মা…নুষের মতো…

আজকে একটা ছেলেকে নিয়ে গল্প। ছেলে বলার থেকে বোধ হয় বালক বলাই শ্রেয়, নাম জিন্না। গল্পের শুরু ১৯৬৫ সালে। তখন জিন্নার বয়স ১১ বছর।

গ্রামের নাম আদনপুর। পুরোটাই গ্রাম জুড়েই বনে ভরা। মাঝে মাঝে জংলা পরিস্কার করে কিছু বাড়ীঘর গড়ে উঠেছে। তেমনই একটা বাড়ীতে জিন্না থাকে। জিন্নার বাবা খুলনা চিনিকলে অফিসার, তাই সে তার মা সহকারে সবসময়ই তার নানাবাড়িতেই থাকে।

নানাবাড়িতে সে ঘুমায় বারান্দায়, তার এক নানীর সাথে, খাদিজা বেগম। ঐ বাড়ীর চারিধারে পুরাটা জুড়েই জঙ্গল। হাঁসেলের (রান্নাঘরের আঞ্চলিক নাম) পিছে বিশাল উচু এক তালগাছ। আর বাড়িভর্তি আম-জাম গাছ তো আছেই।

সেদিন ছিল পূর্নিমার ৩-৪ দিন আগে। আকাশ ভর্তি চাঁদের আলো। আশ্বিন মাসের পুরা ঝকঝকা আকাশ। জিন্না বারান্দায় শুয়ে আছে। পাশে তার নানী গভীর ঘুম। জোস্নার আলো এতই বেশি যে, জিন্নার চোখে লাগতেছে। ঘুমও আসে না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে, আবার স্থির হয়ে শুয়ে থাকে, কিন্তু ঘুম আর আসে না।

একটু পরে মনে হল একটু ঝিমানী আসছে, তখনি জিন্নার মনে হল চোখের উপর দিয়ে যেন একটা সূর্য চলে গেল। প্রচন্ড তীব্র আলো। সাথে আলোর  তাপ। চোখ মেলতে পারলো না আলোতে। একটু পরে যেন আলোটা তার কাছ থেকে একটু দূরে সরে যাওয়া শুরু করলো। জিন্না চোখ মেললো। আলোটা তখন চোখে পড়লো।

আলোটা বেশ বড়। অনেকটা বড় আগুনের গোলার মত, কিন্তু শবধবে সাদা রঙের। আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। এখন হাঁসেলের ছাদের উপর স্থির হয়ে আছে। সে ভয়ে নানীকে ডাকা দিল, “এ নানী, দেখতো এডা কি?”

পোলাপান মানুষ, খাদিজা বেগম কোন গুরুত্ব দিলেন না। ধমক দিয়ে বললেন, ঘুমা।

জিন্না তাকিয়ে দেখলো, আলোটা আস্তে আস্তে উপরে উঠতেছে আর ছোট হইতেছে। একটু পরে মনে হল, ওটা তালগাছে মাথার দিকে আগাচ্ছে। আলোটা খুব আস্তে আস্তে যাচ্ছে আর জিন্নাও অপলক দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে। তাকিয়ে থাকতেই থাকতেই কিছুক্ষন পরে জিন্না কিভাবে যেন ঘুমায়ে গেল।

বোধ হয়, তখন মাঝরাত হবে। গ্রামের নিশুতি রাত। জিন্নার ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। ঘুম ভাঙলো প্রচন্ড ভয় নিয়ে। উঠে বসে রইলো ভয়ে। ভয়টা কি জন্যে, কিছুই মাথায় এলো না তার। কিন্তু ভিতরে ভয়টা এমন যা মৃত্যুর সময়েই বোধ হয় মানুষকে তাড়া করে ফিরে। সে বুঝতে পারলো, ভয়ে তার গলা-বুক শুকিয়ে গেছে, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু কি কারণে ?

তার কি কারনে যেন মনে হল, ঘুমানোর আগে ঐ আলোর জন্যেই হয়তো এই ভয়টা পেয়েছে। আশেপাশে এখন কোন আলো চোখে পড়লো না তার। হঠাৎ মনে পড়লো আলোটা ঐ সময় তালগাছের দিকে উঠতে দেখেছিল। মনে পড়তেই সে ঘুরে তালগাছের দিকে, তালগাছের মাথার দিকে।

ভয়ে মানুষের শিরদাঁড়াতে কাঁপুনি ধরার কথা সে শুনেছে, কিন্তু কখনো অনুভব করে নি। আজকে এখন তার মনে হল তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা ভয়ের একটা স্রোত বয়ে গেল। সে এইটাই বোধ হয় দেখেছিল আবছা ঘুমের ঘোরে, কিন্তু কি জিনিস, সেটা বোঝে নাই।

