সময়টা ১৯৯৩ সাল।
গল্পের মূল চরিত্রের নাম সাফিয়া। বয়স ২৭-২৮ হবে, সুন্দরী এবং বিবাহিত। জামাই সরকারী একটা ব্যাঙ্কে অফিসার। সাড়ে ৬ বছরের এক ছেলে আছে তাদের, নাম আসিফ।
সাফিয়া গিয়েছে তার নানার বাড়ি। গ্রামের নাম চড়ুইপাড়া। সাথে তার নানী খাইরুন্নেসা আর ছেলে আসিফ। খাইরুন্নেসা গত মাসে গিয়েছিলেন নাতনীর বাড়িতে ঘুরতে। আসিফের স্কুল বন্ধ, তাই সাফিয়া এই সুযোগে নানীকে নিয়েই তার বাড়ী যাচ্ছে।
মেইন রোড থেকে গ্রামের বাড়িটা বেশ ভিতরে। ৩-৪ মাইল হবে। ভ্যানে যেতে হয়। রাস্তা মানে এবড়ো-থেবড়ো মাটির রাস্তা, তবে শুকনা। মেইন রোড থেকে বাড়ীতে পৌছাতে প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেল। ঝাকুনি তো আছেই। পৌঁছাতে পৌছাতে বিকেল গড়িয়ে যায়।
সাফিয়ার নানাবাড়িটা বেশ বড়। প্রায় ২ বিঘা জমির উপর বাড়ি। ওর ছোটখালা এই বাড়ীতেই থাকে। ওর নানা গ্রামের মাতব্বর ছিল সেই আমলে।
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে সব খালাতো ভাই-বোন মিলে আড্ডা দিতে বসে একসাথে। এই গ্রামে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নেই। একে তো ফাল্গুন মাস, গ্রামে শীতের ভাব এখনো আছে। তার উপর ৮টা বাজতে বাজতেই মনে হয় নিশুতি রাত। আড্ডায় সিদ্ধান্ত হয়, পরের দিন VCV ভাড়া করে আনা হবে, সাথে ব্যাটারী। সবাই মিলে কাল রাতে ছবি (মুভি) দেখা হবে। বিদ্যুৎ না থাকায় সবাই রাত ৮-৯টার মাঝেই ঘুমায়ে পড়ে। শুধু ওর খালাতো বোন, মিনি জাগে রাত ১২টা অব্দি। তার সামনে এসএসসি পরীক্ষা।
সাফিয়ার ঘুমানোর অভ্যাস জানালার পাশে। জানালার পাশে শুয়ে বাইরের অন্ধকার দেখতে তার অদ্ভুত রকম ভাল লাগে। কি কারনে, কে জানে। বাইরে ফাল্গুন মাসের কুয়াশা, বেশ ঘন, তবে শীত অনেক কম। গায়ে মোটা কাথা দিলে লেপ আর লাগে না। তার ছেলে আসিফ এই বাড়ীতে আসলে তার মাকে প্রায় ভুলেই যায়। মামাতো ভাইবোন আর গ্রামের ছেলেপেলের দল নিয়ে সারাদিন ঘোরে, আবার রাতে ঘুমায়ও তার মামা, নাহলে খালাদের সাথে। শুধু ক্ষিদা লাগলে মায়ের কাছে এসে ক্যান ক্যান করে। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমায়ে গেল সাফিয়া। সারাদিন ধকল তো আর কম যায় নি।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। নতুন জায়গায় এলে যা হয় আর কি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে একটু সময় লাগে বুঝতে যে, কোথায় আছি। এত রাতে ঘুম কেন ভাঙলো, বুঝলো না সাফিয়া। আবার ঘুমানোর চেষ্টা করার সময় মনে হল, একটু হয়তো বাথরুমে যাওয়া দরকার।
