পিতা – ১

“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”

ফজলু ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকাবে নাকি চিন্তা করে। একটু চিন্তা করে না তাকানোটাই ঠিক বলে মনে হয় তার কাছে। তাই সে আর পিছনে ফিরে না তাকিয়ে আবার হাটা শুরু করে।

ফজলু সাধুগঞ্জ বাজারের দিকে যাচ্ছে। বাজারটা আগে অনেক ছোট ছিল। ৫-৬ বছর আগেও বর্ষাকালে বাজারের রাস্তায় কাঁদার চোটে হাঁটা যেত না। আর সৈয়দ মেম্বারের মুদির দোকানটা বাদ দিলে আর কোন বড় দোকানও ছিল না। এখন বাজারের আর সেই দিন নেই। লোকে-লোকে লোকারন্য হয়ে গেছে। এখন আশপাশের দশ গ্রামের মাঝে সাধুগঞ্জ বাজারই সবচেয়ে বড়।

ফজলু বাজারে রইস আলীর দোকানে চাকরি করে। রইস আলীর বাজারে কয়েকটা দোকান আছে। ফজলু কাপড়ের দোকানটাতে বসে। তার কাজ হল দোকানের হিসাব-নিকাশ দেখাশোনা করা। পাশাপাশি রইস আলীর সব দোকানের সার্বিক হিসাবেও সাহায্য করে। পয়সাকড়ির দিক দিয়ে রইস আলী খুবই কৃপণ হলেও কি কারণে যেন ফজলুকে তিনি খুবই বিশ্বাস করেন। তবে এটাও সত্যি যে, ফজলু তার সাথে কখনো বেঈমানী করে নাই।

আজ সোমবার। এখনও ফজরের আযান হয়নি। গতকাল রবিবার বাজারে হাটবার ছিল। ফজলু সাধারনত হাটবারের রাতে দোকানেই থাকে। সব দোকানের হিসাবের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় রাত ২-৩ টা বাজে। তারপর দোকানের চৌকির উপরই পাটি-বালিশ পেতে ঘুমিয়ে যায়।

আজ রাতে ফজলের ঘুম আসছিল না। চৈত্র মাসের গরম একটা কারণ হতে পারে। তাই ফজলু ভাবলো নদী থেকে গোসল করে আসার জন্যে। বাজার থেকে নদীর ঘাট ১০ মিনিটের হাটা পথ। দোকান বন্ধ করে সে বেড়িয়ে পড়লো। নদীর ঘাটে এসে একটা গামছা পড়ে নদীতে নেমে গেল।

ফজলের নদী নিয়ে এক ধরনের ঘোরের মত আছে। নদীতে নামলেই সে তার দম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাঁতার কাটে। আর ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাসের কারণে অনেক সময় অনেকদূরে চলে যায়। আজকে পানিতে নামার পড়ে ফজলের কেমন যেন লাগলো। কেন যেন মনে হল, বেশি দূরে যাওয়া ঠিক হবে না। ফজলু এমনি কোন সময় এইসব বিষয় পাত্তা দেয় না। কিন্তু আজ কেন যেন তার মনে হল, থাক আজকে না হয় নাইবা গেলাম।

আজকে আর সাঁতার কাটবে না ভেবে সে পানিতে ডুব দিল। ডুব দেয়ার পরপরই পানির নিচ থেকে তার মনে হল কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকলো। ফজলু ভাবলো, কেউ বোধ হয় ঘাটে এসেছে আর তাকে দেখে ডাক দিয়েছে। দ্রুত পানির উপরে এসেই বললো “কে?”

কিন্তু তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। ঘাটে তো নাইই, আশেপাশে কোথাওই কেউ নেই। সে মনে ভুল ভেবে আবার পানিতে ডুব দিলো।

এবার স্পষ্ট গলা। “কি, ফজলু মিয়া, কথা কও না ক্যান?” ফজলু পানির মাঝ থেকে একেবারে লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু উপরে উঠে দেখে কেউ নেই। ফজলু ভয় পেল কিনা, নিজেও ঠিক বুঝলো না। গ্রামে তার সাহসের তারিফ করে সবাই। আর গরিবের ছেলে হওয়ায় পড়ালেখাতে ভালো থাকলেও খরচ চালাতে না পেরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, বাবা আর বড়ভাই দুইজনই মারা যাই একই বছরে। যদিও এখন সে সংসারে একা, মা মারা গেছে গতবছর আর বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। তার বাড়িতে সে একাই থাকে। কোনদিন কোথাও ভয় পায়নি। আসলে পায়নি বলা ঠিক হবে না। ফজলু মনে করে, সে ভয় পাওয়া থেকে ভয় পাওয়ার কারণ নিয়ে চিন্তা করে বেশি। আর কারণ ধরতে পারলে সব কিছুরই প্রতিকার করা যায়। এই চিন্তা করার পদ্ধতিটা ও শিখেছিল স্কুলে, বিজ্ঞানের সমাদ্দার স্যারের কাছে। স্যার বছর দুই হলো, মারা গেছেন। ফজলুকে দেখে আফসোস করতেন, এত মেধাবী একটা ছেলে, দোকানে কাজ করে বেড়াচ্ছে।