জিনিসটা যে কি, সেটা এখনও সে বোঝে নি। জিনিসটা লম্বায় তালগাছ থেকেও উচু। পুরাটা জিনিস আবছা কালচে কিছু দিয়ে ঢাকা। চাঁদের আলোতে বোঝা যাচ্ছে যে, সেই কালচে কিছুর নিচে সবসময়ই কিছু একটা নড়ছে। জিনিসটার মাথা এত উচুতে যে, চেহারা দেখা যায় না। তবে, উপর থেকে জিনিসটার চুল জাতীয় কিছু মাটি পর্যন্ত নেমে এসেছে। এটা যে চুল, তা বোঝা যাচ্ছে, কারন চাদের আলোয় একটু চিকচিক করছে।

জিন্নার বোধ হয় ভয়ের চোটে চিৎকার দেয়ার শক্তিটাও আর ছিল না। সে কিছুটা আবিষ্ট হয়ে তাকিয়েছিল। কি কারণে যেন আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে উঠানে এসে দাড়ালো। উপরে তাকিয়ে বুঝলো, জিনিসটা তার দিকে আস্তে আস্তে ঝুকতেছে। দৌড়ে পালানোর প্রবল ইচ্ছাটা থাকলেও কেন জানি তার পা দু’টো এক কদমও সরলো না।

জিন্না দেখলো, জিনিস আস্তে আস্তে নিচে ঝুকছে, তার দিকে। যেন তাকে ভালোভাবে দেখার জন্যে আসছে। এবার সে জিনিসটার মুখটা দেখতে পেলো। বিশাল মুখ। কিছুটা সাদাটে। চেহারার ভেতরটা নড়ছে, একটু পর পর মনে হচ্ছে ঐটা অন্য কেউ। জিনিসটা তার মুখ জিন্নার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আনছে, সে এখন জিনিসটার মুখের ভিতরের অনেক কিছুও দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সবই কালচে। সারা মুখের সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুতভাবে নড়ছে। জিনিসটা আরো কাছে আসছে, আরো কাছে, আরো কাছে।

এরপর জিন্নার আর কিছুই খেয়াল নাই। ঐ সময় তার নানীর ঘুম ভেঙে যায়। সে তাকিয়ে দেখে, আবছা ছায়া-ছায়ার মত বিশাল বড় কিছু একটা তার নাতিকে উচু করে আকাশের দিকে তুলে ধরে আছে। খাদিজা বেগমের ভয়াবহ চিৎকার কিংবা অন্য যে কারনেই হোক, জিনিসটা জিন্নাকে উপর থেকেই ফেলে দিয়ে হাওয়ায় মিলায়ে যায়। বাড়ীর সবাই ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে আসে। তখন জিন্নার অনবরত খিঁচুনি হচ্ছে আর মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। আর সারা শরীর আগুনে পোড়ার মত লাল হয়ে আছে।

জিন্নার জ্ঞান ফেরে পরের দিন। জিনিসটা কি ছিল, তা সে জানে না। জানার কখনো চেষ্টাও করেনি। হয়তো ওটা কোন দুঃস্বপ্ন ছিল, কিংবা নিছকই কল্পনা। কিন্তু জিন্না ঐ ঘটনার পরে তালগাছওয়ালা কোন বাড়ীতে কখনো রাত কাটায়নি। আর কখনো বারান্দাতে ঘুমায় নি।

অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি

“আমার কোন সমস্যা নেই”।

মতিনের কথা শুনে শুভ্র কিছুক্ষণ কপাল কুচকে উত্তর দিলো – তোর আসলেই কোন সমস্যা নেই, সিরিয়াসলি? তোকে চিনি ছোটবেলা থেকে, কিন্তু ইদানীং তোকে আগের মত মেলানো যায় না। বুঝতেছি, তোর লাইফের উপর দিয়ে একটা ঝড় চলে গেছে। কিন্তু…

– কিন্তু, কি? তোকে মিলাতে বলতেছে কে? আমি তো তোকে বলি নাই যে, আমি বিপদে পড়ছি, আমাকে হেল্প কর!!