এই বাড়ীতে বাথরুমে যাওয়া এক বিশাল সমস্যা। এমনিতেই ভালো বাথরুম নাই, তার উপর যা ছিল, সেটাও নাকি পরশু ভেঙে গেছে। এখন একমাত্র উপায় হল বাড়ীর পাশে একটু বনের মত আছে, সেখানে যাওয়া। ওর নানী শুয়ে ছিল ওর পাশে। দেখলো, উনি তখনো জেগে আছে। সাফিয়া তাকে ডেকে তুললো, একা যেতে ভয় লাগে।
নানীকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হল। বদনাতে পানি নিয়ে হাটতে হাটতে বেশ একটু দূরে চলে গেল। বন এদিকটায় বেশ ঘন, কিন্তু সামনে গিয়ে হালকা হয়ে গেছে। নানীকে দাঁড়াতে বলে সে আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল। একটু দূরে আমিন মন্ডলের বাড়ি দেখা যাচ্ছে, সাফিয়ার দূরসম্পর্কের মামা। মাঝে বেশ বড় একটা খোলা মাঠ। সাফিয়া একটু এগিয়ে কিছুক্ষন দাড়ালো, আশেপাশে কেউ আছে কিনা বোঝার জন্যে। খুব যে অন্ধকার, তা না। আকাশে মনে হয় চাঁদ আছে, কিন্তু কুয়াশাতে অত ভাল দেখা যাচ্ছে না। আর তাছাড়া আসার সময় কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে, সাথে কেউ আসতেছে। যাই হোক, কিছুক্ষন দাড়ায়ে থেকে যেই না চিন্তা করতেছে যে বাথরুম করতে বসবে এখন, ঠিক তখনি “ঝুপ” করে একটা শব্দ হল।
সাফিয়া ঘুরে নানীকে জিজ্ঞেস করলো যে, উনি কিছু কিছু শুনছে নাকি !! খাইরুন বেগম উল্টা বিরক্ত হয়ে বললেন যে, বনের ভিতরে আসছিস, শব্দ তো একটু হবিই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর।
সাফিয়া ভাবলো আসলেই তো তাই। বনের ভিতরে এমন শব্দ তো স্বাভাবিক।
হঠাৎ কি কারনে তখন তার চোখ চলে আমিন মামার বাড়ির পাশের বরই গাছের দিকে। চারিদিকেই কুয়াশা, কিন্তু একটু ভাল করে তাকিয়ে মনে হল, গাছটার উপর কিছু একটা বসে আছে, কুয়াশার থেকে একটু বেশি সাদা, ধবধবে সাদা রঙের। একটু ভাল করে তাকিয়ে থাকার পর সাফিয়ার মনে হল, ওটা জীবন্ত কিছু একটা, নড়তেছে এবং ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
নানী পেছন থেকে তাগাদা দেয় “কিরে, হইছে তোর?”
সাফিয়া তখন কিছুটা আবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে আছে বরই গাছটার দিকে। হঠাৎ তার মনে হল, ঐটা পাখি জাতীয় কিছু হবে হয়তো। কিন্তু কোন পাখি কি এত সাদা হয়?
এবার সে স্পষ্ট দেখলো, গাছের উপর থেকে ধবধবে সাদা জিনিসটা ধুপ করে নিচে পড়লো। একটা “ধপ” করে শব্দও শুনলো সে। নানী ততক্ষনে বুঝছে যে, কিছু একটা সমস্যা বোধ হয় হইছে। সে জিজ্ঞেস করলো, কিরে ঐদিকে তাকায়ে এতক্ষন ধরে কি দেখিস?
