত্তারে বেশি লাই দিতে নাই, দিলে মাথার উপর উঠে বসে থাকে। ছেলেটারে তিনি বিশ্বাস করেন, তাই বলে এখন তাকে এই রাস্তার কুত্তাটার জন্যে দোকানের বাইরে বসে থাকতে হবে। এই হারামীটার কাছে দোকানের চাবি দেয়াটাই ভুল হয়েছে। আজকেই এইডারে লাত্থি দিয়ে বের করে দিতে হবে। হারামজাদাটা কতক্ষণ তাকে বাইরে দাঁড় করায়ে রাখবে, আল্লাহই জানে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি দোকানের পাশে চায়ের স্টলের বাইরে রাখা বেঞ্চে বসে রাগে ফুঁসতে লাগলেন । বসে থাকতে থাকতে তার মাথায় এলো, ফজলু আবার তার দোকানের ক্যাশ গাপ করে সরে পড়লো না তো? আজকাইলকের পোলাপাইন বলে বিশ্বাস নেই।
একটু পরে মনে হল, ধুর, তিনি কি চিন্তা করছেন? তিনি নিজে মানুষ চিনতে এত বড় ভুল করতেই পারেন না। খসরুর বয়সে তিনি মানুষের বাড়িতে কাপড় ফেরি করে বেচে বেড়াতেন। সেখান থেকে এতদূর এসেছেন। আজ বাজারে তার তিনটা দোকান। তিনি মানুষ চিনতে ভুল করার লোক না। আচ্ছা ফজলুর কোন বিপদ হয়নি তো আবার? এতবড় বাজারে হাতে গোনা কয়েকটা লোক রাতে থাকে। তাও দোকানের ভেতর থেকে কিছু হলে বাইরের কেউ টেরও পাবে না যে কি হয়ছে। বাজারে পাহারাদার আছে। কিন্তু বিপদের সময় দেখা যায় এরা ঘুমাচ্ছে, এটা তার নিজের অভিজ্ঞতা। মানুষজন চিনতে ভুল করেন না, কিন্তু তার সম্পদের উপর অনেক মানুষেরই নজর আছে। আর হাটবারের রাতে ক্যাশের টাকা হিসাবের জন্যে দোকানেই থাকে। ফজলু একা মানুষ। তার উপর একটু সরল সোজা। ওকে সরায়ে দিয়ে লুট করে নিয়ে যাওয়া খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা না।
নাহ, সেটাই বা কি করে সম্ভব? দোকান তো তালা দেয়া বাইরে থেকে। আর তালা দেয়ার ধরন থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, ফজলু দিছে। তাহলে পোলাডা গেল কই? কয়েকদিন আগে আবার বাজারের পিছনের খালে কারা কল্লাফেলা লাশ ফেলে গেছিল। তারপর থেকে নাকি বাজারে রাতে প্রতিদিন নিশির ডাক শোনা যায়। ছেলেটা আবার এসব জিনিসের পাল্লায় পড়লো না তো? যদিও ফজলুকে কোনদিন এসব জিনিসে ভয় পেতে শোনেন নাই। উল্টা পোলাডা একদিন তারে বুঝাইছে যে, ওগুলো হল মানুষের কল্পনা। যে কয়দিন নিশির ডাক শোনা যায়, সবদিনই বাইরে বেশ বাতাস ছিলো। আর বাজারের পেছনে সৈয়দ মেম্বারের ভুট্টার ক্ষেত। বাতাসে ভুট্টার মোচায় বাড়ি লেগে, আর পাতার ঘষার শব্দ থেকে ঐসব নিশির ডাক শোনা যায়। রইস আলী জীবনে অনেকের কাছ থেকে অনেক কথা শুনেছেন নিশির ডাক নিয়ে। কিন্তু এমন অদ্ভুত ব্যাখ্যা ফজলু ছাড়া আর কারো কাছে শোনেন নাই। এমন ছেলে আর যাই হোক, ভয় পাওয়ার কথা না।
বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলেন বেঞ্চে। নাহ, এখন ছেলেটার জন্যে আসলেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। দূরে বাজারের জেলেদের ভ্যান দেখতে পাচ্ছেন। মাছের নিলাম আর ভাগ-বাটোয়ারা বেচাকেনা শুরুর আগেই করতে হয়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বেড়িয়ে পড়লেন ফজলুর খোঁজে। ছেলেটা বাড়িতে যাবে না নিশ্চিত, কারণ ওর নাকি বাড়িতে থাকতে ভাল লাগে না। তবে মাছ ধরতে যেতে পারে। বর্ষার সময় রাতে মাছ ধরার নেশা আছে ছেলেটার। ভোরবেলা খলুই ভরে মাছ নিয়ে রইস মিয়ার বাড়ি চলে যায়। তার স্ত্রী, মাজেদার হাতে মাছের খলুই ধরায়ে দিয়ে চলে আসে দোকানে। মাজেদা বেগম মাছ রান্না করে সকালে খাবার পাঠায়ে দেয় দোকানে রইস আলী আর ফজলুর জন্যে।