মতিনের এই উত্তরে শুভ্র একটু কষ্ট পেলেও কিছু বলে না। যদিও, ওর সাথে মতিন এভাবে কথা বলবে, এটা ও আশা করে নাই। মতিন ওর ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে পড়েছে। ভার্সিটিতে যদিও আলাদা ডিপার্টমেন্টে ছিল, তারপরও যোগাযোগটা খুব ভালোই ছিল। রোজ সন্ধ্যায় আড্ডা দেয়া, মতিনের বাসায়ও ওর নিয়মিত যাতায়াত, মতিনের গাড়িতেই শুভ্র প্রথম ড্রাইভিং শিখেছে। ভার্সিটির গরমের ছুটিতে ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঘুরতে যাওয়া একটা নেশার মত ছিল। এমনকি মতিনের প্রেমিকাও ছিল শুভ্র’র ডিপার্টমেন্টের, ওদের ৩ বছরের জুনিয়র ব্যাচের, পায়েল। ছটছটে ধরনের একটা মেয়ে, সে তুলনায় মতিন অনেকটা চুপচাপ ধরনের। ওদের পরিচয়ের শুরু থেকে প্রপোজ করা পর্যন্ত শুভ্র’র ভূমিকাও অনেক। সামনের শীতে মতিন আর পায়েল বিয়েটা সেরে ফেলবে, এমন প্লান করছিল। তবে, এখন মতিনের সাথে কথা বলাটাই টাফ। সবসময়ই মেজাজ খারাপ থাকে ওর। যদিও এর পেছনে কারনটাও শুভ্র জানে, কিন্তু কিছু করার নাই।

মাসখানেক আগে পায়েলকে নিয়ে মতিন মাওয়াঘাটে ঘুরতে গিয়েছিল। মতিন নিজেই গাড়ী ড্রাইভ করছিল। যদিও ঐদিন পায়েল বলছিল যে, ওর শরীর ভাল লাগছে না, মাথার ভিতর কেমন যেন লাগছে। তারপরও মতিনের আগ্রহ দেখে সে আর না করে নাই। ওখানে পৌছে গাড়ি থেকে নামার সময় পায়েলের কিছু একটা হয়, নামার সাথে সাথে একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। মতিন তখনো গাড়ি থেকে নামতেও পারেনি। চিৎকার শুনে আশেপাশের মানুষ এসে উল্টা মতিনকে ধরে। তারা ধরে নেয় যে, মতিন গাড়ির ভেতর মেয়েটার সাথে খারাপ কিছু একটা করেছে। মতিন অনেক কষ্টে ওদেরকে বুঝায়ে পায়েলের কাছে যেতে পারে। কিন্তু গিয়ে দেখে, ওর কোন সাড়াশব্দ নেই, কোনভাবেই ওর জ্ঞান ফেরাতে পারে না। তাড়াতাড়ি ওকে গাড়িতে নিয়ে ওখানে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়। ডিউটি ডাক্তার দেখে বলে, তাড়াতাড়ি ঢাকায় নিতে।

ঢাকায় আনার পর হাসপাতাল থেকে বলে, রোগী কোমায় চলে গেছে। ডাক্তার বলে দেয়, উপরওয়ালাকে ডাকেন, সবই উনার হাতে। সম্ভবত cerebral embolism হয়েছিল কোনভাবে, সেখান থেকে ম্যাসিভ স্ট্রোক। ১১ দিনের মাথায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে পায়েলের জ্ঞান ফেরে। পায়েলের বাসার সবাই তখন হাসপাতালের ICU এর বাইরেই ছিল, তবে মতিন ছিল না। ঐ ১১ দিন মতিন হাসপাতাল ছেড়ে যায় নি, ঘুমাইছেও কিনা সন্দেহ আছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, বয়স ১০ বছর বেড়ে গিয়েছে। পায়েলের মা ঐদিন সন্ধ্যায় জোর করে মতিনকে বাসায় পাঠিয়েছিল, ঘুমানোর জন্যে।

মতিন বাসায় গিয়ে কাপড়-চোপড় না ছেড়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। মাঝরাতে “পায়েলের জ্ঞান ফিরেছে” শুনে ঐ অবস্থাতেই আবার দৌড় দেয়। পায়েলের জ্ঞান ফেরার পর ডাক্তাররা বলে যেন একজন করে রোগীর সাথে দেখা করতে যায়, রোগীর অবস্থা খুব ভালো না, তবে সবাইকে দেখতে চাইছে, কিন্তু কেউ যেন কোনভাবেই কান্নাকাটি না করে ভিতরে গিয়ে। সবাই একে একে ভিতরে গিয়ে পায়েলকে দেখে আসে।

পায়েলের মা প্রথমে গিয়েছিলেন। উনি ভিতরে গেলেও মেয়ের পাশ ছেড়ে আর আসেন নাই। নার্সরা বললেও উনি বারবার বলছিলেন, সবার সাথে দেখা করা শেষ হলে উনিও বের হয়ে যাবেন। কয়েকজন ঘুরে যাওয়ার পর পায়েল তার মাকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, মতিন আসে নি?

