সমান্তরাল

শুভ্র আর সারথি।

অল্পদিনের পরিচয় ওদের। শুভ্র’র ফ্রেন্ড সেলিমের দূর সম্পর্কের কাজিন হল সারথি। সেলিমের ভাগনির জন্মদিনের প্রোগ্রামে গিয়ে ওদের প্রথম পরিচয়। দু’জনের দ্বিতীয়বার দেখা হয় মাসখানেক পরে, বেশ কাকতালীয়ভাবে, সিলেটে ঘুরতে গিয়ে, যদিও দুইজন আলাদা ট্রাভেল গ্রুপের সাথে। ওখানেই সামান্য পরিচিত হিসেবে ফোন নাম্বার বিনিময়, ঢাকাতে ফিরে ফোনে কথা বলা, তারপর একসাথে টুকটাক ঘোরাঘুরি, রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন কথা বলা। এক মাসের মাথায়, ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র কয়েক দিন পরে শুভ্র সারথিকে প্রপোজ করে। সারথির একটু সময় চাওয়ার কথা বলে সপ্তাহ দুই নিরব থাকে, তারপর সেটা নিয়ে দু’জনের অভিমান, যোগাযোগ বন্ধ।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সারথি রোড এক্সিডেন্টে পড়লো। “সিরিয়াস না, কিন্তু সিরিয়াস হতে পারতো” টাইপ সিএনজি এক্সিডেন্ট। ফলাফল, পা মচকে দুই সপ্তাহ ঘরে শুয়ে থাকা। ঘরে বসে থাকার প্রথম দিনই কোন এক কারনে শুভ্র’র ফোন, সারথি ধরবে না, ধরবে না করেও শেষে ধরলো। শুভ্র এক্সিডেন্টের কথা শুনে পুরো চুপ করে গেল, একটু পরে ফোন রেখেও দিলো, সারথির কাছে একটু অবাক লাগলেও কিছু বললো না। ঘন্টাখানেক পরে একটা মেসেজ এলো, “তোমার এক্সিডেন্ট শুনে মনে হল, জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি এক মূহুর্তের ভিতরে। তোমাকে পছন্দ করি, সেটা আগেও বলেছি। কিন্তু কতখানি, নিজেও বুঝতাম না, একটু আগে বুঝলাম। সম্ভবত আমার কাছে এটা আর পছন্দের পর্যায়ে নেই। আমাকে তোমার কাছে আসতে না দিলেও, নিজে সাবধান থেকো।”

দুই দিন পরে, মার্চের ১৭ তারিখ, শুভ্র একটা মেসেজ পেলো সারথির কাছ থেকে, “কাছে আসার অনুমতি দিলাম”।

সারথি’র পা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর দুইজনের আবার দেখা, তবে দু’জনের অনুভুতিই একটু আলাদা। কিছুদিন পরে দেখা গেল, দু’জনের দিনে একবার দেখা না হলে দুইজনই অস্থির থাকে। ওদের দু’জনের রিলেশনের কথা সেলিম প্রথম জানে শুভ্র’র কাছ থেকে। শুনে একটু গম্ভীর হয়ে বললো, তুই কি ওর বিষয়ে সবকিছু জানিস? শুভ্র না জানার কথা বললে সেলিম বলে, সারথি হয়তো তোকে কয়েকদিন পরে বলবে এম্নিতেও। তবে, ওর ছোটবেলা থেকেই বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, যতদূর জানি। ছেলে দেশের বাইরে থাকে। এই কারণেই সারথি কারো সাথে কখনো রিলেশনে জড়ায়নি।

মে মাসের ১০ তারিখ। শুভ্র সারথির জন্যে অপেক্ষায় বসে আছে। বেশিরভাগ দিন সারথিই সময়মত আসে আর শুভ্র আসে দেরি করে। আজকে শুভ্র একটা বিশেষ একটা চিন্তা করে এসেছে সারথির জন্যে। একটু পরে সারথি এলো। কিছু কথাবার্তা বলে শুভ্র একটু চুপ করে যায়। ও চুপ করে আছে দেখে সারথি বলে,

-কি হলো, এত চুপ কেন? কি নিয়ে চিন্তা করতেছ এত?

-একটা বিষয় নিয়ে ভাবতেছি। কিভাবে বলবো, বুঝতেছি না।

-বলো। তারপরে, আমিও ভাবি সেটা নিয়ে। দুইজনে আজকে ভাবতে ভাবতে দিন পার করে দিবো। (বলে হেসে ফেলে)।

-(কিছুক্ষন মুগ্ধ দৃষ্টিতে সারথির হাসির দিকে তাকিয়ে) আমাকে ভালোবাসো?

-(একটু হতচকিত হলেও সামলে নিয়ে) তোমার কি মনে হয়? আমার তো মনে হয়, বাসি। (মুচকি হাসি)

-(একটু সিরিয়াস ভয়েসে) তাহলে ঐদিন সেলিম বললো, বাইরে থাকা একজন্ ভদ্রলোকের কথা। (সারথি একবারেই বুঝে গেলো কি বিষয়)

-(কিছুক্ষন চুপ থেকে) সবকিছু কি সবাই সবসময় কন্ট্রোল করতে পারে? ধরে নাও, আমার লাইফের ওই পার্টটা আমি কন্ট্রোলে আনতে পারি নি এখনো, চেষ্টায় আছি, জানিনা সামনে পারবো হয়তো।

-(রাগী গলায়) কন্ট্রোল করতে না পারলে আমার সাথে এখানে বসে আছো কেন? ভিসা নিয়ে বাইরে চলে যাও। আটকায়ে রাখছে কে?

বলে শুভ্র রাগে একটূ দূরে চলে গেল। সারথি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নিঃশব্দে চোখে পানি ফেলতে শুরু করলো। শুভ্র এই প্রথম ওর সাথে রাগী গলায় কথা বললো। কয়েক মিনিট পরে শুভ্র খেয়াল করলো, সারথির চোখেও পানি। আস্তে আস্তে হেটে গিয়ে মাটিতে সারথির সামনে বসে ওর হাতদুটো ধরলো।

-(নরম গলায়) একটু তাকাও আমার দিকে।

-(সারথি তাকায়। চোখের পানিতে কাজল মিশে অদ্ভুত অবস্থা)।

-বিয়ে করবা আমাকে?

-(সারথি কেপে ওঠে) মানে, কি বলো? এভাবে হয় নাকি?

-তবে, কিভাবে হয়? তুমি যদি ওইদিকে কন্ট্রোল করতে না পারো, তাহলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ কি? আজ হোক, কাল হোক, পালিয়েই তো বিয়ে করতে হবে। সেলিমকে বললে ও বুঝবে আমার ধারণা।

-(সারথি চুপ করে থাকে)।

-তোমাকে এখনি উত্তর দিতে হবে না। ভেবে দেখো। তোমার জায়গাতে অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে সম্ভব না। জানিনা, তোমার দিক থেকেও চিন্তাটা এমন কিনা। ভাবনা চিন্তা করে দেখো, কি করতে চাও।

ওরা আরো কিছুক্ষন বসে থেকে চলে যায় ওই দিনের মত। রাত আড়াইটার দিকে শুভ্র’র কাছে সারথির একটা মেসেজ আসে, “হ্যাঁ”।

পরদিন সকালে শুভ্র সেলিমকে জানায়। সেলিম বেশ খুশিই হয়। শুধু বলে, আমি এখন থেকে তোর শ্বশুরপক্ষের লোক, বড়ভাই বলে ডাকবি। সিদ্ধান্ত হয়, পরদিন, মানে ১২ই মে কাজি ওফিসে গিয়ে বিয়ে করবে ওরা।

শুভ্র ওর বাড়িতে পছন্দের কথা আগেই জানিয়ে রেখেছিল। বাসা থেকে কিছু টাকা চেয়ে নেয়। ওর বাবা বলে দেয়, বিয়ের পর বউকে নিয়ে সোজা ওদের বাড়িতে চলে যেতে, রাজশাহীতে। শুভ্র সারথিকে সাথে নিয়ে বিয়ের কেনাকাটা করে। আগে শুনেছে, এটা ঝামেলার কাজ। কিন্তু কোন লেভেলের ঝামেলা, কেনাকাটা করতে গিয়ে টের পায়। সব শেষ মার্কেটিং শেষ করে জিনিসপত্র ওর আরেক ফ্রেন্ড, ইমরানের বাসায় রেখে আসে। প্লান ঠিক হয়, পরদিন শুভ্র আর সারথি আগে ইমরানের বাসায় আসবে, সাথে সেলিমও আসবে। ওখান থেকে সবাই রেডি হয়ে যাবে কাজি অফিসে। বিয়ের পর্ব শেষ করে ইমরানের বাসার গাড়িতেই রাজশাহী রওনা হবে।

সারথিকে যখন বাসার কাছে পৌছে দিয়ে এল, তখন বিকাল হয়ে গেছে। আসার পথে শুভ্র বেশ অনেকক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সারথি একটু লজ্জা পায়। জিজ্ঞেস করে, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? শুভ্র বলে, আমার প্রেমিকাকে শেষ দেখা দেখতেছি, কাল থেকে তো বউকে দেখবো!! দুইটার ভিতর অনেক তফাত, তুমি বুঝবা না!!