বাজার থেকে নদী বেশি দূরে না। তাই ফজলুর বাড়িতে যাবার আগে নদীর পাড়টা ঘুরে যাবার চিন্তা করলেন রইস আলী। একটু জোর পায়েই হাটছেন। ছেলেটার জন্যে তার আসলেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
————————-২য় অধ্যায় শেষ————-
ফজলু চোখ মেলে দেখলো সে খড়ের পালার উপর পড়ে আছে। সে ঘুমাইছে কোন সময় আর এখন কোথায় আছে, কিছুই মনে করতে পারলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, সে তাদের বংশের পুরাতন ভিটার পাশে খড়ের উপরে পড়ে আছে। নাম যদিও পুরাতন ভিটা, মানুষ এখনো বাস করে। গ্রামের একেবারে আরেক প্রান্তে এই ভিটা। ফজলুর দাদা খাজা মিয়া এই ভিটা তার শরিকদের কাছে বেচে দিয়ে যান। তবে গ্রামের লোকেরা বলে যে ঠিক বেচে না, ফজলুর দাদার কাছ থেকে তার শরিকরা এটা জোর করে লিখে নেয়।
ফজলু এই ভিটায় এসেছে অনেক ছোটবেলায়। আজ এখানে কেন এসেছিল, সে তাও মনে করতে পারলো না। ভিটা পুরাতন হওয়ায় এখানে গাছপালা অনেক বেশি। তাদের শরিকদের কয়েকজন এখনো এখানে বাস করে। যদিও এদের সাথে তার সম্পর্ক খুবই খারাপ।
কেমন জানি ক্লান্ত লাগছে তার। ইচ্ছা করছে আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে। কিন্তু গাছের ফাক দিয়ে রোদ এসে একেবারে চোখের উপরে লাগছে। হাত দিয়ে আলোটা একটু আড়াল করতে গিয়ে ফজলু দেখলো তার হাতে চামড়ার হাতমোজা আর হাতমোজা রক্তে ভিজে আছে।
ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলো ফজলু। কিন্তু চোখে প্রায় কিছুই দেখছে না, ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথায় বসে আছে, সেটাও বুঝলো না। কি এক উলটা পালটা স্বপ্ন দেখছিল, যে নিজেও বুঝলো না। একেবারে বাস্তব মনে হচ্ছিলো হাতের রক্ত লেগে থাকা। ফজলু একটু ভয় পেয়েছে, বুক ধুকধুক করছে। বসে থেকে অন্ধকারে একটু পরে চোখ সয়ে এলে বুঝলো, সে আসলে ভুট্টাক্ষেতের ভেতরে। ক্ষেতের ভেতরেই অল্প দূরে মনে হল, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কে বুঝতেছে না, কিন্তু অন্ধকারের মাঝেও একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে। ফজলু জিজ্ঞেস করলো, কে ওখানে? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে অজান্তেই গলাটা একটূ কেপেও উঠলো তার।
লোকটা সামনে এগিয়ে এল আস্তে আস্তে। ফজলু তখনো মাটিতে বসে আছে, হাতে হেলান দিয়ে বসে আছে, অনেকটা ক্লান্ত হয়ে। লোকটা অন্ধকারে আস্তে আস্তে ফজলুর মুখের সামনে আসছে। ফজলু অন্ধকারে চিনতে পারছে না, কে লোকটা। লোকটা আরো কাছে এগিয়ে এলো, আরো কাছে, ফজলুর একেবারে মুখের সামনে চোখে চোখে রেখে তাকালো। ফজলু ভীত চোখে তাকিয়ে রইলো লোকটার মুখের দিকে। হঠাৎ করে অনেক চেনা মনে হল লোকটাকে। ফজলু কিছু সময় লোকটার মুখ আর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝলো, লোকটা দেখতে অবিকল ফজলুর মত, শুধু একটু বয়স্ক। ফজলুর শিরদাড়া দিয়ে ভয়ের একটা স্রোত বয়ে গেল, গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। এবার লোকটা কথা বললো, ফজলুকে জিজ্ঞেস করলো, “ফজলু মিয়া, কেমন আছো?”