পায়েলের মা, মনিরা বেগম একটু ভেবে উত্তর দিলেন, এই কয়দিন এখানেই ছিলোরে মা। ছেলেটা এই কয়দিন ঘুমায়ও নি। আজকে একটু ওকে বাসায় পাঠিয়েছি। জানিয়েছি ওকে, এইতো চলে এল বলে। কথা বলা শেষ করতে না করতেই মনিরা বেগম দেখলেন, তার মেয়ের মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল। ঐ সময়টাতে কয়েকটা মেশিন একসাথে শব্দ করে উঠলো। পায়েলের মা ভয় পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। একজন নার্স এসে উনাকে ওখান থেকে সরিয়ে বাইরে দিয়ে গেল। অন্যদেরও জানায়ে গেল, অবস্থা ভালো না।

মতিন ICU এর সামনে এসে দেখে, সবাই হাউমাউ করে কাঁদতেছে। মতিন ICU এর গেট ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে। নার্স বলে তাকে বের হয়ে যেতে, কিন্তু তখনি পায়েলের বেড থেকে ডাক্তার ডাক দিলে নার্স সেদিকে দৌড় দেয়। মতিন সে সময় পায়েলের বেড থেকে এক বেড দূরে দাঁড়ানো। ডাক্তার-নার্স পায়েলকে বাচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর মতিন সেখানে হতবিহব্বল চোখে পায়েলের দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড পরে পায়েল ঘাড় ঘুরিয়ে মতিনের দিকে তাকায়। অক্সিজেনের টিউব নাকে নিয়েও মুখে একটা হাসি দেয়ার চেষ্টা করে। একটা হাত মতিনের দিকে বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। পারে না, হাতটা আবার বিছানার উপর পড়ে যায়। উপরের মেশিনটা দেখায়, হার্ট-বিট ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। মুখে তখনো হাসিটা লেগে আছে, তবে চোখের মণিটা স্থির হয়ে আছে আর জ্যোতিটা কেমন যেন চলে গেছে।  ডাক্তাররা তখন ডিফিব্রিলেটর দিয়ে চেষ্টা করতেছে ওর হার্ট চালু করার। প্রতিবার শকে পায়েলের শরীর কেপে ঊঠছে। কয়েকবার চেষ্টা করে উনারা হাল ছেড়ে দেয়। একজন হাতের ঘড়িতে টাইম দেখে, “টাইম অফ ডেথ ভোর চারটা চল্লিশ”। মতিন তখনো পায়েলের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু ছোট ছোট পায়ে পায়েলের কাছে যায়। নার্সরা এখন আর বাধা দেয় না। মতিন্ বেডের পাশে গিয়ে পায়েলের হাতটা ধরে। পায়েলের কাছে এলে ওর শরীর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ পেত আগে। সেটা আজ আর পায় না, পরিবর্তে হাসপাতালের কটু গন্ধ নাকে আসে। ওর চুলের গন্ধ নেয়ার জন্যে মুখটা ওর কপালের কাছে নেয়। চুলের গন্ধটা এখনো সামান্য আছে। কপালে একটা চুমু দেয়। চুলের মাঝে হাত দিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে ওভাবে। শুনতে পায় বাইরে কান্নার আওয়াজ। নার্সরা ডাক দেয়, ওরা বডি সরাবে বেড থেকে, এতজন আত্মীয়কে ICU তে ঢুকতে দেয়া যাবে না। একটু আগেও পায়েলের সম্বোধন ছিল “পেশেন্ট” আর এখন সেটা হয়ে গেছে “বডি”। জীবন আসলেই হয়তো এতখানিই ঠুনকো। মতিন পায়েলের হাত ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে যায়, পায়েল তখনো হাসিমুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পরে নার্স গিয়ে পায়েলের চোখ বন্ধ করে দেয়। আর মুখটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়।

এরপরের ঘটনাগুলো অনেক দ্রুত ঘটে। পায়েলের পরিবার কখনো না বললেও মতিন মনে মনে নিজেকেই দায়ী করে পায়েলের মৃত্যুর জন্যে। যদিও ডাক্তারদের মতামত ছিল, এটা আগে থেকে জানা পসিবল ছিল না। মতিন সবার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। একটা প্রাইভেট ফার্মে এক্সিকিউটিভ ছিল সে। ওই চাকরিও ছেড়ে দেয় কিছুদিন পরে। অদ্ভুত এক অস্থিরতা ভর করে ওর উপর। মতিনের বাসা থেকে ওকে জোর করে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠায়। একগাদা ঘুমের ওষুধ ধরায়ে দেয় ওকে। কয়েকদিন ওষুধ খেয়ে আর কন্টিনিউ করে না। বলে, ওষুধ খেলে ও পায়েলকে মনে করতে পারে না।