সারথিকে নামিয়ে দিয়ে শুভ্র হাটতে হাটতে ফিরতেছে। সন্ধ্যা হয় হয় ভাব। ইমরান আর সেলিম সম্ভবত এখন শুভ্র’র বাসায়, মানে ৩ ব্যাচেলরের ফ্লাট আর কি। ওরা ব্যাচেলর পার্টি করবে, ঘোষণা দিয়েছে। কি কি প্লান করতেছে, শুভ্র নিজেও তেমন কিছু জানেনা। এত হঠাৎ করে এত কিছু হয়ে যাবে, ও নিজেও ভাবেনি।

আজিমপুর থেকে মোহাম্মদপুর হেটে আসা, বেশ দূর। শুভ্র তখন ধানমন্ডির ভেতর দিয়ে হাটছে। রাত ১০টা মত বাজে। আকাশে হঠাৎ মেঘ করা শুরু হয়েছে, সাথে হালকা ঠান্ডা বাতাস। মনে হচ্ছে, ঝড় শুরু হবে। শুভ্র ঠিক করলো, আজকে বৃষ্টিতে ভিজবে, যতক্ষন বৃষ্টি হয়। একটু পরেই শুরু হল তুমুল বাতাস, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া টাইপ। আরেকটু পরে এল তুমুল বৃষ্টি। শুভ্র তখনো রাস্তায় হাটছে আস্তে আস্তে, ভিজতে ভিজতে। বৃষ্টির তোড়ে হাটা মুশকিল, সাথে একটার পর একটা বাজ পড়তেছে। হাটতে হাটতে ধানমন্ডি লেকের ব্রিজের উপর এসে দাড়ালো। অন্ধকারের ভেতর এত বৃষ্টিতে রিকশাও তেমন চলতেছে না। হঠাৎ চোখের সামনে একটা আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। তারপর আর কিছু মনে নেই।

শুভ্র’র জ্ঞান ফিরে দেখলো, সে হাসপাতালে। সারা গায়ে কেমন যেন একটা জড়তা। একটু পরে জানতে পারলো, ও যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার একেবার পাশে বাজ পড়েছে। বাজের পুরোটা সম্ভবত লেকের পানিতেই পড়েছে। সে অল্পের জন্যে বেচে গেছে। শুধু বাম হাতের বুড়ো আঙুলের নখের নিচে একটু কালো দাগ পরে গেছে। সম্ভবত, ওখানে পুড়ে যাওয়ার কারনে।

হাসপাতাল থেকে সেলিম আর ইমরানকে ফোন দিল। ওরা প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে এলো। সেলিম একটু বেশিই ঘাবড়ে গেছে শুনে, হাজার হলেও মেয়েপক্ষের লোক বলে কথা। হাসপাতাল থেকে একদিন অবজার্ভেশনে রাখতে চাচ্ছিল। ওরা নিজেরা কথা বলে রিলিজ নিয়ে ভোররাতে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে শুভ্র’কে নিয়ে বাসায় গেল। শুভ্র ওদের বললো, কাউকে না জানাতে, সারথি কিংবা ওর বাসায়। বললো, অনেক টায়ার্ড লাগছে, ঘুম দেয়া দরকার। সেলিম বললো, ঠিক আছে, রুমে গিয়ে ঘুমা। আমরা তোকে ১১ নাগাদ তুলে দিবো, বাদ যোহর তোদের বিয়ে কাজি ওফিসে, আমরা কথা বলে রেখেছি।

শুভ্র “আচ্ছা” বলে নিজের রুমে চলে গেল। অসম্ভব ঘুম পাচ্ছে ওর, যেন কত বছর ঘুমায় না। কাপড় চোপড় না চেঞ্জ করেই বিছানায় শুয়ে পড়লো। শোয়ামাত্রই যেন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। মনে হল, ঘুমের রাজ্য থেকে কেউ ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলে ডাকছে।

ওদের বিয়েটা প্লানমাফিক ভালোমতই শেষ হল। ইমরানের বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার শেষে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিল। গাড়িতে সারথি চুপচাপ বসে আছে, শুভ্র সারথির হাত ধরে নিরবতা ভেঙে ওকে বললো, মন খারাপ করো না, রাজশাহী থেকে ফিরে তোমাদের বাসায় দেখা করতে যাবে। যদি মেয়ে চুরির অপরাধে মেরে না ফেলে, তাহলে ইনশাল্লাহ শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে দেখা করে আসবো। সারথি বলে ওঠে, কি বলো এসব, মারবে কেন? আমি কি এতই ফেলনা নাকি! শুভ্র বলে, সেটাও কথা, তাছাড়া সেলিম বড়ভাইও আছে। বড়ভাই আমাদেরকে রক্ষা করবে। বলে গাড়ীর সামনে সিটে বসা সেলিমের ঘাড়ে একটা বাড়ি মারে, বলে, কি বড়ভাই, ঠিক আছে না? সেলিম ঘাড় ঘুরে তাকিয়ে হাসে। সেও যাচ্ছে ওদের সাথে রাজশাহী, মেয়েপক্ষের কেউ না কেউ মেয়ের সাথে যাওয়া উচিত।

শুভ্র’র বাসায় সবাই বউ বরণের প্রিপারেশন নিয়েই ছিল। সে বাড়ির মেজ ছেলে, ২ ভাই আর ১ বোনের মাঝে। ওর ছোটবোন, নিঝুম আর ভাতিঝি, ঝুমুর সারাদিন ধরে ওদের জন্যে বাসরঘর সাজাচ্ছে। ওর মা আর ভাবী, নূপুর ঘরবাড়ি গোছানো আর রান্নার তদারকিতে কাটিয়েছে সারাদিন। শুভ্র বউ নিয়ে বাড়ী পৌছালো রাত ৮টার দিকে। সারথি ওদের বাড়ির মেইন গেটের ভেতরে ঢুকে গাড়ির ভেতর থেকে চারিদিক তাকিয়ে দেখছিল। দোতালা বাড়ী, বেশ পুরানো। কিন্তু, অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়ির এরিয়া। অনেক খোলামেলা, যেটা ঢাকাতে কখনো সে দেখে নাই।

বরণ করা শেষ হতে আরো ঘন্টাখানেক লাগলো। শুভ্র’র বাবা যতই বলে, “ওরা এতটা জার্নি করে এসেছে, তোমরা এসব শেষ করো, ওদের একটু বিশ্রাম নিতে দাও।”, ততই যেন নিঝুম আর ঝুমুর নতুন নতুন টাকা নেয়ার ফন্দি করে আর সেলিমের সাথে ঝগড়া শুরু করে। অবশেষে ১০টার দিকে ওরা ছাড়া পেল, নূপুর দুইজনকে বাসরঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে একটু হেসে বললো, “আধা ঘন্টা সময়, যা কিছু করার, শেষ করে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসো, সাড়ে ১০টায় সবাই খেতে বসবো”।

রাতের খাওয়া শেষ করে ওরা রুমের ফিরতে ফিরতে প্রায় ১২টা। রুমে ঢুকেই সারথি বিছানায় গা এলিয়ে দিল। –শুভ্র, সারাদিন তো ফোন অফ করে রেখেছি। এখন কি একটু চালু করবো? আম্মুর সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।

-তোমার ইচ্ছা, তবে এখন ফোন চালু করলে একটু পরেই ফোন আসা শুরু করবে। কি বলবা এখনই উনাদের মুখের উপর। আর তাছাড়া, সেলিম অলরেডি তোমাদের বাসায় জানিয়েছে। ওর সাথে একটু আগেও কথা হইছে এটা নিয়ে। বাসার সবাই আপসেট তো বটেই। কিন্তু, সিরিয়াস কিছু হয় নাই।

সারথি আর কিছু বললো না। এমন সময় দরজায় টোকা দিয়ে ঝুমুর বলল, “চাচ্চু, দাদু তোমাকে ৫ মিনিটের জন্যে ডাকে”। শুভ্র একটু আসতেছি বলে বের হয়ে গেল। সারথি কয়েক সেকেন্ড একটু ভেবে দৌড়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করলো। ফোন চালু করতেই দেখলো, অনেকগুলো মিসড কল এলার্ট। ওর মাকে একটা মেসেজ দিয়ে ফোন আবার বন্ধ করে দিল, “আম্মু, আমি ভালো আছি। শুভ্র অনেক ভালো একটা মানুষ। ওদের বাসার সবাই আমাদের অনেক আদর দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। তুমি প্লিজ আমার জন্যে টেনশন করো না। যদি পারো, আমাদেরকে মাফ করে দিও আর আমাদের জন্যে দোয়া করো”। একটু পরে শুভ্র রুমে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। সারথি জিজ্ঞেস করলো, আব্বু ডেকেছিল কেন? শুভ্র বললো, তোমাদের বাসায় কাল ফোন দিয়ে কথা বলবে, সেটা বলার জন্যে। সেলিমও ছিল ওখানে। মুরুব্বিরা মুরুব্বিদের সাথে কথা বলবে আর কি!