সমাদ্দার স্যারের এই শিক্ষার কারনেই হোক, কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক, অন্য কেউ হলে যেখানে ভয়ে দৌড় দিত, ফজলু তখন নদীপাড়ে বসে চিন্তা করতে লাগলো যে সে শুনলোটা কি?

হঠাৎ করে মনে আসলো যে, আজ সোমবার, হাটবারের পরের দিন। এই দিন রইস আলী ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই দোকানে চলে আসে, আগেরদিনের হিসাব দেখার জন্যে। তাড়াতাড়ি দোকানে ফেরা দরকার। ফজলু উঠে গামছা পড়েই প্যান্টটা গলায় ঝুলিয়ে হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।

নদীর কিনার ধরে আসতে আসতে রাস্তায় উঠতেই ফজলু স্পষ্ট শুনলো,

“ঐ ফজলু মিয়া, কই যাও?”

কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ফজলের মাথায় অনেক কিছু খেলে গেল। তারপর পিছনে না ফিরে সে আগের মতই হাঁটা ধরলো বাজারের দিকে।

বাজারের দিকের রাস্তাটা একটু পরেই গিয়ে ক্ষেতের মাঝে পড়েছে। ক্ষেতের মাঝে মানে রাস্তার দু’ধারে যতদূর চোখ যায়, শুধু মাঠ। রাস্তাটা অনেকখানি উঁচু মাঠ থেকে। বর্ষাকালে আউশের ক্ষেত ডুবে যায়, কিন্তু রাস্তাটা ডোবে না। কৃষকেরা হাঁটু পানিতে শুয়ে পড়ে থাকা ধান কেটে নিয়ে যায়। অঞ্চলে সবারই বাড়িঘর গ্রামের একপাশে আর অন্যপাশ দিয়ে এই বিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা। বৃষ্টির সময় নদী আর এই বিল এক হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সাগরের মাঝ দিয়ে আরেক দ্বীপে রাস্তাটা চলে গেছে। এই জন্যেই বোধ হয় ফজলের গ্রামের নাম ভাসানগা। তবে এই রাস্তাটা খুব যে লম্বা, তাও না। আধা কিলো, এক কিলো মত হবে হয়তো। ভাসানগা থেকে সাধুপুর বাজার প্রায় এক কিলোর একটু বেশি। শুকনো মৌসুমে বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায় আর থাকে শুধু নদী।

ফজলু বেশ জোরে জোরে পা চালাচ্ছে। আজকে কি সে ভয় পেয়েছে নাকি দোকানে তাড়াতাড়ি পৌছানোর জন্যে, সেটা পরিস্কার না। আগেও একবার এরকম হয়েছে। সেটা যদিও অনেক আগের কথা।

তখন সে ক্লাস টেনে পরে সম্ভবত। এরকম সময়েরই ঘটনা, মানে চৈত্র মাসে। সে রাতে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিল তার বড়ভাইয়ের নৌকা নিয়ে। বেশ অনেকদূর চলে গিয়েছিল। দুই ধারে শুধু ক্ষেত। কোন মানুষজনও নেই। সে তখন জাল তুলে বিছাইতেছে। ওইদিন মাছ পাচ্ছিল না। সেজন্যে মেজাজও একটু খারাপ ছিলো। এমন সময় হঠাৎ কে যেন জিজ্ঞেস করলো, “কি ফজলু মিয়া, এই কয়ডা মাছ দিয়া চলবো??” ফজলু মাথা না তুলেই বললো “হ, নদীর মাছ আজকে মনে হয় পলাইছে। এতগুলা খ্যাপ মারলাম, মাছই পাইলাম না।” এই বলে মাথা তুলে দেখে কেউ নেই। সে মনে করেছিল, পাশ থেকে কোন নৌকা যাওয়ার সময় মাঝি কথাগুলো বলছিল।

ফজলু টান পায়ে হাঁটছে। কিছুক্ষণের মাঝেই বাজারে পৌছে গেল। বাজারের মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে দোকানে ঢুকে কাপড় ছেড়ে আজকে না ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, একটু পরেই রইস আলী চলে আসবে। শুধু শুধু বিছানা পাতার ঝামেলা করা ঠিক হবে না।

Leave a comment