শুভ্র এসব নিয়ে সবকিছুই জানে। মতিনকে বুঝিয়েছেও বেশ কয়েকবার। তাই, আজকে নতুন করে আর কিছু বলে না। শুধু বলে – দোস্ত, আমি জানি তুই ভাল নেই। অন্তত, আমার সাথে শেয়ার কর। জানি, হয়তো কিছুই করতে পারবো না। কিন্তু, তোর কথা শোনার জন্যে আমার সময় নাই, এমন কথা তো কখনো বলি নাই। বল, বলেছি?

মতিন কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে- না, বলিস নাই।

তারপর আস্তে আস্তে বলে, – তুই এখন যা, শুভ্র। আমার তোর সাথে এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না। যখন কথা বলতে ইচ্ছে করবে, তোকে নক করবো। বলে মতিন আস্তে আস্তে উলটা দিকে হাটা শুরু করে। শুভ্র ওর পথের দিকে তাকিয়ে রইলো, কিছুক্ষন পরে রিকশা নিয়ে নিজের কাজে চলে গেল।

মানুষ আর মানুষের জীবন কারো জন্যে আটকে থাকে না, সময়ের সাথে এগিয়ে যায়। তবে, অনেক সময় কিছু মানুষ অতীতের সাথে এমনভাবে আটকে যায় যে, তারা অতীত ছেড়ে আর বর্তমানে ফিরতে পারে না।

=প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি=

পায়েল চলে যাওয়ার পরে মতিন নিজের ভিতরে পুরো একা হয়ে যায়। ওর নিজের ধারণার বাইরে ছিল যে, সে পায়েলকে এতখানি ভালবাসে। মাঝে মাঝে মনে হত, নিজের একটা অংশ পায়েলের সাথে কবরে চলে গেছে। বাসাতেও কারো সাথে তেমন কথা বার্তা বলে না। চাকরিতে পারফর্মেন্স ভালো ছিল, তাই অফিস থেকে কিছুদিন সাপোর্ট দেয় ওকে। কিন্তু, একদিন হঠাৎ অফিসে গিয়ে ও রিজাইন লেটার দিয়ে আসে। তাও কারো সাথে কথা না বলে।

এরকম অবস্থা ওর বাসা থেকে মেনে নিতে পারে না স্বভাবতই। শুভ্রকেও একদিন ডাকে মতিনের মা। শুভ্র খুব বেশি হেল্প করতে পারে না, কারন তার নিজের সাথেই এখন মতিনের যোগাযোগ খুবই কম। অন্য সব বন্ধুর সাথেও তাই। মতিনের বড়ভাই জিজ্ঞেস করে যে, মতিন ড্রাগস নেয়া শুরু করেছে কিনা। শুভ্র চুপ করে থাকলেও একটু পরে বলে যে, তার মনে হয় না, মতিন ঐ পথে যাবে।

মতিনের ভাই চেষ্টা করতে থাকে যে, মতিনকে কোন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নেয়া যায় কিনা। সমস্যা হল, মতিনের সাথে কথা বলাই মুশকিল। কিছু বললেই ক্ষেপে গিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তারপর কয়েকদিন আর বাসায় ফেরে না। পায়েল মারা যাওয়ার পর ছয়মাসে ইতিমধ্যে চারবার এই কাহিনি করেছে। ওদিকে মতিনের মা গোপনে মতিনের বিয়ের জন্যে মেয়েও দেখা শুরু করে।

মতিন একদিন রাতে বাসায় ঢুকার পর ওর মা ডাক দেয়। সে বসার ঘরে গিয়ে দেখে, ৩ জন অপরিচিত লোক বসে ওর ভাই আর মায়ের সাথে কথা বলতেছে। মতিনের মা ওকে বসতে বলে। মতিন বসে এবং মিনিট দুয়েকের মাঝে বুঝে যায় যে, ওর বিয়ের বিষয়ে কথা চলছে। ভিতরে কিছুটা রেগে গেলেও কিছু বলে না। এটা নতুন কিছু না। ওর কয়েকজন বন্ধু, এমনকি শুভ্রও এর মাঝে চেষ্টা করেছে অন্য কারো সাথে মতিনকে রিলেশনে জড়ানোর। লাভ হয়নি তেমন।