সারথি তখনও বিছানায় বসে আছে। শুভ্র কথা বলতে বলতে সারথির সামনে গিয়ে বললো, তা ম্যাডাম, এখন কি একটু কাছে আসা যায়? আর কতক্ষন দুরে থাকবেন? সারথি শুভ্র’র কথা শুনে হসে ফেললো, বিছানা থেকে উঠে শুভ্র’র দিকে এগিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।

তখন প্রায় ভোররাত। দুইজনই ঘুমে। সারথি শুভ্র’র পায়ের উপর পা তুলে ঘুমিয়ে আছে। তার নাকি অভ্যাস কোলবালিশ নিয়ে ঘুমানো, এখন শুভ্রই কোলবালিশ আর কি। হঠাৎ, শুভ্র ঘুমের মাঝে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। মনে হল, কেউ ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলে ডাকছে। শুভ্র ঘুমের মাঝে সারথির হাত চেপে ধরলো। সারথি একটু ব্যাথা পেয়ে হাত ছাড়িয়ে আরেক দিকে ঘুরে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। শুভ্র প্রাণপণে চেষ্টা করছে ঘুম থেকে জেগে উঠতে, পারছে না। ওই ডাকটাও মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে কাছে আসছে। ঘুমের ভেতরে মনে হল, কেউ যেন ওকে “আয় শুভ্র, আয়” বলতে বলতে দূরে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু, সে তো যেতে চাই না কোনভাবেই।

শুভ্র লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। দেখলো, ও রাস্তার পাশে বসে আছে। ভরদুপুরের রোদ, রাস্তা আগুনের মত গরম। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, কি ব্যাপার! কোথায় এলাম। কয়েক মিনিট পরে বুঝতে পারলো, ঢাকায় যে ফ্লাটে থাকে, সেটার কাছে একটা মোড়ের কোণায় রাস্তায় শুয়ে আছে সে। বিড়বিড় করতে লাগলো, এখানে এলাম কিভাবে? ছিলাম তো বাসায়, সারথির সাথে,এখন এখানে কিভাবে!! কিছুক্ষন মাথায় হাত দিয়ে বসে থেকে ভাবলো, ফ্ল্যাট যখন কাছে, ওখানেই আগে যাই।

ফ্ল্যাটের কাছাকাছি যেতেই দেখলো সেলিম আর ইমরান দাঁড়িয়ে আছে বাসার নিচে। ওকে দেখেই দৌড়ে ছুটে এল। সেলিম তো বেশ রেগেই বললো, “কিরে পালাইতেছিলি নাকি? সারথির সাথে তুই এমন করার চিন্তা করবি না। জানে মেরে দিবো”। শুভ্র হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান সেলিমকে বললো, “তুই থাম তো। কালকেই ওর না একটা এক্সিডেন্ট হল। কি হইছে না হইছে, তুই বুঝবি ক্যাম্নে”। শুভ্রকে বললো, “শুভ্র, দোস্ত তুই ঠিক আছিস তো? তোর না আজকে সারথির সাথে বিয়ে, আমরা কাজি অফিসে দুপুর ২টায় টাইম দিয়ে আসছিলাম, এখন বাজে সাড়ে ৩টা। তোরে তো সকাল থেকে আমরা খুজতে খুজতে পাগল হওয়ার দশা। ভোরবেলা ঘুমানোর জন্যে তোকে রুমে দিয়ে আইলাম। সকালে তোর রুমে গিয়ে দেখি গায়েব। ফোনও রুমে পরে আছে। সারথি ওদিকে কাঁদতে কাঁদতে পাগল হওয়ার অবস্থা। তোর বাসা থেকে ফোন আসতেছে, সেটাও ধরতেছি না ভয়ে যে, কি বলবো। দোস্ত, ছিলি কই? বলবি তো।”

শুভ্র তখন হতভম্ব হয়ে আছে। কি বলবে, বুঝতেছে না। কি হয়েছে, কিছুই বুঝতেছে না। রাতে ঘুমালো সারথির সাথে, রাজশাহীতে। সকালে এখন এখানে। কি মনে করে জিজ্ঞেস করলো, “ ইমরান, দোস্ত আজকে কয় তারিখ?” প্রশ্ন শুনে সেলিম বললো, “তোর কি মাথা ঠিক আছে? নিজে বিয়ের ডেট ঠিক করলি? এখন নিজে বলিস কয় তারিখ? আজকে ১২ তারিখ, ১২ই মে। সারথি তোর জন্যে অপেক্ষা করতেছে, তোকে বিয়ে করার জন্যে”।

শুভ্র আকাশ থেকে পড়লো। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ভাবলো, মনে হয় ইমরান আর সেলিম মজা করতেছে। মাথায় একটা আইডিয়া এল। বললো, “দোস্ত, মাথার ভেতর ভালো লাগতেছে না। মোড়ে গিয়ে এককাপ চা খাই চল, তারপর কথা বলি”। ইমরান একটু চুপ করে থেকে বললো, “আচ্ছা চল। সেলিম, তুই সারথিকে ফোন দে একটু। জানা যে, ওর জামাইকে খুজে পাইছি”। শুভ্র মনে মনে ভাবলো, মানে কি, সারথিও এদের সাথে যোগ দিয়ে আমার সাথে মজা করবে!

সেলিম ফোন দিলো। তারপর শুভ্র’র দিকে ফোন বাড়িয়ে দিল, “নে ধর, তোর বউ কথা বলবে”। শুভ্র ফোন কানে নিয়েই শুনলো, ওই পাশে সারথি ফোপাচ্ছে। শুভ্র কাপা কাপা গলায় বললো, “হ্যালো”। সারথি এবার কান্নায় ভেঙে পড়লো ফোনে, “শুভ্র, তুমি কই ছিলা? ঠিক আছ তো? আমি সেই কখন থেকে রেডি হয়ে বসে আছি ইমরান ভাইদের বাসায়। তোমার জন্যে সব ছেড়ে আজকে চলে এসেছি। তোমার কিছু হলে আমি বাচবো না……”। এরপরে সারথি কথা বলতেই আছে, কিন্তু শুভ্র’র মাথায় কিছুই আর ঢুকছে না। এক পর্যায়ে বললো, “সারথি, মাথার ভেতর ভালো লাগছে না। তাই আমরা একটু চা খেতে যাচ্ছি। ওখান থেকে বাসায় ফিরেই তোমার কাছে চলে আসতেছি”। বলে ফোন সেলিমকে দিয়ে দিল।

মোড়ে চায়ের দোকানে এসে লাল চা অর্ডার দিয়ে চায়ের দোকানে টিভির দিকে তাকালো। টিভিতে একটা নিউজ চ্যানেল চলতেছে। টিভিস্ক্রিনের নিচের দিকে, বামপাশে বড় বড় করে লেখা, ১২ই মে। ও সারথির কান্না শোনার পরে এরকমই কিছু আশংকা করছিল। Something really weird is happening.

চা শেষ করে বাসায় ফিরলো। ফিরতে ফিরতে ভাবছিলো, হয়তো উল্টাপাল্টা কিছু না। অসুস্থ ছিল কাল রাতে, তাই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে ঘুমের ভেতর। স্বপ্নের ভেতর সারথিকে বিয়ে করা শুরু করে কাছেও পেয়ে গেছে। বাসায় ফিরে বাথরুমে গেল ফ্রেশ হতে, বের হতে হবে তাড়াতাড়ি। টি-শার্টটা খোলার পিঠের কাছে একটু জ্বলাজ্বলা ভাব বুঝতে পারলো। এটা আবার কিভাবে হলো? মনে পড়লো, গতকাল রাতে, ওদের বাসর ঘরে সারথিকে আদর করার সময় ও শুভ্র’র পিঠে খামচি দিয়েছিল বের কয়েক বার, তার মাঝে একবার বেশ জোরে।

শুভ্র এবার মাথায় হাত দিয়ে বাথরুমের মেঝেতে বসে পড়লো।

এর মানে কি? সে ১২ই মে দুপুরে সারথিকে বিয়ে করেছে, দু’জনে একই বিছানায় রাত কাটিয়েছে। তারপর ঘুমিয়ে গিয়ে আবার ১২ই মে দুপুরে চলে এসেছে। কিভাবে সম্ভব এটা? কে উত্তর দিবে?

পিতা

“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”

ফজলু ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকাবে নাকি চিন্তা করে। একটু চিন্তা করে না তাকানোটাই ঠিক বলে মনে হয় তার কাছে। তাই সে আর পিছনে ফিরে না তাকিয়ে আবার হাটা শুরু করে।

ফজলু সাধুগঞ্জ বাজারের দিকে যাচ্ছে। বাজারটা আগে অনেক ছোট ছিল। ৫-৬ বছর আগেও বর্ষাকালে বাজারের রাস্তায় কাঁদার চোটে হাঁটা যেত না। আর সৈয়দ মেম্বারের মুদির দোকানটা বাদ দিলে আর কোন বড় দোকানও ছিল না। এখন বাজারের আর সেই দিন নেই। লোকে-লোকে লোকারন্য হয়ে গেছে। এখন আশপাশের দশ গ্রামের মাঝে সাধুগঞ্জ বাজারই সবচেয়ে বড়।

ফজলু বাজারে রইস আলীর দোকানে চাকরি করে। রইস আলীর বাজারে কয়েকটা দোকান আছে। ফজলু কাপড়ের দোকানটাতে বসে। তার কাজ হল দোকানের হিসাব-নিকাশ দেখাশোনা করা। পাশাপাশি রইস আলীর সব দোকানের সার্বিক হিসাবেও সাহায্য করে। পয়সাকড়ির দিক দিয়ে রইস আলী খুবই কৃপণ হলেও কি কারণে যেন ফজলুকে তিনি খুবই বিশ্বাস করেন। তবে এটাও সত্যি যে, ফজলু তার সাথে কখনো বেঈমানী করে নাই।

আজ সোমবার। এখনও ফজরের আযান হয়নি। গতকাল রবিবার বাজারে হাটবার ছিল। ফজলু সাধারনত হাটবারের রাতে দোকানেই থাকে। সব দোকানের হিসাবের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় রাত ২-৩ টা বাজে। তারপর দোকানের চৌকির উপরই পাটি-বালিশ পেতে ঘুমিয়ে যায়।

আজ রাতে ফজলের ঘুম আসছিল না। চৈত্র মাসের গরম একটা কারণ হতে পারে। তাই ফজলু ভাবলো নদী থেকে গোসল করে আসার জন্যে। বাজার থেকে নদীর ঘাট ১০ মিনিটের হাটা পথ। দোকান বন্ধ করে সে বেড়িয়ে পড়লো। নদীর ঘাটে এসে একটা গামছা পড়ে নদীতে নেমে গেল।

ফজলের নদী নিয়ে এক ধরনের ঘোরের মত আছে। নদীতে নামলেই সে তার দম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাঁতার কাটে। আর ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাসের কারণে অনেক সময় অনেকদূরে চলে যায়। আজকে পানিতে নামার পড়ে ফজলের কেমন যেন লাগলো। কেন যেন মনে হল, বেশি দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। ফজলু এমনি কোন সময় এইসব বিষয় পাত্তা দেয় না। কিন্তু আজ কেন যেন তার মনে হল, থাক আজকে না হয় নাইবা গেলাম।

আজকে আর সাঁতার কাটবে না ভেবে সে পানিতে ডুব দিল। ডুব দেয়ার পরপরই পানির নিচ থেকে তার মনে হল কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকলো। ফজলু ভাবলো, কেউ বোধ হয় ঘাটে এসেছে আর তাকে দেখে ডাক দিয়েছে। দ্রুত পানির উপরে এসেই বললো “কে?”

