আজকে একটা ছেলেকে নিয়ে গল্প। ছেলে বলার থেকে বোধ হয় বালক বলাই শ্রেয়, নাম জিন্না। গল্পের শুরু ১৯৬৫ সালে। তখন জিন্নার বয়স ১১ বছর।
গ্রামের নাম আদনপুর। পুরোটাই গ্রাম জুড়েই বনে ভরা। মাঝে মাঝে জংলা পরিস্কার করে কিছু বাড়ীঘর গড়ে উঠেছে। তেমনই একটা বাড়ীতে জিন্না থাকে। জিন্নার বাবা খুলনা চিনিকলে অফিসার, তাই সে তার মা সহকারে সবসময়ই তার নানাবাড়িতেই থাকে।
নানাবাড়িতে সে ঘুমায় বারান্দায়, তার এক নানীর সাথে, খাদিজা বেগম। ঐ বাড়ীর চারিধারে পুরাটা জুড়েই জঙ্গল। হাঁসেলের (রান্নাঘরের আঞ্চলিক নাম) পিছে বিশাল উচু এক তালগাছ। আর বাড়িভর্তি আম-জাম গাছ তো আছেই।
সেদিন ছিল পূর্নিমার ৩-৪ দিন আগে। আকাশ ভর্তি চাঁদের আলো। আশ্বিন মাসের পুরা ঝকঝকা আকাশ। জিন্না বারান্দায় শুয়ে আছে। পাশে তার নানী গভীর ঘুম। জোস্নার আলো এতই বেশি যে, জিন্নার চোখে লাগতেছে। ঘুমও আসে না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে, আবার স্থির হয়ে শুয়ে থাকে, কিন্তু ঘুম আর আসে না।
একটু পরে মনে হল একটু ঝিমানী আসছে, তখনি জিন্নার মনে হল চোখের উপর দিয়ে যেন একটা সূর্য চলে গেল। প্রচন্ড তীব্র আলো। সাথে আলোর তাপ। চোখ মেলতে পারলো না আলোতে। একটু পরে যেন আলোটা তার কাছ থেকে একটু দূরে সরে যাওয়া শুরু করলো। জিন্না চোখ মেললো। আলোটা তখন চোখে পড়লো।
আলোটা বেশ বড়। অনেকটা বড় আগুনের গোলার মত, কিন্তু শবধবে সাদা রঙের। আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। এখন হাঁসেলের ছাদের উপর স্থির হয়ে আছে। সে ভয়ে নানীকে ডাকা দিল, “এ নানী, দেখতো এডা কি?”
পোলাপান মানুষ, খাদিজা বেগম কোন গুরুত্ব দিলেন না। ধমক দিয়ে বললেন, ঘুমা।
জিন্না তাকিয়ে দেখলো, আলোটা আস্তে আস্তে উপরে উঠতেছে আর ছোট হইতেছে। একটু পরে মনে হল, ওটা তালগাছে মাথার দিকে আগাচ্ছে। আলোটা খুব আস্তে আস্তে যাচ্ছে আর জিন্নাও অপলক দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। তাকিয়ে থাকতেই থাকতেই কিছুক্ষন পরে জিন্না কিভাবে যেন ঘুমায়ে গেল।
বোধ হয়, তখন মাঝরাত হবে। গ্রামের নিশুতি রাত। জিন্নার ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। ঘুম ভাঙলো প্রচন্ড ভয় নিয়ে। উঠে বসে রইলো ভয়ে। ভয়টা কি জন্যে, কিছুই মাথায় এলো না তার। কিন্তু ভিতরে ভয়টা এমন যা মৃত্যুর সময়েই বোধ হয় মানুষকে তাড়া করে ফিরে। সে বুঝতে পারলো, ভয়ে তার গলা-বুক শুকিয়ে গেছে, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু কি কারণে ?