শুনে ফজলু সম্ভবত ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, কিংবা এরকমই কিছু, কিন্তু সে কিছু বুঝলো না, কি হচ্ছে। পরে যখন আস্তে আস্তে দুলুনিতে চেতনা ফিরলো, তখন বুঝলো যে, ওর হাত-পা মুখ বেধে লোকটা ওকে ঘাড়ে করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।
ওর উউ শব্দ শুনের লোকটা সম্ভবত বুঝলো যে, ওর জ্ঞান ফিরেছে। লোকটা কথা বলা শুরু করলো,
– ফজলু, ভয় পাইও না। তোমারে মারার জন্যে আমি আসি নাই, বরং তোমার ভবিষ্যৎ বাচাইতে আসছি। তুমি যদি আমার কথা কাউরে না কও, তাইলে তোমারে মাইরা আমার ফায়দা কি? তুমি আর আমি তো একই কথা, নাকি? খালি একাল আর সেকালের পার্থক্য।
– উউ উউউউ উউউ (ফজলু মুখ বাধা অবস্থায় সম্ভবত প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলো, যেটা তার হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টাতে বোঝা গেল।)
– শুনো ফজলু, তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা আমার নাই। তুমি শান্ত হও, তারপর তুমার সাথে কথা বলবো। অনেক কথা পড়ে আছে, যা তুমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। কিন্তু, তুমারে কথা দিতে হবে যে, ঝাপাঝাপি করবা না। করলে তোমার ক্ষতি করা লাগবো আমার। আমি চাইতেছি না, সেটা করতে, কারন তোমার ক্ষতি হইলে আমারও ক্ষতি। চলো, বাড়ীতে গিয়া বসে কথা বলি।
(কার বাড়ি, সেটা ফজলুকে না বললেও সে বুঝি নিলো, ওর নিজের বাড়ির কথাই বলছে। লোকটার কথা শুনেই মনে হয়, সে ফজলুকে নিয়ে সবকিছু জানে। আবার, দেখতেও অবিকল ফজলুর মত। ফজলুর মনে হচ্ছে, যে সম্ভবত এখনো স্বপ্নের মাঝে আছে। একটু পরেই ঘুম ভেঙে দেখবে, দোকানের বাইরে চৌকিতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু, ফজলুর ঘুম ভাঙলো না। লোকটা ওকে ঘাড়ে নিয়ে ওদের বাড়ীর দিকে যেতে থাকলো। একটু দূরে বাড়ী। আর মেঠো পথ। কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। ফজলু কিছু আর বলার চেষ্টা করলো না। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কিছু করার নাই। লোকটা ফজলুর বাড়িতে এসে থামলো। বাড়ি এমনিতেও ফাকা, কেউ তো থাকে না ফজলু ছাড়া। বাড়ির ভেতরে গিয়ে বারান্দায় ফজলুকে ঘাড় থেকে নামিয়ে রেখে বললো – )
– ফজলু, শোনো, আমি তুমার সাথে কথা কইতে আসছি এখানে। অনেক কথা পড়ে আছে, সময় আজকে রাতটাই শুধু। তুমি ছাড়া এগুলো অন্য কাউকে বলেও লাভ নাই। মুখ খুইলা দিলে তুমি কি করবা, বুঝতাছি না। তাই কিছু মনে কইরো না, তোমার মুখটা আপাতত বান্ধাই থাকুক।
(ফজলু ঘাড় নাড়লো। বিশ্বাস করা ছাড়া আর কিছু করারও নাই ওর। লোকটা বলা শুরু করলো।)
– শোন, আমার এই গল্পের শুরু আসলে তুমারে দিয়া। আমাদের চেহারাতে অনেক মিল, এটা তুমি আগেই বুঝে গেছ, আমি ধরে নিচ্ছি। কারন, আমিই আসলে তুমি, শুধু বয়সে আলাদা। তোমার, আমার আমাদের একখান ক্ষমতা আছে। আমরা চাইলে আগের জীবনে যাইতে পারি, তবে সেটা শুধু এক রাতের জন্যে। তবে পরের জীবনে যাইতে পারি না, মানে ভালো বাংলায় যেইডারে কয় ভবিষ্যৎ। যেমন ধরো, আমি এই যে আসছি তোমার কাছে, ১৭ বছর ভবিষ্যৎ থেকে, কিন্তু থাকতে পারুম খালি আজকের রাতটা।
(ফজলু মুখ বাধা অবস্থায়ই হাসার চেষ্টা করলো। লোকটা বলে কি!)