কিন্তু তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। ঘাটে তো নাইই, আশেপাশে কোথাওই কেউ নেই। সে মনে ভুল ভেবে আবার পানিতে ডুব দিলো।

এবার স্পষ্ট গলা। “কি, ফজলু মিয়া, কথা কও না ক্যান?” ফজলু পানির মাঝ থেকে একেবারে লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু উপরে উঠে দেখে কেউ নেই। ফজলু ভয় পেল কিনা, নিজেও ঠিক বুঝলো না। গ্রামে তার সাহসের তারিফ করে সবাই। আর গরিবের ছেলে হওয়ায় পড়ালেখাতে ভালো থাকলেও খরচ চালাতে না পেরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, বাবা আর বড়ভাই দুইজনই মারা যাই একই বছরে। যদিও এখন সে সংসারে একা, মা মারা গেছে গতবছর আর বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। তার বাড়িতে সে একাই থাকে। কোনদিন কোথাও ভয় পায়নি। আসলে পায়নি বলা ঠিক হবে না। ফজলু মনে করে, সে ভয় পাওয়া থেকে ভয় পাওয়ার কারণ নিয়ে চিন্তা করে বেশি। আর কারণ ধরতে পারলে সব কিছুরই প্রতিকার করা যায়। এই চিন্তা করার পদ্ধতিটা ও শিখেছিল স্কুলে, বিজ্ঞানের সমাদ্দার স্যারের কাছে। স্যার বছর দুই হলো, মারা গেছেন। ফজলুকে দেখে আফসোস করতেন, এত মেধাবী একটা ছেলে, দোকানে কাজ করে বেড়াচ্ছে।

সমাদ্দার স্যারের এই শিক্ষার কারনেই হোক, কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক, অন্য কেউ হলে যেখানে ভয়ে দৌড় দিত, ফজলু তখন নদীপাড়ে বসে চিন্তা করতে লাগলো যে সে শুনলোটা কি?

হঠাৎ করে মনে আসলো যে, আজ সোমবার, হাটবারের পরের দিন। এই দিন রইস আলী ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই দোকানে চলে আসে, আগেরদিনের হিসাব দেখার জন্যে। তাড়াতাড়ি দোকানে ফেরা দরকার। ফজলু উঠে গামছা পড়েই প্যান্টটা গলায় ঝুলিয়ে হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।

নদীর কিনার ধরে আসতে আসতে রাস্তায় উঠতেই ফজলু স্পষ্ট শুনলো,

“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”

কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ফজলের মাথায় অনেক কিছু খেলে গেল। তারপর পিছনে না ফিরে সে আগের মতই হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।

বাজারের দিকের রাস্তাটা একটু পরেই গিয়ে ক্ষেতের মাঝে পড়েছে। ক্ষেতের মাঝে মানে রাস্তার দু’ধারে যতদূর চোখ যায়, শুধু মাঠ। রাস্তাটা অনেকখানি উঁচু মাঠ থেকে। বর্ষাকালে আউশের ক্ষেত ডুবে যায়, কিন্তু রাস্তাটা ডোবে না। কৃষকেরা হাঁটু পানিতে শুয়ে পড়ে থাকা ধান কেটে নিয়ে যায়। অঞ্চলে সবারই বাড়িঘর গ্রামের একপাশে আর অন্যপাশ দিয়ে এই বিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা। বৃষ্টির সময় নদী আর এই বিল এক হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সাগরের মাঝ দিয়ে আরেক দ্বীপে রাস্তাটা চলে গেছে। এই জন্যেই বোধ হয় ফজলের গ্রামের নাম ভাসানগা। তবে এই রাস্তাটা খুব যে লম্বা, তাও না। আধা কিলো, এক কিলো মত হবে হয়তো। ভাসানগা থেকে সাধুপুর বাজার প্রায় এক কিলোর একটু বেশি। শুকনো মৌসুমে বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায় আর থাকে শুধু নদী।

ফজলু বেশ জোরে জোরে পা চালাচ্ছে। আজকে কি সে ভয় পেয়েছে নাকি দোকানে তাড়াতাড়ি পৌছানোর জন্যে, সেটা পরিস্কার না। আগেও একবার এরকম হয়েছে। সেটা যদিও অনেক আগের কথা।

তখন সে ক্লাস টেনে পরে সম্ভবত। এরকম সময়েরই ঘটনা, মানে চৈত্র মাসে। সে রাতে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল তার বড়ভাইয়ের নৌকা নিয়ে। বেশ অনেকদূর চলে গিয়েছিল। দুই ধারে শুধু ক্ষেত। কোন মানুষজনও নেই। সে তখন জাল তুলে বিছাইতেছে। ওইদিন মাছ পাচ্ছিল না। সেজন্যে মেজাজও একটু খারাপ ছিলো। এমন সময় হঠাৎ কে যেন জিজ্ঞেস করলো, “কি ফজলু মিয়া, এই কয়ডা মাছ দিয়া চলবো??” ফজলু মাথা না তুলেই বললো “হ, নদীর মাছ আজকে মনে হয় পলাইছে। এতগুলা খ্যাপ মারলাম, মাছই পাইলাম না।” এই বলে মাথা তুলে দেখে কেউ নেই। সে মনে করেছিল, পাশ থেকে কোন নৌকা যাওয়ার সময় মাঝি কথাগুলো বলছিল।

ফজলু টান পায়ে হাঁটছে। কিছুক্ষণের মাঝেই বাজারে পৌছে গেল। বাজারের মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে দোকানে ঢুকে কাপড় ছেড়ে আজকে না ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, একটু পরেই রইস আলী চলে আসবে। শুধু শুধু বিছানা পাতার ঝামেলা করা ঠিক হবে না।

———————–১ম অধ্যায় শেষ—————–

রইস আলীর আজকে মেজাজ যথেষ্টই খারাপ। কালকে হাটবারে বেচাকেনা খুব ভালো হয়নি। এমনিতেই ছোট বাজার। তাই সব ব্যবসায়ীই হাটবারের আশায় থাকে, যে ঐদিন বেচাকেনা ভালো হলে সারা সপ্তাহের হিসাব উঠে যাবে। কিন্তু গতকাল হাটবারে তার দোকানে কর্মচারীরা নিজেদের মাঝে একটু ঝামেলা করে ফেলেছে। অনেক খদ্দের এসে ফিরে চলে গেছে। গ্রামের মানুষ এগুলো মনে রাখে। দেখা যাবে পরের হাটবারে তার দোকানে ওরা আর আসে নাই। আবার কম বেতনে এখন কর্মচারী পাওয়াও আরেক সমস্যা। তিনি এমনিতেই কাউকে বিশ্বাস করেন না। তবে অন্যদের চেয়ে ফজলু ছেলেটা আলাদা। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। আবার পরিবারে কেউ নাই বলে বেতন কম দিলেও কিছু বলে না। এই ফজরের ওয়াক্তের পরে গিয়েই তিনি দেখবেন এরই মধ্যে ফজলু অনেক খানি হিসাবের কাজ গুছিয়ে ফেলেছে। এমন কর্মচারী মালিকের পছন্দ না হয়ে যায় না।

যদিও আজকে রইস আলীর মন খারাপ অন্য কারণে। তার ছেলে, খসরু ইদানীং বেশ বেয়াড়া হয়ে গেছে। গেল অঘ্রানে ১৪ তে পা দিয়েছে ছেলেটা। এই বয়সেই সে তার বড় বোন আর মাকে মারধর করা শুরু করেছে। তিনি নিজে মানুষটা কৃপণ হলেও মেয়েছেলের গায়ে হাত তোলা তার পছন্দ না। তার কথা হল, মেয়েছেলে হল ঘরের আসবাবপত্রের মত, ঘরের সৌন্দর্য। মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হলে অন্য কথা। কিন্তু পারতপক্ষে তিনি ওদের গায়ে হাত তোলেন না। সেখানে তার ছেলে এই বয়সেই যা শুরু করেছে, বড় হলে যে কি করবে সেটাই চিন্তার বিষয়। তিনি নিজেও ছোটবেলায় বড় বোনদের সাথে মারামারি করেছেন। কিন্তু তার ছেলে যা করে, সেটাকে একই অর্থে বলা যায় না।