শুভ্র যার সাথে মতিনকে জড়ানোর চেষ্টা করছিল, মেয়েটার নাম নাবিলা, দেখতে বেশ সুন্দর, ছিমছাম, পায়েলের বয়সী এবং ওর মতই বেশ চটপটে। মতিন প্রথমদিন কথা বলেই বুঝে, শুভ্র অনেক চিন্তাভাবনা করে নাবিলাকে মতিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কারন, অনেক কিছুই মিল পাচ্ছিল পায়েলের সাথে। প্রথমদিন দেখা হওয়ার সময় নাবিলা একটু ভালো লাগার পরেও মতিন আর যোগাযোগ করে নি। এর মাঝে শুভ্র একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, মতিন উত্তর দেয় – মেয়েটাকে ভালো মনে হইছে, কিন্তু ওর জন্যে আমি ভালো না। আমি প্রতি মুহূর্তেই ওকে পায়েলের সাথে তুলনা করছিলাম যেটা নাবিলার জন্যে অপমান বলে মনে হইছে আমার কাছে। তাই আর যোগাযোগ করি নি। আমার অপরাধের ঘানি আরেকজন আমার সাথে টানবে কি জন্যে।

শুনে শুভ্র তেমন আর কিছু বলতে পারেনি।

মতিন জানে, অন্য কারো সাথে তার পক্ষে জড়ানো সম্ভব না। কারন, কোন মেয়েই একটা ছেলেকে মেনে নিতে চাইবে না, যে কিনা একজন মৃত মানুষের স্মৃতি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। তাই রেগে গেলেও ওর মা আর বড়ভাইকে  বিয়ে নিয়ে কিছু বলে না। যে কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে গেলে, মেয়ে সব শুনে এমনিতেই পিছিয়ে যাবে।

সেদিন রাতে মতিন মেয়েপক্ষের সাথে বেশ ভালভাবেই কথা বলল। ওর মা আর ভাই মনে মনে বেশি খুশি ছিল এই বিষয়টা নিয়ে। মতিন মেয়ের সাথে দেখা করতেও রাজি হল। মেহমান চলে গেলেও মতিন কারো সাথে তেমন চিল্লাচিল্লি করলো না, যেটা আগে করতো। মতিনের মা যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

সমস্যা বাধলো পরের দিন সকালে। মতিনের ভাতিজি রুমে গিয়ে ওকে না পেয়ে ওর বাবাকে বললো। মতিনের ভাই তখন শুধু বাড়ী নয়, পুরো এলাকা খুজেও মতিনকে পেল না। এমনকি মোড়ের গার্ডরাও নাকি মতিনকে দেখে নাই। মতিনের পরিবার ঐ পাড়াতে আছে ৪০ বছরের উপর। মোটামুটি সবাইই তাদের চিনে। মতিনের ভাই হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ী ফিরে গেল, ভাবলো, মতিন আবার উধাও হয়ে গেছে। কয়দিন পর হয়তো আবার চলে আসবে।

তবে, এটা কেবল শুরু ছিল। মতিন এবার আর ৩-৪ দিন পরে ফিরে এলো না। যেন হঠাৎ করেই মতিন সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেলো। সবাই ভেবেছিল, আগের মতই কয়েকদিন পরে ফিরে আসবে, কিন্তু কেউ এলো না। দিনের পরে সপ্তাহ গেল। মতিন ফিরে এলো না। শুভ্র চেষ্টা করেছিলো, সবার সাথে যোগাযোগ করে বের করার যে, মতিন যদি কারো সাথে যোগাযোগ করে থাকে। পুলিশে জানানো হলো। তারাও কিছু পেল না। শুভ্র ফেসবুকে লেখালেখি করলো, মতিনকে খুজে বের করতে। সবার সাহায্য চাইলো। কেউ কেউ চেষ্টা করলোও, কিন্তু মতিনকে পাওয়া গেল না। এভাবে মাসের পর মাস গেল, তারপর বছর। মতিনের মা ছেলের শোকে একবছর পর মারা গেলেন। শুভ্র আরো কয়েক বছর লেগে থাকলো, কিছু পেল না। পরে আস্তে আস্তে সেও নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এর ভেতরে ও নিজেও নাবিলার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আসলে নাবিলা জানতে চেয়েছিল মতিনের বিষয়ে। একটু একটু করে কথা বলতে বলতে শুভ্র আর নাবিলা দুজনেই বুঝে যে, তারা একে অন্যের কতটা কাছে চলে এসেছে। বাসাতেও অমত করে না। মতিন নিরুদ্দেশ হওয়ার কয়েক বছর পরেই নাবিলার সাথে শুভ্র’র বিয়ে হয়ে যায়। বছর খানেকের মাঝে ওদের মাঝে চলে আসে প্রথম সন্তান। অন্যদিকে, মতিনের ভাই নিজের ব্যবসা আর পরিবার সামলাতেই হিমসিম খেতে থাকে। শুধু মতিনের ভাতিজি কয়েক বছর মতিনের জন্মদিনটা পালন করতো। আস্তে আস্তে সেও বড় হতে থাকলো আর সেও নিজের ফ্রেন্ড সার্কেলে অভ্যস্ত হয়ে গেল। এভাবে মতিউর রহমান মতিনের নামটা আস্তে আস্তে দুনিয়ার বুক থেকে বিস্মৃত হয়ে গেল। জীবনটা সম্ভবতঃ সবার জন্যেই এরকম, মানুষের স্মৃতিতেই বেচে থাকে। স্মৃতি শেষ হয়ে যাওয়া মানেই কারো আসল মৃত্যু হয়ে যাওয়া।