– তুমি কি হাসতেছো? হ, শুনলে হাসি পাওয়ারই কথা। কিন্তু, যা কইলাম, তার পুরোটাই সত্যি। তুমার ছোটবেলার কথা মনে আছে? ৫-৬ বছর বয়সে একবার পানিতে ডুবতে গেছিলা?
(ফজলু ঘাড় নাড়লো। মনে আছে ওর।)
– আসলে অত মনে থাকার কথা না। মিঞা ভাই কইছিল, পানিতে ডুইবা গেছিলাম। সে আমারে ঘাড়ে করে তুলে আনছিল। আমার নাকি অনেকক্ষন জ্ঞান ছিল না, নিশ্বাস নিতেছিলাম না। ৫-১০ মিনিট পরে নাকি জ্ঞান ফিরছিল। আমি যদিও বিশ্বাস করি নাই। ১০ মিনিট নিঃশ্বাস না নিলে কেউ আবার বাচে নাকি! মিঞা ভাই কইছিল, আমি নাকি জ্ঞান ফিরে কইছিলাম, আব্বার সাথে কথা হইছে।
(ফজলু ঘাড় নাড়লো। ও শুনেছে মিঞাভাইয়ের কাছে।)
– বুঝলা ফজলু, আমি বহুত চিন্তাভাবনা করে বাইর করছি। ঐ পানিতে ডুবে যাওয়ার পরই আমাদের আগের সময়ে যাওয়ার ক্ষমতাটা জন্ম নেয়। চিন্তা করে দেখো, অনেকবার তুমার কাছে মনে হইছে যে, এইরম ঘটনা কালকেও তো হইছে। এ রকম মনে হওয়ার কারন হল, তুমি নিজেই অনেকবার এভাবে অতীতে গেছো না বুঝেই। এটা আমার তুমার, মানে আমাদের কাছে নিত্য রুটিনের মত।
(ফজলু কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো। লোকটা বলে কি‼ তবে, কথা সত্যি যে, অনেকবার এমন হয়ছে।)
– যাই হোক, এইবার বলি এখন তোমার কাছে আইছি ক্যান। আর তুমার সাথে কথা বলারই বা কারন কি!