গতকাল সন্ধ্যায় ছেলেটা তার বড় বোনকে কাটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এমন মার মেরেছে যে সারা গায়ে রক্তের দাগ পড়ে গেছে। মেয়েটার বিয়ের কথা চলছে। ছেলে ঢাকায় থাকে। মাসখানেক পরে সামনের বড় ঈদে ছেলে বাড়ি ফিরলে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। রইস আলীর বউ মাজেদা বেগমও তার মেয়ে নাসরিনকে নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তার মাঝে আছেন। উপযুক্ত মেয়ে ঘরে থাকলে তাকে মায়ের টেনশন যদিও নতুন কিছু না, কিন্তু মাজেদার চিন্তার কারণ হল তার ছেলে খসরু। ভাই-বোনের মাঝে কত মিল-মহব্বত থাকে। অথচ তার এই ছেলে বড় বোনকে দেখতেই পারে না। কালকে রাতে বোনকে যে মারটা মারছে, মাজেদা নিজেও মনে হয় মেয়েকে কখনো এত মারেন নাই। মেয়ের চেহারার এখন যে অবস্থা হইছে, তাতে আল্লাহই জানে মাসখানেকের মাঝে সারবে কিনা। এখন সেই মেয়ে হাটতেই পারছে না। বিবাহযোগ্যা এমন মেয়েকে মাইরের কথা বাইরে ছড়ালে লোকে ছিঃ ছিঃ করবে। তাই তিনি কাউকে না জানিয়ে রইস আলী নিজেই মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলেন। অন্যসময় হলে কাউকে দিয়ে পাঠাতেন। কালকে তার মা সফেদা বেগম এমনভাবে চিল্লানো শুরু করলেন যে না নিয়ে গিয়ে পারেন নি। মেয়ের চিকিৎসাতে অনেকগুলো টাকা জলে গেল। তারপরও কিছু করারও নেই। মান-সম্মান হারালে সেটা ফেরত পাওয়া মুশকিল। মেয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে গেলে বাঁচা। নাহলে ছেলেপক্ষের কাছে কি লজ্জা পাওয়া লাগবে, কে জানে।

কালকে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। তখন ছেলেকে সামনে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেন নাই। ধরে রামপিটুনি দিয়েছেন। সেই পিটুনিতে ছেলেও এখন শয্যাগত। এখন আবার রইস আলী ভয়ে আছেন যে, ছেলে সুস্থ হয়ে উঠলে কি করবে? কারণ, এত মার খেয়েও সে একটুও কাদে নি। তিনি তো ছোটবেলায় এমন ছিলেন না। কারো হাতে মার খেলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেদেছেন। ছেলে এমন হল কিভাবে? সফেদা বেগম বলেন, “রইস হল ওর বাপের মত। লগে আছে, কিন্তু পিছে নাই। সাথে আমার শ্বশুরের গুণ পাইছে, কিপটামো। আর ওর পোলাডা আইছে আসমান থেইকা সগির আলীর মত হয়ে।” সগির আলী হল সফেদা বেগমের দেবর। দুনিয়ার বদ একটা লোক। সবার কপাল ভালো যে, অল্প বয়সে সাপের কামড়ে মরছে। কিন্তু ঐ অল্প বয়সেই যতরকম খারাপ কাজ আছে, তার সবই করেছে আর কত মানুষের বদদোয়া যে কুড়াইছে, তার ঠিক নাই।

রইস আলী দোকানের সামনে গিয়ে দেখলেন, দোকান বন্ধ। বাইরে থেকে তালা দেয়া। হাটবারের দিন রাতে ফজলু সবসময় দোকানে থাকে। নিজের অজান্তেই তার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই দোকানে বেচাকেনা ভাল হয় নাই, তার উপর বাড়িতে এইসব ঝামেলা। হারামজাদা ফজলুডা বেশি লাই পেয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কুত্তারে বেশি লাই দিতে নাই, দিলে মাথার উপর উঠে বসে থাকে। ছেলেটারে তিনি বিশ্বাস করেন, তাই বলে এখন তাকে এই রাস্তার কুত্তাটার জন্যে দোকানের বাইরে বসে থাকতে হবে। এই হারামীটার কাছে দোকানের চাবি দেয়াটাই ভুল হয়েছে। আজকেই এইডারে লাত্থি দিয়ে বের করে দিতে হবে। হারামজাদাটা কতক্ষণ তাকে বাইরে দাঁড় করায়ে রাখবে, আল্লাহই জানে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি দোকানের পাশে চায়ের স্টলের বাইরে রাখা বেঞ্চে বসে রাগে ফুঁসতে লাগলেন । বসে থাকতে থাকতে তার মাথায় এলো, ফজলু আবার তার দোকানের ক্যাশ গাপ করে সরে পড়লো না তো? আজকাইলকের পোলাপাইন বলে বিশ্বাস নেই।

একটু পরে মনে হল, ধুর, তিনি কি চিন্তা করছেন? তিনি নিজে মানুষ চিনতে এত বড় ভুল করতেই পারেন না। খসরুর বয়সে তিনি মানুষের বাড়িতে কাপড় ফেরি করে বেচে বেড়াতেন। সেখান থেকে এতদূর এসেছেন। আজ বাজারে তার তিনটা দোকান। তিনি মানুষ চিনতে ভুল করার লোক না। আচ্ছা ফজলুর কোন বিপদ হয়নি তো আবার? এতবড় বাজারে হাতে গোনা কয়েকটা লোক রাতে থাকে। তাও দোকানের ভেতর থেকে কিছু হলে বাইরের কেউ টেরও পাবে না যে কি হয়ছে। বাজারে পাহারাদার আছে। কিন্তু বিপদের সময় দেখা যায় এরা ঘুমাচ্ছে, এটা তার নিজের অভিজ্ঞতা। মানুষজন চিনতে ভুল করেন না, কিন্তু তার সম্পদের উপর অনেক মানুষেরই নজর আছে। আর হাটবারের রাতে ক্যাশের টাকা হিসাবের জন্যে দোকানেই থাকে। ফজলু একা মানুষ। তার উপর একটু সরল সোজা। ওকে সরায়ে দিয়ে লুট করে নিয়ে যাওয়া খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা না।

নাহ, সেটাই বা কি করে সম্ভব? দোকান তো তালা দেয়া বাইরে থেকে। আর তালা দেয়ার ধরন থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, ফজলু দিছে। তাহলে পোলাডা গেল কই? কয়েকদিন আগে আবার বাজারের পিছনের খালে কারা কল্লাফেলা লাশ ফেলে গেছিল। তারপর থেকে নাকি বাজারে রাতে প্রতিদিন নিশির ডাক শোনা যায়। ছেলেটা আবার এসব জিনিসের পাল্লায় পড়লো  না তো? যদিও ফজলুকে কোনদিন এসব জিনিসে ভয় পেতে শোনেন নাই। উল্টা পোলাডা একদিন তারে বুঝাইছে যে, ওগুলো হল মানুষের কল্পনা। যে কয়দিন নিশির ডাক শোনা যায়, সবদিনই বাইরে বেশ বাতাস ছিলো। আর বাজারের পেছনে সৈয়দ মেম্বারের ভুট্টার ক্ষেত। বাতাসে ভুট্টার মোচায় বাড়ি লেগে, আর পাতার ঘষার শব্দ থেকে ঐসব নিশির ডাক শোনা যায়। রইস আলী জীবনে অনেকের কাছ থেকে অনেক কথা শুনেছেন নিশির ডাক নিয়ে। কিন্তু এমন অদ্ভুত ব্যাখ্যা ফজলু ছাড়া আর কারো কাছে শোনেন নাই। এমন ছেলে আর যাই হোক, ভয় পাওয়ার কথা না।

বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলেন বেঞ্চে। নাহ, এখন ছেলেটার জন্যে আসলেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। দূরে বাজারের জেলেদের ভ্যান দেখতে পাচ্ছেন। মাছের নিলাম আর ভাগ-বাটোয়ারা বেচাকেনা শুরুর আগেই করতে হয়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বেড়িয়ে পড়লেন ফজলুর খোঁজে। ছেলেটা বাড়িতে যাবে না নিশ্চিত, কারণ ওর নাকি বাড়িতে থাকতে ভাল লাগে না। তবে মাছ ধরতে যেতে পারে। বর্ষার সময় রাতে মাছ ধরার নেশা আছে ছেলেটার। ভোরবেলা খলুই ভরে মাছ নিয়ে রইস মিয়ার বাড়ি চলে যায়। তার স্ত্রী, মাজেদার হাতে মাছের খলুই ধরায়ে দিয়ে চলে আসে দোকানে। মাজেদা বেগম মাছ রান্না করে সকালে খাবার পাঠায়ে দেয় দোকানে রইস আলী আর ফজলুর জন্যে।

বাজার থেকে নদী বেশি দূরে না। তাই ফজলুর বাড়িতে যাবার আগে নদীর পাড়টা ঘুরে যাবার চিন্তা করলেন রইস আলী। একটু জোর পায়েই হাটছেন। ছেলেটার জন্যে তার আসলেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

————————-২য় অধ্যায় শেষ————-

ফজলু চোখ মেলে দেখলো সে খড়ের পালার উপর পড়ে আছে। সে ঘুমাইছে কোন সময় আর এখন কোথায় আছে, কিছুই মনে করতে পারলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, সে তাদের বংশের পুরাতন ভিটার পাশে খড়ের উপরে পড়ে আছে। নাম যদিও পুরাতন ভিটা, মানুষ এখনো বাস করে। গ্রামের একেবারে আরেক প্রান্তে এই ভিটা। ফজলুর দাদা খাজা মিয়া এই ভিটা তার শরিকদের কাছে বেচে দিয়ে যান। তবে গ্রামের লোকেরা বলে যে ঠিক বেচে না, ফজলুর দাদার কাছ থেকে তার শরিকরা এটা জোর করে লিখে নেয়।

ফজলু এই ভিটায় এসেছে অনেক ছোটবেলায়। আজ এখানে কেন এসেছিল, সে তাও মনে করতে পারলো না। ভিটা পুরাতন হওয়ায় এখানে গাছপালা অনেক বেশি। তাদের শরিকদের কয়েকজন এখনো এখানে বাস করে। যদিও এদের সাথে তার সম্পর্ক খুবই খারাপ।

কেমন জানি ক্লান্ত লাগছে তার। ইচ্ছা করছে আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে। কিন্তু গাছের ফাক দিয়ে রোদ এসে একেবারে চোখের উপরে লাগছে। হাত দিয়ে আলোটা একটু আড়াল করতে গিয়ে ফজলু দেখলো তার হাতে চামড়ার হাতমোজা আর হাতমোজা রক্তে ভিজে আছে।