=দ্বিতীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি=

শুভ্র আর নাবিলার সংসারের বয়স প্রায় ১০ বছর হতে চললো। সামনের মে মাসে anniversary। ওদের ছেলে, মতিনের বয়স ৮ বছর হতে চললো। শুভ্র’র বন্ধু, মতিন হারিয়ে যাওয়ার ৫ বছর পরে ওদের ছেলের জন্ম হয়। প্রিয় বন্ধুর নামেই ছেলের নাম রাখে শুভ্র। নামের কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক, ছেলে মতিন বেশ চুপচাপ স্বভাবের, যেন বন্ধু মতিনের সাথে সামান্য হলেও মিল আছে।

তবে, শুভ্রর জীবন গত ১০ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিধাতা সৌভাগ্যের প্রায় সবটুকুই শুভ্রকে ঢেলে দিয়েছেন। ২ বছর চাকরি করে বিয়ের পরে শুভ্র নিজের ব্যবসা শুরু করে। শুরুতে নাবিলা আরেকটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে সংসার চালিয়েছে। কিন্তু, বছর কয়েকের মাঝেই শুভ্র বিজনেসে ভাল করা শুরু করে। ওদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। এত অল্প বয়সে শুভ্র ইতিমধ্যে ৪টা ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করেছে। আরেকটার জন্যে জমি কেনা শুরু করেছে। নাবিলা বাইরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুভ্র’র সাথেই কোম্পানিতে জয়েন করেছে, ফিন্যান্স ডিভিশন চালায় ও।

সামনে ওদের বিবাহবার্ষিকী আসতেছে, মে মাসের ১৫ তারিখ। আগের দিন শুভ্র অফিসে যাওয়ার সময় দেখলো, ওদের বাড়ীর সামনে বড় একটা জটলা। ওর তাড়া ছিল, দাড়ানোর সময় নেই। রাতে এসে গেট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলো, সকালের জটলা নিয়ে। দারোয়ান জাহাঙ্গীর বললো, আর বইলেন না, স্যার। সকাল সকাল এক রাস্তার লোক এসে বলে, সে নাকি আপনার সাথে কথা বলবে। সে নাকি আপনার ফ্রেন্ড, নামটা কি যেন বললো…মতিন। জ্বি স্যার, মতিন। আমি তো হো হো করে হাসতে হাসতে খুন। মতিন তো আমাদের ছোট স্যারের নাম। যতই বলি, দেখা হবে না, সে ততই গো ধরে বসে থাকে যে, সে আপনার সাথে দেখা না করে যাবে না। স্যার মনে হয়, পাগল।

শুভ্র অনেকক্ষন ধরে জাহাঙ্গীরের কথা শুনছিল। ১৩ বছর হতে চললো, মতিন হারিয়ে গেছে। ও এখনো বুঝতে পারছে না, জাহাঙ্গীর আসলেই কি বলছে। আসলেই কি মতিন এসেছিল? জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেস করে, সেই মতিন কোথায় এখন? খুজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয়? জাহাঙ্গীর বললো, স্যার যেমনে পাগলামো করতেছিল, মনে হয় স্যার এখনো আশেপাশেই আছে। খুজে দেখতেছি, স্যার।

জাহাঙ্গীর গেট খুলে খুজতে গেল। শুভ্র পাজেরো থেকে নেমে কিছুক্ষন দাড়ালো ওখানে। ওর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, মতিন ফিরে আসতে পারে! কোথায় থাকতে পারে ও এতদিন?