সাফিয়া বলল, নানী ঐখানে বরই গাছের নিচে কি ধবধবে সাদা রঙের কিছু দেখতেছো? খাইরুন বেগম চোখে খুবই কম দেখেন, এক চোখ প্রায় নষ্ট আর আরেক চোখে ছানি পড়া। তবে তিনি জানেন যে, ঐ বরই গাছটার আছে। আগেও শুনেছেন। একটু ঘাবড়ে গেলেও তিনি এগিয়ে এসে একটু তাকিয়ে থেকে নাতনীকে সাহস দিয়ে বললেন, ও কিছু না। সাদা কাপড়-টাপড় কিছু হবে, আমিনদের বাড়ি থেকে হয়তো উড়ে এসে পড়ে আছে, নয়তো দেখ গিয়ে ওদের শয়তান কুকুরটার কাজ। তুই তাড়াতাড়ি তোর কাজ শেষ কর।
সাফিয়া দেখলো, তার নানির কথা ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বলল, আচ্ছা নানী, ঠিক আছে, তুমি ঐ দিকে গিয়ে বস, আমি শেষ করে আসতেছি।
খাইরুন বেগম একটু সরে গিয়ে দাড়ালেন। সাফিয়া বাথরুম করার জন্যে আবার বসতে যাবে, ঠিক তখন ঐ সাদা কাপড়টার দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন ঐটা একটু উচু ঢিবির মত হইছে, আগে পুরাটাই মাটিতে লেপ্টে ছিল। একটু তাকিয়ে থেকে সাফিয়ার মনে হল, জিনিসটা জীবন্ত এবং আস্তে আস্তে নড়তেছে এবং উচু হচ্ছে, কিন্তু পুরাটাই সাদা কাপড়ে ঢাকা।
কিছুক্ষনের মাঝেই সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা প্রায় অর্ধেক মানুষ সমান উচু হয়ে গেল। সাফিয়া কিছুটা সম্মোহিতের মতই তাকিয়ে ছিল। ওর তাকিয়ে থাকা দেখে ওর নানী আবার জিজ্ঞেস করলো, কিরে তাকিয়ে আছিস কেন এখনো ঐদিকে?
সাফিয়া বলল, নানী জিনিসটা নড়তেছে আর আস্তে আস্তে বড় হইতেছে। খাইরুন বেগম বুঝলেন আর যাই হোক, জিনিসটা ভালো না, আর সুন্দরী মেয়েদের এরকম অনেক সময়ই হয়, এমনকি বিয়ের পরেও। তিনি শুনেই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, দেখি চলে আয় তো। তোর কিছু করা লাগবে না। চলে আয় আমার সাথে।
কিন্তু মনে হল, সাফিয়া ওর নানীর কথা শুনতে পেল না, কোন উত্তরও দিল না। খাইরুন বেগম বুঝলেন যে, অবস্থা সুবিধার না। এত রাতে কেউ পাশেও নেই যে, ডাক দিবেন। তিনি উঠে দাড়িয়ে সাফিয়ার দিকে যাওয়া শুরু করলেন। একটু অবাক হলেও তিনি লক্ষ করলেন, তার হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার শরীরের ওজন দুই মানুষ সমান, কিংবা ঘাড়ে কেউ বসে আছে। এবার তিনি ভয় পেলেন। ছোটবেলা থেকে অনেক কিছুই দেখেছেন, এমন কখনো হয়নি। তিনি জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলেন, আর তার নাতনীর দিকে এগুতে থাকলেন। কিন্তু এই কয়েক কদম পথ যেতেই তার যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার দশা।
অন্যদিকে, সাফিয়া তখন পুরোপুরি সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। সে দেখতেছে যে, সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা আস্তে আস্তে বড় হতে হতে প্রায় তার সমান লম্বা হয়ে গেছে। হঠাৎ তার মনে হল, এটা আর কেউ না, এটা সে নিজে। কাফনের ধবধবে সাদা কাপড়ে ঢাকা সে নিজে। হঠাৎ দেখলো জিনিসটা তার দিকে এগিয়ে আসা শুরু করেছে। খুব আস্তে আস্তে, কিন্তু এগিয়ে আসছে। ভয়ে তার আত্তি শুকিয়ে গেল। চেষ্টা করলো দৌড়ে পালানোর জন্যে। কিন্তু পা একটুও নাড়াতে পারলো না। যেন অনন্তকাল ধরে দাড়িয়ে আছে, নড়বার কোন শক্তিও নাই। সাদা কাফনের ভেতরে থাকা অন্য জগতের কেউ তাকে ছোয়ার জন্যে আসছে।