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলো ফজলু। কিন্তু চোখে প্রায় কিছুই দেখছে না, ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথায় বসে আছে, সেটাও বুঝলো না। কি এক উলটা পালটা স্বপ্ন দেখছিল, যে নিজেও বুঝলো না। একেবারে বাস্তব মনে হচ্ছিলো হাতের রক্ত লেগে থাকা। ফজলু একটু ভয় পেয়েছে, বুক ধুকধুক করছে। বসে থেকে অন্ধকারে একটু পরে চোখ সয়ে এলে বুঝলো, সে আসলে ভুট্টাক্ষেতের ভেতরে। ক্ষেতের ভেতরেই অল্প দূরে মনে হল, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কে বুঝতেছে না, কিন্তু অন্ধকারের মাঝেও একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে। ফজলু জিজ্ঞেস করলো, কে ওখানে? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে অজান্তেই গলাটা একটূ কেপেও উঠলো তার।

লোকটা সামনে এগিয়ে এল আস্তে আস্তে। ফজলু তখনো মাটিতে বসে আছে, হাতে হেলান দিয়ে বসে আছে, অনেকটা ক্লান্ত হয়ে। লোকটা অন্ধকারে আস্তে আস্তে ফজলুর মুখের সামনে আসছে। ফজলু অন্ধকারে চিনতে পারছে না, কে লোকটা। লোকটা আরো কাছে এগিয়ে এলো, আরো কাছে, ফজলুর একেবারে মুখের সামনে চোখে চোখে রেখে তাকালো। ফজলু ভীত চোখে তাকিয়ে রইলো লোকটার মুখের দিকে। হঠাৎ করে অনেক চেনা মনে হল লোকটাকে। ফজলু কিছু সময় লোকটার মুখ আর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝলো, লোকটা দেখতে অবিকল ফজলুর মত, শুধু একটু বয়স্ক। ফজলুর শিরদাড়া দিয়ে ভয়ের একটা স্রোত বয়ে গেল, গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। এবার লোকটা কথা বললো, ফজলুকে জিজ্ঞেস করলো, “ফজলু মিয়া, কেমন আছো?”

শুনে ফজলু সম্ভবত ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, কিংবা এরকমই কিছু, কিন্তু সে কিছু বুঝলো না, কি হচ্ছে। পরে যখন আস্তে আস্তে দুলুনিতে চেতনা ফিরলো, তখন বুঝলো যে, ওর হাত-পা মুখ বেধে লোকটা ওকে ঘাড়ে করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।

ওর উউ শব্দ শুনের লোকটা সম্ভবত বুঝলো যে, ওর জ্ঞান ফিরেছে। লোকটা কথা বলা শুরু করলো,

– ফজলু, ভয় পাইও না। তোমারে মারার জন্যে আমি আসি নাই, বরং তোমার ভবিষ্যৎ বাচাইতে আসছি। তুমি যদি আমার কথা কাউরে না কও, তাইলে তোমারে মাইরা আমার ফায়দা কি? তুমি আর আমি তো একই কথা, নাকি? খালি একাল আর সেকালের পার্থক্য।

– উউ উউউউ উউউ (ফজলু মুখ বাধা অবস্থায় সম্ভবত প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করলো, যেটা তার হাত-পা নাড়ানোর চেষ্টাতে বোঝা গেল।)

– শুনো ফজলু, তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছা আমার নাই। তুমি শান্ত হও, তারপর তুমার সাথে কথা বলবো। অনেক কথা পড়ে আছে, যা তুমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। কিন্তু, তুমারে কথা দিতে হবে যে, ঝাপাঝাপি করবা না। করলে তোমার ক্ষতি করা লাগবো আমার। আমি চাইতেছি না, সেটা করতে, কারন তোমার ক্ষতি হইলে আমারও ক্ষতি। চলো, বাড়ীতে গিয়া বসে কথা বলি।

(কার বাড়ি, সেটা ফজলুকে না বললেও সে বুঝি নিলো, ওর নিজের বাড়ির কথাই বলছে। লোকটার কথা শুনেই মনে হয়, সে ফজলুকে নিয়ে সবকিছু জানে। আবার, দেখতেও অবিকল ফজলুর মত। ফজলুর মনে হচ্ছে, যে সম্ভবত এখনো স্বপ্নের মাঝে আছে। একটু পরেই ঘুম ভেঙে দেখবে, দোকানের বাইরে চৌকিতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু, ফজলুর ঘুম ভাঙলো না। লোকটা ওকে ঘাড়ে নিয়ে ওদের বাড়ীর দিকে যেতে থাকলো। একটু দূরে বাড়ী। আর মেঠো পথ। কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। ফজলু কিছু আর বলার চেষ্টা করলো না। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কিছু করার নাই। লোকটা ফজলুর বাড়িতে এসে থামলো। বাড়ি এমনিতেও ফাকা, কেউ তো থাকে না ফজলু ছাড়া। বাড়ির ভেতরে গিয়ে বারান্দায় ফজলুকে ঘাড় থেকে নামিয়ে রেখে বললো – )

– ফজলু, শোনো, আমি তুমার সাথে কথা কইতে আসছি এখানে। অনেক কথা পড়ে আছে, সময় আজকে রাতটাই শুধু। তুমি ছাড়া এগুলো অন্য কাউকে বলেও লাভ নাই। মুখ খুইলা দিলে তুমি কি করবা, বুঝতাছি না। তাই কিছু মনে কইরো না, তোমার মুখটা আপাতত বান্ধাই থাকুক।

(ফজলু ঘাড় নাড়লো। বিশ্বাস করা ছাড়া আর কিছু করারও নাই ওর। লোকটা বলা শুরু করলো।)

– শোন, আমার এই গল্পের শুরু আসলে তুমারে দিয়া। আমাদের চেহারাতে অনেক মিল, এটা তুমি আগেই বুঝে গেছ, আমি ধরে নিচ্ছি। কারন, আমিই আসলে তুমি, শুধু বয়সে আলাদা। তোমার, আমার আমাদের একখান ক্ষমতা আছে। আমরা চাইলে আগের জীবনে যাইতে পারি, তবে সেটা শুধু এক রাতের জন্যে। তবে পরের জীবনে যাইতে পারি না, মানে ভালো বাংলায় যেইডারে কয় ভবিষ্যৎ। যেমন ধরো, আমি এই যে আসছি তোমার কাছে, ১৭ বছর ভবিষ্যৎ থেকে, কিন্তু থাকতে পারুম খালি আজকের রাতটা।

(ফজলু মুখ বাধা অবস্থায়ই হাসার চেষ্টা করলো। লোকটা বলে কি!)

– তুমি কি হাসতেছো? হ, শুনলে হাসি পাওয়ারই কথা। কিন্তু, যা কইলাম, তার পুরোটাই সত্যি। তুমার ছোটবেলার কথা মনে আছে? ৫-৬ বছর বয়সে একবার পানিতে ডুবতে গেছিলা?

(ফজলু ঘাড় নাড়লো। মনে আছে ওর।)

– আসলে অত মনে থাকার কথা না। মিঞা ভাই কইছিল, পানিতে ডুইবা গেছিলাম। সে আমারে ঘাড়ে করে তুলে আনছিল। আমার নাকি অনেকক্ষন জ্ঞান ছিল না, নিশ্বাস নিতেছিলাম না। ৫-১০ মিনিট পরে নাকি জ্ঞান ফিরছিল। আমি যদিও বিশ্বাস করি নাই। ১০ মিনিট নিঃশ্বাস না নিলে কেউ আবার বাচে নাকি! মিঞা ভাই কইছিল, আমি নাকি জ্ঞান ফিরে কইছিলাম, আব্বার সাথে কথা হইছে।

(ফজলু ঘাড় নাড়লো। ও শুনেছে মিঞাভাইয়ের কাছে।)

– বুঝলা ফজলু, আমি বহুত চিন্তাভাবনা করে বাইর করছি। ঐ পানিতে ডুবে যাওয়ার পরই আমাদের আগের সময়ে যাওয়ার ক্ষমতাটা জন্ম নেয়। চিন্তা করে দেখো, অনেকবার তুমার কাছে মনে হইছে যে, এইরম ঘটনা কালকেও তো হইছে। এ রকম মনে হওয়ার কারন হল, তুমি নিজেই অনেকবার এভাবে অতীতে গেছো না বুঝেই। এটা আমার তুমার, মানে আমাদের কাছে নিত্য রুটিনের মত।

(ফজলু কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো। লোকটা বলে কি‼ তবে, কথা সত্যি যে, অনেকবার এমন হয়ছে।)

– যাই হোক, এইবার বলি এখন তোমার কাছে আইছি ক্যান। আর তুমার সাথে কথা বলারই বা কারন কি!