তার কি কারনে যেন মনে হল, ঘুমানোর আগে ঐ আলোর জন্যেই হয়তো এই ভয়টা পেয়েছে। আশেপাশে এখন কোন আলো চোখে পড়লো না তার। হঠাৎ মনে পড়লো আলোটা ঐ সময় তালগাছের দিকে উঠতে দেখেছিল। মনে পড়তেই সে ঘুরে তালগাছের দিকে, তালগাছের মাথার দিকে।
ভয়ে মানুষের শিরদাঁড়াতে কাঁপুনি ধরার কথা সে শুনেছে, কিন্তু কখনো অনুভব করে নি। আজকে এখন তার মনে হল তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা ভয়ের একটা স্রোত বয়ে গেল। সে এইটাই বোধ হয় দেখেছিল আবছা ঘুমের ঘোরে, কিন্তু কি জিনিস, সেটা বোঝে নাই।
জিনিসটা যে কি, সেটা এখনও সে বোঝে নি। জিনিসটা লম্বায় তালগাছ থেকেও উচু। পুরাটা জিনিস আবছা কালচে কিছু দিয়ে ঢাকা। চাঁদের আলোতে বোঝা যাচ্ছে যে, সেই কালচে কিছুর নিচে সবসময়ই কিছু একটা নড়ছে। জিনিসটার মাথা এত উচুতে যে, চেহারা দেখা যায় না। তবে, উপর থেকে জিনিসটার চুল জাতীয় কিছু মাটি পর্যন্ত নেমে এসেছে। এটা যে চুল, তা বোঝা যাচ্ছে, কারন চাদের আলোয় একটু চিকচিক করছে।
জিন্নার বোধ হয় ভয়ের চোটে চিৎকার দেয়ার শক্তিটাও আর ছিল না। সে কিছুটা আবিষ্ট হয়ে তাকিয়েছিল। কি কারণে যেন আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে উঠানে এসে দাড়ালো। উপরে তাকিয়ে বুঝলো, জিনিসটা তার দিকে আস্তে আস্তে ঝুকতেছে। দৌড়ে পালানোর প্রবল ইচ্ছাটা থাকলেও কেন জানি তার পা দু’টো এক কদমও সরলো না।
জিন্না দেখলো, জিনিস আস্তে আস্তে নিচে ঝুকছে, তার দিকে। যেন তাকে ভালোভাবে দেখার জন্যে আসছে। এবার সে জিনিসটার মুখটা দেখতে পেলো। বিশাল মুখ। কিছুটা সাদাটে। চেহারার ভেতরটা নড়ছে, একটু পর পর মনে হচ্ছে ঐটা অন্য কেউ। জিনিসটা তার মুখ জিন্নার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আনছে, সে এখন জিনিসটার মুখের ভিতরের অনেক কিছুও দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সবই কালচে। সারা মুখের সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুতভাবে নড়ছে। জিনিসটা আরো কাছে আসছে, আরো কাছে, আরো কাছে।
এরপর জিন্নার আর কিছুই খেয়াল নাই। ঐ সময় তার নানীর ঘুম ভেঙে যায়। সে তাকিয়ে দেখে, আবছা ছায়া-ছায়ার মত বিশাল বড় কিছু একটা তার নাতিকে উচু করে আকাশের দিকে তুলে ধরে আছে। খাদিজা বেগমের ভয়াবহ চিৎকার কিংবা অন্য যে কারনেই হোক, জিনিসটা জিন্নাকে উপর থেকেই ফেলে দিয়ে হাওয়ায় মিলায়ে যায়। বাড়ীর সবাই ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে আসে। তখন জিন্নার অনবরত খিঁচুনি হচ্ছে আর মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। আর সারা শরীর আগুনে পোড়ার মত লাল হয়ে আছে।
জিন্নার জ্ঞান ফেরে পরের দিন। জিনিসটা কি ছিল, তা সে জানে না। জানার কখনো চেষ্টাও করেনি। হয়তো ওটা কোন দুঃস্বপ্ন ছিল, কিংবা নিছকই কল্পনা। কিন্তু জিন্না ঐ ঘটনার পরে তালগাছওয়ালা কোন বাড়ীতে কখনো রাত কাটায়নি। আর কখনো বারান্দাতে ঘুমায় নি।