হঠাৎ বুঝলো, কেউ তার শরীর ধরে নাড়া দিচ্ছে। অনেক কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, তার নানী। অন্যদিকে খাইরুন বেগম তার নাতনীর চেহারা দেখে চমকে উঠলেন। সাফিয়ার চোখ এমনিতেই অনেক অনেক ভাসা-ভাসা। এখন যেন চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার দশা। উপরন্তু, সাফিয়া সাধারণ মেয়েদের থেকে বেশি লম্বা হওয়ায় আবছা অন্ধকারের মাঝে ওর পুরো চেহারায় একটা দানবীয় ভাব চলে এসেছে। খাইরুন বেগম জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়ছেন আর সাফিয়াকে ধরে ঝাকি দিচ্ছেন।
অন্যদিকে সাফিয়া বুঝতেছে তার এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। তার নানী তাকে ক্রমাগত ঝাকাচ্ছে আর ডাকছে। কিন্তু ডাকটা মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে আসা। সে অনেক চেষ্টা করছে পা নাড়ানোর জন্যে। সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা তার দিকে এগুচ্ছে আস্তে আস্তে। আর কিছুক্ষনের মাঝেই সেটা মাঠ ছেড়ে বনের মাঝে চলে আসবে। তার পালানো উচিত। অনেক চেষ্টা করছে সে তার পা নাড়ানোর জন্যে। একটু পরে মনে হল, পায়ে একটু বল পাচ্ছে। কিন্তু সাদা জিনিসটাও মনে হল তার স্পিড বাড়িয়েছে। কিছুক্ষনের মাঝে সে পায়ে বল পুরোটাই ফিরে পেল। তখন সাদা জিনিসটা বেশ কাছে চলে এসেছে। হঠাৎই তার পায়ে যেন অসুরের বল চলে এল। নানীর হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে দিল দৌড়। পিছে ঘুরে দেখল, সাদা জিনিসটা তাদের থেকে একটু দূরে, পিছে পিছে আসছে, বেশ জোরে। সাফিয়া তখন দৌড়াচ্ছে। তার নানীও ভয় পেয়েছে, তাই সেও চেষ্টা করছিলো তাল রাখার জন্যে। কিন্তু সাফিয়ার গায়ে তখন যেন রাজ্যের শক্তি। সে তার নানীকে মোটামুটি হিচড়ায়ে নিয়ে এগিয়ে চললো। কিছুক্ষনের মাঝেই তারা তাদের বাড়ির উঠানের সীমানায় পৌছে গেল। সাফিয়া পিছে তাকিয়ে আর কিছু দেখলো না।
দৌড়ানোর পায়ের আওয়াজে সাফিয়ার খালার ঘুম ভেঙে গেছে। সেও ওদের সাথেই শুয়ে ছিল। সে তাকিয়ে দেখলো, পাশে তার মা আর সাফিয়া কেউই নেই, উল্টোদিকের জানালা দিয়ে বাড়ির বাইরে উঠানে সাফিয়ার মত লম্বা কাউকে দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে হারিকেন নিয়ে উনি বাইরে চলে এলেন। দেখলেন, তার মায়ের শাড়ী কয়েক জায়গা ছড়ে গেছে। সাফিয়া মাটিতে বসে দরদর করে ঘামছে আর হাপাচ্ছে। খাইরুন্নেসা অল্প কথায় তার মেয়েকে বোঝাচ্ছেন যে, ওদের সাথে কি হয়েছে। বাইরের উঠানে আলো আর কথার শব্দ শুনে বাড়ীর প্রায় সবাই জেগে গেছে।
সাফিয়া জানে না, সাদা জিনিসটা কি ছিল। জানার কোন কৌতুহলও তার নাই। শুধু এইটুকু জানে, আজকে ওখান থেকে পালিয়ে না আসতে পারলে এই প্রিয় মানুষদের মুখ হয়তো আর দেখতে পেত না।