– ফজলু, তুমার বিয়া সামনে সপ্তাহে, নাসরিনের সাথে। অবাক হইও না। আমি জানি, তুমি তারে পছন্দ করো। তুমার নিজের কিছু নাই, তাই তুমি তারে বলতে চাও নাই। সামনের সপ্তাহের নাসরিনের বিয়ে নিয়ে কিছু ঝামেলা হইবো, তুমি রেডি থাইকো, তুমি তারে পাইবা।

– আর কাইলকা রাতে খসরু আমার হাতে মারা গেছে। আমি ওর ধড়-মাথা আলাদা কইরা দিছি। ভয় পাইবা না। তোমার, মানে আমার কথা এর মাঝে কেউ জানতে পারবো না।

(ফজলু খসরুর কথা শুনে একটু নড়াচড়া করার চেষ্টা করলো। লোকটা বলে কি! রইস আলীর ছেলে, খসরুরে মেরে ফেলেছে! নিজেকে মুক্তু করার চেষ্টা করতে লাগলো। লোকটা উৎসুক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষন চেষ্টা করে ফজলু ক্ষান্ত দিলো। লোকটা আবার কথা বলা শুরু লাগলো।)

– ফজলু, আমারে খুনী ভাইবো না। তুমিও যা, আমিও তাই। আমাদের রক্তে খুনি হওয়ার ইচ্ছা নাই। কিন্তু, ঐ শুয়োরের বাচ্চা আমার মেয়েটারে শেষ কইরা দিছে।

– হ, ফজলু, আমার মেয়ে, তোমারও ভবিষ্যতের মেয়ে, আঁখি। মাইয়াটারে আমি বাইরের মানুষ থেকে রক্ষা করতে পারলেও কখনো বুঝি নাই, ওর নিজের মামা এত বড় সর্বনাশ করবো। খসরুর চরিত্র ভালো কোন আমলেও ছিল না, এটা তুমিও জানো। তাই বলে, নিজের আপন ভাগ্নির এত বড় ক্ষতি করবো, কখনো ভাবি নাই। মাইয়াটা আমারে কইলো, “আব্বা, তুমি মামারে আগে চিনতে পারলা না ক্যান! সে মানুষ কেমন, তুমি আগে থেকেই জানতা।” বইলা আম্মা আমার তার ঘরে গিয়া ঢুকলো। আর ঘর থেকে বের হইলো না। সকালে ডাকতে গিয়া দেখি, মা আমার ঘরের ফ্যানের সাথে ঝুইলা আছে। না পারলাম মেয়েডার মান-সম্মান রাখতে, না পারলাম ওর জীবনডা বাচাইতে।

– বুঝলা ফজলু, অনেকদিন পেছনের জীবনে আসতাম না। তোমার, মানে আমার জীবনে তো আসলে আপন বলে কেউ নাই। নাসরিন আমার জীবনে আকাশের চাদের আলোর মত। বিয়ার কয় বছর পরই সংসারে আখি চইলা আইলো। আমার জীবনে আর কি লাগে, কও। এখন আমার সব শেষ, কিছুই নাই আর। তাই আমি তুমার জীবনটা বাচাইতে আইছি।

(ফজলু চুপচাপ রইলো। কি করবে, বুঝতেছে না। বিশ্বাস করেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।)

– ফজলু, আমার গল্প কিন্তু শেষ। আমি জানি, আমার কথা তোমার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু, তুমি আমার আজকের কাজের ফলাফলটুকু যেন পাও, এটা আমি চাই। আমার আখি মা তোমার কোলে আসুক আর বেচে থাকুক তোমার কাছে।

– ভোর হয়ে আসতেছে। তোমার মুখের আর হাতে বাধন আমি খুলে দিতেছি। তুমি দোকানে যাও। রইস আলী তোমারে পাগলের মত খুজতেছে। সে ভাবছে, তোমার সাথে খারাপ কিছু হয়ছে।

(লোকটা ফজলুর মুখ আর হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে লম্বা পায়ে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ফজলু তাড়াতাড়ি পায়ের বাধন খুলে বাড়ির বাইরে এসে দেখল, কেউ নেই।)

কিছুক্ষন হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে থেকে ফজলু বাজারের পথ ধরলো। দোকানে হেটে যেতে যেতে আলো ফুটে গেল ভালভাবেই। দোকানে পৌছে দেখলো বাজারে জেলেদের জটলা ওর দোকান, মানে রইস আলীর দোকানের সামনে। জিজ্ঞেস করতেই জানলো, আজকেও নাকি বাজারের পিছনে মাথাছাড়া লাশ পড়ে আছে। একটু আগে এক জেলের চোখে পড়েছে।

ফজলুকে কেউ না বললেও ফজলু বুঝলো, ওটা খসরুর লাশ। সে কিছু একটা অজুহাত দিতে লাশের দিকে না গিয়ে দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসে রইলো। এর মানে কি? ওর মত দেখতে লোকটা যা যা বলেছিল, সেগুলো তাহলে সত্যি?

সাদা কাপড়

সময়টা ১৯৯৩ সাল।

গল্পের মূল চরিত্রের নাম সাফিয়া। বয়স ২৭-২৮ হবে, সুন্দরী এবং বিবাহিত। জামাই সরকারী একটা ব্যাঙ্কে অফিসার। সাড়ে ৬ বছরের এক ছেলে আছে তাদের, নাম আসিফ।

সাফিয়া গিয়েছে তার নানার বাড়ি। গ্রামের নাম চড়ুইপাড়া। সাথে তার নানী খাইরুন্নেসা আর ছেলে আসিফ। খাইরুন্নেসা গত মাসে গিয়েছিলেন নাতনীর বাড়িতে ঘুরতে। আসিফের স্কুল বন্ধ, তাই সাফিয়া এই সুযোগে নানীকে নিয়েই তার বাড়ী যাচ্ছে।

মেইন রোড থেকে গ্রামের বাড়িটা বেশ ভিতরে। ৩-৪ মাইল হবে। ভ্যানে যেতে হয়। রাস্তা মানে এবড়ো-থেবড়ো মাটির রাস্তা, তবে শুকনা। মেইন রোড থেকে বাড়ীতে পৌছাতে প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেল। ঝাকুনি তো আছেই। পৌঁছাতে পৌছাতে বিকেল গড়িয়ে যায়।

সাফিয়ার নানাবাড়িটা বেশ বড়। প্রায় ২ বিঘা জমির উপর বাড়ি। ওর ছোটখালা এই বাড়ীতেই থাকে। ওর নানা গ্রামের মাতব্বর ছিল সেই আমলে।

রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে সব খালাতো ভাই-বোন মিলে আড্ডা দিতে বসে একসাথে। এই গ্রামে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নেই। একে তো ফাল্গুন মাস, গ্রামে শীতের ভাব এখনো আছে। তার উপর ৮টা বাজতে বাজতেই মনে হয় নিশুতি রাত। আড্ডায় সিদ্ধান্ত হয়, পরের দিন VCV ভাড়া করে আনা হবে, সাথে ব্যাটারী। সবাই মিলে কাল রাতে ছবি (মুভি) দেখা হবে। বিদ্যুৎ না থাকায় সবাই রাত ৮-৯টার মাঝেই ঘুমায়ে পড়ে। শুধু ওর খালাতো বোন, মিনি জাগে রাত ১২টা অব্দি। তার সামনে এসএসসি পরীক্ষা।

সাফিয়ার ঘুমানোর অভ্যাস জানালার পাশে। জানালার পাশে শুয়ে বাইরের অন্ধকার দেখতে তার অদ্ভুত রকম ভাল লাগে। কি কারনে, কে জানে। বাইরে ফাল্গুন মাসের কুয়াশা, বেশ ঘন, তবে শীত অনেক কম। গায়ে মোটা কাথা দিলে লেপ আর লাগে না। তার ছেলে আসিফ এই বাড়ীতে আসলে তার মাকে প্রায় ভুলেই যায়। মামাতো ভাইবোন আর গ্রামের ছেলেপেলের দল নিয়ে সারাদিন ঘোরে, আবার রাতে ঘুমায়ও তার মামা, নাহলে খালাদের সাথে। শুধু ক্ষিদা লাগলে মায়ের কাছে এসে ক্যান ক্যান করে। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমায়ে গেল সাফিয়া। সারাদিন ধকল তো আর কম যায় নি।

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। নতুন জায়গায় এলে যা হয় আর কি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে একটু সময় লাগে বুঝতে যে, কোথায় আছি। এত রাতে ঘুম কেন ভাঙলো, বুঝলো না সাফিয়া। আবার ঘুমানোর চেষ্টা করার সময় মনে হল, একটু হয়তো বাথরুমে যাওয়া দরকার।

এই বাড়ীতে বাথরুমে যাওয়া এক বিশাল সমস্যা। এমনিতেই ভালো বাথরুম নাই, তার উপর যা ছিল, সেটাও নাকি পরশু ভেঙে গেছে। এখন একমাত্র উপায় হল বাড়ীর পাশে একটু বনের মত আছে, সেখানে যাওয়া। ওর নানী শুয়ে ছিল ওর পাশে। দেখলো, উনি তখনো জেগে আছে। সাফিয়া তাকে ডেকে তুললো, একা যেতে ভয় লাগে।

নানীকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হল। বদনাতে পানি নিয়ে হাটতে হাটতে বেশ একটু দূরে চলে গেল। বন এদিকটায় বেশ ঘন, কিন্তু সামনে গিয়ে হালকা হয়ে গেছে। নানীকে দাঁড়াতে বলে সে আরেকটু সামনে এগিয়ে গেল। একটু দূরে আমিন মন্ডলের বাড়ি দেখা যাচ্ছে, সাফিয়ার দূরসম্পর্কের মামা। মাঝে বেশ বড় একটা খোলা মাঠ। সাফিয়া একটু এগিয়ে কিছুক্ষন দাড়ালো, আশেপাশে কেউ আছে কিনা বোঝার জন্যে। খুব যে অন্ধকার, তা না। আকাশে মনে হয় চাঁদ আছে, কিন্তু কুয়াশাতে অত ভাল দেখা যাচ্ছে না। আর তাছাড়া আসার সময় কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে, সাথে কেউ আসতেছে। যাই হোক, কিছুক্ষন দাড়ায়ে থেকে যেই না চিন্তা করতেছে যে বাথরুম করতে বসবে এখন, ঠিক তখনি “ঝুপ” করে একটা শব্দ হল।

সাফিয়া ঘুরে নানীকে জিজ্ঞেস করলো যে, উনি কিছু কিছু শুনছে নাকি !! খাইরুন বেগম উল্টা বিরক্ত হয়ে বললেন যে, বনের ভিতরে আসছিস, শব্দ তো একটু হবিই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর।

সাফিয়া ভাবলো আসলেই তো তাই। বনের ভিতরে এমন শব্দ তো স্বাভাবিক।

হঠাৎ কি কারনে তখন তার চোখ চলে আমিন মামার বাড়ির পাশের বরই গাছের দিকে। চারিদিকেই কুয়াশা, কিন্তু একটু ভাল করে তাকিয়ে মনে হল, গাছটার উপর কিছু একটা বসে আছে, কুয়াশার থেকে একটু বেশি সাদা, ধবধবে সাদা রঙের। একটু ভাল করে তাকিয়ে থাকার পর সাফিয়ার মনে হল, ওটা জীবন্ত কিছু একটা, নড়তেছে এবং ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

নানী পেছন থেকে তাগাদা দেয় “কিরে, হইছে তোর?”