– ফজলু, তুমার বিয়া সামনে সপ্তাহে, নাসরিনের সাথে। অবাক হইও না। আমি জানি, তুমি তারে পছন্দ করো। তুমার নিজের কিছু নাই, তাই তুমি তারে বলতে চাও নাই। সামনের সপ্তাহের নাসরিনের বিয়ে নিয়ে কিছু ঝামেলা হইবো, তুমি রেডি থাইকো, তুমি তারে পাইবা।
– আর কাইলকা রাতে খসরু আমার হাতে মারা গেছে। আমি ওর ধড়-মাথা আলাদা কইরা দিছি। ভয় পাইবা না। তোমার, মানে আমার কথা এর মাঝে কেউ জানতে পারবো না।
(ফজলু খসরুর কথা শুনে একটু নড়াচড়া করার চেষ্টা করলো। লোকটা বলে কি! রইস আলীর ছেলে, খসরুরে মেরে ফেলেছে! নিজেকে মুক্তু করার চেষ্টা করতে লাগলো। লোকটা উৎসুক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষন চেষ্টা করে ফজলু ক্ষান্ত দিলো। লোকটা আবার কথা বলা শুরু লাগলো।)
– ফজলু, আমারে খুনী ভাইবো না। তুমিও যা, আমিও তাই। আমাদের রক্তে খুনি হওয়ার ইচ্ছা নাই। কিন্তু, ঐ শুয়োরের বাচ্চা আমার মেয়েটারে শেষ কইরা দিছে।
– হ, ফজলু, আমার মেয়ে, তোমারও ভবিষ্যতের মেয়ে, আঁখি। মাইয়াটারে আমি বাইরের মানুষ থেকে রক্ষা করতে পারলেও কখনো বুঝি নাই, ওর নিজের মামা এত বড় সর্বনাশ করবো। খসরুর চরিত্র ভালো কোন আমলেও ছিল না, এটা তুমিও জানো। তাই বলে, নিজের আপন ভাগ্নির এত বড় ক্ষতি করবো, কখনো ভাবি নাই। মাইয়াটা আমারে কইলো, “আব্বা, তুমি মামারে আগে চিনতে পারলা না ক্যান! সে মানুষ কেমন, তুমি আগে থেকেই জানতা।” বইলা আম্মা আমার তার ঘরে গিয়া ঢুকলো। আর ঘর থেকে বের হইলো না। সকালে ডাকতে গিয়া দেখি, মা আমার ঘরের ফ্যানের সাথে ঝুইলা আছে। না পারলাম মেয়েডার মান-সম্মান রাখতে, না পারলাম ওর জীবনডা বাচাইতে।
– বুঝলা ফজলু, অনেকদিন পেছনের জীবনে আসতাম না। তোমার, মানে আমার জীবনে তো আসলে আপন বলে কেউ নাই। নাসরিন আমার জীবনে আকাশের চাদের আলোর মত। বিয়ার কয় বছর পরই সংসারে আখি চইলা আইলো। আমার জীবনে আর কি লাগে, কও। এখন আমার সব শেষ, কিছুই নাই আর। তাই আমি তুমার জীবনটা বাচাইতে আইছি।
(ফজলু চুপচাপ রইলো। কি করবে, বুঝতেছে না। বিশ্বাস করেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।)
– ফজলু, আমার গল্প কিন্তু শেষ। আমি জানি, আমার কথা তোমার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু, তুমি আমার আজকের কাজের ফলাফলটুকু যেন পাও, এটা আমি চাই। আমার আখি মা তোমার কোলে আসুক আর বেচে থাকুক তোমার কাছে।
– ভোর হয়ে আসতেছে। তোমার মুখের আর হাতে বাধন আমি খুলে দিতেছি। তুমি দোকানে যাও। রইস আলী তোমারে পাগলের মত খুজতেছে। সে ভাবছে, তোমার সাথে খারাপ কিছু হয়ছে।
(লোকটা ফজলুর মুখ আর হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে লম্বা পায়ে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ফজলু তাড়াতাড়ি পায়ের বাধন খুলে বাড়ির বাইরে এসে দেখল, কেউ নেই।)
কিছুক্ষন হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থেকে ফজলু বাজারের পথ ধরলো। দোকানে হেটে যেতে যেতে আলো ফুটে গেল ভালভাবেই। দোকানে পৌছে দেখলো বাজারে জেলেদের জটলা ওর দোকান, মানে রইস আলীর দোকানের সামনে। জিজ্ঞেস করতেই জানলো, আজকেও নাকি বাজারের পিছনে মাথাছাড়া লাশ পড়ে আছে। একটু আগে এক জেলের চোখে পড়েছে।
ফজলুকে কেউ না বললেও ফজলু বুঝলো, ওটা খসরুর লাশ। সে কিছু একটা অজুহাত দিতে লাশের দিকে না গিয়ে দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসে রইলো। এর মানে কি? ওর মত দেখতে লোকটা যা যা বলেছিল, সেগুলো তাহলে সত্যি?