ভাবতে ভাবতেই জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন মাথা নিচু করে আরেকজন ঢুকলো।

শুভ্র’র বন্ধু মতিন।

শুভ্র কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে, ১৩ বছর পর মতিনের সাথে ওর দেখা আর মতিন ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আগের মতই আছে, শুধু বয়সটা বেড়ে গেছে একটু। চুল দাড়িতে পাক ধরেছে। তবে, হারিয়ে যাওয়ার আগের উদভ্রান্ত ভাবটা নাই। মতিনই আগে কথা বললো – শুভ্র, কেমন আছিস?

শুভ্র বুঝে পাচ্ছে না, কি বলবে। মতিনকে ও পাগলের মত খুজেছে একসময়। কোথাও পায়নি। এত বছর পর সামনে মতিন দাড়িয়ে আছে, বিশ্বাস হচ্ছে না। আস্তে করে বললো, আছি। তুই কেমন আছিস? এতদিন কোথায় ছিলি?

মতিন – সে অনেক কথা। বলবো আস্তে আস্তে। আজকেই এসেছি এখানে! থাকার জায়গা নাই। তাই ভাবলাম, তোকে খুজে বের করি। তোর তো দেখছি, এলাহী ব্যাপার স্যাপার।

শুভ্র – তাহলে চল। বাসায় চল।

মতিন বাসায় গিয়ে নাবিলাকে দেখে চিনতে পারলো, যেন আগে থেকেই জানত যে, শুভ্র আর নাবিলার বিয়ে হয়েছে। তবে, শুভ্র’র ছেলের নাম মতিন, শুনে একটু অবাক হল। কথায় কথায় শুভ্র জিজ্ঞেস করলো – মতিন, তোর কি অবস্থা? বিয়ে থা করেছিস? কিছু তো জানি না তোকে নিয়ে।

মতিন – জানবি কিভাবে? এখানে ছিলাম নাকি?

শুভ্র – কোথায় গেছিলি তুই। এমন কোন জায়গা নাই, তোকে খুজি নাই।

মতিন – পায়েলকে খুজতে খুজতে আরেক জগতে চলে গেছিলাম। এতদিন ওখানেই ছিলাম। আমাদের সংসারেও এক ছেলে আছে। ওর নাম সাব্বির। কালকে রাতে হঠাৎ দেখি, তোদের জগতে চলে আসছি। এই দেখ ওদের ছবি।

বলে একটা ছবি শুভ্র’র দিকে বাড়ায়ে দেয়। শুভ্র হাতে নিয়ে ছবিটা দেখে, ছোট সাইজের প্রিন্ট, অনেকটা মানিব্যাগে রাখার সাইজ। মতিনের সাথে একটা মেয়ে শাড়ী পড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর সাথে একটা ছেলে। মেয়েটা যে পায়েল, এতে শুভ্র’র কোন সন্দেহ নাই। মধ্যবয়সী, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এটা পায়েল। শুভ্র কি বিশ্বাস করবে, বুঝতে পারলো না।

মতিন বলে, জানি তোর বিশ্বাস হবে না। তবু দেখালাম। খুব ঘুম পাচ্ছে, কাল কথা বলি, চল। শুভ্র ভদ্রতার খাতিরে বললো, হ্যা অবশ্যই। কিন্তু, খাওয়া দাওয়া করবি না?

মতিন বলে, নাহ, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। কালকে রাত থেকে আর ঘুমানো হয়নি। ঘুমানোর জায়গা পায়নি আসলে। শুভ্র বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। চল, গেস্ট রুমে গিয়ে ঘুম দে। পরে খাওয়ার সময় ডাক দিবো তোকে।

মতিনকে রুমে দিয়ে শুভ্র কপাল কুচকে ওর নিজের রুমে এল। ছবিটা ওর হাতে এখনও আছে। নাবিলাকেও দেখালো। ২ জনের কেউই বুঝতেছে না, কি হয়েছে। পায়েল বললো, ঘুম থেকে উঠলে মতিন ভাইয়ের সাথে কথা বলে দেখো।

কিন্তু, খাবার আগে শুভ্র ডাকতে গিয়ে মতিনকে আর খুজে পেল না। পুরো বাড়ী, এমনকি সিকিউরিটি ক্যামেরা ঘেটেও কিছু পেলো না। ১৩ বছর আগের মত আবার যেন মতিন হারায়ে গেছে। হঠাৎ করে ছবিটার কথা মনে পড়লো। গিয়ে দেখলো, ছবিটা এখনো আগের জায়গায় আছে। আগের তিনজন মানুষ এখনও ছবিতে আছে। শুভ্র মাথায় চুপচাপ বসে রইলো। মতিনের আসা, চলে যাওয়া, আর এই ছবি – কোন কিছুরই ব্যাখ্যা তার কাছে নাই। কেউ কি তাকে বোঝাবে?

==========================সমাপ্তি==============================