সাফিয়া তখন কিছুটা আবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে আছে বরই গাছটার দিকে। হঠাৎ তার মনে হল, ঐটা পাখি জাতীয় কিছু হবে হয়তো। কিন্তু কোন পাখি কি এত সাদা হয়?

এবার সে স্পষ্ট দেখলো, গাছের উপর থেকে ধবধবে সাদা জিনিসটা ধুপ করে নিচে পড়লো। একটা “ধপ” করে শব্দও শুনলো সে। নানী ততক্ষনে বুঝছে যে, কিছু একটা সমস্যা বোধ হয় হইছে। সে জিজ্ঞেস করলো, কিরে ঐদিকে তাকায়ে এতক্ষন ধরে কি দেখিস?

সাফিয়া বলল, নানী ঐখানে বরই গাছের নিচে কি ধবধবে সাদা রঙের কিছু দেখতেছো? খাইরুন বেগম চোখে খুবই কম দেখেন, এক চোখ প্রায় নষ্ট আর আরেক চোখে ছানি পড়া। তবে তিনি জানেন যে, ঐ বরই গাছটার আছে। আগেও শুনেছেন। একটু ঘাবড়ে গেলেও তিনি এগিয়ে এসে একটু তাকিয়ে থেকে নাতনীকে সাহস দিয়ে বললেন, ও কিছু না। সাদা কাপড়-টাপড় কিছু হবে, আমিনদের বাড়ি থেকে হয়তো উড়ে এসে পড়ে আছে, নয়তো দেখ গিয়ে ওদের শয়তান কুকুরটার কাজ। তুই তাড়াতাড়ি তোর কাজ শেষ কর।

সাফিয়া দেখলো, তার নানির কথা ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বলল, আচ্ছা নানী, ঠিক আছে, তুমি ঐ দিকে গিয়ে বস, আমি শেষ করে আসতেছি।

খাইরুন বেগম একটু সরে গিয়ে দাড়ালেন। সাফিয়া বাথরুম করার জন্যে আবার বসতে যাবে, ঠিক তখন ঐ সাদা কাপড়টার দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন ঐটা একটু উচু ঢিবির মত হইছে, আগে পুরাটাই মাটিতে লেপ্টে ছিল। একটু তাকিয়ে থেকে সাফিয়ার মনে হল, জিনিসটা জীবন্ত এবং আস্তে আস্তে নড়তেছে এবং উচু হচ্ছে, কিন্তু পুরাটাই সাদা কাপড়ে ঢাকা।

কিছুক্ষনের মাঝেই সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা প্রায় অর্ধেক মানুষ সমান উচু হয়ে গেল। সাফিয়া কিছুটা সম্মোহিতের মতই তাকিয়ে ছিল। ওর তাকিয়ে থাকা দেখে ওর নানী আবার জিজ্ঞেস করলো, কিরে তাকিয়ে আছিস কেন এখনো ঐদিকে?

সাফিয়া বলল, নানী জিনিসটা নড়তেছে আর আস্তে আস্তে বড় হইতেছে। খাইরুন বেগম বুঝলেন আর যাই হোক, জিনিসটা ভালো না, আর সুন্দরী মেয়েদের এরকম অনেক সময়ই হয়, এমনকি বিয়ের পরেও। তিনি শুনেই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, দেখি চলে আয় তো। তোর কিছু করা লাগবে না। চলে আয় আমার সাথে।

কিন্তু মনে হল, সাফিয়া ওর নানীর কথা শুনতে পেল না, কোন উত্তরও দিল না। খাইরুন বেগম বুঝলেন যে, অবস্থা সুবিধার না। এত রাতে কেউ পাশেও নেই যে, ডাক দিবেন। তিনি উঠে দাড়িয়ে সাফিয়ার দিকে যাওয়া শুরু করলেন। একটু অবাক হলেও তিনি লক্ষ করলেন, তার হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার শরীরের ওজন দুই মানুষ সমান, কিংবা ঘাড়ে কেউ বসে আছে। এবার তিনি ভয় পেলেন। ছোটবেলা থেকে অনেক কিছুই দেখেছেন, এমন কখনো হয়নি। তিনি জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলেন, আর তার নাতনীর দিকে এগুতে থাকলেন। কিন্তু এই কয়েক কদম পথ যেতেই তার যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার দশা।

অন্যদিকে, সাফিয়া তখন পুরোপুরি সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। সে দেখতেছে যে, সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা আস্তে আস্তে বড় হতে হতে প্রায় তার সমান লম্বা হয়ে গেছে। হঠাৎ তার মনে হল, এটা আর কেউ না, এটা সে নিজে। কাফনের ধবধবে সাদা কাপড়ে ঢাকা সে নিজে। হঠাৎ দেখলো জিনিসটা তার দিকে এগিয়ে আসা শুরু করেছে। খুব আস্তে আস্তে, কিন্তু এগিয়ে আসছে। ভয়ে তার আত্তি শুকিয়ে গেল। চেষ্টা করলো দৌড়ে পালানোর জন্যে। কিন্তু পা একটুও নাড়াতে পারলো না। যেন অনন্তকাল ধরে দাড়িয়ে আছে, নড়বার কোন শক্তিও নাই। সাদা কাফনের ভেতরে থাকা অন্য জগতের কেউ তাকে ছোয়ার জন্যে আসছে।

হঠাৎ বুঝলো, কেউ তার শরীর ধরে নাড়া দিচ্ছে। অনেক কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, তার নানী। অন্যদিকে খাইরুন বেগম তার নাতনীর চেহারা দেখে চমকে উঠলেন। সাফিয়ার চোখ এমনিতেই অনেক অনেক ভাসা-ভাসা। এখন যেন চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার দশা। উপরন্তু, সাফিয়া সাধারণ মেয়েদের থেকে বেশি লম্বা হওয়ায় আবছা অন্ধকারের মাঝে ওর পুরো চেহারায় একটা দানবীয় ভাব চলে এসেছে। খাইরুন বেগম জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়ছেন আর সাফিয়াকে ধরে ঝাকি দিচ্ছেন।

অন্যদিকে সাফিয়া বুঝতেছে তার এখন এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। তার নানী তাকে ক্রমাগত ঝাকাচ্ছে আর ডাকছে। কিন্তু ডাকটা মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে আসা। সে অনেক চেষ্টা করছে পা নাড়ানোর জন্যে। সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসটা তার দিকে এগুচ্ছে আস্তে আস্তে। আর কিছুক্ষনের মাঝেই সেটা মাঠ ছেড়ে বনের মাঝে চলে আসবে। তার পালানো উচিত। অনেক চেষ্টা করছে সে তার পা নাড়ানোর জন্যে। একটু পরে মনে হল, পায়ে একটু বল পাচ্ছে। কিন্তু সাদা জিনিসটাও মনে হল তার স্পিড বাড়িয়েছে। কিছুক্ষনের মাঝে সে পায়ে বল পুরোটাই ফিরে পেল। তখন সাদা জিনিসটা বেশ কাছে চলে এসেছে। হঠাৎই তার পায়ে যেন অসুরের বল চলে এল। নানীর হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে দিল দৌড়। পিছে ঘুরে দেখল, সাদা জিনিসটা তাদের থেকে একটু দূরে, পিছে পিছে আসছে, বেশ জোরে। সাফিয়া তখন দৌড়াচ্ছে। তার নানীও ভয় পেয়েছে, তাই সেও চেষ্টা করছিলো তাল রাখার জন্যে। কিন্তু সাফিয়ার গায়ে তখন যেন রাজ্যের শক্তি। সে তার নানীকে মোটামুটি হিচড়ায়ে নিয়ে এগিয়ে চললো। কিছুক্ষনের মাঝেই তারা তাদের বাড়ির উঠানের সীমানায় পৌছে গেল। সাফিয়া পিছে তাকিয়ে আর কিছু দেখলো না।

দৌড়ানোর পায়ের আওয়াজে সাফিয়ার খালার ঘুম ভেঙে গেছে। সেও ওদের সাথেই শুয়ে ছিল। সে তাকিয়ে দেখলো, পাশে তার মা আর সাফিয়া কেউই নেই, উল্টোদিকের জানালা দিয়ে বাড়ির বাইরে উঠানে সাফিয়ার মত লম্বা কাউকে দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে হারিকেন নিয়ে উনি বাইরে চলে এলেন। দেখলেন, তার মায়ের শাড়ী কয়েক জায়গা ছড়ে গেছে। সাফিয়া মাটিতে বসে দরদর করে ঘামছে আর হাপাচ্ছে। খাইরুন্নেসা অল্প কথায় তার মেয়েকে বোঝাচ্ছেন যে, ওদের সাথে কি হয়েছে। বাইরের উঠানে আলো আর কথার শব্দ শুনে বাড়ীর প্রায় সবাই জেগে গেছে।

সাফিয়া জানে না, সাদা জিনিসটা কি ছিল। জানার কোন কৌতুহলও তার  নাই। শুধু এইটুকু জানে, আজকে ওখান থেকে পালিয়ে না আসতে পারলে এই প্রিয় মানুষদের মুখ হয়তো আর দেখতে পেত না।